বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/সপ্তম গল্প/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

ঢাক মহাশয়।

 ডমরুধর বলিলেন,— শুক্লাম্বর ঢাক মহাশয় গুরুগিরি করেন। তাঁর অনেক শিষ্য আছেন। গুরুগিরি করিয়া তাঁহার বিলক্ষণ দুপয়সা উপার্জ্জন হয়। দোতালা কোঠা বাড়ীতে তিনি বাস করেন। মকদ্দমা-মামলা সম্বন্ধে তাঁহার যেরূপ ব্যুৎপত্তি, এরূপ ব্যুৎপত্তি প্রায় দেখিতে পাওয়া যায় না। নানা বিষয়ে ঢাক মহাশয় আমার সহায়তা করেন। তিনি আমার পরম বন্ধু। ঢাক মহাশর অতি নিষ্ঠাবান পুরুষ। পূজা আহ্নিক জপ তপে তিনি অনেক সময় অতিবাহিত করেন। সে জন্য তাঁহার প্রতি আমার অগাধ ভক্তি। আজ কাল ব্রাহ্মণেরা ত্রিসন্ধ্যা করে না। টিকিনাড়ারা সে উপদেশ কাহাকেও প্রদান করে না। কিন্তু ঢাক মহাশয় সে প্রকৃতির লোক নহেন। কাহাকেও চা বা বরফ খাইতে দেখিলে তিনি আগুনের ন্যায় জ্বলিয়া উঠেন। সন্ধ্যা-আহ্নিকে যাহাতে লোকের প্রবৃত্তি হয় সে বিষয়ে তিনি চেষ্টা করেন।


শুক্লাম্বর ঢাক।

 গত বৈশাখ মাসে একদিন ঢাক মহাশয় আমাকে ডাকিতে পাঠাইলেন। সূর্য্য অগ্নি বৃষ্টি করিতেছেন। রৌদ্রে পৃথিবী পুড়িয়া যাইতেছে। আমি তাঁহার বাড়ী গমন করিলাম। ঘোর পিপাসায় কাতর হইয়া আমি কোঁৎ কোঁৎ করিয়া এক ঘটি জল খাইয়া ফেলিলাম। কিঞ্চিৎ সুস্থ হইলে ঢাক মহাশয় আমাকে বলিলেন যে, তাঁহার কন্যা কুন্তলার প্রখর জ্বর হইয়াছে। কুন্তলার বয়স নয় বৎসর। আট বৎসর বয়সে ঢাক মহাশয় তাহার বিবাহ দিয়াছিলেন। বিবাহের দুই মাস পরেই সে বিধবা হইয়াছিল। দোতালার উপর যে ঘরে কুন্তলা শুইয়া ছিল, ঢাক মহাশয়ের সহিত আমি সেই ঘরে গমন করিলাম।

 জ্বরে কুন্তলার কাঠ ফাটিতেছে। আগুনের ন্যায় শরীরের উত্তাপ হইয়াছে। ক্রমাগত এপাশ ওপাশ করিতেছে। মা একটু জল দাও, মা একটু জল দাও, ক্রমাগত এই কথা বলিতেছে। মা! পিপাসায় আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছে। একটু জল দাও। একটু জল দাও মা। একটু খানি দাও। কেবল মুখটি ভিজাইয়া দাও। একটু জল না খাইয়া থাকিতে পারি না। জল, জল, জল।

 আর বিরস বদনে মা নিকটে বসিয়া আছেন। মাঝে মাঝে বাতাস করিতেছেন। মাঝে মাঝে চক্ষুর জল মুছিতেছেন।

 ঢাক মহাশয় আমাকে চুপি চুপি বলিলেন,—আজ একাদশী। বিধবা। সেই জন্য জল দিতে বারণ করিয়াছি। কিন্তু জল দিতে আমার গৃহিণীর ইচ্ছা। এখন করি কি? এখন করি কি? সেই জন্য তোমাকে ডাকিতে পাঠাইয়াছিলাম।

 নীচে গিয়া আমি বলিলাম,—বাপরে! জল কি দিতে পারা যায়? ব্রাহ্মণের ঘরের বিধবা। একাদশীর দিন জল খাইতে দিলে তাহার ধর্মটি একেবারে লোপ হইয়া যাইবে!

 ঢাক মহাশয় তাহাই করিলেন। কন্যাকে জল দিলেন না। রাত্রিতে কন্যা পাছে নিজে জল চুরি করিয়া খায়, অথবা তাহার কষ্ট দেখিয়া মাতা ভগিনী কি অপর কেহ পাছে তাহাকে জল প্রদান করে, সে জন্য সন্ধ্যার সময় কুন্তলাকে তিনি নীচে তালার এক ঘরে বদ্ধ করিয়া চাবি দিয়া দিলেন। সমস্ত রাত্রি পীড়িতা কন্যা একেলা সেই ঘরে রহিল। ধর্মরক্ষা সম্বন্ধে ঢাক মহাশয়ের এমনি দৃঢ় পণ।

 প্রাতঃকালে যখন তিনি ঘরের চাবি খুলিলেন, তখন সকলে দেখিল যে, বালিকা পিপাসায় হতজ্ঞান হইয়া ঘরের ভিজা মেজে এক বার হইতে অপর ধার পর্যন্ত সমস্ত রাত্রি বার বার চাটিয়াছে।অবশেষে অজ্ঞান হইয়া ঘরের এক কোণে পড়িয়া আছে।মাতা তাহাকে কোলে তুলিয়া লইলেন। কিন্তু তাহার মাথাটি লুটিয়া পড়িল। সেদিন দ্বাদশী। মাতা তাহার মুখে জল দিলেন, কিন্তু সে গিলিতে পারিল না। দুই কশ দিয়া জল বাহিরে আসিয়া পড়িল। সে আর কথা কহিল না। শেষকালে একবার মাত্র বলিল,—“জল—জল।” এই কথা বলিয়া সে প্রাণত্যাগ করিল।

 এই ঘটনার কথা যখন চারিদিকে প্রচারিত হইল, তখন দেশশুদ্ধ লোক ঢাক মহাশয়কে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। সকলে বলিল,—কি দৃঢ় মন! কি ধর্ম্মের প্রতি আস্থা! এরূপ পুণ্যবান্ লোক কলিকালে হয় না। তাঁহার প্রতি লোকের এত ভক্তি হইল যে, এক মাসের মধ্যে তাঁহার এক শতের অধিক নূতন শিষ্য হইল।

 কন্যার মৃত্যুতে ঢাক মহাশয়ের আনন্দ হইল। তিনি বলিলেন, বিধবা হইয়া চিরজীবন দুঃখে যাপন করা অপেক্ষা মরাই ভাল। কিন্তু মৃত কন্যা তাঁহাকে অধিক দিন আনন্দ ভোগ করিতে দিল না। একদিন রাত্রি দুই প্রহরের সময় সহসা “জল, জল! হা জল! হা জল!” এইরূপ ভীষণ চীৎকার করিয়া সে বাড়ীর চারিদিকে ছট্‌ফট্‌ করিয়া বেড়াইল। সকলের নিদ্রা ভঙ্গ হইল। সকলে ঘোর ভয়ে ভীত হইল। ইহার চারিদিন পরে ঢাক মহাশয়ের পুত্রটি মরিয়া গেল। এইবার ঢাক মহাশয় শোকে অভিভূত হইয়া পড়িলেন। পনর দিন পরে আবার কুন্তলার ভূত সেইরূপ জল জল করিয়া চীৎকার করিল। এবার মাতঙ্গিনী নামক দাসীর মৃত্যু হইল।

 ফল কথা, যখনই কুন্তলার ভূত চীৎকার করিত, তখনই বাড়ীর একটা না একটা লোক মরিতে লাগিল। দাসীর মৃত্যুর পর ঢাক মহাশয় গয়াতে পিণ্ড দিবার জন্য লোক পাঠাইলেন। কিন্তু তাহাতে কোন ফল হইল না। কারণ কিছুদিন পরে পুনরায় যখন চীৎকার হইল, তখন ঢাক মহাশয়ের ছট্টু নামক চাকর মরিয়া গেল। বিধবা হইয়া একাদশীর দিন ভিজা মেজে চাটা পাপটি সামান্য নহে। গয়াতে হাজার পিণ্ড দিলেও ইহা ক্ষয় হয় না।