বিষয়বস্তুতে চলুন

ডিগবাজী খাঁ/গাঁয়ের মোড়ল

উইকিসংকলন থেকে

​

গাঁয়ের মোড়ল



 সাঁওতালদের গাঁয়ের মোড়ল মারা যেতেই ডিগ্‌বাজী খাঁ ভাব্‌লো—এবার তাকেই সবাই গাঁয়ের মোড়ল হ’তে ডাক্‌বে।

 সন্ধ্যাবেলা হাটবাজার সেরে সাঁওতালরা যখন বাড়ী ফিরছে, তখন সে একে একে গাঁয়ের সবাইকে এই কথাটা বল্লে।

​শেয়ালের স্পর্দ্ধা শুনে সাঁওতালরা হেসে গড়াগড়ি যেতে লাগলো; কেউ
সাঁওতালদের বাড়ী ফিরিবার পথে ডিগ বাজী খা···
শেয়ালকে লাঠি দেখিয়ে বল্‌ল—“আয়, এখুনি মুড়ে ঝাঁটা দিয়ে তোর উল তৈরী করি। খাসা! —শেয়াল হবে গাঁয়ের মোড়ল?—তবেই হয়েছে। দিনে দিনে আরো কত কি শুনতে পাবো।” বাড়ী ফিরে এসে ডিগবাজী খা ভাবলো—তাইতো, সাঁওতালগুলি বদ্-খৎ! অত ক'রে বল্‌লুম, তবু তারা সেটা কাণেই তুল্‌লে না—বরং উল্টে আমায় গাল মন্দ দিয়ে তাড়িয়ে দিলে।
ডিগ্‌বাজী খা বাশী ফুঁকতে লাগলো।

 সেদিন ডিগবাজী খা গাছ থেকে গুটিকতক পেঁপের ডাল কেটে তাই দিয়ে বাঁশী তৈরী কর্‌লো।

 রাত্রিবেলা জঙ্গলে ঢুকে ডিগ্‌বাজী খাঁ খুব জোরে বাঁশী ফুঁকতে লাগলো।

​ একদিন—দুইদিন, তারপর রোজ রাত্রিবেলা এই বাঁশীর আওয়াজ শুনে সাঁওতালরা ভাবলো—নিশ্চয়ই এ কোন বন-দেবতার বাঁশী। বাঁশীর স্বর কি মিষ্টি—আর কি করুণ!

 বনদেবতাকে খুসী করবার জন্য সাঁওতালরা মস্ত এক পূজার আয়োজন করলো; পূজায় মুরগী বলি দিল আর মাদল বাজিয়ে খুব ধূমধাম হ'লো।

 গাঁয়ের লোক ভাব্‌লো, বনদেবতা এবার নিশ্চয়ই খুসী হবেন।

 পরদিন রাত্রিবেলা ডিগ্‌বাজী খা আরো জোরে বাঁশী বাজাতে শুরু করলো। রাত্রির পর রাত্রি সেই আওয়াজ বন্ধ হলোনা দেখে, সাঁওতালরা ভাব্‌লো—নিশ্চয়ই বনদেবতা আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন।

 তখন সাঁওতালদের একটা পঞ্চায়েত বস্‌লো। বনদেবতা সন্তুষ্ট না হ'লে কেউ মোড়ল হ'তেও রাজী নয়।

 ইতিমধ্যে ডিগ্‌বাজী খাঁ সভায় দাঁড়িয়ে সবাইকে বল্লে— “আমায় মোড়ল কর তবে এসব বন্ধ হবে।”

 সাঁওতালরা সবাই হেসে উঠলো। ডিগ্‌বাজী খাঁ ভারি দুঃখিত হয়ে বাড়ী ফিরে এল।

 শেয়ালনী বল্লে—তোমার কি হোল বলতো?

 ডিগ্‌বাজী খাঁ বল্লে—আমি সাঁওতালদের মোড়ল হতে চাই।

 শেয়ালনী বল্লে—তবে এক কাজ কর। একটা মস্ত গৰ্ত্ত খুঁড়ে বাঁধের সব জল তলিয়ে নিয়ে যাও। বাঁধ শুকিয়ে গেলে, সাঁওতালরা মহা ফাঁপরে পড়ে তোমাকেই গাঁয়ের মোড়ল করবে।

 বেশ বুদ্ধি—বলে ডিগ্‌বাজী খাঁ মহা আনন্দে দুই লাফ মারলো।

 শেয়ালনীর কথা মত ডিগ্‌বাজী খাঁ সেদিন থেকে বাঁধের নীচে দিয়ে একটা গর্ত্ত খুঁড়তে লাগ্‌লো।

​ গর্ত্ত যখন অনেক বড় হয়েছে, তখন ডিগ্‌বাজী খাঁ একদিন সাঁওতালদের গায়ে গিয়ে বলে এলো,—তোরা আমাকে তো মোড়ল করলি না, দেখবি তোদের কি দুর্গতি হয়।

 সাঁওতালরা বল্ল,—আমাদের মোড়ল হ'বার জন্য হাঁটাহাঁটি করে শেয়ালটা কিছুদিন থেকে শুকিয়ে উঠেছে। মোড়ল হওয়া কি যার তার কাজ? মোড়ল হ'তে হ'লে খুব হাঁকডাক চাই ৷

 ডিগ্‌বাজী খাঁ বল্লে,—আমি কি আর কারুর চেয়ে কম ডাকতে পারি। হুক্কা—হুয়া —হুক্কা—হুয়া-ক্যাক্ ক্যাক্।

 সাঁওতালরা বল্লে—এই ডাকে কাজ চলে না—তার সঙ্গে হাঁক্‌ থাকা চাই। বুঝলি তো ?

 হাঁক্ যে কা’কে বলে ডিগ্‌বাজী খাঁ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না।

 সে ভাবলো, এবার হাঁক টা কারু কাছে শিখে নিতে হবে।

 রাস্তায় এক বেড়ালের সঙ্গে দেখা হোল। ডিগবাজী খাঁ বল্লে,—দেখ, মিনি, হাঁক, কা'কে বলে বলতে পারিস?

 বেড়াল বল্লে—রাজবাড়ীতে থাকতে এই কথাটা আমি ঢের শুনেছি। রাজার
ডিগ্‌বাজী খাঁ বিড়ালকে জিজ্ঞাসা করিতেছে।
পাইক আছে, তারা মাথায় পাগড়ী বেঁধে খুব হাঁক্‌ ডাক করে বেড়ায়—প্রজার কাছে খাজনা আদায় করে—এরি নাম হোল হাঁক্‌ ডাক।

 সেই কথা শুনে সে ভাবলো—তাইতো, এবার হাঁক্‌ ডাক ক'রে গাঁয়ের মোড়ল হব।

​ ডিগ্‌বাজী খাঁ বাড়ী গিয়ে মাথায় একটা মস্ত পাগ্‌ড়ী বেঁধে, হাতে এক গাছা লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।

 এদিকে শেয়ালনী বাঁধের মুখখুলে দিয়ে এসেছে আর রাতারাতি বাঁধের জল শুকিয়ে মাঝখানে একটা চড়া পড়েছে।

 ভোরবেলা মেয়েরা বাঁধে জল নিতে এসে দেখে—বাঁধে জল নেই, কাদার উপর পড়ে মাছগুলি কাত্‌রাচ্ছে।

 সাঁওতালদের গাঁয়ে হৈ চৈ কাণ্ড! ডিগ্‌বাজী খাঁ তখন পাগ্‌ড়ী বেঁধে গাছের ছায়ায় বসে খুব হাঁক্‌ ডাক শুরু করেছে।

 সাওতালরা সভায় ঠিক করলো, বন-দেবতার পর জল দেবতাও বুঝি তাদের উপর বাম হয়েছে।

 এক সাঁওতাল ডিগ্‌বাজী খাঁকে সেজেগুজে বসে থাকতে দেখে বল্লে— শেয়াল ভাই, এসব ব্যাপার কেন হোল বলতে পার?

 সে বল্লে—তোরা আমাকে মোড়ল কর্‌লি না, তাই তোদের এত দুর্গতি।

 সেই সাঁওতাল সবাইকে গিয়ে এই খবর দিল। তখন সবাই ঠিক করলো, শেয়ালকেই তাদের মোড়ল করা যাক্।

 কিন্তু এবার ডিগ্‌বাজী খাঁ আর সাঁওতালদের কাছে গেল না; সেখানে বসে বসেই মহা হাঁক্‌ ডাক শুরু করলো।

 তখন সব সাওতাল এসে তাকে গাঁয়ের মোড়ল হবার কথাটা বল্লে।

 শেয়াল হাঁক্‌ ডাক করে বল্লে,— আজ তোরা যা—কাল তোদের বাঁধে আবার জল হবে।

 রাত্রিবেলা বাঁধের জল ফিরিয়ে আন্‌বার জন্য, উল্টা দিকে শেয়াল গৰ্ত্ত খুঁড়তে লাগ্‌লো।

​ ভোরবেলা সেই গর্ত্তের মুখের মাটি আলগা হতেই, হু হু করে জল এমন বেগে নেমে এল যে, ডিগ্‌বাজী খাঁ তার চোটে ডিগ্‌বাজী খেয়ে উল্টে পড়ে নাকানি চুবুনি খেতে লাগলো।