ডমরু-চরিত/ষষ্ঠ গল্প/প্রথম পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ গল্প।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
সাহেবের সাজ।
গত তিন বৎসর যাহারা পূজার 'বঙ্গবাসী' পাঠ করিয়াছেন, ডমরুধর তাঁহাদের নিকট অপরিচিত নহেন। ডমরুধরের বাস কলিকাতার দক্ষিণ, যে স্থানে অনেক কাটি-গঙ্গা আছে। প্রথম অবস্থায় ইনি দরিদ্র ছিলেন।নানা উপায় অবলম্বন করিয়া এক্ষণে ধনবান হইয়াছেন। এলোকেশী ইহার তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী। ডমরুধর বৃদ্ধ, সুপুরুষ নহেন। তথাপি এলোকেশীর সর্ব্বদাই সন্দেহ। গত বৎসর দুর্লভী বাগ্দিনী ডমরুধরকে ঝাঁটা- পেটা করিয়াছিল।সেই উপলক্ষে এলোকেশী ও তাঁহাকে উত্তম মধ্যম দিয়াছিলেন। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে ডমরুধর সন্ন্যাসি-বিভ্রাটে পড়িয়াছিলেন। সেই অবধি ইনি দুর্গোৎসব করেন। সুন্দরবনে ডমরুধরের আবাদ আছে। প্রজাদিগের নিকট হইতে চাউল, ঘৃত, মধু, মৎস্য প্রভৃতি আদায় করেন। প্রতিমাটী গড়া হয়, কিন্তু পূজার উপকরণ,— প্রায় সমস্তই কাটিগঙ্গার জল। আজ পূজার পঞ্চমীর দিন, দালানে প্রতিমার পার্শ্বে বন্ধুগণের সহিত বসিয়া ডমরুধর গল্প গাছা করিতেছেন।
লম্বোদর বলিলেন,—“এবার তুমি মরিয়া বাঁচিয়াছ। যে ভয়ানক রোগ হইয়াছিল, তাহাতে পূজার সময় তোমার গল্প যে আবার শুনিব, সে আশা আমরা করি নাই।”
![]()
নেঙটা গোরা। ডমরুধর উত্তর করিলেন, “হাঁ ভাই! এবার আমি মরিয়া বাঁচিয়াছি। মা দুর্গার আমি বরপুত্র। সেবার সন্ন্যাসিবিভ্রাট হইতে তিনি আমাকে রক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার কৃপায় গত বৎসর বাঘের মুখ হইতে আমি বাঁচিয়াছিলাম। এবার উৎকট রোগ হইতে তিনি আমাকে মুক্ত করিয়াছেন। সমুদয় দুর্ঘটনা নষ্টচন্দ্র দেখিয়া ঘটিয়াছিল।”
আধকড়ি জিজ্ঞাসা করিলেন,—“নষ্টচন্দ্র দেখিয়া কি হইয়াছিল?”
ডমরুধর উত্তর করিলেন,—সে কথা এতদিন আমি প্রকাশ করি নাই। কি হইয়াছিল, তাহা শুন। এবার আমি নষ্ট চন্দ্র দেখিয়াছিলাম। নষ্ট চন্দ্র দেখিলে চুরি করিতে হয়। মনে করিলাম যে, দুর্লভীর উঠানে যে শসা গাছের মাচা আছে, তাহা হইতে শসা চুরি করিয়া আনি। বাহিরে যাহাই বলুক, কিন্তু দুর্লভীর মনটা আমার উপর আছে। শসা চুরি করিতে গিয়া যদি ধরা পড়ি, এলোকেশী যদি কিছু বলেন, তাহা হইলে আমি বলিব যে, নষ্টচন্দ্র দেখিয়া চুরি না করিলে কলঙ্ক হয়।
চুপে চুপে আমি শসা চুরি করিতে যাইলাম। কিন্তু দূর হইতে আমি দেখিলাম যে, দুর্লভী কেরোসিনের ডিবে জ্বালাইয়া ঠেঙা হাতে করিয়া দাওয়াতে বসিয়া আছে। তাহার উগ্রমূর্তি দেখিয়া আর অগ্রসর হইতে আমি সাহস করিলাম না।
সে রাত্রি আমার চুরি করা হইল না। মনে করিলাম যে, আজ রাত্রিতে না হউক, তিনদিনের মধ্যে কিছু চুরি করিলেই নষ্টচন্দ্রের দোষ কাটিয়া যাইবে। কোথায় কি চুরি করি, রাত্রিতে শুইয়া শুইয়া তাহা ভাবিতে লাগিলাম। দুর্লভীর বাড়ীর পার্শ্বে গদাই ঘোষের পুষ্করিণী আছে। তাহাতে অনেক মাছ আছে। গদাই ঘোষ দুর্লভীর জিম্মায় পুষ্করিণীটী রাখিয়াছে। মনে করিলাম যে, কাল বৈকাল বেলা ছিপ ফেলিয়া সেই পুষ্করিণী হইতে মাছ চুরি করিব।
সুন্দরবনে আমার আবাদের নিকট একবার জন কয়েক সাহেব শিকার করিতে আসিয়াছিলেন। তাঁহারা একটা টুপি ফেলিয়া গিয়াছিলেন। টুপিটা কুড়াইয়া আমি বাড়ী আনিয়াছিলাম। পরদিন সন্ধ্যার কিছু পূর্ব্বে সেই টুপিটা বগলে লইয়া ছিপ হাতে করিয়া আমি গদাই ঘোষের পুষ্করিণীর পাড়ে উপস্থিত হইলাম; যে ধার দিয়া লোক গতায়াত করে, তাহার বিপরীত দিকে এক কোণ বনে পূর্ণ ছিল। ঝোপের ভিতর গিয়া আমি সাহেবদের সেই কালো রঙের ধুচুনির মত লম্বা টুপিটী মাথার দিলাম। আজ কালের বাবুদের মত গায়ে আমি জামা পরি না। কোমরে কেবল ধুতি ছিল। আমি ভাবিলাম যে, আমাকে কেহ চিনিতে পারিবে না। সকলে মনে করিবে যে, সাহেব মাছ ধরিতে আসিয়াছে। সাহেব দেখিলে কেহ কিছু বলিবে না।
নিকটের জল নাল ফুল ও কলমি শাকের গাছে পূর্ণ ছিল। কেবল এক স্থানে একটু ফাঁক ছিল। ময়দার টোপ গাঁথিয়া আমি সেই পরিষ্কার স্থানে ছিপ ফেলিলাম। কিছুক্ষণ পরে বোধ হইল যেন মাছে ঠোকরাইল। আমি টান মারিলাম। বড়শি জলের ভিতর নাল গাছে লাগিয়া গেল। অনেক টানাটানি করিলাম, অনেক চেষ্টা করিলাম, কিছুতেই খুলিতে পারিলাম না। তখন বুঝিলাম যে, জলে নামিয়া না খুলিলে আর অন্য উপায় নাই। কিন্তু কাপড় ভিজিয়া যাইবে, জলে কি করিয়া নামি! চারি দিকে চাহিয়া দেখিলাম— কেহ কোথাও নাই। কাপড় খুলিয়া উলঙ্গ হইয়া জলে নামিলাম। একবুক জল হইল। অতি কষ্টে নাল গাছের ডাঁটা হইতে বড়শি খুলিয়া উপরে উঠিয়া কাপড় পরিতে যাই— সর্ব্বনাশ! যে স্থানে কাপড় রাখিয়া গিয়াছিলাম, সে স্থানে কাপড় নাই! বনের ভিতর চারিদিকে অনেক খুঁজিলাম, কাপড় দেখিতে পাইলাম না।
তখনও সম্পূর্ণ সন্ধ্যা হয় নাই। সে উলঙ্গ অবস্থায় আমি বাটী ফিরিয়া যাইতে পারি না। কি করিব। চার করিয়া পুনরায় ছিপ ফেলিলাম। মনে মনে ভাবিতে লাগিলাম যে, এ সেই কেষ্টা ছোড়ার কর্ম, সে আমার টাকের বর্ণনা করিয়া আমাকে ক্ষেপায়। সে দূর হইতে আমাকে বলে—টাক চাঁদ, টাক বাহাদুর, টাক টাক টাকেশ্বর।
![]()
পুকুর পাড়ে দুর্লভী। কেষ্টা ছোঁড়ার অগম্য স্থান নাই। যখন জলে নামিয়া, পিছন ফিরিয়া একমনে আমি বঁড়শি খুলিতেছিলাম, সেই সময় সে আমার কাপড় লইয়া গিয়াছে। কেবল তাহা নহে। সে দুর্লভীকে গিয়া সংবাদ দিয়াছিল। কারণ অল্পক্ষণ পরেই দুর্লভী ও হিরী বাগ্দিনী আসিয়া পুষ্করিণীর অপর পাড়ে দাঁড়াইল।
কিছুক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে চাহিয়া দুর্লভী বলিল,—“একটা সাহেব!”
হিরী বাগ্দিনী বলিল,—“সাহেবটার গায়ের রং কালো মিশমিশে। যাহারা পাখী মারিতে আসে, সেই সাহেব।”
দুর্লভী বলিল,—“তা নয়। ওটা নেঙটা গোরা।”
হিরী বলিল,—“সর্ব্বনাশ! নেঙটা গোরা! তবে আমি পলাই; যাকে বলে ব্রাণ্ডি, তাই উহারা খায়।”
দুর্লভী বলিল,—“চল, গদাই ঘোষকে গিয়া বলি।”
আমি ভাবিলাম,—ঘোর বিপদ হইল। সমস্ত গ্রামের লোককে সঙ্গে লইয়া গদাই ঘোষ হয় তো এখনি আসিয়া উপস্থিত হইবে। আমি সম্পূর্ণ উলঙ্গ, মাথায় কেবল এক সাহেবি টুপি। এ অবস্থায় সকলে হয়তো আমাকে এলোকেশীর নিকট ধরিয়া লইয়া যাইবে। সাহেবের পোষাক পরিয়া দুর্লভীর ঘরের নিকট আমি গিয়াছিলাম, তাহা শুনিলে এলোকেশী আর রক্ষা রাখিবেন না।