ডমরু-চরিত/পঞ্চম গল্প/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
ভিকু ডাক্তার।
ডমরুধর বলিতে লাগিলেন,—ফাঁকতালে অনেকগুলি টাকা লাভ করিয়া মন আমার প্রফুল্ল হইল। শরীরটি নাদুর নুদুর নধর হইয়া উঠিল। আমি মনে করিলাম, দুর্লভীকে দেখাইয়া আসি। সে বার এই বাগ্দিনী সম্বন্ধে কি হইয়াছিল, তাহা তোমাদিগকে বলিয়াছি। সুন্দরবনের আবাদ হইতে আমি বাটী ফিরিয়া আসিতেছিলাম। পথে এক বেটা সাঁওতাল আমার কাপড় কাড়িয়া লইয়া আমাকে উলঙ্গ করিয়া ছাড়িয়া দিল। কোন স্থানে একদল বেদিয়া তাঁবু ফেলিয়াছিল। তাহাদের ছোট একটা লাল ঘাগরা বেড়ার গায়ে শুকাইতেছিল। সেই ঘাগরা চুরি করিয়া আমি পরিধান করিলাম। আমি মনে করিলাম যে, এরূপ বেশে দিনের বেলা গ্রামে প্রবেশ করিব না, সন্ধ্যা পর্য্যন্ত দুর্লভীর ঘরে লুকাইয়া থাকিব। তাহার ঘরে যেই প্রবেশ করিয়াছি, আর কেষ্টা ছোড়ার বাপ আসিয়া দ্বারে শিকল দিয়া দিল। কেষ্টা গ্রামের লোককে ডাকিয়া আনিয়া আমাকে দেখাইল। “রাঙা ঘাগরা পরিয়া পোড়ার মুখো ডেকরা বুড়ো আমার মন ভুলাইতে আসিয়াছে,”— এইরূপ গালি দিয়া দুর্লভী আমাকে অনেক ভর্ৎসনা করিল। তাহার পর এলোকেশী আসিয়া আমাকে ঝাঁটার দ্বারা প্রহার করিলেন।
এ সব কথা তোমাদিগকে আমি পূর্ব্বে বলিয়াছি। সেই অবধি দুর্লভী আমার সহিত কথা কয় না। পথে দেখা হইলে মুখ ফিরাইয়া চলিয়া যায়। যখন কন্দর্প পুরুষের ন্যায় আমার নাদুর নুদুর নধর শরীর হইল, তখন আমি মনে করিলাম যে, চুপি চুপি দুর্লভীকে দেখাইয়া আসি,—যেন এলোকেশী জানিতে না পারেন।
দুর্লভীর ঘরে গিয়া দেখিলাম যে, সে কয়দিন জ্বরে পড়িয়া আছে। তাহার বোনঝি সেবা করিতে আসিয়াছে। বোন-ঝির নাম চঞ্চলা। পাঁচ ক্রোশ দূরে ঝিঁ'ঝিরডাঙ্গা নামক গ্রামে তাহাদের বাস। সে বিধবা। বয়স প্রায় ত্রিশ। রং কাল বটে, কিন্তু দেখিতে মন্দ নহে। আমি মনে করিলাম,—ইহার সহিত ভাব করিতে হইবে। তাহা করিলে দুর্লভীর হিংসা হইবে। আমার উপর আর তাহার রাগ থাকিবে না। চঞ্চলার চিত্র পরে প্রদত্ত হইল।
রং ফরসা হইবার জন্য শঙ্কর ঘোষ আমাকে যে ঔষধ বিক্রয় করিয়াছিল, তাহা আমি ব্যবহার করি নাই। সেই ঔষধ দুর্লভীকে আমি খাইতে দিলাম। তাহা খাইয়া দুর্লভীর পেট ছাড়িয়া দিল, দুর্লভী মৃতপ্রায় হইল। গ্রামের সকলে আমাকে ছি ছি করিতে লাগিল। পুলীশে সংবাদ দিবে বলিয়া কেষ্টার বাপ আমাকে ভয় দেখাইল।
চঞ্চলা বলিল যে, তাহাদের গ্রামে ভিকু ডাক্তার নামক এক ভাল চিকিৎসক আছেন, তাঁহাকে আনিলে তাহার মাসী ভাল হইবে। আমার ঔষধ খাইয়া দুর্লভীর প্রাণ যাইতে বসিয়াছে, সে জন্য ভয়ে আমি খরচ দিতে সম্মত হইলাম। ব্যাগ হাতে করিয়া পাঁচ ক্রোশ দূরে ঝিঁ'ঝিরভাঙ্গা হইতে ভিকু ডাক্তার পদব্রজে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ইনি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রদান করেন।
শুনিলাম যে, ভিকু কলিকাতায় কোন ডাক্তারখানায় ছয় মাস কম্পাউণ্ডারি করিয়াছিলেন। একবার কোন রোগীকে কৃমির ঔষধের পরিবর্তে কুচিলা বিষ প্রদান করিয়াছিলেন। রোগীর তাহাতে মৃত্যু হইয়াছিল। সেজন্য ভিকুর ছয় মাস কারাবাস হইয়াছিল। এইরূপ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া ভিকু এখন স্বগ্রামে আসিয়া ডাক্তার হইয়াছেন।
ভিকুর বয়স চল্লিশের অধিক। শরীর কাহিল। রং ময়লা, তবে কাল নহে। সচরাচর হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারদের বিশেষতঃ হাতুড়েদের যেরূপ হয়, ভিকুর মুখ দিয়াও সেইরূপ চড় বড় করিয়া কথার যেন খৈ ফুটিতে থাকে। দুর্লভীকে দেখিয়া ভিকু বলিলেন,— “কোন ভয় নাই, সরিষা-প্রমাণ এক বড়িতে ইহাকে আমি ভাল করিব। এ বা কি রোগ। আমি কত অসাধ্য রোগ ভাল করিয়াছি। কত মরা মানুষকে জীবন প্রদান করিয়াছি।”
এইরূপ ভূমিকা করিয়া ভিকু নিজের বিদ্যার পরিচয় দিতে আরম্ভ করিলেন। ভিকু বলিলেন,— “নেহালা গ্রামের ত্রিলোচন সরকেলের পেট ক্রমে ক্রমে ফুলিতে লাগিল; পেট ফুলিয়া ক্রমে জালার মত হইল। কেহ বলিল উদরী, কেহ বলিল টিউমার। কত ঔষধ তিনি খাইলেন। কত ডাক্তার কত বৈদ্য আসিল। কিছুতে কিছু হইল না। অবশেষে তাঁহার লোকেরা আমাকে লইয়া গেল। আমি অনেকক্ষণ ধরিয়া বিশেষরূপে পরীক্ষা করিয়া তাঁহার পেটটা দেখিলাম। অবশেষে তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমাদের ঘরে মাছ ধরিবার সূতা বঁড়শী আছে? তাহারা সূতা বঁড়শী আনিয়া দিল। বড়শীতে হোমিওপ্যাথিক গুলির টোপ করিয়া সূতা সহিত রোগীকে গিলিতে বলিলাম। মুখের বাহিরে সূতাটীর অপর দিক্ ধরিয়া আমি এক দৃষ্টে তাহার দিকে চাহিয়া রহিলাম। সূতা যেই একটু নড়িয়া উঠিল, আর সেই সময় আমি টান মারিলাম। বলিব কি মহাশয়! ধামার মত প্রকাণ্ড একটা কচ্ছপ তাঁহার পেট হইতে আমি বাহির করিলাম। জলের সহিত সামান্য শিশু কচ্ছপ সরকেল মহাশয় ভক্ষণ করিয়াছিলেন। উদরে সেই কচ্ছপ ক্রমে বড় হইয়া তাঁহার জীবন সংশয় করিয়াছিল। আমার চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হইলেন।
“আর একবার রাত্রি দুই প্রহরের সময় আমি ঝিল গ্রামের শ্মশান ঘাটের নিকট দিয়া যাইতেছিলাম। দেখিলাম যে, সে স্থানে কয়েকটা ভূত কেহ দাড়াইয়া কেহ বসিয়া কমিটি করিতেছে। আমি একটু দূরে বসিয়া ব্যাগ হইতে হোমিওপ্যাথিক পুস্তক বাহির করিলাম। দিয়াশলাই জ্বালিয়া তাহার আলোকে ভূতের ঔষধ দেখিলাম। তাহার পর যেই ঔষধের শিশি বাহির করিয়াছি, আর তাহার গন্ধ পাইয়াই ভূতেরা রুদ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল। একটু বিলম্ব করিলে আমার ঔষধের গুণে তাহারা ভস্ম হইয়া যাইত। ভূতের ছাই দিয়া হিষ্টিরিয়া রোগের চমৎকার ঔষধ আমি প্রস্তুত করিতে পারিতাম।” শ্মশানে ভূতেরা কিরূপ কমিটি করিয়াছিল, তাহার চিত্র পর পৃষ্ঠায় দেখুন।
ভিকু ডাক্তার আরও বলিলেন যে,—“ভূতগণ যখন পলায়ন করিল, তখন আমি সেই স্থানে গিয়া দেখিলাম যে, তাহারা এক মড়া ভক্ষণ করিতেছিল। মড়ার হাত পা সর্ব্ব শরীর তাহারা খাইয়া ফেলিয়াছিল, কেবল মুখটি অবশিষ্ট ছিল। আমি তৎক্ষণাৎ দুইটী হোমিওপ্যাথিক ঔষধের গুলি বাহির করিয়া তাহার মুখে দিলাম। মুখে গুলি দিবামাত্র সে চাহিয়া দেখিল, তাহার পর আশ্চর্য্য কথা কি বলিব মহাশয়! আমার ঔষধের গুণে তাহার শরীর গজাইতে লাগিল। প্রথম গলা হইল, তাহার পর বক্ষঃস্থল হইল, তাহার পর উদর হইল, তাহার পর হাত পা হইল। সে উঠিয়া বসিল। তখন আমি বুঝিলাম যে, সে হিন্দুস্থানী, বাঙ্গালী নহে। সে রাত্রি আমি তাহাকে আমার বাটীতে লইয়া যাইলাম। পরদিন সে আপনার দেশে চলিয়া গেল। এখানে থাকিলে আপনাদিগকে দেখাইতাম। হোমিওপ্যাথিক ঔষধের গুণ আছে বটে, কিন্তু ঠিক ঔষধটী ধরা বড় কঠিন। অনেক দেখিয়া শুনিয়া আমার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা হইয়াছে। রোগীর চেহারা দেখিলেই আমি ঠিক ঔষধ ধরিতে পারি। আমার হাতে একটাও রোগী মারা পড়ে না। সেজন্য কলিকাতার হোমরা চোমরা ডাক্তারগণ, যাহারা ষোল টাকা বত্রিশ টাকা ভিজিট গ্রহণ করেন, তাঁহাদের যখন হালে পানি পায় না, তখন তাঁহারা বলেন, ঝিঁ'ঝিরডাঙ্গার ভিকু ডাক্তারকে লইয়া এস, তিনি না হইলে এ রোগের ঔষধ কেহ ঠিক করিতে পারিবে না। সে জন্য মাঝে মাঝে আমাকে কলিকাতায় যাইতে হয়।”
ভিকু পুনরায় বলিলেন,—“আমি আর একটা চমৎকার ঔষধ বাহির করিয়াছি। যে ঔষধে প্রজাপতি দক্ষের গলায় ছাগলের মুণ্ড জোড়া লাগিয়াছিল, ইহা সেই ঔষধ। হাত পা এমন কি মানুষের মাথা কাটিয়া দুইখানা হইয়া গেলেও, আমি এক বড়িতে পুনরায় জুড়িয়া দিতে পারি।”
ভিকু নানারূপ গল্প করিলেন। অবাক্ হইয়া সকলে তাঁহার গল্প শুনিতে সকলে মনে করিল যে, ইহার তুল্য বিচক্ষণ ডাক্তার জগতে লাগিল। নাই। দুর্লভীর চিকিৎসার জন্য আমি তাঁহাকে এক টাকা দিতে চাহিলাম। কিন্তু প্রথমে তিনি কিছুতেই তাহা লইলেন না। তিনি বলিলেন,—“আমি পাঁচ ক্রোশ পথ হইতে আসিয়াছি। চারি টাকা লইব।”
অনেক কচলাকচলির পর আমি বলিলাম যে,—“আপাততঃ আপনি এক টাকা লউন, রোগী ভাল হইলে পরে আর তিন টাকা দিব।”
এ প্রস্তাবে সম্মত হইয়া তিনি এক টাকা লইয়া প্রস্থান করিলেন।
দুর্লভী ভাল হইল। কিন্তু তাহার পর ডাক্তারকে ঘোড়ার ডিম! রোগ ভাল হইলে অনেকেই ডাক্তার বৈদ্যকে কলা দেখায়।