ডমরু-চরিত/প্রথম গল্প/সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
ডমরুধরের গলায় কফ্।
ডমরুধর বলিলেন,—“তাহার পর লম্ফ দিয়া একে বারে আমি বরের চারি ঘোড়ার গাড়ীতে গিয়া উঠিলাম। ঘোর ত্রাসে সন্ন্যাসীর হৃৎকম্প হইল। আমার শরীর হইতে ফট করিয়া সে আপনার সূক্ষ্ম শরীর বাহির করিল। আপনার সূক্ষ্ম শরীর লইয়া কোথায় যে সে পলায়ন করিল, তাহা বলিতে পারি না। সেই দিন হইতে তাহাকে অথবা তাহার চেলা দুইজনকে আর কখন আমি দেখি নাই। বিন্দীর চালায় তাহার দেহটীও আমি দেখিতে পাই নাই।
আমি দেখিলাম যে, গাড়ীর উপর আমার দেহটী পড়িয়া রহিয়াছে। বাঘছাল হইতে বাহির হইয়া তৎক্ষণাৎ আমি নিজ দেহে প্রবেশ করিলাম। গাড়ীর গদিতে বাঘছালখানি পাতিয়া তাহার উপর আমি গঠ হইয়া বসিলাম। নিজের শরীর পুনরায় পাইয়া আনন্দে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিলাম। কন্যার জন্য যে সমুদয় গহনা প্রস্তুত করিয়াছিলাম, সম্মুখে দেখিলাম যে, সেই গহনার বাক্সটা রহিয়াছে। পরে শুনিলাম যে, ঘটকীর পরামর্শে সন্ন্যাসী এই গহনার বাক্স সঙ্গে আনিয়াছিল।
এখন বিবাহ-বাড়ীতে যাইতে হইবে। কিন্তু নিকটে জনপ্রাণী ছিল না। একেলা বিবাহ-বাড়ীতে যাইতে পারি না। গাড়ী হইতে নামিলাম। পথ হইতে একটা ঢোল লইয়া নিজেই ঢ্যাং ঢ্যাং করিয়া বাজাইতে লাগিলাম। তিন চারি জন ঢাকি ঢুলি বাঘ দেখিয়া মুর্চ্ছিত হইয়া পড়িয়াছিল ক্রমে তাহাদের চেতনা হইল। পিট্ পিট্ করিয়া আমার দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া তাহারা উঠিয়া বসিল। অন্য বাদ্যকর কেহ আসিল না। পরে শুনিলাম যে, তাহারা প্রাণপণে দৌড়িয়া একেবারে কলিকাতা গিয়া তবে নিশ্বাস ফেলিয়াছিল। ভালই হইয়াছিল। তাহাদিগকে টাকা দিতে হয় নাই। বিবাহের পর দিন, কন্যা লইয়া যখন নিজ গ্রামে আমি প্রত্যাগমন করি, তখন তাহাদের যন্ত্রগুলি আমি কুড়াইয়া আনিয়াছিলাম। কিছু দিন পরে যখন তাহারা আসিল, তখন অনেক কষ্টে আমার নিকট হইতে যন্ত্রগুলি বাহির করিল। টাকা আর চাহিবে কোন্ লজ্জায়?
আমার কেনারাম চাকর ও দুই চারিজন বরযাত্র ক্রমে আসিয়া জুটিল। প্রথম তাহারা মনে করিয়াছিল যে, নিকটে মানুষ আনিবার নিমিত্ত বাঘ স্বয়ং ঢোল বাজাইতেছে। যাহা হউক, সেই দুই চারিজন বরযাত্র ও দুই চারিজন বাদ্যকর লইয়া আমি বিবাহ-বাড়ীতে উপস্থিত হইলাম। অধিক কথায় প্রয়োজন কি? প্রথম তো কন্যা সম্প্রদান হইল। তাহার পর আমাকে সকলে ছালনা তলায় লইয়া গেল। এক পাল স্ত্রীলোক আসিয়া আমাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। তাড়কা রাক্ষসীর মত এক মাগী প্রথম আমার এক কাণ মলিয়া দিল, আর বলিল,—“বিবাহ তৃতীয় পক্ষে; সে কেবল পিত্তি রক্ষে।” পুনরায় আর এক কাণ মলিয়া বলিল,—“বিবাহ তৃতীয় পক্ষে; সে কেবল পিত্তি রক্ষে।” এইরূপে একবার এ কাণ একবার সে কাণ মলিতে লাগিল এবং ঐ কথা বলিতে লাগিল। মাগীর হাত কি কড়া। আমি মনে করিলাম যে, সাঁড়াশি দিয়া বুঝি আমার কাণ ছিঁড়িয়া লইতেছে। তার দেখা-দেখি, নয় দশ বৎসরের একটা ফচকে ছুঁড়ি ডিঙ্গি দিয়া আমার কান টানিতে লাগিল আর ঐ কথা বলিতে লাগিল। আমার আর সহ্য হইল না। আমি বলিলাম,—“নে নে! তোর আর অত ফচকুমিতে কাজ নাই, আমি তোর পিতেমোর বয়সি।”
কিন্তু এই সময়ে আবার এক বিপত্তি ঘটিল। বরণ ডালা হস্তে আমার শাশুড়ী ঠাকুরাণী বরণ করিতে আসিলেন। আমার মুখ পানে একবার কটাক্ষ করিয়াই তিনি অজ্ঞান! বরণ ডালা ফেলিয়া, কন্যার হাত ধরিয়া, প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে গিয়া মাটির উপর তিনি শুইয়া পড়িলেন। সেই স্থানে শুইয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে লাগিলেন। কান্নার সুরে তিনি বলিলেন,—“ও গো, মা গো, ও পোড়া বাঁদরের হাতে তোরে কি করিয়া দিব গো! ও গো মা গো! ও বুড়ো ডেক্রার হাতে কি করিয়া তোকে দিব গো! ঘরে যে কালীঘাটের কালীর পট আছে, যা এক পয়সা দিয়া কিনিয়াছিলাম, তার মত তোর যে মুখখানি গো! তুই যে আমার কেলে সোণা গো!” ইত্যাদি।
কালীঘাটের পটের মত মুখ বটে! কন্যাকে বাড়ী আনিয়া যখন ভাল করিয়া প্রথম তাঁহার মুখ দেখিলাম, তখন আমার মনে হইল যে, ইনি মানুষ নহেন, কালীঘাটের মা কালীর বাচ্ছা।
হুড়তে পুড়তে এই সময় ঘটকী আসিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল। ঘটকী বলিল,—“শীঘ্র গহণার বাক্ম লইয়া এস।”
কেনা চাকরের নিকট গহণার বাক্স আমি রাখিয়াছিলাম। গহণার বাক্স সে লইয়া আসিল। আমার নিকট হইতে চাবি লইয়া বাক্স খুলিয়া ঘটকী কন্যার গায়ে গহণা পরাইতে বসিল। বাম হাতে তাগা, জসম, তাবিজ, বাজু, চুড়ি ও বালা পরাইল। কন্যার কালো গায়ে সোণা ঝক্মক্ করিতে লাগিল। শাশুড়ী ঠাকুরাণী চক্ষুর জলের ভিতর দিয়া আড়ে আড়ে চাহিয়া দেখিতে লাগিলেন। তাঁহার কান্নার সুর ক্রমে ঢিলে হইরা আসিল, আমার রূপবর্ণনাও কিঞ্চিৎ শিথিল হইল। এখন তিনি বলিলেন,—“ওগো মা গো! কালীঘাটের কালী ঠাকুরের মত ভোর যে মুখখানি গো”। এবার এই পর্যন্ত হইল।
যখন অপর হস্তে সমুদয় গহণা পরানো হইল, তখন তিনি বলিলেন,—“ওগো মা গো! কালীঘাটের কালী ঠাকুরের মত—।” এবার এই পর্য্যন্ত হইল।
যখন গলায় গহণা পরানো হইল, তখন চক্ষু মুছিয়া একবার ভাল করিয়া দেখিলেন। তাহার পর কান্নার সুরে বলিলেন,—“ওগো মা গো! কালীঘাটের—।” এবার এই পর্যন্ত।
এইরূপে ক্রমেই কান্নার সুর মৃদু ও ছন্দ পাপড়িভাঙ্গা হইয়া আসিল। অবশেষে কন্যা যখন সমুদয় ভূষণে ভূষিত হইল, তখন তিনি উঠিয়া বসিলেন, দুইবার চক্ষু মুছিয়া বলিলেন,—“তা হউক! আমার এলোকেশী সুখে থাকিবে।”
শুভদিনে শুভক্ষণে আমার বিবাহ হইয়া গেল। পরদিন কন্যা লইয়া আমি গৃহে প্রত্যাগমন করিলাম। কিন্তু দুঃখের কথা বলিব কি—সেই তাড়কা রাক্ষসীর বোল সকলে যেন লুফিয়া লইল। সেই দিন হইতে সকলে আমার স্ত্রীর নাম রাখিল “পিত্তি রক্ষে।” কেবল স্ত্রীর কেন? আমি একটু বুঝিয়া পুঝিয়া খরচ-পত্র করি বলিয়া কেহ আমার নাম করে না। আড়ালে সকলে আমাকেও “পিত্তি রক্ষে” বলে। আমার গৃহিণী ঘোষেদের গঙ্গায় স্নান করিতে যাইতেন। ছোঁড়ারা তাঁহাকে “পিত্তিরক্ষে” বলিয়া ক্ষেপাইত। সে জন্য এখন ভোরে ভোরে তিনি বসুদের গঙ্গায় স্নান করেন। কিন্তু যাই বল আর যাই কও, আমাদের কাটী গঙ্গার যেমন মাহাত্ম্য তেমন আর কোন গঙ্গার নয়, হরিদ্বার, প্রয়াগ, বৃন্দাবনের গঙ্গা কোথায় লাগে!
সন্ন্যাসী আমার কত টাকা নষ্ট করিয়াছিল? সে কথায় এখন আর প্রয়োজন কি? কিন্তু চিরকাল আমি কপালে পুরুষ, আমার সৌভাগ্যক্রমে এই সময় স্বদেশী হিড়িকটা পড়িল। আমি এক স্বদেশী কোম্পানি খুলিলাম। পূর্ব্বদেশের এক ছোকরাকে চারিদিকে বক্তৃতা করিতে পাঠাইলাম। তাহার বক্তৃতার ধমকে শত শত গরীব কেরাণী স্ত্রীর গহনা বেচিয়া সেয়ার কিনিল; শত শত দীনদরিদ্র লোকও ঘটি বাটি বেচিয়া আমার নিকট টাকা পাঠাইল! তারপর—এঃঁ—এঃঁ—এঃঁ—এঃঁ—গলায় কিরূপ কফ বসিয়াছে। লম্বোদর বলিলেন,—“কফ কাশীতে আবশ্যক কি? স্পষ্ট বল না কেন যে, সমুদয় টাকাগুলি তুমি হাম্ করিয়াছ। তাহার পর, দেশশুদ্ধ লোক এখন মাথায় হাত দিয়া কাঁদিতেছে।”
ডমরুধর বলিলেন,—ভাগ্যবান পুরুষদিগের টাকা একদিক্ দিয়া যায়, অন্যদিক্ দিয়া আসে। যাহা হউক, মা দুর্গা আমাকে সেই সন্ন্যাসি-সঙ্কট হইতে উদ্ধার করিয়াছিলেন। সেই অবধি প্রতি বৎসর আমি মা দশভুজার পূজা করি!
পুরোহিত বলিলেন,—
“যদি বাপি বরো দেয়স্ত্বয়াস্মাকং মহেশ্বরি।
সংস্মৃতা সংস্মৃতা ত্বং নো হিংসেথাঃ পরমাপদঃ॥’
দেবগণ বলিলেন,—হে মহেশ্বরি। যদি আমাদিগকে বর দিবে, তবে ঘোর বিপদে পড়িয়া তোমাকে স্মরণ করিলে, তুমি আমাদিগকে রক্ষা করিও।”
সমাপ্ত।
মন্তব্য। “পিত্তিরক্ষে” বলিয়াছেন যে,—“বঙ্গবাসী”র[১] পাঠকদিগের যদি আমার গল্পের সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ হয়, তাহা হইলে তাঁহাদিগকে আমার নিকট পাঠাইয়া দিবেন। সে বাঘছাল আমার ঘরে আছে। আমি তাঁহাদিগকে দেখাইব। তাঁহাদের সন্দেহ দূর হইবে।”
- ↑ ১৩১৭ সালের ১৯শে আশ্বিন তারিখের “বঙ্গবাসী”তে এই গল্পটি প্রকাশিত হইয়াছিল।