ডমরু-চরিত/প্রথম গল্প/চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
চিত্রগুপ্তের গলায় দড়ি—মোটা দড়ি নয়।
নির্ধারিত দিন সন্ধ্যার সময় কেবল সন্ন্যাসী ও আমি সেই ঘরে গিয়া উপবেশন করিলাম। সন্ন্যাসী পাছে কোনরূপে পলায়ন করে, সে জন্য ঘরের দ্বারে চাকরকে কুলুপ দিয়া বন্ধ করিতে বলিলাম এবং একটু দূরে তাহাকে সতর্ক ভাবে পাহারা দিতে আদেশ করিলাম। সন্ন্যাসী ঘট স্থাপন করিল। দধি, পিঠালি ও সিন্দূর দিয়া ঘটে কি সব অঙ্কন করিল। তাহার পর ফট বষট্ শ্রীং ঐং এইরূপ কত কি মন্ত্র উচ্চারণ করিল। অবশেষে হোম করিতে আরম্ভ করিল। কিছুক্ষণ পরে স্বাহা স্বাহা বলিয়া আগুনে ঘৃত দিয়া সন্ন্যাসী আপনার থলি হাতড়াইয়া একটা টিনের কৌটা বাহির করিল। সেই কৌটাতে এক প্রকার সবুজ রঙের গুড়া ছিল। হরিৎ বর্ণের সেই চূর্ণ সন্ন্যাসী আগুনে ফেলিয়া দিল।
ঘর সবুজ বর্ণের ধূমে পরিপূর্ণ হইল। আমার নিদ্রার আবেশ হইল। আমি ভাবিলাম যে, এইবার সন্ন্যাসী বেটা একটা কাণ্ড করিবে, আমাকে অজ্ঞান করিয়া আমার টাকাকড়ি লইয়া কোনরূপে পলায়ন করিবে। উঠিয়া দ্বারে ধাক্কা মারিয়া আমার চাকরকে ডাকিব, এইরূপ মানস করিলাম। আমি উঠিতে পারিলাম না। আমার হাত পা অবশ অসাড় হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু আমার জ্ঞান ছিল। হঠাৎ আমার মাথা হইতে “আমি” বাহির হইয়া পড়িলাম। আমার শরীরটী তৎক্ষণাৎ মাটির উপর শুইয়া পড়িল। শরীর হইতে যে “আমি” বাহির হইয়াছি, তাহার দিকে তখন চাহিয়া দেখিলাম। দেখিলাম যে, সে “আমি” অতি ক্ষুদ্র, ঠিক বুড়ো আঙ্গুলের মত, আর সে শরীর বায়ু দিয়া গঠিত। সেই ক্ষুদ্রশরীরে আমি উপর দিকে উঠিতে লাগিলাম সূক্ষ্ম বা লিঙ্গ শরীরের কথা পূর্ব্বে শুনিয়াছিলাম। মনে করিলাম যে, ঔষধের ধূমে সন্ন্যাসী আমাকে হত্যা করিয়াছে, মৃত্যুর পর লোকের যে লিঙ্গ শরীর থাকে, তাহাই এখন যমের বাড়ী যাইতেছে।
ছাদ ফুঁড়িয়া আমি উপরে উঠিয়া পড়িলাম। সোঁ সোঁ করিয়া আকাশ পথে চলিলাম। দূর–দূর–দূর—কত দূর উপরে উঠিয়া পড়িলাম, তাহা বলিতে পারি না। মেঘ পার হইয়া যাইলাম, চন্দ্রলোক পার হইয়া যাইলাম, সূর্যলোকে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সে স্থানে এক অশ্চর্য্য ঘটনা দর্শন করিলাম। দেখিলাম যে, আকাশ–বুড়ী এক কদম গাছতলায় বসিয়া, আঁশ বঁটি দিয়া সূর্য্যটাকে কুটি কুটি করিয়া কাটিতেছে, আর ছোট ছোট সেই সূর্য্য–খণ্ডগুলি “আকাশ–পটে জুড়িয়া দিতেছে। তখন আমি ভাবিলাম,—“ওঃ! নক্ষত্র এই প্রকারে হয় বটে! তবে এই যে নক্ষত্র সব, ইহারা সূর্য্যখণ্ড ব্যতীত আর কিছুই নহে! যে খণ্ডগুলি বুড়ী আকাশ-পটে ভাল করিয়া জুড়িয়া দিতে পারে না, আল্গা হইয়া সেইগুলি খসিয়া পড়ে। তখন লোকে বলে,—“নক্ষত্র পাত হইল।” কিছুক্ষণ পরে আমার ভয় হইল যে, —সূর্য্যটী তো গেল, পৃথিবীতে পুনরায় দিন হইবে কি করিয়া? আকাশ-বুড়ী আমার মনের ভাব বুঝিয়া হাসিয়া বলিল,—“ভোরে ভোরে উঠিয়া আকাশে ঝাড়ু দিয়া সমুদয় নক্ষত্রগুলি আমি একত্র করিব। সেইগুলি জুড়িয়া পুনরায় আস্ত সূর্য্য করিয়া প্রাতঃকালে উদয় হইতে পাঠাইব। প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলা আঁশ বটি দিয়া সূর্য্য কাটিয়া নক্ষত্র করি, সকাল বেলা আবার সেইগুলি জুড়িয়া আস্ত সূর্য্য প্রস্তুত করি। আমার এই কাজ।”
আকাশ-বুড়ীর নিকট হইতে বিদায় হইয়া, আমি ভাবিলাম যে, নভোমণ্ডলের সমুদয় ব্যাপারটা ভাল করিয়া দেখিতে হইবে। এইরূপ ভাবিয়া পুনরায় আমি শূন্য-পথে সোঁ সোঁ করিয়া ভ্রমণ করিতে লাগিলাম। কিন্তু সর্ব্বনাশ! কিছু দূর গিয়া দেখি যে, দুইটা বিকটাকার যমদূত আমার মত আর একটা সূক্ষ্ম শরীরকে লইয়া যাইতেছে। আমার বড় ভয় হইল। সে স্থানে মেঘ নাই যে তাহার ভিতর লুকাইব পলাইবার সময় পাইলাম না। স্বপ করিয়া তাহারা আমাকে ধরিয়া ফেলিল। একজন জিজ্ঞাসা করিল, তুই বেটা কে রে? সত্যযুগের রাজা হরিশ্চন্দ্র ভিন্ন বেওয়ারিশ হইয়া আর কাহারও এখানে বেড়াইবার হুকুম নাই। নিশ্চয় তুই বেটা কুম্ভীপাক অথবা রৌরব নরকের ফেরারি আসামী।’ এই বলিয়া তাহারা আমাকে বাঁধিয়া ফেলিল ও ধাক্কা মারিতে মারিতে লইয়া চলিল॥
ক্রমে আমরা যমপুরীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। যম দরবার করিয়া সিংহাসনে বসিয়া আছেন। পাশে স্তূপাকার খাতাপত্রের সহিত চিত্রগুপ্ত, সম্মুখে ডাঙ্গস হাতে ভীষণমূর্ত্তি যমদূতের পাল। আমাদের দুই জনকে যমদূতেরা সেই রাজসভায় হাজির করিল। প্রথমে অপর লোকটীর বিচার আরম্ভ হইল।
চিত্রগুপ্ত তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তোমার নাম?”
সে উত্তর করিল,—“আমার নাম বৃন্দাবন গুঁই।”
তাহার পর কোথায় নিবাস, কি জাতি প্রভৃতি জিজ্ঞাসা করিয়া, খাতা পত্র দেখিয়া যমকে চিত্রগুপ্ত বলিলেন,—“মহাশয়! এ লোকটা অতি ধার্ম্মিক, অতি পুণ্যবান্। পৃথিবীতে থাকিয়া এ বার মাসে তের পার্ব্বণ করিত, দীন দুঃখীর প্রতি সর্ব্বদা দয়া করিত, সত্য ও পরোপকার ইহার ব্রত ছিল।”
এই কথা শুনিয়া যম চটিয়া গেলেন। তিনি বলিলেন,—“চিত্রগুপ্ত! তোমাকে আমি বারবার বলিয়াছি যে, পৃথিবীতে গিয়া মানুষ কি কাজ করিযাছে, কি কাজ না করিয়াছে, তাহার আমি বিচার করি না। মানুষ কি খাইযাছে, কি না খাইয়াছে, তাহার আমি বিচার করি। ব্রহ্মহত্যা, গো-হত্যা, স্ত্রীহত্যা করিলে এখন মানুষের পাপ হয় না, অশাস্ত্রীয় খাদ্য খাইলে মানুষের পাপ হয়। তবে শিবোক্ত তন্ত্রশাস্ত্র মতে সংশোধন করিয়া খাইলে দোষ হয় না।” তন্ত্রশাস্ত্রে শিব বলিয়াছেন,—
‘গো–মেষাশ্ব–মহিষক–গোধাজোষ্ট্র–মৃগোদ্ভবম্।
মহামাংসাষ্টকং প্রোক্তং দেবতাপ্রীতিকারকম্।’
গোমাংস, মেষমাংস, অশ্বমাংস, মহিষমাংস, গোধামাংস, ছাগমাংস, উষ্ট্রমাংস ও মৃগমাংস,—এই অষ্টবিধ মাংসকে মহামাংস বলে। এই সকল মাংসই দেবতাদিগের প্রীতিদায়ক। “ওঁ প্রতদ্বিষ্ণুস্তরতে' অথবা 'ওঁ ব্রহ্মার্পণমস্ত' এই মন্ত্রে সংশোধন করিয়া লইলে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণও এই সমুদয় -মাংস ভক্ষণ করিতে পারে। মৃগমাংসের ভিতর শূকরের মাংসও ধরিয়া লইতে হইবে। তন্ত্রশাস্ত্রে যাহাকে কলামাংস বলে, শিব তাহা খাইতেও অনুমতি দিয়াছেন। আর দেখ, চিত্রগুপ্ত! তুমি এ কেরাণিগিরি ছাড়িয়া দাও। পৃথিবীতে তোমার বংশধর কায়স্থগণ কি করিতেছে, একবার চাহিয়া দেখ। উড়ে গয়লার মত এক এক গাছা সূতা অনেকে গলায় পরিতেছে। ব্রাহ্মণকে তাহারা আর প্রণাম করে না। ইংরেজি পড়িয়া তাহাদের মেজাজ আগুন হইয়া গিয়াছে। তাই বলি যে, চিত্রগুপ্ত! তুমিও ইংরেজি পড়। ইংরেজি পড়িয়া তোমার হেড্টী গরম কর। হেড্টী গরম করিয়া তুমিও গলায় দড়ি দাও। মোটা দড়ি নয়। বুঝিয়াছ তো? গলায় দড়ি দিয়া ‘চিত্রবর্ম্মা’ নাম গ্রহণ কর।”
এই কথা বলিয়া যম নিজে সেই লোকটীকে জেরা করিতে লাগিলেন,—“কেমন হে বাপু! কখনও বিলাতি বিস্কুট খাইয়াছিলে?”
সে উত্তর করিল,—“আজ্ঞা না।”
যম জিজ্ঞাসা করিলেন,— “বিলাতি পাণি? যাহা খুলিতে ফট্ করিয়া শব্দ হয়? যাহার জল বিজবিজ করে?”
সে উত্তর করিল,—“আজ্ঞা না।”
যম পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,—“সত্য করিয়া বল, কোনরূপ অশাস্ত্রীয় খাদ্য ভক্ষণ করিয়াছিলে কি না?”
সে ভাবিয়া চিন্তিয়া উত্তর করিল,—“আজ্ঞা, একবার ভ্রমক্রমে একাদশীর দিন পুইশাক খাইয়া ফেলিয়াছিলাম।”
যমের সর্ব্বশরীর শিহরিয়া উঠিল। তিনি বলিলেন,—“সর্ব্বনাশ! করিয়াছ কি! একাদশীর দিন পুইশাক! একাদশীর দিন পুইশাক! ওরে! এই মুহূর্তে ইহাকে রৌরব নরকে নিক্ষেপ কর্। ইহার পূর্ব্ব পুরুষ, যাহারা স্বর্গে আছে, তাহাদিগকেও সেই নরকে নিক্ষেপ কর্। পরে ইহার বংশধরগণের চৌদ্দ পুরুষ পর্যন্তও সেই নরকে যাইবে। চিত্রগুপ্ত! আমার এই আদেশ তোমার খাতায় লিখিয়া রাখ। “
যমের এই বিচার দেখিয়া আমি তো অবাক্। এইবার আমার বিচার। কিন্তু আমার বিচার আরম্ভ হইতে না হইতে আমি উচ্চৈঃস্বরে বলিলাম,—“মহারাজ! আমি কখন একাদশীর দিন পুইশাক ভক্ষণ করি নাই।”
আমার কথায় যম চমৎকৃত হইলেন। হর্ষোৎফুল্ল লোচনে তিনি বলিলেন,—“সাধু সাধু! এই লোকটী একাদশীর দিন পুইশাক খায় নাই। সাধু,সাধু! এই মহাত্মার শুভাগমনে আমার যমালয় পবিত্র হইল। যমনীকে শীঘ্র শঙ্খ বাজাইতে বল। যমকন্যাদিগকে পুষ্পবৃষ্টি করিতে বল। বিশ্বকর্ম্মাকে ডাকিয়া আন,—ভূঃ ভুবঃ স্বঃ মহঃ জনঃ তপঃ সত্যলোক পারে ধ্রুবলোকের উপরে এই মহাত্মার জন্য মন্দাকিনী-কলকলিত, পারিজাত–পরিশোভিত, কোকিল–কুহরিত, অপ্সরাপদ–নুপুর–ঝুনঝুনিত হীরা–মাণিক–খচিত নূতন একটী স্বর্গ নির্ম্মাণ করিতে বল।”
চিত্রগুপ্তের—ওঁ থুড়ি! চিত্রকর্ম্মার হিংসা হইল। তিনি বলিলেন,—মহাশয়! পৃথিবীতে লোকটীর এখনও আয়ু শেষ হয় নাই। স্থূল দেহের রক্তমাংসের আঁষটে গন্ধ এখনও ইহার সূক্ষ্ম শরীরে রহিয়াছে।
এই কথা শুনিয়া যম চটিয়া আগুন হইলেন। আমার আদর লোপ হইল। তিনি বলিলেন,—“কি! সাদা সাদা গোল গোল হাঁসের ডিমের গন্ধ গায়ে! মার্, ইহার মাথায় দশ ঘা ডাঙ্গস্ মার্।”
যম বলিবামাত্র তাঁহার একজন দূত আমার মাথায় এক ঘা ডাঙ্গস্ মারিল। বলিব কি হে, মাথায় আমার যেন ঠিক বজ্রাঘাত হইল। যাতনায় ত্রাহি মধুসূদন বলিয়া আমি চীৎকার করিতে লাগিলাম। সেই এক ঘা ডাঙ্গসে যমপুরী হইতে আকাশপথে অনেক নিম্নে আসিয়া পড়িলাম। দমাস্ করিয়া আর এক ডাঙ্গসের ঘা! শূন্যপথে আরও নীচে আসিয়া পড়িলাম। আর এক ঘা! আরও নিম্নে আসিয়া পড়িলাম। এইরূপ দশম আঘাতে পৃথিবীতে আসিয়া আমার বাড়ীর ছাদ ফুঁড়িয়া আমার সূক্ষ্ম শরীর পুনরায় সেই পূজার ঘরে আসিয়া পড়িল।
নিজের বাড়ীতে সেই পূজার ঘরে আসিয়া ক্ষুদ্র মাথায় ক্ষুদ্র হাত বুলাইতে লাগিলাম। প্রহারের চোটে চক্ষুতে সরিষা–ফুল দেখিতেছিলাম। অনেকক্ষণ কিছুই দেখিতে পাইলাম না। অনেকক্ষণ পরে চাহিয়া দেখি যে, “আমি” বসিয়া আছি। অর্থাৎ আমার সেই বড় শরীর আসনে বসিয়া আছে, আর সন্ন্যাসীর শরীর মাটীতে পড়িয়া আছে। কি হইআাছে, তখন বুঝিতে পারিলাম। বুঝিলাম, যে সবুজ গুঁড়ার ধুম দিয়া আমার শরীর হইতে প্রাণময় কোষ, মনোময় কোষ, আর সকল কোষ বাহির করিয়া, সন্ন্যাসী আপনার সূক্ষ্ম শরীর দ্বারা আমার স্থূল অন্নময় কোষ অধিকার করিয়াছে। আমার শরীর বটে, কিন্তু ঐ যে আসনে বসিয়া আছে, ও আমি নই, ও সন্ন্যাসী। সূক্ষ্ম শরীরে মুখ দিয়া আমি সন্ন্যাসীর সহিত কথোপকথন করিতে পারিলাম না! সে জন্য নিরুপায় হইয়া আমি সন্ন্যাসীর দেহে প্রবেশ করিলাম।