ডমরু-চরিত/পঞ্চম গল্প/প্রথম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম গল্প।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
স্বদেশী-কোম্পানি।
ডমরুধরের প্রথম উপাখ্যানে চিত্রগুপ্ত, যম, যমনী, পুঁইশাক, এলোকেশী,এলোকেশীর মাতা প্রভৃতির বিষয় বর্ণিত হইয়াছিল। এলোকেশী ডমরুধরের তৃতীয় পক্ষের পত্নী। সেই উপাখ্যান পাঠের ফল এইরূপ,—
'ডমরুচরিত পড় রে ভাই ক'রে একান্ত ভক্তি।
ইহকালে পাবে সুখ পরকালে মুক্তি॥
চিত্রগুপ্তর গলায় দড়ি যমনী বাজায় শাঁক।
পুঁইশাকের নামে যমের সিটকে উঠলো নাক॥
ঝক্ মক্ করে সোণার গহনা এলোকেশীর গায়।
আড় নয়নে শ্বাশুড়ী ঠাকুরুণ পিটির পিটির চায়॥
পয়সা দিয়া ডমরুচরিত কিনে রাথ ঘরে।
ধর্ম্ম অর্থ কাম মোক্ষ পাবে ইহার বরে॥
বর্ত্তমান ডমরু উপাখ্যানের ফলও সেই রূপ, বরং অধিক।
প্রতিবৎসর পূজার সময় ডমরুধর বন্ধুবান্ধবের সহিত নানারূপ গল্পকরেন। পঞ্চমীর দিন বৈকালে তাঁহার পূজার দালানে লম্বোদর, গজানন হলধর প্রভৃতি বন্ধু-বান্ধবের সহিত প্রতিমার নিকট তিনি বসিয়া আছেন। ডমরুধরের মুখের দিকে চাহিয়া লম্বোদর বলিলেন,— “এবার পুনরায় স্বদেশী কোম্পানি খুলিয়া তুমি অনেকগুলি টাকা উপার্জ্জন করিয়াছ!”
ডমরুধর উত্তর করিলেন, —“হাঁ ভাই! স্বদেশী কোম্পানি বৃথা যায় না। কিছু না কিছু দিয়া যায়। কিন্তু ভাই, সম্প্রতি আমি এক ঘোর বিপদে পড়িয়াছিলাম। সে বিপদ্ হইতে মা দুর্গা আমাকে রক্ষা করিয়াছেন। আমার প্রতি মায়ের অসীম কৃপা। বলিতে গেলে আমি মা দুর্গার বরপুত্র।”
লম্বোদর বলিলেন,— “সেবার স্বদেশী কোম্পানি খুলিয়া তুমি অনেক রাঁড়ী ভুঁড়ী গরীব দুঃখীর টাকা হাম করিয়াছিলে। এবার মকদ্দমা হুইয়াছিল জানি। কি হইয়াছিল বল দেখি!”
ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“মকদ্দমা স্বদেশী কোম্পানির প্রধান অঙ্গ। স্বদেশী কোম্পানি খুলিলে সকলকেই মামলা মকদ্দমা করিতে হয়। যাহা হউক, এখন সব চুকিয়া গিয়াছে। এই নূতন স্বদেশী কোম্পানির বৃত্তান্ত এখন আমি তোমাদিগকে বলিতে পারি, শুন।”
ডমরুধর এইরূপ বলিতে লাগিলেন,—
গত বৎসর পূজার পর একদিন বেলা দশটার সময় আমি বাহিরে বসিয়া আছি, এমন সময় ব্যাগ হাতে করিয়া এক ছোকরা আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহার বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ বৎসর। রং অল্প গৌর বর্ণ। কাল কাল গোঁপ আছে। দেখিতে সুশ্রী। ভদ্রলোকের ছেলে বলিয়া বোধ হইল।
ব্যাগ হইতে চারিটী শিশি সে বাহির করিয়া বলিল,—“এইটা ম্যালেরিয়া জ্বরের আরক, এইটা অজীর্ণ রোগের ঔষধ, এইটা বহুমূত্র রোগের ব্রহ্মাস্ত্র; আর এইটা মুখে মাখিলে রং ফরসা হয়। প্রতি শিশির মূল্য এক টাকা, চারিটা টাকা আমাকে প্রদান করুন।”
আমি বলিলাম,— “ঔষধে আমার প্রয়োজন নাই। তুমি বোকা লোক- দিগের নিকট গমন কর। তোমার একটীও ঔষধ আমি ক্রয় করিব না।”
আমার কথা শুনিয়া সে চলিয়া গেল না। অতি সুমিষ্ট স্বরে সে ঔষধের গুণ ব্যাখ্যা করিতে লাগিল। সে বলিল,—“আমি তিনটা পাস দিয়াছি। যে বিদ্যা শিখিলে নানা পদার্থ মিশাইয়া উত্তম উত্তম নূতন বস্তু প্রস্তুত করিতে পারা যায়, আমি সেই বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছি। সেই বিদ্যাবলে আমি এই সব ঔষধ প্রস্তুত করিয়াছি। ইহাদের গুণ অলৌকিক। দিন কয়েক ব্যবহার করিলেই আপনার শরীরে কান্তি ফুটিয়া পড়িবে। আপনি নব যৌবন প্রাপ্ত হইবেন।”
আমি উত্তর করিলাম,—“আমার ম্যালেরিয়া জ্বর নাই, অজীর্ণ ও বহুমূত্র রোগ নাই। বৃদ্ধ হইয়াছি, রং ফরসা হইবার সাধ নাই। তাহা ব্যতীত আমি বৃথা একটা পয়সাও খরচ করি না। তোমার ঔষধ আমি ক্রয় করিব না।”
আমাদের দুই জনে এইরূপ তর্ক বিতর্ক হইতে লাগিল। কিন্তু সে ছোকরা নাছোড় বন্দা। এমনি সুমিষ্ট ভাষায় সে বক্তৃতা করিতে লাগিল যে, ক্রমে আমার মন ভিজিয়া আসিল। অবশেষে সে বলিল,—“আপনি বৃদ্ধ হইয়াছেন সত্য, কিন্তু মন আপনার বৃদ্ধ হয় নাই। মনটা আপনার নব যৌবনে ঢল ঢল করিতেছে। আর কোন ঔষধ লউন আর নাই লউন, আপনাকে এই রং ফরসা হইবার ঔষধটী লইতে হইবে। দিন কয়েক মুখে মাথিয়া দেখুন। আপনি ফুট গৌর বর্ণ হইয়া পড়িবেন। সুন্দর সুকুমার কুড়ি বৎসরের যুবক হইবেন।”
ছেলেবেলা হইতে ফরসা হইবার আমার সাধ ছিল। অনেক সাবাং মাখিয়াছিলাম। কিছুতে কিছু হয় নাই। মনে মনে ভাবিলাম,—“এই ঔষধটা পরীক্ষা করিয়া দেখি না কেন? যদি আমার রং ফরসা হয়, তাহা হইলে দুর্লভী বাগিনী আমার রূপ দেখিয়া মোহিত হইবে।”
শিশির মুল্য এক টাকা, কিন্তু সে আমাকে আট আনায় দিল। মূল্য লইয়া সে কিছু দূর গিয়াছে, এমন সময় আমার মনে এইরূপ চিন্তার উদয় হইল,—“আমি ডমরুধর! সুমিষ্ট বক্তৃতা করিয়া আমাকে ঠকাইয়া এ আট আনা লইয়া গেল। এ সামান্য ছোকরা নয়। ইহা দ্বারা কি কোনরূপ কাজ করিতে পারা যায় না?”
এইরূপ ভাবিয়া আমি তাহাকে ডাকিলাম। অনেক আদর করিয়া আমার নিকট বসাইলাম। আমি বলিলাম,—“বাপু! তোমার নাম কি?”
সে উত্তর করিল,—“আমার নাম শঙ্কর ঘোষ।”
তাহার বাড়ী কোথায়, সে কি কাজ করে, প্রভৃতি তাহার পরিচয় গ্রহণ করিলাম। তাহার পর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—“তুমি তিনটা পাস দিয়াছ। পাঁচ দ্রব্য মিশাইয়া নূতন বস্তু প্রস্তুত করিতে পার। ঔষধ বেচিয়া কি হইবে? কোন একটা লাভের বস্তু প্রস্তুত করিতে পার না?”
কিছুক্ষণ নীরবে সে চিন্তা করিয়া আমাকে বলিল,—“কল্য আসিয়া আপনার এ কথায় উত্তর দিব।”
পরদিন সে একরাশি এঁটেল মাটি ও চারি পাঁচ খানি ধব ধবে চিক্কণ কাগজ আনিয়া আমাকে দেখাইল। সে বলিল —“এঁটেল মাটি হইতে আমি এই কাগজ প্রস্তুত করিয়াছি। এক টাকার এঁটেল মাটি হইতে দশ টাকার কাগজ হইবে। নয় টাকা লাভ থাকিবে। প্রথম প্রথম যাহা অল্প খরচ হইবে, তাহা যদি আপনি প্রদান করেন, তাহা হইলে আমরা এক স্বদেশী কোম্পানি খুলিব। লাভ অর্দ্ধেক আপনার, অর্দ্ধেক আমার।”
এটেল মাটি ও কাগজ দেখিয়া আমি মনে মনে একটু হাসিলাম। স্বদেশী কোম্পানি সম্বন্ধে আমার একটু অভিজ্ঞতা আছে। ভাবিলাম যে, একাজ হালাগুলো বাঙ্গালির উপযুক্ত বটে। তাহার প্রস্তাবে আমি সম্মত হইলাম।
চারি পাঁচ দিন পরে আমরা দুই জনে কলিকাতা গমন করিলাম। ভালরূপ একটা স্বদেশী কোম্পানি খুলিতে হইলে দুই চারি জন বড়লোকের নাম আবশ্যক। আমরা তাহার যোগাড় করিলাম। একটি মিটিং হইল। এঁটেল মাটি ও কাগজের নমুনা দেখিয়া বড়লোকেরা ঘোরতর আশ্চর্য্য হইলেন। তাঁহাদের মধ্যে কেবল একজন বলিলেন,—“এঁটেল মাটি দিয়া কাগজ প্রস্তুত হইতে পারে, তাহা আমি জানিতাম না। আমি মনে করিতাম যে, খড়ি মাটি দিয়া কাগজ প্রস্তুত হয়।”
শঙ্কর ঘোষ উত্তর করিলেন,—“খড়ি মাটি দিয়া হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে খরচ অধিক পড়ে।”
কাগজ সম্বদ্ধে ইহার এইরূপ গভীর জ্ঞান দেখিয়া অন্য সকলে তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
সেই যাঁহারা ইংরেজিতে বক্তৃতা করেন, যাহাদের বক্তৃতা শুনিয়া স্কুল কালেজের ছোড়াগুলো আনন্দে হাততালি দিয়া গগন ফাটাইয়া দেয়, আমরা সেইরূপ দুইজন বক্তার যোগাড় করিয়াছিলাম। তাঁহারা ইজের দিয়া কোমর আঁটিয়া রাখেন। তাঁহাদের একজন বক্তৃতা করিলেন—
![]()
উগ্র বক্তৃতা।
আমাদের কোম্পানির নাম হইল,—“গ্রাণ্ড স্বদেশী কোম্পানি লিমিটেড।” কয়েকজন বড়লোক ও উগ্র বক্তা: ডাইরেক্টর বা পরিচালক হইলেন। কারণ, এই সকল বড়লোক ও বক্তারা সকল প্রকার কারুকার্য্য ও ব্যবসা বাণিজ্য সম্বন্ধে হূনহর। ইহারা না জানেন, এমন বিষয় নাই। শঙ্কর ঘোষ ইংরেজি ও বাঙ্গালায় কোম্পানির বিবরণ প্রদান করিয়া কাগজ ছাপাইলেন ও সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করিলেন। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল যে, যে ব্যক্তি এক শত টাকার শেয়ার বা অংশ কিনিবে, প্রতিমাসে লাভ স্বরূপ তাহাকে পঁচিশ টাকা প্রদান করা হইবে।
দেশে ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল। সকলে বলিতে লাগিল যে, আর আমাদের ভাবনা নাই। যখন এঁটেল মাটি হইতে কাগজ প্রস্তুত হইবে, তখন বালি হইতে কাপড় হইবে। বিদেশ হইতে কোন দ্রব্য আর আমাদিগকে আমদানি করিতে হইবে না। দেশ টাকায় পূর্ণ হইয়া যাইবে। এই কথা বলিয়া কলিকাতার বাঙ্গালিরা একদিন সন্ধ্যা বেলা আপন আপন ঘর আলোকমালায় আলোকিত করিল।
প্রথম প্রথম শত শত লোক শেয়ার কিনিতে লাগিল। হুড় হুড় করিয়া টাকা আসিতে লাগিল। আমি কোষাধ্যক্ষ ছিলাম। টাকা সব আমার কাছে আসিতে লাগিল।
কয়েক মাস গত হইয়া গেল। এঁটেল মাটি দিয়া শঙ্কর ঘোষ একখানিও কাগজ প্রস্তুত করিলেন না। মাসে যে পঁচিশ টাকা লাভ দিবার কথা ছিল, তাহার একটা পয়সাও কেহ পাইল না। আসল টাকার মুখ ও কেহ দেখিতে পাইল না। জন কয়েক আমাদের নামে নালিশ করিল। শঙ্কর ঘোষ চমৎকার এক হিসাবের বহি প্রস্তুত করিয়া কাছারিতে দাখিল করিলেন। লাভ দূরে থাকুক, হিসাবে লোকসান প্রদর্শিত হইয়াছিল। কোম্পানি “লিমিটেড” ছিল। মকদ্দমা ফাঁক হইয়া গেল। আমাদের কাহারও গায়ে আঁচড়টী পর্যন্ত লাগিল না।
অনেকগুলি টাকা লোকে দিয়াছিল। বলা বাহুল্য যে, সে টাকাগুলি সমুদয় আমি লইলাম। শঙ্কর ঘোষ ভাগ চাহিল। আমি তাহাকে বুঝাইয়া বলিলাম,—“হিসাবের বহি তুমি নিজে হাতে প্রস্তুত করিয়াছ। তাহাতে তুমি লিথিয়াছ যে, লোকসান হইয়াছে। কোম্পানি ফেল হইয়া গিয়াছে। টাকা আর কোথা হইতে আসিবে। বরং যাহা লোকসান হইয়াছে, তাহা আমাকে দিয়া যাও।”
আমার কথা শুনিয়া শঙ্কর ঘোষ ঘোরতর রাগান্বিত হইল। “তুমি আমাকে ফাঁকি দিলে; তোমাকে আমি দেখিয়া লইব,”— আমাকে এইরূপ ভয় দেখাইয়া সে চলিয়া গেল। আমার দ্বিতীয় স্বদেশী কোম্পানির বৃত্তান্ত এই।
লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তুমি বলিলে যে সম্প্রতি বড় বিপদে পড়িয়া ছিলে। আমরা পাড়ায় থাকি। কোন বিপদের কথা আমরা তো শুনি নাই!”
ডমরুধর উত্তর করিলেন, “সে বিপদের কথা আজ পর্য্যন্ত আমি কাহারও নিকট প্রকাশ করি নাই। আজ তাহা তোমাদিগকে বলিতেছি, শুন।”