বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/পঞ্চম গল্প/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

চঞ্চলার গাই গরু।

 দুর্লভী ভাল হইলে চঞ্চলা আপনার গ্রামে চলিয়া গেল। কিন্তু চঞ্চলার সহিত সদ্ভাব করিতে আমার বাসনা হইয়াছিল। তাহাদের গ্রাম অনেক দূর। সর্ব্বদা আমি যাইতে পারিতাম না। কেবল মাঝে মাঝে যাইতাম। সেই গ্রামের পাশ দিয়া বড় রাস্তা গিয়াছে। তাহার উপর দিয়া গরুর গাড়ী সর্ব্বদা যায়। দুই চারিটা পয়সা দিয়া তাহার উপর বসিয়া কখন কখন কতক দূর যাইতাম। ফিরতি ঘোড়ার গাড়ীতেও দুই একবার গিয়াছিলাম। এ পথে দুই তিনবার মোটর গাড়ী দেখিয়াছিলাম। স্বদেশী কোম্পানি স্থাপনের সময় বড়লোকদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত শঙ্কর ঘোষ মোটর গাড়ী ভাড়া করিয়াছিলেন। সেই সময় আমি মোটর গাড়ী চড়িয়াছিলাম। কিন্তু অতি বেগে গমন করে। আমার ভয় হইয়াছিল। মোটর গাড়ী টানিবার নিমিত্ত ঘোড়া থাকে না। তবে ইহার ভিতর কোনরূপ বিলাতি জন্তু জানোয়ার থাকে কি না, তাহা আমি জানি না।

 মাঝে মাঝে চঞ্চলাদের গ্রামে গিয়া তাহাদের দাওয়াতে আমি বসিতাম। চঞ্চলার মা নাই, কেবল বাপ আছে। তাহার নাম সহদেব বাগ্দী। সহদেব মজুরি করে। চঞ্চলার একটা গাই গরু আছে। তাহার দুধ সে বিক্রয় করে।

 চঞ্চলার দাওয়াতে বসিয়া আমি গল্প গাছা করিতাম। কখন কখন দুই একটা রসের কথাও বলিতাম। তখন হাসিয়া সে লুটিপুটি হইত। পাড়ার মাগীদের সে ডাকিয়া আনিত। আমার দিকে চক্ষু ঠারিয়া সকলে হাসিয়া লুটিপুটি হইত। আমাকে দেখিলে লোকের আনন্দ হয়। মাগীদের তো কথাই নাই। আমার রূপ দেখিয়া তাহাদের মন ভুলিয়া যায়। মাগীগুলা আমার গায়ে যেন ঢলিয়া পড়ে।

 চঞ্চলাকে দশ পয়সা দিয়া একখানি গামছা কিনিয়া দিয়াছিলাম। গামছা পাইয়া তাহার আহ্লাদ হইয়াছিল, আমি মনে ভাবিলাম,—দুর্লভী একবার এই কথা শুনিলে হয়। তাহা হইলে সে আর মুখ হাঁড়ী করিয়া থাকিবে না।

 লম্বোদর! এই বার ভাই সেই ঘোর দুর্ঘটনা ঘটিয়াছিল। এইবার সেই গ্রামে আমাকে প্রায় একমাস কয়েদ থাকিতে হইয়াছিল।

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,—“সে কবে?”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“আজ পঞ্চমী, ইহার তিনটা পঞ্চমী আগে, প্রায় দুই মাসের কথা।”

 লম্বোদর বলিলেন,—“সে কি করিয়া হইবে! তুমি বলিতেছ যে, দুই মাস পূর্ব্বে দুর্ঘটনা ঘটিয়াছিল। তাহার পর এক মাস তুমি সেই গ্রামে কয়েদ হইয়াছিলে। কিন্তু গত ছয় মাস ধরিসা তুমি গ্রাম হইতে কোন স্থানে গমন কর নাই। এই ছয় মাস প্রতিদিন তোমাকে আমরা দেখিয়াছি।”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“সকলই জগদম্বার মায়া! তাঁহার মায়াতে তোমরা আচ্ছন্ন হইয়াছিলে।”

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,— “দুর্ঘটনাটা কি?”

* * * *

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“তাহা বলিতেছি, শুন।” প্রায় দুই মাসের কথা হইল। একদিন রাত্রিতে আমি ঘরে শুইয়াছিলাম। শেষ রাত্রিতে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। আর নিদ্রা হইল না। এ-পাশ ও-পাশ করিতে লাগিলাম। চঞ্চলার জন্য একখানি নয়হাতি কাপড় কিনিয়াছিলাম। মনে করিলাম, বিছানায় আর বৃথা পড়িয়া থাকিব না। কাপড়খানি তাহাকে দিয়া আসি। এলোকেশীর ভয়ে কাপড়খানি এক স্থানে লুকাইয়া রাখিয়াছিলাম। কাপড়খানি লইয়া চঞ্চলাদের গ্রাম অভিমুখে আমি হাঁটিয়া চলিলাম। যাইতে যাইতে সকাল হইয়া গেল। সূর্য্যোদয়ের পরে বড় রাস্তায় গিয়া উঠিলাম। বেলা প্রায় নয়টার সময় চঞ্চলাদের গ্রামের নিকট উপস্থিত হইলাম। চঞ্চলার পিতা সহদেবের সহিত বড় রাস্তায় সাক্ষাৎ হইল। চঞ্চলার গাই গরুর দড়ি ধরিয়া বড় রাস্তার উপর দিয়া সে তাহাকে মাঠে লইয়া যাইতেছিল। তাহার সহিত কথা কহিতে কহিতে আমি কিছুদূর চলিলাম, অন্যমনস্ক হইয়া আমরা দুইজনে যাইতেছি, পশ্চাতে যে ভোঁ ভোঁ শব্দ হইয়াছিল, তাহার কিছুই শুনিতে পাই নাই। সহসা পশ্চাৎ হইতে এক মোটর গাড়ী আমার উপর আসিয়া পড়িল। গাড়ীর ঢাকায় আমার কোমর পর্যন্ত কাটিয়া দুইখানা হইয়া গেল। আমার দুইটা কাটা পা গাড়ীর চাকায় কিরূপে আটকাইয়া গেল। কোমর হইতে আমার পা দুইটী লইয়া মোটর গাড়ী অতি দ্রুতবেগে পলায়ন করিল।

 লম্বোদর প্রভৃতি সকলে শিহরিয়া উঠিলেন। সকলে বলিয়া উঠিলেন, “বল কি হে? সত্য?”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“হাঁ ভাই, সত্য।”

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,— “তাহার পর?”

 ডমরুধর বলিলেন,—রাস্তার ধুলায় আমার ধড়টা পড়িয়া কাটা ছাগলের ন্যায় ছট্‌ ফট্ করিতে লাগিল। তখনও আমার প্রাণ বাহির হইয়া যায় নাই। তখনও সম্পূর্ণ আমি জ্ঞানহারা হই নাই। আমি এদিক্ ওদিক্‌ চাহিয়া দেখিলাম। দেখিলাম যে, সহদেব বাগ্দী হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। বোধ হয় যে, তাহাকে আঘাত লাগে নাই। সে চঞ্চলার গরুর দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া আছে। গরুটাও পথে পড়িয়া ছিল। গাড়ীর আর একটী চাকায় তাহারও কোমর পর্যন্ত কাটিয়া দুই থানা হইয়া গিয়াছিল। তাহার কোমর ও পা কিন্তু গাড়ীর চাকায় লাগিয়া যায় নাই। এক দিকে গরুর ধড় ও অপর দিকে তাহার কোমর ও পা রাস্তার উপর পড়িয়া ছিল। বিষণ্ণ বদনে সহদেব তাহাই দেখিতেছিল।

 সেই পথ দিয়া ভিকু ডাক্তার ব্যাগ হাতে লইয়া চিকিৎসা করিতে যাইতেছিলেন। তিনি দৌড়িয়া আসিলেন। এদিক ওদিক্ চাহিয়া আমার কোমর ও প। দেখিতে পাইলেন না। তখন সেই গরুর কোমর ও পা আমার শরীরে তিনি জুড়িয়া দিলেন। তাহার পর ব্যাগ খুলিয়া দুইটা হোমিওপ্যাথিক ঔষধের গুলি আমার মুখে দিলেন। ঔষধের গুণে সেই গরুর কোমর ও পা আমার শরীরে জুড়িয়া গেল। তাহার পর আর দুইটী বড়ি তিনি আমার মুখে দিলেন। তাহা খাইয়া আমি শরীরে বল পাইলাম। কিন্তু মানুষের মত গরুর দুই পায়ে আমি সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারিলাম না। গরুর দুই পা আর আমার দুই হাত মাটিতে পাতিয়া চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় আমাকে দাঁড়াইতে হইল।

 ইতিমধ্যে সে স্থানে অনেক লোক একত্র হইয়াছিল। এই অবস্থায় সকলে আমাকে গ্রামের ভিতর লইয়া গেল। সে স্থানে গিয়া ভিকু ডাক্তার বলিলেন,—“ডমরু বাবু! তুমি আমার পাওনা টাকা দাও নাই। আমাকে ফাঁকি দিয়াছিলে। কিন্তু এখন তোমার এই শরীরটী আমার হইল। গরুর কোমর তোমার শরীরে যদি আমি না জুড়িয়া দিতাম, তাহা হইলে এতক্ষণ কোন্ কালে তুমি মরিয়া যাইতে। দুইদিন পরে তোমার ধড়টা পচিয়া যাইত, অথবা পুড়িয়া ছাই হইত। অতএব তোমার শরীরটা এখন আমার। আমার চাষ আছে। যতদিন বাঁচিবে ততএই। দিন আমার ক্ষেত্রে তোমায় কাজ করিতে হইবে।” এই কথা বলিয়া আমার গলায় গরুর দড়ি দিয়া তিনি টানিতে লাগিলেন। চঞ্চলার পিতা সহদেব তাঁহার হাত হইতে দড়ি কাড়িয়া লইল। সে বলিল,—“ভাল রে ভাল! ইনি তোমার? সে কিরূপ কথা? ইহার আধখানা চঞ্চলার গাই। এখনও ইহার দুধ হইবে। আমরা ইহাকে ছাড়িয়া দিব না।”

 আমাকে লইয়া দুইজনে বিবাদ বাধিয়া গেল। এ বলে ইনি আমার প্রাপ্য, ও বলে আমার প্রাপ্য। ক্রমে হাতাহাতি হইবার উপক্রম হইল। অবশেষে গ্রামের লোক সমস্যার এইরূপ মীমাংসা করিয়া দিল। দিনের বেলা আমাকে ভিকু ডাক্তারের নিকট থাকিতে হইবে। সমস্ত দিন তিনি 'আমাকে খাটাইয়া লইবেন। রাত্রিকালে আমি চঞ্চলার গোয়ালে বাঁধা থাকিব। প্রাতঃকালে চঞ্চলা আমার দুধ দুহিয়া ভিকু ডাক্তারের বাড়ীতে আমাকে পাঠাইয়া দিবে। এক বেলা ভিকু ডাক্তার আমাকে খাইতে দিবেন, অন্য বেলা সহদেব বাগদি আমাকে খাইতে দিবে।

 প্রথম দিন আর আমাকে কোন কাজ করিতে হয় নাই। সেদিন চঞ্চলার গোয়ালে খোঁটায় আমি বাঁধা রহিলাম, পাছে হাত দিয়া দড়ি খুলিয়া আমি পলায়ন করি, সেজন্য হাত দুইটাও তাহারা বাঁধিয়া রাখিল। ইহার পর প্রতি রাত্রিতে তাহারা এই ভাবে আমাকে বাঁধিয়া রাখিত, সন্ধ্যাবেলা চঞ্চলা আমাকে দুইটী মুড়ি খাইতে দিল। যতদিন ইহাদের নিকট ছিলাম, ততদিন দুই বেলা দুইটী মুড়ি আমার আহার ছিল। এক বেলা ভিকু ডাক্তার দিত, অন্য বেলা চঞ্চলা দিত। আমার দাঁত নাই, মুড়ি চিবাইতে পারিতাম না। প্রাণধারণের নিমিত্ত কোনরূপে গিলিয়া ফেলিতাম।

 পরদিন প্রাতঃকালে চঞ্চলা আমার দুধ দোহন করিল। প্রায় দুই সের দুধ হইল। তাহার পর সে বাছুর ছাড়িয়া দিল; বাছুর আমার দুধ খাইতে লাগিল ও মাঝে মাঝে বাছুর আমার পেটে মাথার হুড়ো মারিতে লাগিল। তাহার মাথার গুঁতোতে আমি অস্থির হইয়া পড়িলাম। ভাগ্যক্রমে এই সময় ভিকু ডাক্তার আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি বলিলেন,—“ডমরু বাবুর ঐ পেট এখন আমার। পেট আমার ভাগে পড়িয়াছে। পেটে আমি বাছুরকে মারিতে দিব না। তাহার ঢুতে যদি ডমরু বাবুর নাড়ীভুড়ি ছিঁড়িয়া যায়, তাহা হইলে তোমাদের নামে আমি নালিশ করিব।” সেই দিন হইতে চঞ্চলা বাছুরের দড়ি টানিয়া রাখিত বাছুর আমার পেটে আর হুড়ো মারিতে পারিত না।

 দুধ দোহন হইলে ভিকু ডাক্তার আমাকে তাঁহার ক্ষেতে লইয়া গেলেন! কৃষককে বলিলেন যে,— “একটা গরুর সহিত ইহাকে লাঙ্গলে জুড়িয়া দাও।”

 কৃষক তাহাই করিল। মানুষের হাত কোমল, তাহাতে খুর নাই। কিন্তু এখন আমাকে দুইটী হাত মাটিতে পাতিয়া গরুর ন্যায় চলিতে হইয়াছিল। আমার হাতে কাঁটা খোচা ফুটিয়া যাইতে লাগিল। ঘোরতর কষ্টে আমার চক্ষু দুইটী জলে ভাসিয়া গেল। আমি ভাবিলাম যে, আমার নুদুর নাদুর নধর শরীরটী এই বার মাটি হইয়া গেল। আমার সঙ্গী বলদের সহিত সমান ভাবে আমি ক্ষেত্রের উপর লাঙ্গল কাঁধে করিয়া চলিতে পারিতেছিলাম না, সেজন্য কৃষক আমার লাঙ্গুলে সবলে মোচড় দিতে লাগিল। এমন সময় সহদেব সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল। সহদেব বলিল,—“ও কি! তুমি উহার লেজ মলিতে পারিবে না। লেজ তোমাদের নহে, লেজ আমাদের ভাগে পড়িয়াছে।”

 কৃষক আর আমার লাঙ্গুল মর্দন করিল না বটে, কিন্তু আমার পিঠে ছড়ি মারিতে লাগিল। ফল কথা, আমার দুঃখের আর সীমা রহিল না। সন্ধ্যাবেলা ভিকু ডাক্তার আমাকে চঞ্চলার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিলেন। চঞ্চলা আমাকে তাঁহার গোয়ালে বাঁধিয়া রাখিল। পরদিন প্রাতঃকালে আমার দুধ দুহিয়া পুনরায় আমাকে ভিকু ডাক্তারের নিকট পাঠাইয়া দিল। পুনরায় আমাকে লাঙ্গল ঘাড়ে করিয়া ক্ষেত চষিতে হইল।

 প্রতিদিন এইরূপ হইতে লাগিল। মনের দুঃখে রাত্রিদিন আমি কাঁদিতেছিলাম। ভাবিতেছিলাম যে,—হায় হায়! স্বদেশী কোম্পানি খুলিয়া দেশের লোকের মাথায় হাত বুলাইয়া যে এত টাকা উপার্জ্জন করিলাম, সে সব বৃথা হইল। এলোকেশী অথবা তোমরা বন্ধু বান্ধব কেহ আমার কোন সন্ধান লইলে না, সে জন্য আমার বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল।

 লম্বোদর বলিলেন,— “আজ ছয় মাস প্রতিদিন দুই বেলা তোমাকে দেখিতেছি। তোমার আবার সন্ধান কি লইব? কিন্তু তুমি বলিতেছ যে, সে সব জগদম্বার মায়া। তবে আমরা আর কি বলিব?”

 ডমরুধর পুনরায় বলিতে লাগিলেন,— দিন দিন আমি দুর্ব্বল হইয়া পড়িতে লাগিলাম। আমার সে নুদুর নাদর নধর শরীর শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেল। অস্থিচর্মসার হইয়া যাইলাম। ভালরূপ লাঙ্গলও টানিতে পারি না, দুধও দিতে পারি না। প্রায় এক মাস কাটিয়া গেল। একদিন প্রাতঃকালে চঞ্চলা আমাকে যথারীতি দুহিতে আসিল। কিছুমাত্র দুধ হইল না। পিতাকে গিয়া সে সেই কথা জানাইল। সহদেব বলিল যে, -“কাল প্রাতঃকালে আমি নিজে দুহিয়া দেখিব। পরদিন প্রাতঃকালে সে নিজে আমাকে দুহিতে আসিল। এক ফোটাও দুধ বাহির হইল না। তখন সে বিড় বিড় করিয়া আপনা-আপনি বলিল,—পুনরায় বাছুর না হইলে দুধ হইবে না, তাহার যোগাড় করিতে হইবে।'

 এই কথা শুনিয়া আমার প্রাণ উড়িয়া গেল। একে লাঙ্গল টানিয়া প্রাণ আমার ওষ্ঠাগত হইয়াছিল। তাহার উপর আবার বাছুরের যোগাড়!

 সে রাত্রি আমার নিদ্রা হইল না। ক্রমাগত আমি মা দুর্গাকে ডাকিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম,—“মা! চিরকাল তুমি আমাকে নানা বিপদ হইতে রক্ষা করিয়াছ। সন্ন্যাসীর হাত হইতে, বাঘের মুখ হইতে তুমি আমাকে উদ্ধার করিয়াছ। এখন কেন মা! তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিয়াছ?”

 এইরূপ স্তব স্তুতি মিনতি করিয়া আমি কাঁদিতে লাগিলাম। সহসা কে যেন আমার পিঠে চাপড় মারিয়া বলিল, “ভয় নাই বাছা, ভয় নাই! শীঘ্রই তোমাকে আমি এ বিপদ হইতে পরিত্রাণ করিব। গত বৎসর তোমার পূজায় কিঞ্চিৎ ত্রুটি হইয়াছিল। সেই পাপের জন্য তোমাকে কষ্ট পাইতে হইয়াছে।”

 মা যাহা বলিলেন, তাহাই করিলেন। পরদিন প্রত্যুষে শঙ্কর ঘোষ আসিয়া বলিল,—“তুমি আমাকে টাকা ফাঁকি দিয়াছ। চল, তোমাকে আমি পুলীশে দিব।”

 এই বলিয়া সে আমার দক্ষিণ হস্ত ধরিয়া টানিতে লাগিল। সে সংবাদ পাইয়া ভিকু ডাক্তার দৌড়িয়া আসিলেন,—তিনি বলিলেন,—“ধড়টী আমি রক্ষা করিয়াছি। এ ধড় আমার সম্পত্তি।”

 এই কথা বলিয়া তিনি আমার বাম হাত ধরিয়া টানিতে লাগিলেন। গোলমাল শুনিয়া চঞ্চলা সে স্থানে দৌড়িয়া আসিল। সে বলিল,—“ইহার নীচের দিকটা আমার। আমার গাই-গরু”

 এই বলিয়া সে আমার পশ্চাৎ দিকের দক্ষিণ পায়ের খুর ধরিয়া টানিতে লাগিল।

 এমন সময় “হু হু” পালকির শব্দ হইল। আমি ও অপর সকলে সেইদিকে চাহিয়া রহিলাম। এলোকেশী ঠাকুরাণী উগ্রমূর্তি ধারণ করিয়া পালকি হইতে নামিলেন। আমার নিকট আসিয়া তিনি বলিলেন,— “ইনি আমার স্বামী। তোমরা ছাড়িয়া দাও। ইহাকে আমি বাড়ী লইয়া যাইব। বাড়ী গিয়া ঝাঁটা-পেটা করিয়া ইহার ভূত ছাড়াইব।”

 এই কথা বলিয়া, তিনি আমার পশ্চাৎ দিকের বাম পায়ের খুর ধরিয়া টানিতে লাগিলেন। আপন আপন দিক্ কেহই ছাড়িয়া দিল না। একদিকে শঙ্কর ঘোষ ও ভিকু ডাক্তার আমার দুই হাত ধরিয়া টানিতে লাগিল। অপর দিকে চঞ্চলা ও এলোকেশী দুই খুর ধরিয়া টানিতে লাগিল। তাহাদের টানাটানিতে আমার প্রাণ বাহির হইবার উপক্রম হইল। “ছাড়িয়া দাও, ছাড়িয়া দাও” বলিয়া আমি চীৎকার করিতে লাগিলাম, কিন্তু কেহই ছাড়িল না।

 অবশেষে তাহাদের টানাটানিতে আমার শরীর হইতে ফস্ করিয়া চঞ্চলার গাই-গরুর কোমর ও পা খসিয়া পৃথক্‌ হইয়া গেল। আমি অজ্ঞান হইয়া পড়িলাম।

* * * *

 কতক্ষণ অজ্ঞান হইয়া ছিলাম, তাহা জানি না; যখন আমার জ্ঞান হইল, তখন আমি চক্ষু চাহিয়া দেখিলাম যে, আমি আমার ঘরে শয়ন করিয়া আছি।

আমি উঠিয়া বসিলাম। পায়ের দিকে চাহিয়া দেখিলাম। দেখিলাম যে, মানুষের দুইটী পা, গরুর পা নহে। তাহাতে লোম নাই, খুর নাই, কেবল মানুষের পায়ের পাতা। ফল কথা, আমার পা। শরীরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম। দেখিলাম যে, আমার নুদুর নাদুর নধর শরীর যেরূপ ছিল, সেইরূপ রহিয়াছে। শুষ্ক হইয়া যায় নাই। ঘরের ভিতর শঙ্কর ঘোষ অথবা ভিকু ডাক্তার, অথবা চঞ্চলা, কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না। কেবল দেখিলাম যে, এলোকেশী বাক্স খুলিয়া কাপড় বাহির করিতেছিলেন।

 আমি জাগরিত হইয়াছি দেখিয়া এলোকেশী বলিলেন,— “কা’ল রাত্রিতে ওরূপ বিড় বিড় করিয়া বকিতেছিলে কেন? চঞ্চলা কে?”

 আমি কোন উত্তর করিলাম না। মনে মনে ভাবিলাম যে,—সকলই জগদম্বার মায়া! সমুদয় মায়ের লীলা!