ডিগবাজী খাঁ/কাঠ বেড়ালীর কারসাজী
কাঠ বেড়ালীর কারসাজি
ক
ডিগ্বাজী খাঁ এক চাষার ক্ষেতের খরমুজা চুরী করে এনে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রাখ্ল। ভাবলে, পেকে যখন ট্যাব্, ট্যাবে হবে তখন সেটি সে খাবে। পরদিন ভোর বেলা এসে সে দেখে, খরমুজার চিহ্নটিও নেই! ডিগ্বাজী খাঁর ভারি রাগ হোল।—হ্যাঁগা এত কষ্ট ক’রে খরমুজা নিয়ে এলুম তার ছিবড়ে টুকুও কিনা পেটে গেল না। এমনি পোড়া অদৃষ্ট আমার। কাকেই বা বলি! ![]()
ডিগ্বাজী ও কাকেরা
শেয়াল তখন কাকগুলিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল,—“ভাই তোমরা আমার খরমুজা খেয়েছ?” কাকেরা বলে,—“সে কি ভাই, আমরা তো তার নামগন্ধও জানি না। সূর্য্যি উঠবার আগে বাসা ছেড়ে এসেছি—তোমার খরমুজা চোখেও দেখিনি।”
ডিগবাজী খাঁ তখন পেঁচার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল,—“পেঁচা ভাই, বলতে পার আমার খরমুজা কি হ’ল?”
পেঁচা বললে,—“সে খবর তো কিছু বলতে পারব না। জান ত, সারারাত আমরা মাঠে মাঠে ইদুর ধরেই বেড়াই।”
শেয়াল তখন ময়ূরের কাছে গিয়ে বলে—“ময়ূর, আমার খরমুজার কোন খবর বলতে পারো?”
ময়ূর বললে—“না ভাই, আমি সারারাত সাপ খুঁজেই বেড়াই। তোমার খরমুজার খবর তো জানি নে।”
ডিগ্বাজী খাঁ তখন বকের কাছে গিয়ে বললে,—“বক ভাই, আমার খরমুজার কি হল বল্তে পার?”
বক ঝুটি নেড়ে বল্লে,—“তোমার খরমুজা না বত্রিশ ভাজা, তার খবর আমরা কি জানি? বরং যদি বল্তে—চাই চ্যাঙ্ কি ব্যাঙ্ ভাজা, তা হ’লে চলন বিলে গিয়ে খোঁজ করে দেখ, সেখানে বড় বড় চ্যাঙ্ আর কোলাবেঙের ঠ্যাং—অনেক কুড়িয়ে পাবে।” ডিগ্বাজী খাঁ তখন রাগ করে হাঁসের কাছে গেল খবর জিজ্ঞাসা করতে।
হাঁস অমনি জলে ডুব দিয়ে একটা আস্ত গুগলি তুলে শেয়ালকে ছুঁড়ে মারলো। আর ক্যাক্ ক্যাক্ করে বলে উঠল,—“দেখ তো ভাই, এটা কিনা?”
শেয়াল রেগে চুপ করে রইল। ভাবল, আচ্ছা দেখা যাবে, এর পর যদি কোন দিন দেখা পাই, তবে ঘাড় মট্কে এই গুলি ছোড়ার শোধ নেব।
ডিগ্বাজী খাঁ বনের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দেখলে, গাছের ডালে ছোট এক কাঠবেড়ালী নেচে নেচে হাততালি দিয়ে বল্ছে,—
“ক্ষেতে হয় খরমুজা,
খেতে তাহা ভারি মজা।
তিন কড়ি দিয়ে ভাই,
খরমুজা কিনে খাই।”
ডিগ্বাজী খাঁ এই কথা শুনে ভাবলে, দেখচ কাঠ-বেড়ালীর কাণ্ডখানা! খরমুজা খেয়ে দেয়ে কিনা বলা
![]()
ডিগ্বাজী ও কাঠবেড়ালী।
হচ্ছে, তিন কড়ি দিয়ে তার কেনা। আচ্ছা বেইমান তো! সবুর মজাটা দেখাচ্ছি।
ডিগবাজী খাঁ কাঠ-বেড়ালীকে ডেকে বললে,—ফাঁকিরাম বাবাজি, আজ যে তোমার বড় স্ফুর্তির চাড়া দেখ্ছি? বহু দিন তোমার দেখা পাইনি, তাই দেখা করতে এলাম।”
কাঠ-বেড়ালী—বললে কি? খবর বলতো? ডিগ্বাজী খাঁ বলে,—“ভারি একটা সুখবর, তাই খবর দিতে এলাম। কাল এক জায়গায় নিমন্ত্রণে যাচ্ছি, সেখানে খাওয়া দাওয়ার প্রচুর আয়োজন, তোমায় ফেলে যাব সেটা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না, তাই এতটা পথ ছুটে এলাম তোমার কাছে।
কাঠবেড়ালী বল্লে,—“তা বেশ বেশ। কখন যাচ্ছ বলতো?”
ডিগবাজী খাঁ বল্লে,—“কাল খুব সকালেই রওনা হব। তুমি সেজেগুজে ঠিক ঠাক হয়ে থেকো, তোমাকে সঙ্গে নিয়েই যাব।”
কাঠ-বেড়ালী বললে,—“বেশ, সেই কথা রইলো।”
খ
পরদিন সকালে ডিগ্বাজী খাঁ এসে ঠিক সময়ে হাজির। পিঠে তার মস্ত একটা থলে।
কাঠ-বেড়ালী বলে,—“এই থলেটা এনেছ ভাই, কি জন্যে?”
ডিগ্বাজী খাঁ বলে,—“ভাই, দু’জনে মিলে আর কত খাব। তাই ভাবলুম এক থলে খাবার নিয়ে এলে মজা করে দু’জনের অনেক দিন খাওয়া চলবে।
কাঠবেড়ালী ভারি খুসি হয়ে শেয়ালের সঙ্গে নিমন্ত্রণে রওনা হো’ল।
শেয়াল যাচ্ছে পথ দিয়ে হেঁটে—আর কাঠ-বেড়ালী চলেছে প্রত্যেক গাছের ডালে ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে।
কিছুদূর গিয়েই কাঠ-বেড়ালী জিজ্ঞাসা করল,—“ভাই, সেখানে কি কি খাবার তৈরী হয়েছে জান?
ডিগ্বাজী খাঁ বলে,—“জানি বই কি। বুঁদে, জিলিপী, মতিচুর, মিহিদানা, পান্তোয়া, বর্দ্ধমানের সীতাভোগ”—তারপর দুই পা ফাঁক করে বললে—“ইয়া বড় বড় রাজভোগ।”
আরো কিছু দূর গিয়ে ডিগ্বাজী খাঁ কাঠ-বেড়ালীকে বললে—“ফাঁকিরাম বাবাজি, রোদ্দুরে তোমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে, এই রোদ্দুরে তেতে পুড়ে গেলে কিছুই যে তোমার পেটে সইবে না—বরং এক কাজ কর, পিঠেতো আমার এই থলিটা রয়েছে তার ভিতরে বসে শুয়ে আরামে যেতে পারবে।”
কাঠ-বেড়ালী তাতেই রাজী হয়ে বললে—তা’ বেশ পরামর্শ। তোমায় যে না চেনে সে একটি আস্ত অজবুগ আর কালা। সাধে বলি তুমি একটি বুদ্ধির জালা। অমনি কাঠ-বেড়ালী গাছ থেকে নেবে শেয়ালের পিঠের ঐ থলেটার ভিতরে ঢুকলো। শেয়াল অমনি থলের মুখে গিট্ দিয়ে বেঁধে গাছের একটা লম্বা ডালে সেটি ঝুলিয়ে রাখল।
তারপর শেয়াল রাস্তার ইট পাটকেল কুড়িয়ে এনে থলের গায়ে ছুড়ে মার্তে লাগলো।
থলের ভিতর থেকে কাঠ-বেড়ালী বললে— “একি ভাই?”
ডিগ্বাজী খাঁ জবাব দিলে—“বুদের হাড়ি খুলল ভাই,
- একটুতে কি আর হবে ছাই।
তারপর শেয়াল শক্ত ঝামা কুড়িয়ে এনে থলের গায় ছুঁড়ে মারতে লাগলো।
কাঠবেড়ালী বল্লে—“এ গুলি কি ভাই, লাগচে যে বড্ড বেজায়।
ডিগ বাজী খাঁ হেসে জবাব দিলে,—“এ গুলি ভাই জিলিপি,
- কটা চাই বলবে কি?”
তারপর ডিগ্বাজী খাঁ থলের গায়ে পাথরের ঢেলা দমাদম্ ছুঁড়ে মারতে লাগলো।
কাঠ-বেড়ালী তখন চেঁচিয়ে বললে—“এ তোমার কি রকম কাণ্ড?”
ডিগ্বাজী খাঁ উত্তর দিলে,—“এ গুলি ভাই, পান্তোয়া,
- ওজনে ঠিক পাঁচ পোয়া।
- একটি খেলেই পরিপাটি,
- লাগবে দাঁতে দাঁত-কপাটি।
- যদি খাওতো রাজভোগ
- তবেই পাবে পরলোক।”
কাঠবেড়ালী তখন থলের ভিতর প্রায় আধ মড়া হয়েছে, শেয়াল ছড়া কেটে বল্লে—
“খরমুজা খেতে কেমন মজা,
এইবারে তার পেলে সাজা।
খেলে যখন অনেক কিছু,
দক্ষিণাটা দিচ্ছি পিছু।”
কাঠবেড়ালী বুঝ্ল, শেয়ালের খরমুজা খাওয়ার দরুণ তার এই শাস্তি। ভাব্ল, খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেই শেয়াল ভাব্বে, আমি বোধ হয় মরে গেছি। এই ভেবে কাঠবেড়ালী থলির ভিতর চুপ করে পড়ে রইলো।
শেয়াল আরো বার কতক ঢিল ছুঁড়্ল, দেখলে কাঠবেড়ালীর আর কোন সাড়া শব্দ নেই, তখন সে ভাবলো, নিশ্চয়ই কাঠবেড়ালীর “পরলোকপ্রাপ্তি” হয়েছে, কাজেই শেয়াল বগল বাজাতে বাজাতে বাড়ী রওনা হো’ল।
গ
“যেখানে গাছের ডালে থলেটা ঝুলছে, সেই পথ দিয়ে হাট বাজার সেরে লোকজন বাড়ী যাচ্ছে।
এক মজুর সেই থলেটা দেখতে পেয়ে বললে, “ওটা কার এখানে পড়ে রয়েছে। ওতে আমার জিনিষ পত্র গুলি ভরে নিলে তো ভারি সুবিধে হয়। অমনি সে গাছ থেকে থলেটা নাবিয়ে তাতে হাতের ও বগলের খর্মুজা গুলি ভরে মাথায় ক’রে বাড়ী রওনা হোল। সারাদিন কাঠবেড়ালীর খাওয়া হয় নি, তার উপর থলের ভিতর থেকে শেয়ালের মারের চোটে ক্ষিধেয় তার পেট চন্চন্ কচ্ছে। কাজেই মজুরের খরমুজাগুলি সে একে একে খেতে সুরু করল। অনেক খেয়ে দেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে সে থলের ভিতর চুপ ক’রে বসে রইল।
রাত্রিবেলা মজুর বাড়ী ফিরে এসে থলেটি মাচার উপর রেখে ঘুমিয়ে পড়্ল।
পরদিন মজুর-বৌ বললে,—“দেখি কাল থলে ভরে কি আন্লে?” মজুর বল্লে,—“খুব ভাল ভাল খরমুজা এনেছি।”
![]()
মজুর ও মজুর-বৌ।
মজুর-বৌ খুসী হয়ে থলের মুখটা খুলতেই কাঠবেড়ালী ফুরুৎ করে লাফিয়ে মারলে দৌড়!
মজুর-বৌ ত এই কাণ্ড দেখে রেগে বললে,—“ হ্যাঁগা, এই তোমার খরমুজা? পয়সা দিয়ে বাজারের মিষ্টি কিনে খেয়ে তারপর শেষটায় মজুর ও মজুর-বৌ। রাস্তা থেকে একটা কাঠ-বেড়ালী ধরে থলের ভিতর পুরে কিনা বলা হচ্ছে—ভাল ভাল খরমুজা এনেছি।”
কাণ্ড দেখে মজুর ত অবাক! এ আবার কি গেরো! খরমুজাগুলি রাতারাতি হয়ে গেল কি না কাঠবেড়ালী? থলের ভিতর খরমুজাও ত নেই; তার বিচিগুলি পর্য্যন্ত কাঠবেড়ালী খেয়ে সাবার করেছে!
মজুরের মনে মনে ভারি রাগ হ’ল; কি আর করে! ভাব্ল, কাঠবেড়ালীকে সাজা দিয়ে তবে ছাড়ব। মজুর-বৌ রাগে গিস্ গিস্ কচ্ছে। মজুর সেই থলেটা হাতে নিয়ে চুপ, করে বাড়ী থেকে বেরুল।
পথের ধারে থলে রেখে মজুর বসে ভাবছে। ডিগ্বাজী খাঁ অমনি তা দূর থেকে দেখ্তে পেলে।
ডিগ্বাজী খাঁ তখন আস্তে আস্তে লোকটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে ভাই, তোমার?” মজুর বলে,—“দেখ, কাল দু’কুড়ি পয়সা দিয়ে পাঁচগণ্ডা খরমুজা আন্লুম কিনে, তার যদি একটা থাক্ত! সবই দুষ্টু, কাঠবেড়ালীর পেটে গেছে।”
ডিগ্বাজী খাঁ বললে—“তা আমি পূর্ব্বেই বুঝেছি।”
মজুর বললে—“তুমি তা বুঝলে কি করে?”
ডিগ্বাজী খাঁ বললে—“কেন, ঐ থলের ভিতর যে কাঠবেড়ালী আধমড়া হয়ে পড়েছিল; তুমি না দেখে শুনে তার ভিতর খরমুজা ভরলে—তাইতে তোমার এই দুর্গতি।”
মজুর বললে,— “এখন সেই কাঠবেড়ালীকে পাই কোথায়?”
শেয়াল বললে,—“সে কিছু শক্ত নয়; কাল একটা খরমুজা কিনে এনে আমায় দিও; আমি ওকে ধরবার ব্যবস্থা কচ্ছি।”
শেয়ালের কথামত মজুর একটা খরমুজা কিনে আনলে।
ডিগবাজী খাঁ ভিতরটা ফুটা ক’রে তাতে ভর্ল, আধসের লঙ্কাবাটা আর তিন ছটাক পেঁয়াজের খোসা।
তারপর সেটা গাছের ডালে এনে টাঙিয়ে রাখ্লে। শেয়াল ভাব্লে, এইবার কাঠবেড়ালী খরমুজা খেলেই হয়।
গাছের ডালে খরমুজ। ঝুল্তে দেখেই কাঠবেড়ালী লেজ ফুলিয়ে উঁচু ক’রে ছুটে এল; কাছে গিয়ে খেতে সুরু করবার আগেই তার নাকে ঢুক্ল—একটা বিশ্রী রকমের ভোটকা গন্ধ।
কাঠবেড়ালী নখ দিয়ে ফুটো ক’রে দেখে খরমুজার ভিতর অর্দ্ধেক লঙ্কার গুঁড়ো আর পেঁয়াজের খোসা।
কাঠবেড়ালী ভাব্ল, তাইতো, খেলেই গেছিলুম আর কি! লঙ্কার ঝালে জিভ জ্বলতো আর পেঁয়াজের খোসার রসে চোখ টাটিয়ে কাণা হ’ত। ভাগ্যিস টের পেয়েছি!
তার মাথায় এল এক নূতন ফন্দি ৷
কাঠবেড়ালী সেই খরমুজ। ঘাড়ে করে শেয়ালের বাড়ী রওনা হ’ল।
শেয়াল বাড়ী নেই, শেয়াল-বৌকে দেখে সে বলে,—“দেখ শেয়াল-গিন্নি, শেয়াল আজ আর
![]()
শেয়াল-গিন্নির জ্বলুনি।
বাড়ী ফিরবে না, তাই এটা তোমায় খেতে পাঠিয়ে দিল। শেয়াল গিন্নি সেই আস্ত খরমুজাটা খেয়ে চোখের জ্বালা, জিভের জ্বলুনি আর পেটের কামরে ছট্ফট্ ক’রে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগ্ল।
“ক্যায়া হুয়া, ক্যায়া হুয়া—হ্যাঁ।”
বাকি শেয়ালেরা সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া হ্যাঁ। কাঠবেড়ালী গাছে থেকে বল্লে,—
“খরমুজা খেতে কেমন মজা?
পেলে এবার তুমি সাজা।”
