বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/প্রথম গল্প/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

ছাল-ছাড়ান বাঘ।

 এইরূপে চারিদিকে আমি দেখিয়া বেড়াইলাম। বলা বাহুল্য যে, আমাকে কেহ দেখিতে পাইল না। সূক্ষ্ম শরীর অতি ক্ষুদ্র, হাওয়া দিয়া গঠিত, সূক্ষ্ম শরীর কেহ দেখিতে পায় না। একে যমদূতের ভয়, তাহার উপর আবার এই সমুদয় হৃদয়—বিদারক দৃশ্য! সে স্থানে আমি অধিক্ষণ তিষ্ঠিতে পারিলাম না। আমি ভাবিলাম,—“দূর কর! বনে গিয়া বসিয়া থাকি। সুন্দরবনে মনুষ্যের অধিক বাস নাই, যমদূতদিগের সে দিকে বড় যাতায়াত নাই, সেই সুন্দরবনে গিয়া বসিয়া থাকি।”

 বায়ুবেগে সুন্দরবনের দিকে চলিলাম। প্রথম আমি আমার আবাদে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সে স্থানে আমার কোন কর্মচারীকে দেখিতে পাইলাম না। কেহ মাছ, কেহ ঘৃত, কেহ মধু, কেহ পাঁঠা লইয়া তাহারা “আমার” বিবাহে নিমন্ত্রণে গিয়াছিল। সে স্থান হইতে আমি গভীর বনে প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম যে, এক গাঙের ধারে একখানি নৌকা লাগিয়া আছে, উপরে পাঁচ ছয়জন কাঠুরিয়া কাঠ কাটিতেছে। তাহাদের সঙ্গে মুগুর হাতে একজন ফকীর আছে। মন্ত্র পড়িয়া ফকীর বাঘদিগের মুখ বন্ধ করিয়া দিয়াছে। নির্ভয়ে কাঠুরিয়াগণ কাঠ কাটিতেছে। সেই স্থানে গিয়া আমি একটী শুষ্ক কাঠের উপর উপবেশন করিলাম। বলা বাহুল্য যে, তাহারা আমাকে দেখিতে পাইল না।

 এই স্থানে বসিয়া মনের বেদনায় আমি কাঁদিতে লাগিলাম। অশ্রুজলে আমার বক্ষঃস্থল ভাসিয়া গেল। না এদিক্, না ওদিক্, না মরা, না বাঁচা, আমার অবস্থা ভাবিয়া আমি আকুল হইলাম। আজ “আমি” সাজিয়া সন্ন্যাসী আমার কন্যাকে বিবাহ করিবে, বাসর ঘরে সন্ন্যাসী গান করিবে, তাহার পর ফুলশয্যা হইবে,—ওঃ! আর আমার প্রাণে সয় না। হায় হায়! আমার সব গেল। হঠাৎ এই সময় মা দুর্গাকে আমার স্মরণ হইল। প্রাণ ভরিয়া মাকে আমি ডাকিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম,—“মা! তুমি জগতের মা! তোমার এই অভাগা পুত্রের প্রতি তুমি কৃপা কর। মহিষাসুরের হাত হইতে দেবতাদিগকে তুমি পরিত্রাণ করিয়াছিলে, সন্ন্যাসীর হাত হইতে তুমি আমাকে নিস্তার কর। মনসা লক্ষ্মীর কখন পূজা করি নাই, ঘেঁটু পূজাও করি নাই, কোন দেবতার পূজা করি নাই। কিন্তু এখন হইতে, মা, প্রতি বৎসর তোমার পূজা করিব। অকালে তোমার পূজা করিয়া রামচন্দ্র বিপদ্ হইতে উদ্ধার হইয়াছিলেন। আমিও মা! সেইরূপ অকালে তোমার পূজা করিব। তুমি আমাকে বিপদ্ হইতে উদ্ধার কর। ব্রজের নন্দ ঘোষের স্বজাতি কলিকাতার হরিভক্ত গোয়ালা মহাপ্রভুরা কসাইকে যখন নবপ্রসূত গোবৎস বিক্রয় করেন, কসাই যখন শিশু বৎসের গলায় দড়ি দিয়া হিচড়াইয়া লইয়া যায়, তখন সেই দুধের বাছুরটী নিদারুণ কাতরকণ্ঠে যেরূপ মা মা বলিয়া ডাকিতে থাকে, সেইরূপ কাতর স্বরে আমিও মা দুর্গাকে ডাকিতে লাগিলাম।

 জগদম্বার মহিমা কে জানে! প্রাণ ভরিয়া তাঁহাকে ডাকিলে তিনি কৃপা করেন। জগদম্বা আমার প্রতি কৃপা করিলেন। বন হইতে হঠাৎ এক বাঘ আসিয়া কাঠুরিয়াদিগের মাঝখানে পড়িল। সুন্দরবনের মানুষ-থেকো প্রকাণ্ড ব্যাঘ্র! শরীরটী হরিদ্রাবর্ণের লোমে আচ্ছাদিত, তাহার উপর কাল কাল ডোরা। এ তোমার চিতে বাঘ নয়, গুল বাঘ নয়, এ বাবা, টাইগার! ইংরেজিতে যাহাকে রয়াল টাইগার বলে, এ সেই আসল রয়াল টাইগার!

 এক চাপড়ে একজন কাঠুরিয়াকে বাঘ ভূতলশায়ী করিল, ফকীরের মন্ত্রে তাহার মুখ বন্ধ ছিল, মুখে করিয়া তাহাকে সে ধরিতে পারিল না। সেই স্থানে শুইয়া থাবা দিয়া মানুষটাকে পিঠে তুলিতে চেষ্টা করিল। না মোটা না সরু নিকটে একটা গাছ ছিল। বাঘের দীর্ঘ লাঙ্গুলটা সেই গাছের পাশে পড়িয়া ছিল। একজন কাঠুরিয়ার একবার উপস্থিত বুদ্ধি দেখ! বাঘের লাঙ্গুলটী লইয়া সে সেই গাছে এক পাক দিয়া দিল, তাহার পর লেজের আগাটী সে টানিয়া ধরিল।

 বাঘের ভয় হইল। বাঘ মনে করিল,—“মানুষ ধরিয়া মানুষ খাইয়া বুড়া হইলাম, আমার লেজ লইয়া কখন কেহ টানাটানি করে নাই। আজ বাপধন! তোমাদের একি নূতন কাণ্ড! পলায়ন করিতে বাঘ চেষ্টা করিল। একবার, দুইবার, তিনবার বিষম বল প্রকাশ করিয়া বাঘ পলাইতে চেষ্টা করিল। কিন্তু গাছে লেজের পাক, বাঘ পলাইতে পারিল না। অসুরের মত বাঘ যেরূপ বল প্রকাশ করিতেছিল, তাহাতে আমার মনে হইল যে,যাঃ! লেজটা বা ছিঁড়িয়া যায়। কিন্তু দৈবের ঘটনা একবার দেখ! এত টানাটানিতেও বাঘের লাঙ্গুল ছিঁড়িয়া গেল না। তবে এক অসম্ভব ঘটনা, প্রাণের দায়ে ঘোরতর বলে বাঘ শেষকালে যেমন এক হ্যাঁচকা টান মারিল, আর চামড়া হইতে তাহার আস্ত শরীরটা বাহির হইয়া পড়িল। অস্থি মাংসের দগদগে গোটা শরীর, কিন্তু উপরে চর্ম্ম নাই! পাকা আমের নীচের দিক্‌টা সবলে টিপিয়া ধরিলে যেরূপ আঁটিটা হড়াৎ করিয়া বাহির হইয়া পড়ে, বাঘের ছাল হইতে শরীরটী সেইরূপ বাহির হইল পড়িল। কলিকাতার হিন্দু কসাই মহাশয়েরা জীয়ন্ত পাঁঠার ছাল ছাড়াইলে চর্ম্মবিহীন পাঁঠার শরীর যেরূপ হয়, বাঘের শরীরও সেইরূপ হইল। মাংসের বাঘ রুদ্ধশ্বাসে বনে পলায়ন করিল।

 ফকীর ও কাঠুরিয়াগণ ঘোরতর বিস্মিত হইয়া এক দৃষ্টে হাঁ করিয়া সেইদিকে চাহিয়া রহিল। বাঘের লাঙ্গুল লইয়া গাছে যে পাক দিয়াছিল লেজ ফেলিয়া সেও সেইদিকে হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল। বাঘ-শূন্য ব্যাঘ্রচর্ম্ম সেই স্থানে পড়িয়া রহিল। আমার কি মতি হইল, গরম গরম সেই বাঘ-ছালের ভিতর আমি প্রবেশ করিলাম। ব্যাঘ্রচর্ম্মের ভিতর আমার সূক্ষ্ম শরীর প্রবিষ্ট হইবা মাত্র ছালটা সজীব হইল। গা ঝাড়া দিয়া আমি উঠিয়া দাড়াইলাম। গাছ হইতে লাঙ্গুলটা সরাইয়া লইলাম। পাছে ফের পাক দেয়! তাহার পর দুই একবার আস্ফালন করিলাম। পূর্বে তো অবাক্ হইয়াছিল, তাহা অপেক্ষা এখন দশগুণ অবাক্ হইয়া ফকীর ও কাঠুরিয়াগণ দৌড়িয়া নৌকায় গিয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি নৌকা নদীর মাঝখানে লইয়া দ্রুতবেগে ভাঁটার স্রোতে তাহারা পলায়ন করিল।

 এখন এই নৃতন শরীরের প্রতি একবার আমি চাহিয়া দেখিলাম এখন আমি সুন্দরবনের কেঁদো বাঘ হইয়াছি—সেই যারে বলে রয়াল টাইগার! ভাবিলাম যে,—এ মন্দ কথা নয়, এখন যাই, এই শরীরে বিবাহ আসরে গিয়া উপস্থিত হই। এখন দেখি, সন্ন্যাসী বেটা কেমন করিয়া আমার কন্যাকে বিবাহ করে। এইরূপ স্থির করিয়া আমি দৌড়িলাম। কখন নিবিড় বনের ভিতর দিয়া চলিলাম, কখন লোকের আবাদের ধার দিয়া চলিলাম, সাঁতার দিয়া অথবা লম্ফ দিয়া শত শত নদী নালা পার হইলাম। যে গ্রামে কন্যার বাড়ী, সন্ধ্যার সময় তাহার এক ক্রোশ দূরে গিয়া পৌঁছিলাম। দূর হইতে আলো দেখিয়া ও বাজনা-বাদ্যের শব্দ শুনিয়া বুঝিলাম যে, ঐ বর আসিতেছে। সেই দিকে দ্রুতবেগে ধাবিত হইলাম। আলুম করিয়া এক লাফ দিয়া প্রথম বাদ্যকরদিগের ভিতর পড়িলাম, কালো কালো বিলাতী সাহেবের কোট পেনটু পিঁধে যাহারা বিলাতী বাজা বাজাইতেছিল, তাহারা আমার সেই মেঘগর্জ্জনের ন্যায় আলুম শব্দ শুনিয়া আর আমার সেই রুদ্রমূর্ত্তি দেখিয়া আপন আপন যন্ত্র ফেলিয়া যে যেদিকে পারিল পলায়ন করিল। ঢাকি ঢুলিদের ত কথাই নাই। তাহাদের কেহ পলাইল, কেহ সেই স্থানে মুর্চ্ছিত হইয়া পড়িল। যাহারা আলো প্রভৃতি লইয়া চলিয়াছিল, তাহারাও সকলে পলায়ন করিল। তাহার পর পুনরায় আলুম করিয়া আমি বরযাত্রদিগের গাড়ীর নিকট উপস্থিত হইলাম। টপ টপ করিয়া তাহারা গাড়ী হইতে লাফাইয়া পড়িল ও যে যে দিকে পারিল পলায়ন করিল।

 লম্বোদর বলিলেন,—“আমিও বরযাত্র গিয়াছিলাম। আমি একটী গাছে গিয়া উঠিয়াছিলাম।”

 শঙ্কর ঘোষ বলিলেন,—“গাড়ী হইতে লাফাইয়া পড়িতে আমার পা ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। শেষে কেলে-হাঁড়ী মাথায় দিয়া সমস্ত রাত্রি একটা পুস্করিণীতে গা ডুবাইয়া বসিয়া রহিলাম।