বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/প্রথম গল্প/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

ডমরু-চরিত।

প্রথম গল্প

প্রথম পরিচ্ছদ।

সূচনা।

 ডমরুবধর বলিলেন,—“এই যে দুর্গোৎসবটী, এটী তোমরা সামান্য জ্ঞান করিও না। কিন্তু এখনকার বাবুদের সে বোধ নাই। বাবুরা এখন হাওয়াখোর হইয়াছেন। দেশে হাওয়া নাই, বিদেশে গমন করিয়া বাবুরা হাওয়া সেবন করেন, আর বাপ-পিতামহের পূজার দালান ছুঁচো-চামচীকাতে অপরিষ্কার করে।”

 লম্বোদর বলিলেন,—“সত্য কথা! সেকালে পূজার সময় লোকে বিদেশ হইতে বাড়ী আসিত। বন্ধু-বান্ধবের সহিত মিলিত হইত। যাহার যেমন ক্ষমতা মায়ের পূজা করিত, গরীব দুঃখীরা অস্ততঃ এক শরা খয়ে-মুড়কি দুইটা নারিকেল-নাডু পাইত।”

 শঙ্কর ঘোষ বলিলেন, “শুনিয়াছি যে, কলিকাতায় পুজা করা এক নূতন ব্যবসা হইয়াছে। একটা প্রতিমা খাড়া করিয়া বন্ধু-বান্ধবদিগকে লোক নিমন্ত্রণ করে, পরে তাহাদের কাণ মলিয়া প্রণামি আদায় করে। পূজা করিয়া অনেকে দুই পয়সা উপার্জ্জন করে।”

 ডমরুধর বলিলেন,—“তাহাতে আর দোষ কি? পূজার সময় আমি আমার আবাদের প্রজাগণকে নিমন্ত্রণ করি। ভক্তিভাবে মায়ের পাদপদ্মে তাহারা যদি কিছু প্রণামি প্রদান করে, তাহাতে আর আপত্তি কি? যাহা হউক, বিলক্ষণ ঠেকিয়া এই দুর্গোৎসবটী আরম্ভ করিয়াছি। আমি এখন বুঝিয়াছি যে, ভগবতীর আরাধনা করিলে ধনসম্পদ হয়।”

 পুরোহিত বলিলেন,—“তে সম্মতা জনপদেষু ধনানি তেষাং, তেষাং যশাংসি ন চ সীদতি ধর্ম্মবর্গঃ।” হে দেবি! তুমি যাহার প্রতি কৃপা কর, জনপদে সে পূজিত হয়; তাহার ধন ও যশ হয়, তাহার ধর্ম অক্ষুণ্ণ থাকে।”

 কলিকাতার দক্ষিণে একখানি গ্রামে ডমরুধরের বাস। প্রথম বয়সে তিনি নিতান্ত দরিদ্র ছিলেন। অনেক কৌশল করিয়া, সাধ্যমতে একটী পয়সাও খরচ না করিয়া তিনি এখন প্রভূত ধনশালী হইয়াছেন। অন্যান্য সম্পত্তির মধ্যে সুন্দরবনের আবাদে তাঁহার এখন বিলক্ষণ লাভ হইয়াছে। ডমরুধর এখন পাকা ইমারতে বাস করেন। পূজার পঞ্চমীর দিন সন্ধ্যার পর দালানে, যে স্থানে প্রতিমা হইয়াছে, সেই স্থানে গল্পগাছা প্রসঙ্গে এইরূপ কথাবার্তা হইতেছিল।

 ডমরুধর পুনরায় বলিলেন,— “হাঁ! মা আমাকে ঘোরতর বিপদ্ হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। সেই বিপদে পড়িয়া, একান্ত মনে মাকে ডাকিয়া আমি বলিয়াছিলাম, ‘মা! তুমি আমাকে এ সঙ্কট হইতে পরিত্রাণ কর। তাহা করিলে প্রতি বৎসর আমি তোমার পূজা করিব।”

 লম্বোদর বলিলেন,—“তুমি তো কেবল তিন বৎসর পূজা করিতেছ। এ তিন বৎসরের ভিতর তোমাকে তো, কোন বিপদে পড়িতে দেখি নাই। বরং তিন বৎসর পূর্ব্বে এই বৃদ্ধ বয়সে তুমি নূতন পত্নী লাভ করিয়াছ।”

 ডমরুধর বলিলেন,—“তিন বৎসর পূর্ব্বে আমি ঘোরতর বিপদে পড়িয়াছিলাম। তৃতীয় পক্ষ বিবাহের সময় আমি সঙ্কটাপন্ন হইয়াছিলাম। গ্রামের লোক, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব কেহই সে কথা জানে না। মুখ ফুটিয়া আজ পর্যস্ত কাহারও নিকট সে কথা আমি প্রকাশ করি নাই। মা জগদম্বা আমাকে সে বিপদ হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। দুর্গতিনাশিনী দুর্গার প্রতি লোকের ভক্তি ক্রমে লোপ হইতেছে। কলেরা ম্যালেরিয়া বসন্ত প্লেগ তো আছেই, মায়ের প্রতি ভক্তির অভাবে এখন আবার ফুলো রোগ দেখা দিয়াছে, ঘুমন্ত রোগও আসিয়াছে। জগদম্বার প্রতি ভক্তি থাকিলে লোকের এ সব বিপদ্ হয় না।”

 পুরোহিত অপরিস্ফুট স্বরে বলিলেন,―

 “দুর্গে! স্মৃতা হুরসি ভীতিমশেষজন্তোঃ,
স্বস্থৈঃ স্মৃতা মতিমতীব শুভাং দদাসি॥
দারিদ্রদুঃখভয়হারিণি! কা ত্বদন্যা,
সর্ব্বোপকারকরণায় সদার্দ্রচিত্তা॥

 হে দুর্গে! বিপদে পড়িয়া তোমাকে স্মরণ করিলে জীবগণের ভয় তুমি দূর কর। সুস্থ অবস্থায় তোমাকে স্মরণ করিলে তুমি তাহাদের মঙ্গল কর। হে দারিদ্র্য-দুঃখহারিণি! সর্ব্বপ্রকার উপকার করিবার নিমিত্ত তুমি ভিন্ন দয়ার্দ্রচিত্তা আর কে আছে?”

 লম্বোদর বলিলেন,—“কিন্তু বিপদটা কি? কি বিপদে তুমি পড়িয়াছিলে?”

 ডমরুধর বলিলেন,—“এতদিন পরে সে বিপদের কথা আজ আমি প্রকাশ করিতেছি, শুন।”