ডিটেক্‌টিভ পুলিস (প্রথম কাণ্ড)/ডাক্তার বাবু বক্তা/নবম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

নবম পরিচ্ছেদ।

 পূর্ব্বে প্রত্যহ সন্ধ্যার পর একবার আহারার্থে বাটীতে যাইতাম, আজ ক্রমিক সাত দিবসের পর বাটীতে যাইলাম। পিতা আমাকে দেখিয়া ঘাড় হেঁট করিয়া বাহির হইয়া গেলেন। বাটীর ভিতর যাইয়া দেখি, আমার স্ত্রী অন্য দিবসের অপেক্ষা অতিশয় ম্রিয়মাণ। সে দিবস আমার সহিত কথা কহিল না, বা আমার নিকটেও আসিল না। মাতা আমাকে ডাকাইয়া আহার করাইলেন ও অতিশয় দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। আমার ছোট ছোট দুইটী পুত্ত্র ও একটী কন্যা আসিয়া গলা ধরিয়া বলিল, “বাবা! তুই কোথায় ছিলি?”

 আমার সে সকল কিছুই ভাল লাগিল না; হৃদয়ের মধ্যে সেই গোলাপের রূপ চিন্তা করিতে লাগিলাম, তাহার কথাগুলি স্মরণ করিতে লাগিলাম। আহার সমাপ্ত হইল, আমার ঘরে গিয়া শয়ন করিলাম; ঘড়িতে নয়টা বাজিয়াছে। ক্রমে একটা বাজিয়া গেল, তথাপি আমার স্ত্রীকে সে রাত্রে আর দেখিতে পাইলাম না, বা অন্য কাহারও আর কোন প্রকার সাড়া শব্দ পাইলাম না। রাত্রি ২টা বাজিলে আস্তে আস্তে উঠিয়া, যে আল্‌মারির ভিতর আমার স্ত্রীর গহনা থাকিত, তাহা খুলিলাম। খুলিতে কোন কষ্ট হইল না, যে স্থানে চাবি থাকিত, তাহা আমি জানিতাম। বাক্স খুলিয়া তাহার মধ্য হইতে তিনখানি সোণার অলঙ্কার বাহির করিয়া লইয়া সকলের অলক্ষিতভাবে বাটী হইতে বহির্গত হইলাম, এবং সেই রাত্রিতেই গোলাপের বাটীতে গিয়া তাহাকে সেই সকল অলঙ্কার প্রদান করিলাম। সে অবশ্যই অতিশয় সন্তুষ্ট হইল।

 পরদিন সন্ধ্যার সময় আমার জননী গোলাপের বাটীতে আমার নিকট লোক দ্বারা বলিয়া পাঠাইলেন,—“তুমি যে গহনা তিনখানি চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছ, তাহা আর পুনরায় পাইবার প্রত্যাশা করি না; কিন্তু তুমি একবার বাটীতে আসিয়া তোমার পিতাকে বলিয়া যাইবে। নতুবা শুনিলাম, তিনি তোমাকে পুলিসের হস্তে দিবার বন্দোবস্ত করিতেছেন।” আমি সেই লোককে বলিয়া দিলাম, “আমি যাইয়া পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিব”, কিন্তু আর গেলাম না। গোলাপকে ছাড়িয়া যাইতে ইচ্ছা হইল না।

 পরদিন সন্ধ্যার সময় দেখিলাম, একজন ইংরাজ পুলিসকর্ম্মচারী আমার অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত গোলাপের বাটীতে আসিতেছেন। তাঁহাকে দেখিয়া, মাতা যে সংবাদ পাঠাইয়া দিয়াছিলেন, তাহা মনে পড়িল, ভয়ও হইল। কিন্তু বুদ্ধিমতী গোলাপের পরামর্শে অন্য একটী ঘরের ভিতর যাইয়া লুকাইলাম। সে বাহির হইতে ঐ ঘরের তালা বন্ধ করিল। ইংরাজ পুলিস-কর্ম্মচারী বাটীর ভিতর প্রবেশ করিলে, গোলাপ অতিশয় যত্নের সহিত তাঁহাকে বসাইল, আপনিও তাহার নিকট বসিয়া রামদাসকে পাখার বাতাস দিতে বলিল। রামদাস বাতাস দিতে লাগিল। গোলাপ নিজহস্তে একটী বোতল খুলিয়া তাহা হইতে এক গ্লাস সুরা ঢালিয়া সাহেবের হস্তে অর্পণ করিলে, সাহেব বিনা-আপত্তিতে তাহা পান করিলেন। গোলাপ তখন দেশলাই ও চুরট আনাইয়া দিয়া তাঁহার সহিত বাক্যালাপে প্রবৃত্ত হইল। সাহেব ধীরে ধীরে ধূমপান করিতে করিতে, গোলাপকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ডাক্তার বাবু কোথায়?” গোলাপ বলিল, “আমি কোন ডাক্তার বাবুকে জানি না। তবে নিত্য নিত্য নূতন নূতন লোক আসে বটে, কিন্তু আমি তাহাদিগের নাম বলিতে পারিব না।” সাহেব গোলাপের কথায় বিশ্বাস করিয়া উঠিলেন, ও যাইবার সময় এদিক ওদিক চতুর্দ্দিকে লক্ষ্য করিতে করিতে, যে ঘরে আমি ছিলাম, সেই ঘরের নিকট আসিয়া বলিলেন, “এ ঘরে কে থাকে?” গোলাপ বলিল, “সুন্দরী নাম্নী অন্য আর একটী স্ত্রীলোক ঐ ঘরে থাকে। সে অদ্য প্রাতঃকালে দরজা বন্ধ করিয়া তাহার ভগিনীর বাটীতে গিয়াছে। যদি আপনার কোন প্রকার সন্দেহ হয়, আপনি তালা ভাঙ্গিয়া দেখুন।” সাহেব মনে মনে কি ভাবিয়া বলিলেন, “না, ও ঘর আমার দেখিবার কোনও আবশ্যক নাই। তোমার কথায় অবিশ্বাস করার কোন কারণ দেখি না।” এই বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন।

 সাহেব চলিয়া গেলে ঐ ঘর হইতে গোলাপ আমায় বাহির করিয়া দিল, কিন্তু আমার মনে অতিশয় ভাবনা রহিল। গোলাপ বলিল, “তুমি আপাততঃ দিন কয়েকের নিমিত্ত অন্য কোনস্থানে গিয়া থাক, গোলমাল মিটিয়া গেলে পুনরায় আসিও।” আমিও সম্মত হইলাম এবং গোলাপের নিকট হইতে কিছু টাকা লইয়া সেইদিন রাত্রি নয়টার সময় এলাহাবাদ যাত্রা করিলাম।

 আমি যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে এলাহাবাদে বাঙ্গালীর সংখ্যা এখন অপেক্ষা অল্প ছিল। আমি এলাহাবাদে গমন করিয়া একজন বাঙ্গালী ডাক্তারের বাসায় উপস্থিত হইলাম। “শরীরের অসুস্থতা বশতঃ বায়ু পরিবর্ত্তন করিতে আসিয়াছি” তাঁহাকে এই বলিয়া পরিচয় দিলাম, তিনি আমাকে অতিশয় যত্ন করিলেন। তাঁহার বাসায় প্রায় এক মাসকাল থাকিলাম। সেইস্থানে আমি এম্, বি, ডাক্তার বলিয়া সকলের নিকট পরিচয় দিয়াছিলাম, সুতরাং সকলে আমাকে “এম্, বি,” ডাক্তার বলিয়া অতিশয় মান্য করিতে লাগিলেন। ডাক্তার বাবুও মধ্যে মধ্যে আমার পরামর্শ লইয়া চিকিৎসা করিতে লাগিলেন।

 এই সময় আমি দুষ্কর্মের আরও এক সোপান ঊর্দ্ধে উখিত হইলাম। সেইস্থানের সমস্ত বাঙ্গালীর নিকট হইতে হাওলাত বলিয়া কাহারও নিকট ১০০৲ টাকা, কাহারও নিকট ২০০৲ টাকা লইলাম। সকলেই আমাকে বিশ্বাস করিয়া হাওলাত দিলেন, কিন্তু কেহ কাহাকে কিছু বলিলেন না। সকলেই বুঝিলেন, আমার টাকা যাইলে আমি সকলের ঋণ পরিশোধ করিয়া দিব। এইরূপে প্রায় দুই সহস্র টাকা সংগ্রহ করিলাম।

 এই সময় আমাদিগের বাসায় হঠাৎ একজন কলিকাতার লোককে দেখিতে পাইলাম। তিনি আমাকে চিনিতেন, তিনি আমার সমস্ত গুণ ডাক্তার বাবুর নিকট প্রকাশ করিয়া দিলেন। “এম্, বি,” উপাধি সকলে জানিতে পারিল, হাওয়া পরিবর্ত্তনের কারণ সকলে অবগত হইল; ডাক্তার বাবু অতিশয় অসন্তুষ্ট হইলেন। অনন্যোপায় হইয়া আমি সেই রাত্রিতেই এলাহাবাদ হইতে পলায়ন করিয়া পুনরায় কলিকাতায় আসিলাম। পরে শুনিয়াছিলাম, আমাকে পুলিসের হস্তে সমর্পণ করিবার নিমিত্ত সকলেই আমার অনুসন্ধান করিয়াছিলেন, কিন্তু কেহই আমার কোনরূপ সন্ধান করিতে সমর্থ হয়েন নাই।

 বাটীতে আসিয়া এক সহস্র টাকা পিতাকে দিলাম, তাঁহার সমস্ত ক্রোধ অন্তর্হিত হইল, তিনি ঐ টাকা দিয়া আমার স্ত্রীকে পূর্ব্বের মত তিনখানি গহনা গড়াইয়া দিলেন। বক্রী টাকা লইয়া গোলাপের নিকট উপস্থিত হইলাম। পাঁচ সাত দিন সে আর কিছু বলিল না; অষ্টম দিবস হইতে আবার পূর্ব্ব ব্যবহার আরম্ভ করিল। তখন ভাবিলাম, এরূপ করিলে আর অধিক দিন চলিবে না; কোন প্রকার কাজকর্ম্মের বন্দোবস্ত করিতে হইবে। সেই সময় বঙ্গদেশীয় একজন প্রধান জমীদার এখানে ছিলেন, ক্রমে যাইয়া তাঁহার সহিত মিলিলাম। তাঁহার নিকট “এম্, বি” ডাক্তার বলিয়া পরিচয় দিলাম। তিমি আমাকে বিশ্বাস করিলেন, আমার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হইয়া ক্রমে তিনি আমাকে তাঁহার বাটীর ডাক্তার নিযুক্ত করিলেন। মাসে মাসে ২০০৲ টাকা বেতন দিতে লাগিলেন, তাহা ব্যতীত মধ্যে মধ্যে পারিতোষিক প্রভৃতিও পাইতে লাগিলাম। ঐ টাকা হইতে ১০০৲ টাকা মাসে মাসে গোলাপকে দিতে লাগিলাম, বক্রী ১০০৲ টাকার মধ্যে আমার নিজের আবশ্যকীয় খরচ পত্র বাদে যাহা অবশিষ্ট থাকিত, তাহা মাতার হস্তে দিতে লাগিলাম। ক্রমে পিতা মাতা ভাবিতে লাগিলেন যে, আমার মতিগতি এখন একটু ভাল হইতেছে। তখন মধ্যে মধ্যে বাটীতে যাইতে আরম্ভ করিলাম। প্রথম ৭।৮ দিবস আমার স্ত্রী আমার ছায়া পর্য্যন্ত স্পর্শ করিল না, কিন্তু সে হিন্দুরমণী হইয়া আর কত দিবস স্বামীর সেবা শুশ্রূষা না করিয়া থাকিতে পারিবে? পরে আপনিই আমার নিকট আসিল, আসিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। তাহার কান্না দেখিয়া আমার হৃদয়ে একটু দয়ার উদ্রেক হইল। একবার ভাবিলাম, যাহা করিবার করিয়াছি, আর এরূপ দুকর্ম্ম করিব না; কিন্তু পর মুহূর্ত্তেই তাহা ভুলিয়া গেলাম, গোলাপের বাড়ীতে যাইয়া উপস্থিত হইলাম। এখন আর আমার লজ্জা সরম নাই, হৃদয় কঠিন হইয়া গিয়াছে। এখন যখন ইচ্ছা, তখনই গোলাপের বাড়ীতে যাই, যখন ইচ্ছা, তখনই সে স্থান হইতে চলিয়া আসি। কাহাকেও ভয় বা লজ্জা করিতে ইচ্ছা হয় না, ইহা যেন কোন প্রকার দুষ্কর্ম্ম বলিয়া বিবেচনা হয় না।