ডমরু-চরিত/দ্বিতীয় গল্প/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
সন্ন্যাসীর কালী ঠাকুর।
সকলে মনে করিবে যে, আমার অনেক টাকা আছে, সেই জন্য বৃহৎ চাবির থোলো সর্ব্বদা আমি কোমরে পরিতাম। চারি পাঁচটী ঘুনসি একত্র পাকাইয়া মোটা দড়ির ন্যায় করিয়া, চাবির থোলো তাহাতে বাঁধিয়া আমি কোমরে পরিয়াছিলাম।
যখন লোকের হাতা, বেড়ি, খন্তা, কুড়ুল সন্ সন্ শব্দে আইরণচেষ্টের সঙ্গে সঙ্গে চলিয়া গেল, তখন আমার চাবির থোলোতে টান ধরিল। সহজ অবস্থায় চাবির থোলো ঝুলিয়া থাকে, এখন সোজা সটান হইয়া লোহার সিন্দুকের পশ্চাতে যাইবার নিমিত্ত চেষ্টা করিতে লাগিল। আমার পশ্চাৎ দিকের কোমরের মাংসে ঘুনসি বসিয়া গেল, আমার ঘোর যাতনা হইল, আমি ভাবিলাম যে কোমর পর্য্যন্ত কাটিয়া আমার শরীর বা দুইখানা হইয়া যায়। একটু আলগা করিবার নিমিত্ত আমি চাবির থোলোটী ধরিতে যাইলাম। যেই ছুঁইয়াছি, আর আমার হাতে যেন হাজার সূচ ফুটিয়া গেল। চাবি হইতে আমি হাত ছাড়াইয়া লইতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু তাহা পারিলাম না। চাবি আমাকে মাঠের দিকে টানিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। “আমার প্রাণ বাঁচাও, আমার প্রাণ বাঁচাও” বলিয়া আমি গ্রামের লোককে ডাকিতে লাগিলাম, কিন্তু এ ভূতের কাণ্ড, এইরূপ মনে করিয়া সকলে পলায়ন করিল, আপন আপন ঘরে গিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।
চাবির থোলো আমাকে মাঠের দিকে লইয়া চলিল। মাঠে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম যে, আগে অনেক দূরে তিনটী ঘোড়া যাইতেছে। জ্যোৎস্না রাত্রি, সে জন্য অনেকটা স্পষ্ট দেখিতে পাইলাম। দুইটা ঘোড়ার উপর দুই জন সন্ন্যাসী চড়িয়াছে, তৃতীয় ঘোড়ার উপর সেই প্রস্তরের কালীমূর্ত্তি ও পূজার আসবাব বোঝাই আছে। তাহার পশ্চাতে প্রায় পাঁচ শত হাত দূরে মাটি হইতে চারি পাঁচ হাত উপরে শূন্যপথে লোহার সিন্দুক যাইতেছে। সিন্দুক হইতে প্রায় দুই শত হাত পশ্চাতে হাতা, বেড়ি, কড়া, খন্তা, দা, কুডুল লৌহনির্ম্মিত দ্রব্যসমূহ সেইরূপ শূন্যপথে যাইতেছে। তাহার প্রায় দুই শত হাত দূরে চাবির থোলো আমাকে টানিয়া লইয়া যাইতেছে। কাণ্ডখানা কি, তখন আমি কিছুই বুঝিতে পারি নাই। তখন আমার প্রাণ লইয়া টানাটানি, কোমর কাটিয়া শরীরটী দুইখানা হইবার উপক্রম হইয়াছিল। ভাবিবার চিন্তিবার তখন সময় ছিল না।
মাঠের উপর দিয়া প্রায় এক ক্রোশ পথ এই ভাবে আমাকে টানিয়া লইয়া চলিল। তাহার পর সহসা দুম্ করিয়া শব্দ হইল। চাহিয়া দেখিলাম যে, দূরে সিন্দুকটী মাটিতে পড়িয়াছে, তাহার শব্দ। আরও নিরীক্ষণ করিয় দেখিলাম যে, সিন্দুকের অগ্রে ঘোড়া তিনটী স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, সন্ন্যাসী দুই জন ঘোড়ার পিঠ হইতে নামিয়াছে, আর তৃতীয় ঘোড়া হইতে কালীর প্রতিমাটীও নামাইয়া নীচে মাটির উপর সিংহাসনে রাখিয়াছে।
সিন্দুকটী সেই মাটিতে পড়িল, আর তাহার পরক্ষণেই হাতা, বেড়ি, খন্তা, কুড়ুল প্রভৃতি ঝুপঝাপ ঠুনঠান্ করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। তাহার পরক্ষণেই আমার চাবি পূর্ব্বের ন্যায় কোমরে ঝুলিয়া পড়িল। কোমরে ঘুনসির টান আর রহিল না। তখন আমার ধড়ে প্রাণ আসিল, তখন যথানিয়মে নিঃশ্বাস ফেলিয়া আমি সুস্থির হইলাম। সেই স্থানে আমি প্রায় এক ঘণ্টা পড়িয়া রহিলাম। এক ঘণ্টা পরে যখন আমি পুনরায় চাহিয়া দেখিলাম, তখন দেখিলাম যে, দূরে সে ঘোড়াও নাই, সে সন্ন্যাসীও নাই, অনেকক্ষণ পরে অতি সাবধানে, অতি ধীরে ধীরে, অতি ভয়ে ভয়ে আমি সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলাম; দেখিলাম যে, সন্ন্যাসী দুই জন লোহার সিন্দুকটি কোনরূপে ভাঙ্গিয়াছে অথবা খুলিয়াছে। তাহার ভিতর টাকাকড়ি গহনা-পত্র যাহা কিছু ছিল, সে সমুদয় লইয়া গিয়াছে। চারিদিকে কাগজ-পত্র ছড়াছড়ি হইয়া আছে। দুই চারিখানি কাগজে ষ্ট্যাম্প দেখিয়া বুঝিলাম যে, সে সব দলিল-পত্র। তাহাতে আমি হাত দিলাম না। অন্য এক তাড়া কাগজ তুলিয়া দেখিলাম যে, সে কোম্পানীর কাগজ, তাহা আমি ফেলিয়া দিলাম। আর এক তাড়া কাগজ পাইলাম, তাহা কি? লম্বোদর! সে দিন তোমাদিগকে আমি বলিয়াছিলাম যে, আমি ভাগ্যবান্ পুরুষ। আজ তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখ। কাগজ-তাড়াটা একটু খুলিয়া দেখিলাম যে, সে সব নোট! তাহার পর দৌড়! বেলা নয়টার সময় বাড়ীতে পৌঁছিয়া, তবে হাঁপ ছাড়িলাম।
লম্বোদর বলিলেন,—“এ সমুদায় তোমার আজগুবি গল্প। এ অনেক দিনের কথা, কিন্তু আমরা সেই মময় শুনিয়াছিলাম যে, সরকেল মহাশয়ের বাড়ী যথার্থই চুরি হইয়াছিল এবং সে চোরগণ তোমার অপরিচিত লোক ছিল না।”
ডমরুধর উত্তর করিলেন,— “সমুদয় মিথ্যা কথা, হিংসায় লোকে কি না বলে।”