বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/দ্বিতীয় গল্প/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

একশত মোহর।

 ইহার পর ছয় মাস পরম সুখে অতিবাহিত হইয়া গেল। পাশেই শ্বশুরবাড়ী। সে স্থানে সর্ব্বদাই আমার নিমন্ত্রণ হইত। আমার আদরের সীমা ছিল না, যখন আহার করিতে বসিতাম, তখন এটা খাই কি সেটা খাই, সর্ব্বরাই এই গোলে পড়িতাম। এত দ্রব্য তাঁহারা আমার সম্মুখে দিতেন।

 কিন্তু চিরদিন সমান যায় না। একদিন বেলা নয়টার সময় আহার করিয়া দোকানে যাইবার উদ্যোগ করিতেছি, এমন সময় আমার শ্বশুর- বাড়ীর নীচে তলায় ঠিক আমার ঘরের পাশের ঘরে একটা ভয়ানক কোলাহল পড়িয়া গেল। আমি পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে, আমার শ্বশুরবাড়ীর নীচের তলায় গোলোক বাবু নামে আমাদের একজন স্বজাতি বাস করিতেন। এ বাড়ীতে আমার ঘর, সে বাড়ীতে তাঁহার ঘর, ঠিক গায়ে গায়ে ছিল। এ বাড়ীতে আমার ঘর যেরূপ স্যাঁত সেঁতে কদর্য্য ছিল, গোলোক বাবুর ঘর সেরূপ ছিল না। তাঁহার ঘরটী খট—খটে শুষ্ক ফিট্‌-ফাট্ ছিল। তিনি নিজে সরকারী আফিসে কাজ করিতেন, পশ্চিমে কোথায় তাঁহার পুত্র কাজ করিত। তাঁহার অবস্থা নিতান্ত মন্দ ছিল না। গোলোক বাবুর বয়স হইয়াছিল। কলিকাতায় কেবল তিনি নিজে ও তাঁহার বয়স্কা গৃহিণী থাকিতেন। গোলোক বাবুর ঘরেই এই কোলাহল হইয়াছিল।

 গোল শুনিয়া আমি আমার শ্বশুরবাড়ীতে দৌড়িয়া যাইলাম, মনে করিলাম হয় তো কোন বিপদ্ ঘটিয়া থাকিবে। সেস্থানে গিয়া দেখিলাম যে, আমার শ্বশুরবাড়ীর সমুদয় লোক নীচে আসিয়াছেন। আমাকে দেখিয়া মালতী উপরে পলায়ন করিল। অন্যান্য স্ত্রীলোকেরা ঘোমটা টানিয়া দিলেন। আমার শ্বশুর মহাশয়ের নিকট শুনিলাম যে, গোলোক বাবুর পুত্র মাঝে মাঝে পিতার নিকট টাকা পাঠাইতেন। পিতা সেই টাকায় মোহর গাঁথাইয়া তাঁহার ঘরের প্রাচীরের গায়ে যে আলমারি আছে, একটা বগ্‌লি অর্থাৎ থলি করিয়া তাহার ভিতর রাখিয়া দিতেন। ক্রমে ক্রমে তিনি এক শত মোহর গাঁথাইয়া আলমারির ভিতর রাখিয়াছিলেন। ঘরের প্রাচীরের গায়ে আলমারি, তাহাতে চারিটী তক্তার খোপ ছিল, সম্মুখে কাঠের কপাট ছিল, কপাট সর্ব্বদা চাবি বন্ধ থাকিত। গোলোক বাবুর এই এক শত মোহর চুরি গিয়াছিল। তাহার জন্যই এ গোলমাল। গোলোক বাবু মনের দুঃখে নীরবে বসিয়া আছেন, তাঁহার স্ত্রী কাঁদিতেছেন। কবে চুরি গিয়াছে, তাহা তিনি বলিতে পারেন না। তিনি বলিলেন যে, এক বৎসর পূর্ব্বে ঐ মোহরগুলি তিনি আলমারির ভিতর রাখিয়াছিলেন। তাহার পর আর তিনি নূতন মোহর ক্রয় করিতে পারেন নাই। তিনি বলিলেন যে, এ ঘরে কেবল তিনি ও তাঁহার স্ত্রী থাকেন, অন্য কেহ এ ঘরে প্রবেশ করে না। সেজন্য কাহাকেও তিনি সন্দেহ করিতে পারেন না। আমার শ্বশুর মহাশয় পুলীশে খবর দিবার প্রস্তাব করিলেন। কিন্তু আমি তাহাতে আপত্তি করিলাম। আমি বলিলাম যে, —“কখন কবে চুরি গিয়াছে, তাহার কোন ঠিক নাই, কাহারও প্রতি গোলোক বাবুর সন্দেহ হয় না, তখন মিছামিছি পুলীশে আর সংবাদ দিয়া কি হইবে?” পুলীশে আর সংবাদ দেওয়া হইল না।

 সন্ধ্যার পর যখন আমি দোকান হইতে ফিরিয়া আসিলাম, তখন আমার শ্বশুর প্রহ্লাদ বাবু আমাকে ডাকিয়া বলিলেন,—“ডমরুধর! বড় বিপদের কথা। পাশের বাড়ীতে তুমি যে ঘরে বাস কর, আর এ বাড়ীতে গোলোক বাবু যে ঘরে বাস করেন, এই দুই ঘরের কেবল একটা প্রাচীর, দুই ঘরের কড়ি সেই এক দেওয়ালের উপর। গোলোক বাবুর ঘরে যেস্থানে সে আলমারি আছে, সে স্থানের দেওয়ালটা কাজেই অতিশয় পাতলা। আজ তিনি আলমারির ভিতর ভাল করিয়া অনুসন্ধান করিতেছিলেন, যেস্থানে তিনি মোহর রাখিয়াছিলেন, তাঁহার হাত লাগিতেই সেই স্থানের দেওয়ালটা ভাঙ্গিয়া গেল। তখন তিনি দেখিলেন যে, সে স্থানে দেওয়ালে ইট ছিল না, কেবল একটু বালি খাম ছিল। সেই বালি ভাঙ্গিয়া প্রাচীরে ফুটা হইয়া গেল। দুই ঘরের এক দেওয়াল, সুতরাং সেই ছিদ্র তোমার ঘরেও হইল। তোমার উপর এখন বিলক্ষণ সন্দেহ হইয়াছে। যদি মোহরগুলি তুমি বাপু লইয়া থাক, তাহা হইলে আস্তে আস্তে ফিরিয়া দাও। তাহা হইলে সকল কথা মিটিয়া যাইবে। তা না হইলে বড় গোলমাল হইবে।”

 এই কথা শুনিয়া আমি যেন আকাশ হইতে পড়িলাম। আমি বলিলাম,—“সে কি মহাশয়! আমি ভদ্রসন্তান, আমি চোর নই। তাহার পর আপনি আমার শ্বশুর। আমাকে ওরূপ কথা বলিবেন না।”

 তাহার পর গোলোক বাবু নিজে এবং তাঁহার গৃহিণী আমাকে অনেক মিনতি করিয়া বলিলেন,— “বাপু! ভুল ভ্রান্তিক্রমে যদি মোহরগুলি তোমার হাতে পড়িয়া থাকে, তামাসা করিয়া যদি রাখিয়া থাক, তাহা হইলে ফিরিয়া দাও, তোমার পায়ে পড়ি মোহরগুলি ফিরিয়া দাও।”

 তাঁহাদের উপর আমি রাগিয়া উঠিলাম। আমি বলিলাম যে,—“আমাকে আপনারা চোর বলেন! আপনারা ভাল মানুষ নহেন।” ইত্যাদি।

 ক্রমে এ কথা আমার মনিব হর ঘোষের কাণে উঠিল। মোহর ফিরিয়া দিতে তিনিও আমাকে অনেক অনুরোধ করিলেন। আমি তাঁহাকে বলিলাম,—“মহাশয়! আজ কয় বৎসর আপনার দোকানে কাজ করিতেছি, আর কয় বৎসর আপনার বাটীতে বাস করিতেছি। একটা পয়সা কথন কি আপনার লইয়াছি? আমার প্রতি সন্দেহ হয়, এমন কাজ কখন কি আমি করিয়াছি?”

 দিন কয়েক বিলক্ষণ গোল চলিল। দেখ, লম্বোদর! মানুষ হাজার বুদ্ধিমান্ হউক, এরূপ কাজে একটা-না-একটা ভুল করে। আমিও তাহাই করিয়াছিলাম। এ অনেক দিনের কথা হইল, এখন আর প্রকাশ করিতে দোষ নাই। প্রকৃত ঘটনা এই হইয়াছিল,—মশার দৌরাত্ম্যে রাত্রিতে আমার নিদ্রা হইত না। অনেক কষ্টে পাঁচ সিকা দিয়া একটা মশারি কিনিয়াছিলাম। মশারিটা খাটাইবার নিমিত্ত দেওয়ালে একদিন পেরেক মারিতেছিলাম! পেরেক মারিতে হঠাৎ দেওয়ালের কতকটা বালি ভাঙ্গিয়া পড়িল। সেই স্থানটীতে একটা ছিদ্র হইল। ছিদ্রের ভিতর আমি হাত দিলাম। হাতে কি এক ভারি দ্রব্য ঠেকিয়া গেল। বাহির করিয়া দেখিলাম যে, মোহরপূর্ণ এক বগলি। তৎক্ষণাৎ আমি আমার ঘরের দ্বার বন্ধ করিয়া দিলাম। তাহার পর পুনরায় গর্ত্তের ভিতর হাত দিয়া দেখিলাম যে, তাহার অপর পার্শ্বে কাঠ, হাতে সেই কাঠ ঠেকিয়া গেল। তখন ইহার অর্থ কিছু বুঝিতে পারিলাম না। কিন্তু তাহার পর প্রকাশ হইল যে, আমার ঘরের ও গোলোক বাবুর ঘরে এক প্রাচীর, প্রাচীরের অপর পার্শ্বে গোলোক বাবুর ঘরে আলমারি, আমার হাতে আলমারির কপাট ঠেকিয়াছিল।

 বলা বাহুল্য যে, মোহরগুলি পাইয়া আমার যেন স্বর্গ লাভ হইল। চুপি চুপি সেই গুলি গণিতে লাগিলাম। পাছে শব্দ হয়, সেজন্য একটী একটী করিয়া গণিলাম একশত মোহর। চিরকাল পরিশ্রম করিলেও কখন আমি এত টাকা উপার্জ্জন করিতে পারিতাম না। দেখিলাম যে, এ সে কালের মোহর নহে, বিলাতি মোহর, যাহাকে লোকে গিনি বলে। পরদিন একটু বালি ও চূণ আনিয়া দেওয়ালের ছিদ্রটা বুজাইয়া দিলাম। তাহার পর বাজারে গিয়া মোহরগুলি বিক্রয় করিলাম। পনরশত টাকার অধিক হইল। দেশে গিয়া তের শত টাকা কোন এক নিভৃত স্থানে পুতিয়া রাখিলাম। বিবাহের নিমিত্ত বাকী টাকা কাছে রাখিয়া দিলাম। মোহর যে গিয়াছে, ভাগ্যে গোলোক বাবু ছয় মাস পর্য্যন্ত দেখেন নাই। যে সময় মোহর আমার হস্তগত হইয়াছিল, সে সময় যদি তিনি খোঁজ করিতেন, তাহা হইলে আমার আর বিবাহ হইত না।

 বলিতেছিলাম যে, এই মোহর সম্বন্ধে আমি একটা ভুল করিয়াছিলাম। বড় বাজারে আমাদের কাপড়ের দোকানের পার্শ্বে এক পোদ্দারের দোকান ছিল। সেই দোকানে আমি মোহরগুলি বিক্রয় করিয়াছিলাম। একটু দূরে গিয়া যদি এ কাজ করিতাম, তাহা হইলে আর বিশেষ কোন গণ্ডগোল হইত না। পাশেই দোকান, সে জন্য পোদ্দারের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে আমার মনিব হর ঘোষ মহাশয় আমি যে মোহর বেচিয়াছিলাম, তাহা জানিতে পারিলেন। প্রহ্লাদ বাবুকে তিনি বলিয়া দিলেন। সকলে জটলা করিয়া আমাকে মোহর বিক্রয়ের টাকা গোলোক বাবুকে দিতে বলিলেন। আমি বলিলাম যে,—“এ মোহর আমার মায়ের ছিল। মৃত্যুকালে মা আমাকে দিয়া গিয়াছিলেন। বিবাহে ও অন্যান্য বিষয়ে মোহর বিক্রয়ের টাকা আমি খরচ করিয়া ফেলিয়াছি। সে টাকা এখন আমি কোথায় পাইব, আর যদি থাকিত, তাহা হইলে কেনই বা দিব।”

 অবশ্য আমার একথা তাঁহারা বিশ্বাস করিলেন না। যখন নিতান্ত আমার নিকট হইতে তাঁহারা টাকা আদায় করিতে পারিলেন না, তখন আমাকে পুলীশে দিবার নিমিত্ত তাঁহারা স্থির করিলেন। আমি মনে মনে ভাবিলাম,—“তাহাতে ক্ষতি কি? এক বৎসর কি দুই বৎসর যদি আমার জেল হয়, তাহা হইলে মেয়াদ খাটিয়া পরে সেই টাকা লইয়া কোনরূপ ব্যবসা করিব। আর এখন যদি টাকাগুলি দিয়া দিই, তাহা হইলে আমার দশা কি হইবে? ভগবান্ আমাকে মোহরগুলি দিয়াছেন! সে টাকা ফিরিয়া দিলে আমার মহাপাতক হইবে।”

 কিন্তু আমাকে পুলীশে দেওয়া হইল না। আমার শাশুড়ী ঠাকুরাণী কাঁদিয়া কাটিয়া কুরুক্ষেত্র করিলেন! অবশেষে সকলে মিলিয়া আমার নিকট হইতে গোলোক বাবুর পুত্রের নামে এক হাজার টাকার হ্যাণ্ডনোট লিখিয়া লইলেন। আর আমি মালতীকে যে গহনাগুলি দিয়াছিলাম, প্রহ্লাদ বাবু সেগুলি গোলোক বাবুকে দিয়া দিলেন। তাঁহারা আরও অনুসন্ধান করিয়া জানিলেন যে, আমার বিবাহের সময় যে জমি জোরাত বাগান বাগিচার কথা বলিয়াছিলাম, সে সমুদয় মিথ্যা।