বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/দ্বিতীয় গল্প/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

চুম্বকের সার।

 ডমরুধর বলিতে লাগিলেন,—বাড়ীতে আসিয়া নোটগুলি গণিয়া দেখিলাম যে, দুই শত দশ টাকার নোট, মোট দুই হাজার টাকা। আর ঋণের প্রয়োজন কি? সরকেল মহাশয়কে আমি এক পত্র লিখিলাম যে, —“সে দিন আপনার বাড়ীতে গিয়া ভূতের হাতে প্রাণ হারাইতে বসিয়াছিলাম। আপনার টাকায় আমার প্রয়োজন নাই।”

 তাহার পর সেই টাকা দিয়া আমি সমুদয় আবাদটী উঠিত করিলাম। এখন সেই স্থানে সোণা ফলিতেছে। তাহার লাভ হইতে ক্রমে ক্রমে আমি আরও অনেক আবাদ ক্রয় করিলাম। আমি ছাই মুঠা ধরিলে সোণা মুঠা হইয়া যায়। সে অঞ্চলে এখন অনেক লোকের আবাদ হইয়াছে। বহুদূর পর্য্যন্ত এখন লোকের বাস হইয়াছে। নদীতে খেয়া বসিয়াছে, মাঝে মাঝে হাট বসিয়াছে। গ্রীষ্মকালে কোন কোন স্থানে বরফের কুলফি বিক্রয় হয়। শীতকালে হিন্দুস্থানীরা ফুলুরি ফেরি করিয়া বেড়ায়। যে সাঁওতালগণ মশা মারিতে আমার সহায়তা করিয়াছিল, তাহাদিগকে আমি জমি দিয়াছি, তাহারা আমার প্রজা হইয়াছে। তাহাদিগের দেখাদেখি আরও অনেক সাঁওতাল নিকটস্থ আবাদসমূহে বাস করিয়াছে।

 এখন আমার কিরূপ সম্পত্তি হইয়াছে, কিরূপ জনসাধারণের নিকট আমি গণ্যমান্য হইয়াছি, তাহা তোমরা অবগত আছ। শ্বশুর প্রহ্লাদ বাবু সম্বন্ধে আমি যে ভবিষ্যৎ বাণী বলিয়াছিলাম, তাহা পূর্ণ হইয়াছে। মালতীকে আপনা হইতে তিনি পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তাহার পর তিনি নিজে, তাঁহার পুত্রগণ, তাঁহার ভগিনী কতবার যে আমার বাড়ীতে আসিয়াছিলেন, তাহার সংখ্যা নাই। এখন মালতী জীবিত নাই। এখন অবশ্য তাঁহাদের সহিত আমার আর কোন সম্বন্ধ নাই। শুনিয়াছি যে, এখন সংসারে তাঁহাদের আর কেহ নাই। দেশে গিয়া ম্যালেরিয়া জ্বরে সে সংসার মরিয়া হাজিয়া গিয়াছে।

 লম্বোদর বলিলেন,—“অনেক কথা তো শুনিলাম। তুমি বলিলে যে, সরকেল মহাশয়ের বাড়ী চুরি হয় নাই, আর সে চোরগণকে তুমি দ্বার খুলিয়া দাও নাই। তবে সন্ন্যাসী দুইজন কি করিয়াছিল যে, লোহার সিন্দুক ও অন্যান্য লোহা লক্করে টান ধরিয়াছিল।” ডমরুধর উত্তর করিলেন যে,—“আমি যখন কাপড়ের দোকানে কাজ করিতাম, তখন কোন কোন দিন সন্ধ্যার পর সে স্থানে পুঁথি পড়া হইত। মহাভারত রামায়ণের পর একজন আরব্য উপন্যাস পাঠ করিয়াছিলেন। তাহাতে এক রাজপুত্রের গল্প শুনিয়াছিলাম। জাহাজে চড়িয়া সমুদ্রপথে তিনি দেশ বিদেশ পরিদর্শন করিয়াছিলেন। অবশেষে ঝড়ে তাড়িত লইয়া তাঁহার জাহাজ এক কৃষ্ণবর্ণের পর্ব্বতের সমীপে উপস্থিত হইয়াছিল। জাহাজের যত পেরেক ছিল, সব খুলিয়া সেই পর্ব্বতে গিয়া লাগিল। জাহাজ জলমগ্ন হইল। আমার বোধ হয়,সন্ন্যাসীদের যে বৃহৎ কালীমূর্তি ছিল, তাহা চুম্বক পাথরে গঠিত। কিন্তু সে সামান্য চুম্বক পাথর নহে। চোলাই করা চুম্বক পাথরের সার। সিংহাসনটী এরূপ পদার্থে গঠিত,যাহা ভেদ করিয়া চুম্বক প্রস্তরের আকর্ষণশক্তি দূরে যাইতে পারে না। প্রথম কয়দিন সন্ন্যাসী দুইজন দেবীকে সেই সিংহাসনে বসাইয়া পূজা করিয়াছিল। সে নিমিত্ত সে কয়দিন লৌহ দ্রব্যে টান ধরে নাই। শেষ দিন গভীর রাত্রিতে তাহারা দেবীকে সিংহাসন হইতে নিম্নে রাখিয়াছিল, আর সেই সময় নিকটস্থ লৌহ নির্ম্মিত দ্রব্য আকৃষ্ট হইয়াছিল। সে রাত্রিতে প্রথম আমি দেখিয়াছিলাম যে, তৃতীয় ঘোড়ার উপর বলদের ছালার ন্যায় তাহারা দুই দিকে দুই প্রকার বোঝা রাখিয়াছিল। বোধ হয় এক দিকে প্রতিমা অপর দিকে সিংহাসন ও পূজার সামগ্রী রাখিয়াছিল। সিংহাসন হইতে মূর্ত্তি পৃথক ছিল, সেজন্য তখনও লোহার দ্রব্যে টান ছিল। তাহার পর মাঠে প্রতিমা নামাইয়া সেই সিংহাসনে বসাইয়াছিল, আর প্রতিমার আকর্ষণশক্তি লোপ হইয়াছিল। তাহার পর সিংহাসনের উপর মূর্ত্তি রাখিয়া ঘোড়ার উপর সেই ভাবে বোঝাই দিয়া তাহারা পলায়ন করিয়াছিল। আমার বোধ হয় লৌহ দ্রব্যসমূহ এই কারণে শূন্যপথে ভ্রমণ করিয়াছিল।”

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,—তুমি যে এই গল্পটী করিলে, উহার কোন প্রমাণ আছে?

 ডমরুধর উত্তর করিলেন, “প্রমাণ নাই? নিশ্চয় আছে। সে চাবির থোলো এখনও আমার ঘরে আছে। বল তো এখনি আনিয়া দেখাই।”