বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/ষষ্ঠ গল্প/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

বলাই চিন্তির বিবরণ।

 ভূতের কথা শুনিয়া সকলে ভয়ে আপন আপন গৃহে চলিয়া গেল। বিন্দু আপনার দাওয়াতে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল। সে বলিল যে, কি কপাল করিয়া যে পৃথিবীতে আসিয়াছিলাম, তাহা বলিতে পারি না। আজ রাত্রিতে ভূতে আমাকে খাইয়া ফেলিবে। যাহা হউক, এমন সময় একখানি গরুর গাড়ী লইয়া বলাই চিন্তি বিন্দুর গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইল। বলাই জাতিতে সদগোপ। আমাদের গ্রাম হইতে আধ ক্রোশ মাঠ পারে আমডাঙ্গায় তাহার বাস। বিন্দুর ফল পাকড় সে হাটে বিক্রয় করে।

 বলাই বলিল, —মা ঠাকুরাণি! গাড়ী লইয়া আমি নিশ্চিন্তপুরে গিয়াছিলাম। বাড়ী ফিরিয়া যাইতেছি। নারিকেল দিবে বলিয়াছিলে, কই দাও। আজ আমার বাড়ীতে রাখিয়া দিব। কাল ভোরে ভোরে হাটে লইয়া যাইব।

 বিন্দু বলিল,—'ঘরের ভিতর বোরা করিয়া আমি এক শত নারিকেল রাখিয়াছি। আজ তাহা লইয়া যাও। বাকী পরে দিব।'

 আমি সম্মুখেই বসিয়া ছিলাম। আমার থলিটী সে প্রথম তুলিয়া লইল। পা দুইটা আমি থলির ভিতর গুটাইয়া লইলাম। 'সব ঝুনো', একবার বোঁটা দেখে, এই কথা বলিয়া সে আমাকে গাড়ীর সম্মুখ ভাগে বসাইয়া দিল। তাহার পর আর পাঁচটী নারিকেলের থলি আনিয়া আমার পশ্চাতে উচ্চ ভাবেই বসাইয়া দিল।

 নারিকেল লইয়া বলাই গাড়ী হাঁকাইয়া দিল। বাড়ী যাইতেছে, সে জন্য গরু দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল। গ্রাম পার হইয়া মাঠে গিয়া উপস্থিত হইল। গাড়ীর ভিতর বসিয়া থলির ভিতর যে স্থানে আমার চক্ষু দুইটী ছিল, সেই দুইটী স্থানে আঙ্গুল দিয়া আমি অল্প ফাঁক করিয়া লইলাম। তাহার পর থলির ভিতর হইতে আমি আমার হাত দুইটী বাহির করিতে চেষ্টা করিলাম। এমন সময় আমার মাথা দিয়া বলাইয়ের পিঠে ঢুঁ লাগিয়া গেল। বলাই আপনা আপনি বলিল, —“সম্মুখের থলিটা নড়িতেছে। এখনি পড়িয়া যাইবে। ভাল করিয়া রাখি।”

 এই কথা বলিয়া সে গাড়ী থামাইল ও বাম পার্শ্বে নামিয়া পড়িল। সেই অবসরে আমিও দক্ষিণ পাশ দিয়া নামিয়া পড়িলাম। বলাই ভাবিল যে, থলিটা পড়িয়া গেল। গরুর সম্মুখ দিয়া ঘুরিয়া সে আমাকে তুলিতে আসিল। তাহার পর সে যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার আত্মা পুরুষ শুকাইয়া গেল। নিশ্চয় সে মনে মনে ভাবিয়াছিল যে,—এতকাল নারিকেল বেচিতেছি, নারিকেল পূর্ণ বোরার ভিতর হইতে কালো কালো দুইটা পা বাহির হইতে কখন দেখি নাই। সেই কালো কালো পা দুইটা দিয়া নারিকেলের বোরা যে ছুটিয়া পলায়, তাহাও কখন দেখি নাই।

 কিছুকাল সে সেই পা-ওয়ালা বোরার দিকে অবাক্ হইয়া চাহিয়া রহিল। তাহার পর “বাপ” এইরূপ শব্দ করিয়া মাঠের মাঝখানে গাড়ী ফেলিয়া অ-পথ দিয়া ক্ষেত্রের আলি দিয়া পুনরায় আমাদের গ্রামের দিকে দৌড়িল। কিন্তু সে যে আমার ভয়ে সোজাপথ দিয়া আসিতে সাহস করে নাই, তখন তাহা আমি জানিতাম না। পাছে সে আসিয়া আমাকে ধরে, সেজন্য শরীর হইতে বোরা খুলিবার নিমিত্ত আমি আর দাঁড়াইলাম না। গুণে আবদ্ধ শরীরেই যথাসাথ্য দ্রুতবেগে সোজাপথে আমি গ্রাম অভিমুখে দৌড়িলাম।

 গ্রামে প্রবেশ করিলাম। ক্রমে নেকো পালের দোকানের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। গুণের ঈষৎ ফাঁক দিয়া দেখিলাম যে, তাহার দোকান খোলা রহিয়াছে, দোকানে আলো জ্বলিতেছে। অনেকগুলি লোকের কথাবার্ত্তা আমার কাণে প্রবেশ করিল। দেখিলাম যে, দোকানের
বোরার ভিতর নেঙটা ভূত।

সম্মুখে একখানি খালি পাল্কি রহিয়াছে। এমন সময় একজন মানুষের সহিত আমার ধাক্কা লাগিয়া গেল। সেও পড়িয়া গেল, আমিও পড়িয়া যাইলাম। তাড়াতাড়ি আমি উঠিয়া দাঁড়াইলাম। সেও উঠিয়া পাছে চীৎকার করে, সেজন্য পথের দক্ষিণ পার্শ্বে একটা বনে গিয়া আমি প্রবেশ করিলাম। বন দিয়া আরও কিছুদূর গিয়া মেনী গোয়ালা-ছুঁড়ির ঘরের পার্শ্বে গিয়া উপস্থিত হই। শরীর হইতে গুণটা খুলিয়া কোমরে জড়াইলাম। গুণ হইতে একটু সূতা বাহির করিয়া কোমরে বাঁধিলাম। এখনও আমার মাথায় সেই সাহেবী টুপী ছিল। তাহার পর হাঁ করিয়া দাঁড়াইয়া চারিদিক্ আমি দেখিতে লাগিলাম।

 টুপিটী এখন আমি ফেলিয়া দিলাম। তাহার পর দেখিলাম যে, নেকোর দোকানের সম্মুখে সে পাল্কি নাই। কিন্তু সে স্থানে অনেকগুলি লোক একত্র হইয়াছে। তাহারা সকলেই বলাই চিন্তির বিবরণ শুনিতেছে। বলাই বলিতেছে,— “বিন্দু ঠাকুরাণীর নারিকেলের বোরার ভিতর ভুত ছিল। ভূত লইয়া আমি গাড়ীতে বোঝাই করিয়াছিলাম। মাঠের মাঝখানে সে আমার ঘাড় ভাঙ্গিয়া রক্ত খাইবার উপক্রম করিয়াছিল। অতিকষ্টে আমার প্রাণ রক্ষা হইয়াছে।”

 এমন সময় কেষ্টা ছোড়া সেই স্থানে আসিয়া সকলকে জিজ্ঞাসা করিল,—“আমার ঠাকুরমা কোথায়? অনেকক্ষণ হইল তেল লইতে আমার ঠাকুরমা দোকানে আসিয়াছিলেন। আমার ঠাকুরমা কোথায়?”

 কিছুদিন পূর্ব্বে কেষ্টা আমার বাগানে বাতাবি লেবু চুরি করিয়াছিল। সেজন্য তাহাকে পুলীশে দিতে আমি উদ্যত হইয়াছিলাম। অনেক মিনতি করিলে তাহাকে ছাড়িয়া দিয়াছিলাম। কিন্তু বলিয়া দিয়াছিলাম যে, পুনরায় যদি সে আমার কোন বস্তু চুরি করে, অথবা আমাকে ক্ষেপায়, তাহা হইলে তাহার নামে আমি নালিশ করিব। আজ আমার কাপড় লইয়া সে কোথায় ফেলিয়া দিয়াছিল। পাছে আমি নালিশ করি, সেই ভয়ে সে কাহারও নিকট আমার নাম করে নাই। “ঐ পুকুরে কে মাছ ধরিতেছে” দুর্লভীকে কেবল এই কথা বলিয়া সে সরিয়া পড়িয়াছিল।

 এখন কেষ্টার ঠাকুরমা কোথায় গেল? কেষ্টার বাপ ও প্রতিবেশিগণ লণ্ঠন লইয়া চারিদিকে অনুসন্ধান করিতে লাগিল, ক্রমে হৈ হৈ পড়িয়া গেল। সকলে বলিল যে, নেঙটা ভূত কেষ্টার ঠাকুরমাকে লইয়া গিয়াছে। গোল শুনিয়া মেনী গোয়ালা-ছুঁড়ি ঘর হইতে বাহির হইল। মেনীর বয়স দশ বৎসর। ছয় বৎসর বয়স্ক একটা ভাই ব্যতীত সংসারে তাহার আর কেহ নাই। কয় বৎসর হইল তাহাদের বাপ ও মা মরিয়া গিয়াছে। তাহাদের মাসী কলিকাতায় এক বাবুর বাড়ীতে চাকরাণী ছিল। মাসী ইহাদিগকে টাকা দিত। মাসীও এখন মরিয়া গিয়াছে।