বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/দ্বিতীয় গল্প/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

সুন্দর বনের অদ্ভুত জীব।

 আমার নিকট হইতে ইহাঁরা যখন হ্যাণ্ডনোট লিখিয়া লইলেন, তখন আমি মনে মনে ভাবিলাম, “যত পার হ্যাণ্ডনোট লিখিয়া লও। উপুর হস্ত কখন আমি করিব না। নালিশ করিবে? ডিক্রি করিবে? ডিক্রি ধুইয়া খাইও। কি বেচিয়া লইবে বাপু?”

 বস্তুতঃ এ হ্যাণ্ডনোটের একটা পয়সাও আমাকে দিতে হয় নাই। ইহার কিছুদিন পরে গোলোক বাবু কর্ম্ম ত্যাগ করিয়া কাশী চলিয়া গেলেন। সে স্থানে তাঁহার ও তাঁহার স্ত্রীর মৃত্যু হইল। টাকা সম্বন্ধে তাঁহার পুত্র অনেকবার আমাকে পত্র লিখিয়াছিলেন। তাহার উত্তর আমি দিই নাই। দাঁড়াও! একবারেই যে টাকা আমাকে দিতে হয় নাই, তাহা নহে। দুইটা ছুঁড়ী! সে কথা পরে বলিব।

 হর ঘোষ আমাকে দোকান হইতে ছাড়াইয়া দিলেন। সে জন্য আমি কিছুমাত্র দুঃখিত হইলাম না। মনে জানি যে, আমার সেই তেরশত টাকা আছে। পূর্ব্বেই মনে মনে স্থির করিয়াছিলাম যে, সেই টাকা দিয়া হয় জমিদারি কিনিব আর না হয় ব্যবসা করিব, কিন্তু যতদিন ঐ হ্যাণ্ডনোটের ভয় থাকিবে ততদিন কিছু করিব না।

 আমার শ্বশুর মহাশর বলিলেন,—“তোমাকে আর আমার বাড়ীতে আসিতে দিব না। আজ হইতে জানিলাম যে, আমার কন্যা বিধবা হইয়াছে। তোমার মুখ দেখিলেও পাপ হয়, আর জন্মে অনেক পাপ করিয়াছিলাম, সে জন্য তোমা হেন ইতরের হাতে আমি কন্যা দিয়াছি। তোমার ঘরে আমি কন্যা পাঠাইব না।”

 আমি ভাবিলাম যে,—“বটে, এখন আমার পুঁজি হইয়াছে, কি করিয়া অর্থ সঞ্চয় করিতে হয়, হর ঘোষের বাড়ীতে তাহা আমি শিখিয়াছি। যেমন করিয়া পারি আমি ধনবান্ হইব, টাকা হইলে কেহ তখন জিজ্ঞাসা করে না যে, অমুক কি করিয়া সম্পত্তিশালী হইয়াছে। জাল করিয়া হউক, চুরি করিয়া হউক, যেমন করিয়া লোক বড় মানুষ হউক না কেন, অমুকের টাকা আছে, এই কথা শুনিলেই ইতর ভদ্র সকলেই গিয়া তাহার পদ লেহন করে, সকলেই তাহার পায়ে তৈল মর্দ্দন করে, রও, একবার আমার টাকা হউক, তখন দেখিব যে, তুমি বাছাধন আমার বাড়ীতে ফ্যান চাটিতে যাও কি না।” অবশ্য এ সব মনের চিন্তা প্রকাশ করিলাম না, কিন্তু যথাকালে আমার সে ভবিষ্যদ্‌বাণী পূর্ণ হইয়াছিল।

 আমার শ্বশুর মহাশয়ের রাগের আর একটা কারণ ছিল, মালতীকে আমি, যে পাঁচশত টাকার গহনা দিয়া দিয়াছিলাম, তাহা একশত টাকায় ক্রয় করিয়াছিলাম। দুইখানি ব্যতীত সমুদয় অলঙ্কার কেমিকাল সোণার অর্থাৎ গিল্টির গহনা ছিল। সুতরাং গহনাগুলি পাইয়া গোলোক বাবুর বিশেষ লাভ হয় নাই।

 হর ঘোষের দোকান হইতে বাহির হইয়া কিছুদিন আমি সুন্দরবনের এক আবাদে চাকরি করিয়াছিলাম। সেই সময় আবাদ সম্বন্ধে আমার অভিজ্ঞতা জন্মিল। কিছুদিন পরে যখন হ্যাণ্ডনোটের ভয় যাইল, তখন নিজের জন্য আমি একটী আবাদ খুঁজিতে লাগিলাম। খুঁজিতে খুঁজিতে শুনিলাম যে, দূরে নিবিড় বনের নিকট এক আবাদ সুলভ মূল্যে বিক্রয় হইবে। যাঁহার আবাদ, তাঁহার নিকট গিয়া সমুদয় তত্ত্ব আমি অবগত হইলাম। তিনি বলিলেন যে, এই আবাদ তিনি পাঁচ হাজার টাকায় ক্রয় করিয়াছিলেন। নোনাজল প্রবেশ নিবারণের নিমিত্ত ইহাতে তিনি ভেড়ি অর্থাৎ বাঁধ বাঁধিয়াছিলেন, পানীয় জলের নিমিত্ত পুষ্করিণী খনন করিয়াছিলেন, বন পরিষ্কার করিয়াছিলেন, দুই চারি ঘর প্রজাও বসাইয়াছিলেন, কিন্তু সহসা তাঁহার বাঁধ কয়েক স্থানে ভাঙ্গিয়া গেল, আবাদের ভিন্ন নোনা জল প্রবেশ করিল, প্রজাগণ পলায়ন করিল, সে আবাদ পুনরায় বনে আবৃত হইয়া পড়িল। পুনরায় উঠিত করিবার টাকা তাঁহার নাই। সেজন্য তিনি আবাদ বিক্রয় করিয়া ফেলিবেন। এই সম্পত্তি তিনি পাঁচ হাজার টাকায় ক্রয় করিয়াছিলেন। এক্ষণে এক হাজার টাকা পাইলে ছাড়িয়া দিবেন। আমি একখানি নৌকা ভাড়া করিয়া সে স্থান দেখিতে যাইলাম। কিন্তু বাঘের ভয়ে নৌকা হইতে নীচে নামিলাম না। এ অঞ্চলে তখন অধিক আবাদ হয় নাই, চারিদিক্ বনে আবৃত ছিল, সে জন্য বিলক্ষণ বাঘের ভয় ছিল। নৌকার উপর হইতে স্থানটী দেখিয়া আমার মনোনীত হইল। মনে ভাবিলাম যে, একটু বিপদের আশঙ্কা না থাকিলে এরূপ সম্পত্তি হাজার টাকায় পাওয়া যায় না। মোহর প্রদান করিয়া ভগবান্ আমার প্রতি কৃপা প্রকাশ করিয়াছেন। আমার পড়তা খুলিয়া গিয়াছে। একটু যত্ন করিলেই এই আবাদে পরে সোণা ফলিবে। আরও ভাবিলাম যে, আমার কাছে পূর্ব্বে হইতেই তের শত টাকা ছিল। তাহার পর আবাদে কাজ করিয়া আরও পাঁচ শত টাকা সঞ্চয় করিয়াছি। এক হাজার টাকা দিয়া সম্পত্তি ক্রয় করিলে আমার কাছে আট শত টাকা থাকিবে। ভেড়ি বাঁধিতে, বন কাটিতে, প্রজা বসাইতে এই আট শত টাকা খরচ করিব। তাহার পর মাছের তেলে মাছ ভাজিব, অর্থাৎ ইহার আয় হইতেই বাকী ভূমি উঠিত করিব। এইরূপ ভাবিয়া চিন্তিয়া সে বিষয় আমি ক্রয় করিলাম। তাহার পর শুন বিপত্তির কথা। বলে।

আবাদে কাজ করিবার সময় একজন সাঁইয়ের সহিত আমার আলাপ হইয়াছিল। মন্ত্রবলে যাহারা বাঘ দূর করিতে পারে, এরূপ লোককে সাঁই বলে। বড়গোছের একখানি নৌকা ভাড়া করিলাম। তাহাতে ছয়জন মাঝি ছিল। আবাদে কোথায় কি করিতে হইবে, তাহা দেখিবার নিমিত্ত সাঁই ও আমি যাত্রা করিলাম। আমার আবাদের পাশেই এক গাঙ ছিল। এই নদী দিয়া পূর্ব্ব ও পশ্চিম বঙ্গের নৌকা যাতায়াত করিত। আমি ও সাঁই ও তিনজন মাঝি লাঠিসোটা লইয়া নৌকা হইতে নামিলাম। আবাদের এদিক্ ওদিক কিয়ৎপরিমাণে ভ্রমণ করিলাম। অনেক ভূমি বনে আবৃত, সকল স্থান দেখিতে পারিলাম না। যে যে স্থানে বাঁধ ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল, তাহা দেখিলাম। পুষ্করিণীটী উচ্চ ভূমিতে ছিল, তবুও কতক পরিমাণে তাহার ভিতর জোয়ারের নোনাজল প্রবেশ করিয়াছিল। যে কয়জন কৃষক বাস করিয়াছিল, একখানি ব্যতীত আর সকলের ঘর ভূমিসাৎ হইয়া গিয়াছিল। সেই একখানি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিতে আমার ইচ্ছা হইল। কিন্তু একটু আগে গিয়া দেখিলাম যে, একটী মৃত ব্যাঘ্র সেই স্থানে পড়িয়া রহিয়াছে। কিছুক্ষণ তাহার নিকট দাঁড়াইয়া আমরা দেখিতে লাগিলাম। আমার সাঁই বলিল যে, এ ব্যাঘ্রটীকে অন্য কোন সাঁই মন্ত্রবলে বধ করিয়া থাকিবে। কারণ ইহার শরীরে গুলি অথবা অন্য কোন অস্ত্র চিহ্ন নাই।

 তাহার পর কৃষকের ভগ্ন গৃহ অভিমুখে আমরা গমন করিলাম। এ ঘরখানির চারিদিকে প্রাচীর ও উপরে চাল ছিল, কিন্তু ঘরের দ্বারে আগড় অথবা কপাট ছিল না, যেই আমরা দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়াছি, আর ঘরের ভিতরে বন্ বন্ করিয়া শব্দ হইতে লাগিল। প্রথম মনে করিলাম যে, লক্ষ লক্ষ মৌমাছির গুন্ গুন্ রব। ভিতরে হয়তো বৃহৎ একটা চাক হইয়াছে। কিন্তু পরক্ষণেই যাহা দেখিলাম, তাহাতে ঘোরতর আশ্চর্য্যান্বিত হইলাম। কালো কালো চড়াই পাখীর হায় শত শত কি সব দেয়ালের গায়ে বসিয়া আছে। তাহাদের সর্ব্ব শরীর কালো, কিন্তু পেটগুলি রক্তবর্ণের। তাহাদের দুইটী করিয়া ডানা আছে, উড়িবার নিমিত্ত ডানাগুলি নাড়িতেছে। তাহাতেই এরূপ বন্ বন্ শব্দ হইতেছে, রক্তবর্ণের কোন দ্রব্য খাইয়া পেট পূর্ণ করিয়াছে, সে জন্য উড়িতে পারিতেছে না। এ কি জীব? কিছুই আমরা বুঝিতে পারিলাম না। যে জীব হউক, এই জীবই রক্তপান করিয়া ব্যাঘ্রটীকে বধ করিয়া থাকিবে। এই সময়ে সাঁই এক বড় নির্ব্বোধের কাজ করিয়া বসিল, লাঠি দ্বারা মাটীতে আঘাত করিয়া শব্দ করিল। গুটিদশ জীব যাহারা সম্পূর্ণভাবে উদর পূর্ণ করিয়া রক্তপান করে নাই, প্রাচীরের গা হইতে উড্ডীয়মান হইল। সাঁই সকলের অগ্রে ছিল, জীব কয়টী তাহার গায়ে আসিয়া বসিল, প্রাণ গেল, প্রাণ গেল, বলিয়া সাঁই দৌড়িল, দশ হাত না যাইতে যাইতে সাঁই ভূতলে পতিত হইয়া ছট্‌ফট্‌ করিতে লাগিল।