বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/দ্বিতীয় গল্প/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

শূন্যপথে লোহার সিন্দুক।

আমাদের গ্রাম হইতে সাত ক্রোশ দূরে কচপুরের স্বরূপ সরকেলের সহিত আমার আলাপ পরিচয় ছিল। কাপড়ের দোকানে যখন কাজ করিতাম, তখন তিনি আমাদের খরিদদার ছিলেন। কাপড়ের দাম লইয়া তিনি বড় হেঁচড়া-হিঁচড়ি কচলা-কচলি করিতেন না। তিন সত্য করিয়া ধর্ম্মের দোহাই দিয়া আমি তাঁহাকে বলিতাম যে, “আপনার নিকট হইতে কখনও আমি এক আনার অধিক লাভ করিব না।” কিন্তু ফলে তাঁহাকে বিলক্ষণ ঠকাইতাম। আমি ব্যবসাদারের চাকর ছিলাম। দোকানদারদের রীতি এই। আলাপী লোকেরা আমাদিগকে বিশ্বাস করে, আলাপী লোককে ঠকাইতে দোকানদারদের বিলক্ষণ সুবিধা হয়। বড় বাজারে বসিয়া প্রতিদিন হাজার হাজার মিথ্যা কথা বলিতাম; শত শত লোককে আমরা ঠকাইতাম। না ঠকাইলে আমাদের কাজ চলে না। এই সূত্রে সরকেল মহাশয়ের সহিত আমার আলাপ পরিচয় হইয়াছিল। সরকেল মহাশয়ের একটু জমিদারি আছে, তাহা ব্যতীত তিনি তেজারতি করেন। আমি ভাবিলাম যে, তাঁহার নিকট হইতে এক হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করিয়া আমি আমার আবাদের পতিত ভূমি উঠিত করিব।

 এইরূপ মনে করিয়া আমি সরকেল মহাশয়ের ভবনে গমন করিলাম। আবাদ বাঁধা রাখিয়া তাঁহার নিকট এক হাজার টাকা ঋণ চাহিলাম। তিনি বলিলেন যে, “আবাদ না দেখিয়া টাকা দিতে পারি না।” একজন গমস্তাকে আমার আবাদ দেখিতে পাঠাইলেন। সাতদিন পরে পুনরায় আমাকে যাইতে বলিলেন। এই সময় আমি দেখিলাম যে, সেই গ্রামে দুইজন সন্ন্যাসী আসিয়াছেন। সরকেল মহাশয়ের বাড়ীর বাহিরে তাঁহারা আড্ডা গাড়িয়াছেন। তাঁহাদের সহিত তিনটী ঘোড়া ও বৃহৎ এক কৃষ্ণ প্রস্তর নির্মিত কালীর প্রতিমা আছে। দিনের মধ্যে তিনবার শঙ্খ ও শিঙ্গা বাজাইয়া তাঁহারা দেবীর পূজা করেন। সমস্ত দিন অনেক লোক আসিয়া প্রতিমা দর্শন করে। খুব ধুম! যে পর্য্যন্ত সন্ন্যাসী মহাশয়েরা এই গ্রামে আসিয়াছেন, সেই পর্য্যন্ত সরকেল মহাশয় তাঁহাদের সমুদয় ব্যয় নির্ব্বাহ করিতেছেন। ইহার অনেক বৎসর পরে আমি নিজে সন্ন্যাসি-সঙ্কটে পড়িয়াছিলাম। তখনও এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা জন্মে নাই। সন্ন্যাসি-মাহাত্ম্য সম্বন্ধে তখন যদি কিছু অভিজ্ঞতা থাকিত, তাহা হইলে সরকেল মহাশয়কে সাবধান করিতাম।

 সাত দিন পরে পুনরায় আমি সরকেল মহাশয়ের বাটী গমন করিলাম। সন্ধ্যাবেলা পৌঁছিলাম। সে জন্য টাকা কড়ি সম্বন্ধে সে রাত্রি কোন কথা বার্ত্তা হইল না। সর্‌কেল মহাশয়ের দুই মহল কোটা বাড়ী। পূর্ব্বদিকে অন্তঃপুর, পশ্চিমদিকে সদর বাটী। সদর বাটীর উত্তর দিকে পূজার দালান। আহারাদি করিয়া আমি পূজার দালানে শয়ন করিলাম, পথশ্রমে ঘোর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িলাম। রাত্রি বোধ হয় তখন একটা, এমন সময় ভিতর বাড়ীতে দুম্ দুম্ করিয়া শব্দ হইতে লাগিল। আমার নিদ্রা ভঙ্গ হইল। ডাকাত পড়িয়াছে মনে করিয়া আমি উঠিয়া বসিলাম। কিন্তু লোকের সাড়া শব্দ কিছুই পাইলাম না। শব্দটাও ডাকাতপড়া শব্দের ন্যায় নহে। আমার বোধ হইল যেন একটা ভারি বস্তু এক সিঁড়ি হইতে অপর সিঁড়িতে সবলে লাফাইয়া উপরতানা হইতে নীচের তালায় নামিতেছে। প্রথম মনে করিলাম যে, সর্‌কেল মহাশয় বুঝি কোন বস্তু এই প্রকারে উপর হইতে নীচে আনিতেছেন। রথের সময় পুরুষোত্তমে জগন্নাথের কোমরে দড়ি বাঁধিয়া উড়ে পাণ্ডারা যেরূপ মন্দিরের এক পৈঠা হুইতে অপর পৈঠায় নামায় সরকেল মহাশয় বুঝি সেইরূপ কোন ভারি বস্তু নামাইতেছেন।

 কিছুক্ষণ পরে বাড়ীর ভিতর কোলাহল পড়িয়া গেল। সরকেল মহাশয় চীৎকার করিয়া বলিলেন যে, টাকাকড়ি পূর্ণ তাঁহার লোহার  সিন্দুক কে লইয়া যাইতেছে। তাহার পর স্ত্রীলোকেরা চীৎকার করিয়া বলিল যে, ভূতে লোহার সিন্দুক লইয়া যাইতেছে। আমি স্বচক্ষে দেখি নাই, কিন্তু পরে শুনিলাম যে, সিন্দুক আপনা আপনি উপরের ঘর হইতে বাহির হইয়াছিল। আপনা আপনি সিঁড়ির এক পৈঠা হইতে অপর পৈঠায় নামিতেছিল। লোহার সিন্দুক যখন উপর হইতে নীচে নামিতেছিল, তখন সরকেল মহাশয় একবার তাহার আংটা ধরিয়াছিলেন। পর মুহূর্ত্তে পায়ের উপর লোহার সিন্দুক পড়িয়া তাঁহার পা ছেচিয়া গিয়াছিল। তখন সরকেল মহাশয় অজ্ঞান হইয়া মাটীতে পড়িয়া রহিলেন। সিন্দুক নীচে নামিয়া ভিতর-বাড়ীর দরজায় সবলে দুম্ দুম্ শব্দে আঘাত করিল। ভিতর-বাড়ীর দরজা ভাঙ্গিয়া গেল। সিন্দুক সদর-বাড়ীর উঠানে আসিয়া উপস্থিত হইল। আমি দেখিলাম যে, মাটী হইতে চারি পাঁচ হাত উপরে শূন্য-পথে সিন্দুক আপনা আপনি সদর দ্বার অভিমুখে গমন করিতেছে। তাড়াতাড়ি দালান হইতে নামিয়া আমি একটা আংটা ধরিয়া টানিতে লাগিলাম। সেই সময় সরকেল মহাশয়ের দারোয়ান রামগোপাল সিংও আসিয়া সিন্দুকের অপর পার্শ্বের আংটা ধরিয়া ফেলিল। সিন্দুক তৎক্ষণাৎ ভূতলে পতিত হইয়া দ্বারবানের পা ছেঁচিয়া দিল। সে মাটীতে পড়িয়া, ‘জান্ গিয়া জান্ গিয়া’ বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। ভাগ্যে আমার পায়ে পড়ে নাই! আমার পায়ে পড়িলে আমি মারা যাইতাম। এ নিশ্চয়, ভৌতিক ব্যাপার, এইরূপ বুঝিয়া আমি আর সিন্দুক ধরিয়া রাখিতে চেষ্টা করিলাম না।

 সদর দরজায় উপস্থিত হইয়া সিন্দুক গুরুভাবে তাহাতে আঘাত করিতে লাগিল। তিন ঘায়ে সদর দরজা ভাঙ্গিয়া ফেলিল। সদর দ্বার ভাঙ্গিয়া সিন্দুক শূন্য-পথে গ্রাম পার হইয়া মাঠের দিকে যাইতে লাগিল। গভীর রাত্রিতে ভয়ানক শব্দ শুনিয়া গ্রামের লোক মনে করিল যে, সরকেল মহাশয়ের বাড়ীতে ডাকাত পড়িয়াছে। লাঠি সোঁটা লইয়া প্রতিবেশিগণ দৌড়িয়া আসিল, কিন্তু তখন সিন্দুক গ্রামের প্রাস্তভাগে গিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। এই সময় আর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটিল। সরকেল মহাশয়ের গৃহে ও নিকটস্থ প্রতিবেশীদিগের গৃহে হাতা, বেড়ি, কড়া, দা, কুড়ুল, ছুরি, কাঁচি যাহা কিছু লোহার দ্রব্য ছিল, সমুদয় বাহির হইয়া সন্ সন্ শব্দে শূন্য-পথে সিন্দুকের পশ্চাৎ ধাবিত হইল। তাহার পর যাহা হইল, তাহা বলিলে তোমরা হয়তো বিশ্বাস করিবে না, অতএব চুপ করিয়া থাকাই ভাল।

 লম্বোদর বলিলেন,—“বিশ্বাস করি না করি, বলই না ছাই।”

 ডমরুধর বলিলেন,—“বাঘের ছালের ভিতর প্রবেশ করিয়া যখন তোমাদের সম্মুখে লম্প ঝম্প করিয়াছিলাম, তখন তো বিশ্বাস করিয়া ছিলে। তখন পুকুরে গিয়া কেলে হাঁড়ি মাথায় দিয়া সমস্ত রাত্রি বসিয়াছিলে!”

 লম্বোদর উত্তর করিলেন,— “বাঘ দেখি নাই। বাঘ বাঘ বলিয়া একটা গোল পড়িয়াছিল, তাহা শুনিয়াই গাড়ী হইতে লাফাইয়া পলায়ন করিয়া ছিলাম।”

 শঙ্কর ঘোষ বলিলেন,—“না না,—বিশ্বাস করিব না কেন? তাহার পর কি হইল বল।”

 উপস্থিত অন্যান্য ব্যক্তিগণও অনেক সাধ্য সাধনা করিলেন। তখন ডমরুধর পুনরায় বলিতে আরম্ভ করিলেন।

 আমার কোমরে তখন বড় এক থোলো চাবি থাকিত। কিন্তু তখন কেবল আমার দুইটী বাক্স ছিল। লোকে মনে করিবে যে, ইহার অনেক টাকা আছে, টাকা রাখিতে স্থান হয় না, তাই অনেক বাক্স করিতে হইয়াছে, ঐ চাবিগুলি সেই সব বাক্সের। দেখ লম্বোদর! সত্য সত্য লোকের টাকা না থাকুক, একটা জনরব উঠিলেই হইল যে, অমুকের অনেক টাকা আছে। কাহাকেও একটী পয়সা দিতে হয় না। মুখ বন্ধ গুড়ের কলসীর নিকট কত মাছি থাকে। তাহারা এক ফোঁটাও গুড় খাইতে পায় না, তথাপি আশে পাশে ভ্যান্‌ ভ্যান্‌ করে। সেইরূপ যদি লোকে শুনিতে পায় যে, অমুকের অনেক টাকা আছে, তাহা হইলে দেশ শুদ্ধ লোক তাহার আশে পাশে আসিয়া ভ্যান্‌ ভ্যান্‌ করে, সে হাই তুলিলে তুড়ি দেয়। বিশেষতঃ আমার হাই। আমার হাই তোলা দেখিলে মানুষের প্রাণ শীতল হয়। হাই তুলিয়া একবার সকলকে দেখাই।



ডমরুধরের হাই।