ডিগবাজী খাঁ/হুমোবেড়াল
হুমো বেড়াল
এক সাঁওতালের দুই মেয়ে—লুকু আর সুকু। তাদের বাপ মা বান্সা পাহাড়ের চূড়ায় গেল পাহাড়ী বাবার পূজো দিতে, সঙ্গে গেল লুকু। বাড়ীতে সুকু একা। রান্না বান্না সেরে সুকু এক আঁজল তেল মেখে পুকুরে ডুব দিয়ে এল; তারপর বাড়াভাত পাতে নিয়ে সে খেতে বস্ল।
হুমো বেড়াল তখন পাতের গোড়ায় বসে বলে,—“খুকু, আমায় দুটো ভাত দিবে?” সুকু কাঁটা বেছে ভাজা মাছখানা হুমোকে খেতে দিল।
ভাজা মাছখানা খেয়ে হুমো বললে,—“আরো দুটি ভাত দিবে?”
সুকু এক বাটি দুধে ভাত মেখে হুমোকে খেতে দিল। হুমো পেট ভরে সেই দুধভাত খেয়ে সুকুকে বলে—“সুকু, তুমি• খেয়ে দেয়ে ঘুমাও, আমি দরজায় পাহারা দিই।”
সন্ধ্যা হ'তেই সুকুর মনে ভয় হোল। একলা বাড়ী—আশে পাশে লোকজন কেউ নেই।
হুমো সুকুকে বলে,—“সুকু, ভয় কি তোমার? দরজার আগটা বন্ধ কর। আমি সারা রাত জেগে তোমার পাহারা দিব।”
সুকু ঘরের আগল বেশ ভাল করে বন্ধ করে মাচার উপর গিয়ে শুয়ে পড়ল।
অনেক রাত্রিতে এক ভালুক দরজায় এসে ঘা দিয়ে বল্লে,—“দরজাটা খোল, খুব জরুরী খবর আছে।”
হুমো দরজার বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখে ভালুকটা দরজার সামনে হাঁ ক'রে দাঁড়িয়ে আছে।
হুমো জবাব দিল—“দাড়াও, এখন উনুনে আঁচ দিচ্ছি।”
খানিক বাদে ভালুক আবার দরজা ঠেলতেই হুমো বলে,—“সবুর, ময়দাগুলি বেলে নি।”
ভালুক আবার দরজা ঠেলতে শুরু করলো।
হুমো বলে—“এত উতলা হ'লে কেন? এইবার রুটিগুলি তাওয়ায় সেকে নি।”
খানিক পরে ভালুক এমন জোরে দরজায় ধাক্কা মারল যে দরজা ভাঙ্গে আর কি !
হুমো বলে,—“কি চাই বল তো?”
ভালুক বলে—“দামী দামী পোষাক আর গয়না দিতেই আমি এসেছি।” হুমো দরজা খুলে ভালুকের ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়েই পা দিয়ে চোখ দুটো জোরে টিপে ধরেই বলে,—“ভালুক মহাশয়, এবার হুমোর হাতে পড়েছ, সহজে নিস্তার নেই।”
ভালুক পেটেরাটি মাটিতে ফেলে দিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে,—“এবারটি মাপ কর; পেটেরায় অনেক ভাল ভাল জিনিষ আর গয়না-গাটি রইল—এবার ছেড়ে দাও, কানমলে বিদায় হচ্ছি।”
হুমো তখন ভালুককে ছেড়ে দিয়ে পেটেরা ঘাড়ে ক'রে ঘরে এসে সুকুকে বল্লে—“সুকু, এই নেও তোমার গয়না আর পোষাক-পত্ৰ।”
সুকু পেটেরার ভিতর এতগুলি গয়না আর ভাল পোষাক-পত্র পেয়ে ভারী খুসী হ'ল। সুকু একটা ভাল জামা তৈরী ক'রে হুমোর গায় পরিয়ে দিল; আর এক জোড়া সোণার নূপুর তৈরী করে হুমোর পায় পরিয়ে দিল।
পরদিন লুকু বাড়ী ফিরে এসে সুকুর গা ভরা গয়না আর পোষাক-পত্ৰ দেখেই তো চটে লাল।
লুকু রেগে সুকুকে বললে,—“তুই নিশ্চয় এগুলি কোথাও থেকে চুরি করে এনেছিস্? এখুনি দারোগা এসে তোকে থানায় ধরে নিয়ে যাবে।”
সুকু বলে,—“এগুলিতো আমি চুরী করে আনি নি; ভালুক এসে কাল এগুলি আমায় দিয়ে গেছে।”
দিন কয়েক বাদে সুকু গেল বাপ মায়ের সঙ্গে ‘ছাতা পরব' উৎসবে। সেই উৎসবে সাঁওতালরা সেজেগুজে খুব নাচগান করে। সুকু সেজে গুজে সেই উৎসবে নাচ্তে গেল। লুকু কিছুতেই সেই উৎসবে গেল না—বাড়ীতেই রইলো।
বাড়ীতে রান্না বান্না সেরে লুকুর আর তর সইল না; নাওয়া দাওয়া না সেরেই ভাত বেড়ে পাতে খেতে বস্ল।
হুমো পাতের কাছে এসে বললে—“লুকো, আমায় দুটো ভাত দিবে?”
লুকু ডালের কাঁটাটা দিয়েই মারলে হুমোর পিঠে জোরে এক ঘা।
হুমো চুপ ক'রে রইল।
লুকুর খাওয়া দাওয়া সারা হ'তেই হুমো বল্লে,—“তোমার পাতের দুটো কাঁটাই না হয় ফেলে দেও।”
লুকু উনুনের জ্বলন্ত চ্যালা কাঠখানা দিয়ে হুমোর পিঠে জোরে এক ঘা মেরে হাস্তে লাগলো।
চ্যালার আগুনে হুমোর লোম গুলি গেল সব পুড়ে।
লুকু দরজা ঠেলে মাঁচার উপর গিয়ে শুয়ে পড়ল। লুকুর চোখে ঘুম নাই; কখন ভালুক আসবে আর লুকু তার কাছ থেকে সুকুর চেয়েও ভাল ভাল গয়না আর পোষাক-পত্র আদায় করবে—এই ভাবনায় সে জেগে রইল।
রাত্রিবেলা ভালুক এসে দরজায় ধাক্কা দিল। লুকু দরজার ফাঁক দিয়ে ভালুককে দেখেই আদর ক'রে বললে—“আসুন ভালুক মশায়, বসুন।”
ভালুক ঘরের ভিতর ঢুকতেই লুকু একখানা আসন বিছিয়ে দিয়ে বল্ল—“আসুন মশায়, বসুন মশায়।”
তারপর লুকু ভালুকের লম্বা পায়ের দিকে তাকিয়ে বললে,—“ভালুক মশায়, আপনার পাগুলি এমন লম্বা কেন ?”
ভালুক জবাব দিল—“তাড়াতাড়ি চলার জন্য।”
“আপনার নাকটি এরকম কেন ?”
“গন্ধ শোঁকবার জন্য ।”
“আপনার কানগুলি কুলোর মত বড় কেন?”
“ভালো শোবার জন্য ।”
“আপনার চক্ষুগুলি এমন উজ্জ্বল কেন?”
“দূরের জিনিষ দেখ্বার জন্য।”
“আপনার দাঁতগুলি এত লম্বা কেন ?”
ভালুক মুখ হাঁ ক'রে বললে—“এই তোমাকে খাবার জন্য।”
লুকু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছুটতে গিয়ে দাওয়ার উপর পড়ে গেল।
ভালুক লুকুর পিঠে কামড় দিয়ে তাড়াতাড়ি বনের দিকে ছুটে চল।
হুমো এতক্ষণ মাচার উপর থেকে ভালুকের কাণ্ড কারখানা দেখ ছিল।
ভালুক যখন, সত্যি সত্যি লুকুকে মুখে করে বনের দিকে রওনা হ'ল, তখন হুমো ভাবল লুকুকে ভালুক খেয়ে ফেললে সুকু আর তার বাপ মায়ের ভারি কষ্ট হবে। হুমো তখন উনুনের পোড়া কাঠখানা নিয়ে পিছনে পিছনে গিয়ে ভালুকের পিঠের উপর চড়ে বস্ল।
হুমো সেই পোড়া কাঠখানা দিয়ে ভালুকের পিঠে খুব জোরে চাবুক কস্তে লাগল!
ভালুকের চামড়া পুড়ে যেতেই ভালুক চেঁচিয়ে হুমোকে বললে,—“এই বার লুকুকে ফেলে দিচ্ছি, আমাকে রেহাই দেও।”
লুকুকে মাটিতে ফেলে দিতেই হুমো ভালুকের পিঠ থেকে নেবে পড়ল।
সেবার ভালুকের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে লুকু আর কখনো হুমোর প্রতি কোন অত্যাচার করতো না ।