ডিগবাজী খাঁ/কার জোর বেশী
কার জোর বেশী
ক
একবার এক পিঁপ্ড়ের ভারি ইচ্ছে হোল, লেখাপড়া শিখে সে একজন বিদ্বান ও বুদ্ধিমান হয়।
গোলাবাড়ীর তলা থেকে বেরিয়ে সে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ালো, কিন্তু তাকে শেখাবার পড়াবার মতো লোক একটিও খুঁজে পেল না শেষে একদিন পুকুর পাড়ে পণ্ডিত গঙ্গাফড়িংয়ের দেখা পেয়ে পিঁপড়ে বল্লে—
পেন্নাম হই পণ্ডিত জী,
আপনার সব কুশল কি?
![]()
পণ্ডিত গঙ্গাফড়িংয়ের দেখা পেয়ে পিঁপড়ে বললে—
গঙ্গাফড়িং থাকে উঁচু তাল গাছে, কাজেই তার মান ভারি। মাথা নেড়ে সে বল্লে—
কে বট তুমি?—পরিচয়টা কি?
কোথায় ঘর—ঠিকানা তার কি?
পিঁপড়ে উত্তর দিল,—
নামটি হোল মোর ডেঞে
বাঁচি আমি খুঁদ কুড়ো খেয়ে।
পণ্ডিত হবো ইচ্ছে মনে
এলাম তাই আপনার চরণে।
আপনি দয়া করে আমাকে কিছুটা শিখিয়ে পড়িয়ে দিন।
পণ্ডিত গঙ্গাফড়িং বল্লে,—তা বেশ কথা। তোমার মতো শিষ্য পাই তো বিদ্যাটা ‘ওয়াকিব্হাল’ করে দিতে বেশী দেরী হবে না। দেখ, দুনিয়ায় পণ্ডিত আর ক'জন মিলে? সেকালেতো আড়াই জন পণ্ডিতের নাম শোনা যেতো।
আর একালে পাঁচে দুয়ে সাত বলতে যা বোঝ, তেমনি আড়াই পণ্ডিত বল্তে একাই আমি। তাই তালগাছের মাথায় বাসা নিয়েছি। তেমন উঁচু আসন আর কার আছে বল।
পণ্ডিতের কথা শুনে পিঁপ্ড়েতো মহা খুসী। এতদিনে যা হোক, একজন ডাক্সাইটে পণ্ডিতের দেখা পেলাম।
গঙ্গাফড়িং বলে,—একটা কথা আমি তোমায় শিখিয়ে দিচ্ছি। কথাটার অর্থ ঠিক বুঝে নিলেই হবে তুমি মস্ত পণ্ডিত, আর না বুঝলেই হবে তুমি খণ্ডিত, অর্থাৎ কি না দুই টুক্রো।
পিঁপ্ড়ে উৎসাহের সহিত বললে,—
বেশ বেশ, দয়া ক’রে সে কথাটাই আমাকে শিখিয়ে দিন।
গঙ্গাফড়িং বলে,—“জোর যার মুলুক তার”—শুধু এই কথাটুকুর মানে ঠিক রকম বুঝে নিও, তা হোলেই কোন গোলযোগ থাকবে না।
পিঁপ্ড়ে তো গুরুজীকে প্রণাম করে বিদায় হোল।
পিঁপড়ে মনে মনে ভাবলো,—আর ভাবনা কি ! এই একটা কথা শিখে নিলেই যখন পণ্ডিত হবো তখন আর ভাবনা কিসের ? দেশে বিদেশে আমার ধী-নাম হবে ।
কাজেই পিঁপড়ে কানে একটা কলম গুঁজে দেশে রওনা হোল ।
বাড়ী ফির্তেই পিঁপ্ড়ের রাত কাবার। ভোরবেলা ঘাসের উপর পুরু শিশির জমেছে তাতে পিঁপড়ের কোমর অবধি ডুবে গেল, পা আর চলে না।
![]()
ভোরের সূর্য্য।
কাজেই পিঁপ্ড়ে ভাব্লো, পণ্ডিতজী যা বলে দিয়েছেন, দেখ্চি এবার তাই ঠিক হোল—“জোর যার মুলুক তার” এই শিশিরের যে জোর বেশী তাতে আর সন্দেহ কি
এতবড় একটা বিদ্যে তার আয়ত্ত হোল ভেবে সে শিশিরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো,—ভাই, দেখ্চি তোমারই জোর সকলের চেয়ে বেশী।
শিশির উত্তর দিল,—না ভাই, সূর্য্যের জোর আমার চেয়েও ঢের বেশী। ভোরের সূর্য্য এখুনি ঘাসের সমস্ত শিশির শুষে ফেলবে। পিঁপ্ড়ে তখন সূর্য্যকে ডেকে বললে,—সূর্য্যি মামা, দেখ্চি গায়ের জোর তোমারই সকলের চেয়ে বেশী।
![]()
মেঘ এসে আকাশ ছেয়ে ফেলবে
সূর্যকিরণ বললে,—না ভাগ্নে, ঠিক তা নয়। মেঘ এসে এখুনি আকাশ ছেয়ে আমায় ঢেকে ফেল্বে, তখন আমায় দেখ্তেও পাবে না।
পিঁপড়ে তারপর মেঘের দেখা পেয়ে বল্লে,—মেঘ ভাই তোমারই দেখ্চি গায়ের জোর সকলের চেয়ে বেশী।
মেঘ উত্তর দিল,—তা’ও কি হয়। এই দেখনা বাতাস এসে এখুনি আমায় উড়িয়ে নিবে।
পিঁপ্ড়ে বাতাসের দেখা পেয়ে বললে,—ভাই, দেখ্লুম তোমারই জোর সকলের চেয়ে বেশী।
বাতাস বল্লে, না গো না, আমার চেয়েও ঘরদোরের জোর বেশী। সে সবতো আর আমি উড়িয়ে নিতে পারি না।
পিঁপ্ড়ে তখন ঘরদোরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,—শুনে এলুম বাতাসের কাছে, গায়ের জোর তোমারই সকলের চেয়ে বেশী।
ঘর বলে, তুমি যে ভুল কচ্ছ। ইদুর আমার দেয়াল ফুটো ক'রে দেয়, কাজেই ইদুরের জোর আমার চেয়েও বেশী।
কাজেই পিঁপ্ড়ে গেল ইদুরের কাছে,—ইঁদুর ভাই, পৃথিবীতে তোমারই জোর সকলের সেরা ।
ইদুর বল্লে,—তা’নয়, বেড়াল দেখা পেলেই আমার টুঁটি চেপে ধরে। পিঁপ্ড়ে গেল বেড়ালের কাছে।
বেড়াল মাসী, বেড়াল মাসী, শুনে এলাম ইঁদুরের কাছে, তোমারই ভয়ে সে গর্ভের ভিতর লুকিয়ে থাকে। তা হোলে তোমারই জোর সকলের চেয়ে বেশী।
বেড়াল বল্লে, ম্যাঁও ম্যাঁও—তাও কি হয়, তাও কি হয়। ভুলু কুকুরটা দেখা পেলেই আমায় তেড়ে কামড়াতে আসে। ভোলার গায় বড্ড জোর।
কাজেই পিঁপ্ড়ে গেল ভোলা কুকুরের কাছে।
পিঁপ্ড়ে বললে,—কেমন ভোলা, তোমার জোর সকলের চেয়ে বেশী?
কুকুর বললে,—না ভাই, ঐ যে মুগুরটা দেখ চো, তার এক ঘা পিঠে পড়লে এখুনি আমায় ছুটে পালাতে হবে।
পিপ্ড়ে মুগুরের কাছে গিয়ে বললে, কেমন পালোয়ান জী, তোমার জোর সকলের চেয়ে বেশী ?
মুগুর বল্লে,—না ভাই ঐ যে আগুন দেখচো, এখুনি সে আমাকে পুড়িয়ে হাই করে ফেল্বে। ঐ দেখনা রেগে কেমন অগ্নিশৰ্ম্মা হয়ে আছে।
![]()
মুগুর বল্লে,—ঐ যে আগুন দেখ চো।
পিঁপ্ড়ে গেল আগুনের কাছে।
—আগুন মশাই, জোরে তুমিই সবার উপর। আগুন বলে,—না, জল এখুনি আমায় নিভিয়ে ফেলবে।
কাজেই পিঁপড়ে জলের ডোবার কাছে গিয়ে বললে,—জল ভাই, তোমার জোর সকলকে হার মানিয়েছে ৷
জল বল্লে,—তা' নয়, এখুনি মোষ গরু এসে আমার জল খেয়ে শুষে ফেল্বে।
পিঁপ্ড়ে তাই মোষ গরুর কাছে গিয়ে বল্লে,—শুনলুম্ তোমাদেরই জোর বেশী।
গরু আর মোষ্ বল্লে,—মানুষ এখুনি আমাদিগকে গাড়ীতে জুতে হাট বাজার করতে যাবে।
অগত্যা পিঁপড়ে মানুষের কাছে গিয়ে বললে,—তুমিই ভাই বীর, গায়ের জোরে জগতে তুমিই সবার সেরা।
মানুষ বল্লে,—তাও কি হয়? ঐ দেখ্চোনা লোহার বাটের সাম্নে ইস্পাতের ফলাখানা, ওতে আমায় অবধি কেটে দুই টুক্রো করে ফেল্তে পারে। ওরই গায়ের জোর বেশী।
পিঁপড়ে তখন ছুরির বাট ঘেঁসে বললে,—
“সবাইর কাছে শুনে এলাম ভাই,
তোমার জোরের জোড়াটি আর নাই।”
ইস্পাতের ছুরি হেসে বল্লে,—
একটু ভাই করতো অপেক্ষা
এখুনি তার দিচ্ছি পরীক্ষা।
কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ইস্পাতের ছুরির ধারটুকু পিঁপড়ের গায়ের উপর এসে পড়তেই পিঁপ্ড়ের শরীর কেটে দুই টুকরো হোল।
পিঁপ্ড়ে তখন মনে মনে ভাব্লো,—
“ভাব্লেম আমি হোলেম বুঝি
মস্ত একটা পণ্ডিত,
শেষটায় শূন্য বুদ্ধির জন্য
হোলেম দুই খণ্ডিত।”