তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব
তবুও আমি তাঁহারই উপর
নির্ভর করিব
কুমারী এইচ. আর. হিগেন্সের
আত্ম-জীবনী
রেভারেণ্ড সি. এইচ. আরউইনের লিখিত
ভূমিকাসহ
শ্রীমথুরানাথ নন্দী বি. এ.
কর্ত্তৃক অনূদিত
(মূল গ্রন্থ দি রিলিজিয়াস্ ট্র্যাক্ট সোসাইটী, লণ্ডন,
কর্ত্তৃক প্রকাশিত)
প্রকাশক—শ্রীনরেন্দ্রনাথ নন্দী
১০৮এ, আপার সাকিউলার রোড
কলিকাতা।
মূল্য ॥০ আনা
মুদ্রাকর: শ্রীদেবেন্দ্রনাথ বাগ
ব্রাহ্ম মিশন প্রেস
২১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
উৎসর্গ
দুঃখের মধ্যে ঈশ্বর-করুণার ও চিন্তা-লহরীর
এই সংক্ষিপ্ত কাহিনী
তাঁহার দুঃখক্লিষ্ট সন্তানগণের
উদ্দেশ্যে
উৎসর্গীকৃত
হইল।
অনুবাদকের নিবেদন
ইহা একখানি অপূর্ব্ব গ্রন্থ। মানুষের জীবনে যে এমন শারীরিক দুঃখ ঘটিতে পারে, তাহা কল্পনাও করিতে পারি নাই। এই ভক্তিমতী মহীয়সী নারী যে এমন প্রসন্নচিত্তে এই বেদনার দান বহন করিয়াছেন, তাহা ভাবিয়া শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ে তাঁহাকে নমস্কার করিয়াছি, এবং ভগবৎ চরণে এই প্রার্থনা করিয়াছি যে, যদি তাঁহার বিধানে দুঃখ আসে, তাহা হইলে তাহা যেন নির্ভরের ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া শান্তচিত্তে বহন করিতে পারি। এই গ্রন্থখানা পাঠে যদি একটি আর্ত্তের মনেও এই আদর্শ জাগ্রত হয়, তাহা হইলে আমার শ্রম সার্থক হইয়াছে মনে করিব।
গ্রন্থকর্ত্রী খ্রীষ্টধর্ম্মবিশ্বাসিনী। তাই তিনি পুনঃ পুনঃ যীশুর নাম উল্লেখ করিয়াছেন। ইহাতে একটা বিষয়ে ভ্রান্ত সংস্কারের পরিচয় পাওয়া গেলেও, সর্ব্বত্র আরাধ্য দেবতার কথাই বলা হইয়াছে মনে করিলে, বোধ হয় অন্য ধর্ম্মাবলম্বী পাঠকদের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক সত্যটা বুঝিতে কোনও অসুবিধা হইবে না।
শ্রদ্ধেয় বন্ধু শ্রীযুক্ত বরদা কান্ত বস্তু মহাশয় নানা ভাবে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন। তাঁহার সাহায্য ভিন্ন এই গ্রন্থ প্রকাশ করা সম্ভবপর হইত না। আমি এই জন্য তাঁহার নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞ আছি।
ভূমিকা
মেলবোর্ণ নগরে বাস করিবার সময়ে কুমারী হিগেন্সের (Miss Higgens) সঙ্গে আমার পরিচিত হইবার সৌভাগ্য হইয়াছিল। উক্ত কারণেই এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানি ইংলণ্ডবাসী বন্ধুবর্গের নিকট সুপরিচিত করিয়া দিবার জন্য আমি অনুরুদ্ধ হইয়াছি।
তাঁহার কথা স্মরণ করিলেই, আমার সূর্য্য-কিরণের কথা মনে হয়, পরন্তু মেঘের কথা নহে। যথার্থতঃ প্রভু যীশুর আনন্দই তাঁহার শক্তির মূল। তাহা সত্ত্বেও, তিনি অনেক শারীরিক ক্লেশ সহ্য করিয়াছেন, এবং এখনও করিতেছেন। কোন মানুষের দুইটি বাহু ও একখানা পা কর্ত্তিত হইয়াছে, এইরূপ ঘটনা সংসারে অতি বিরল। এইরূপ জীবনের কহিনীগুলি কৃপার কাহিনী। দুরারোগ্য রোগে যাহারা পঙ্গু, তাহাদের পক্ষে ইহা আশাপ্রদ। এইরূপ ব্যাধিগ্রস্ত কোনও ব্যক্তি সহজেই বলিতে পারিত, ‘আমার কর্ম্ম শেষ হইয়াছে’। কিন্তু, তিনি তাঁহার পঙ্গু দেহ এবং ক্লেশকর রোগশয্যা হইতেও অনেকের সহায়স্বরূপ হইয়াছেন।
কুমারী হিগেন্স্ তাঁহার শিক্ষকের চিঠির ফলেই যীশুর শরণাপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি নিজেও অল্প সময়ের জন্য রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করিয়াছিলেন, এবং তাঁহার ছাত্রীদের মধ্যে তিন জন এখনও শিক্ষা কার্য্যে ব্রতী আছেন। এই সকল কথা রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষে উৎসাহজনক।
এখন যখন এই ক্ষুদ্র প্রাণস্পর্শী কাহিনীটি মানব সমাজে প্রচারিত হইল, তখন প্রার্থনা এই যে, যিনি লেখিকাকে তাঁহার অনেক দুর্ব্বল মুহূর্ত্তে বল বিধান করিয়াছেন, তাঁহারই করুণাতে ইহার প্রত্যেক পাঠকের চিত্ত যেন প্রচুর আনন্দ সান্ত্বনায় পূর্ণ হইয়া উঠে।
এই অদ্ভুত হৃদয়গ্রাহী আত্মজীবনীখানির একটি ছোট ভূমিকা লিখিবার জন্য আমি অনুরুদ্ধ হইয়াছি, এবং অত্যন্ত আনন্দের সহিত আমি সেই কার্য্য সম্পন্ন করিতেছি।
পঁচিশ বৎসরের অধিক কাল হইতে আমি কুমারী হিগেন্স্কে জানি। তিনি তাঁহার মাতা পিতা ও ভগ্নীদের সঙ্গে বহু বৎসর আমার ভজনালয়ের উপাসনায় যোগদান করিয়াছিলেন। বালিকা বয়সে তিনি আমার জেষ্ঠা কন্যা কর্ত্তৃক পরিচালিত রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন; এবং তিনি যে তাহার সনির্ব্বন্ধ অনুরোধেই যীশুর শরণাপন্ন হইয়াছিলেন, তাহা বিবৃত করিয়াছেন। ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দের ১৭ই জুন প্রভুর ভোজে বসিয়া তিনি প্রকাশ্যভাবে তাঁহার বিশ্বাস ব্যক্ত করিয়াছিলেন।
এই সময়ের পূর্ব্ব হইতেই তাঁহার দক্ষিণ হস্তে সেই অজ্ঞাত ব্যাধির সূত্রপাত হয়, যাহা চিকিৎসকগণের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া তাঁহার দারুণ বেদনার কারণ হইয়াছিল। তাঁহার মতন যন্ত্রণাভোগ অতি অল্প লোকের জীবনেই ঘটিয়াছে। রোগবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহাকে ক্লেশকর অস্ত্র-প্রয়োগের অধীন হইতে হইয়াছিল। তাঁহার দক্ষিণ হস্ত,—কনুইর নীচ পর্য্যন্ত—তাহার কিছুকাল পরে, তাঁহার বাম পদ কাটিয়া ফেলিতে হইয়াছিল। তৎপরে, তাঁহার বাম হস্তেও সেই ব্যাধি দেখা দিয়াছিল, এবং তাহাও রক্ষা করিতে পারা যায় নাই। ইহার কয়েক বৎসর পরে, তাঁহার দক্ষিণ বাহুর কনুইর উপরের যে অংশ ছিল, তাহাও কাটিয়া ফেলিতে হইয়াছিল।
এই সকল অত্যধিক ক্লেশকর পরীক্ষার ভিতরেও তিনি আশ্চর্য্য সাহস, ধৈয্য, ও উপায়োদ্ভাবনী শক্তি প্রদর্শন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। যখন তাঁহার দক্ষিণ বাহু কর্ত্তিত হইয়াছিল, তখন তিনি বাম হস্তের সাহায্যে লিখিতে শিক্ষা করিয়াছিলেন; কিন্তু, এখন কনুইর উপর পর্য্যন্ত বাম বাহুও কাটা হইল, তখন তিনি দুইটি যন্ত্র উদ্ভাবন পূর্ব্বক, একটির সাহায্যে দক্ষিণ বাহু দ্বারা লিখিতে, এবং অপরটির সহায়তায় বাম বাহুদ্বারা পুস্তকের পাতা উল্টাইতে পারিতেন। এই ভাবে যে চিকিৎসকের সঙ্গে তিনি বাস করিতেন, তাঁহার সহকারী লেখিকার কার্য্য করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। বিগত ২৮ বৎসর কাল তাঁহার শারীরিক যন্ত্রণা অত্যন্ত তীব্র থাকিলেও, তিনি সকল সময়ই উৎফুল্ল, আনন্দিত এবং ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতাপূর্ণ থাকিতেন। তিনি বলিয়াছেন, তিনি সময়ে সময়ে উত্যক্ত হইয়া পড়িতেন; ইহাতে আশ্চর্য্য হইবার কিছু নাই। কিন্তু, আমি যখনই তাঁহার নিকট গিয়াছি, আমি কখনও তাঁহাকে উত্যক্ত দেখি নাই। অধিকন্তু, আমি যে তাঁহাকে শুধু সহিষ্ণু দেখিয়াছি তাহা নহে, পরন্তু দেখিয়াছি, তিনি ঈশ্বরের গুণগানে নিযুক্ত, এবং তাঁহার গৌরবে আশান্বিত ও হর্ষোৎফুল্ল। তিনি ঈশ্বরে যে আনন্দ পাইতেন, তাহা তাঁহার বাসগৃহখানিকে সূর্য্যকিরণে উদ্ভাসিত করিয়া রাখিত, এবং যাঁহারা তাঁহাকে সান্ত্বনা প্রদান করিতে যাইতেন, তাঁহারা, সান্ত্বনা প্রদান করা দূরে থাকুক, নিজেরাই তাঁহার নিকট হইতে সান্ত্বনা ও আনন্দ লাভ করিয়া প্রত্যাবর্ত্তন করিতেন। ‘দুঃখ ক্লেশ যেমন তাঁহার প্রচুর ছিল, তেমনি তাঁহার সান্ত্বনাও তদপেক্ষা অনেক বেশী ছিল’।
হিগেন্সের জীবনের কথা পুনঃপুনঃ বলিয়াছি। ঈশ্বর কেমন করিয়া অত্যন্ত ক্লেশকর যন্ত্রণাদায়ক অবস্থায়ও মানুষকে শান্তি, বিশ্রাম ও আনন্দ প্রদান করিতে পারেন, তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্বরূপ কুমারী হিগেন্সের উল্লেখ করিয়াছি। আমার মনে হয়, এই জীবনী পাঠে মানব-চিত্ত বিস্ময়ে ও কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ হইয়া উঠিবে, এবং যাহারা মনে করে যে, জগতের যত দুঃখ বেদনার উত্তাল তরঙ্গ তাহাদের উপর দিয়াই প্রবাহিত হইতেছে, তাহারাও ইহা পাঠ করিয়া প্রাণে সান্ত্বনা লাভ করিতে সমর্থ হইবে।
(স্বাক্ষর) ডান্কেন এস ম্যাক্ ইয়াক্রেণ
সেণ্ট এণ্ড্রুস্ ম্যান্স্, কার্লটন, মেল্বোর্ণ
ডিসেম্বর ১৫, ১৮৯৮
এই গ্রন্থকর্ত্রী “রেইনাউড্” রোগে অত্যন্ত কষ্ট পাইয়াছেন, এবং এখনও পাইতেছেন। ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে ডাঃ রেইনাউড্ সর্ব্ব প্রথম এই ব্যারামের বিবরণ প্রকাশ করেন, এবং সেই সময় হইতে চিকিৎসাজগতে ইহা তাঁহার নামে সুপরিচিত হইয়াছে। তিনি বলেন যে, এই ব্যাধি এক প্রকার নূতন ধরণের শুষ্ক gangrene (গলন পচন)। রক্তনালীর প্রসারণ ও সংকোচনের প্রতিবন্ধকতাই ইহার উৎপত্তির কারণ! সাধারণতঃ রক্তসঞ্চালনের অন্ত্য সীমায়, পায়ের কি হাতের আঙুলেই, সর্ব্বপ্রথম এই ব্যাধি দেখা দেয়, তৎপরে ক্রমে ক্রমে সেই অংশটা অবশ হইয়া পড়ে। ব্যারাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেদনা ও অন্যান্য উপসর্গ ও বর্ত্তমান থাকে। এই ব্যাধির সমধিক বৃদ্ধিতে দেহ-যন্ত্রের সমস্ত সূক্ষ্ম উপাদানগুলি (tissues) বিনষ্ট হয়; কাজেই রুগ্ন অংশ দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করা অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে। হোমিওপ্যাথিক হাসপাতালে ৪ঠা জুলাই ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে কুমারী হিগেন্সের উপর আমি শেষ বার অস্ত্রোপচার করি, এবং ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ্চ হইতে আমি মনোযোগপূর্ব্বক তাঁহার তত্ত্বাবধান করিয়া আসিতেছি।
পরিচ্ছেদ (মূল গ্রন্থে নেই)
সূচীপত্র
এই লেখাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত কারণ এটি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারির পূর্বে প্রকাশিত।
লেখক ১৯৪০ সালে মারা গেছেন, তাই এই লেখাটি সেই সমস্ত দেশে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত যেখানে কপিরাইট লেখকের মৃত্যুর ৮০ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকে। এই রচনাটি সেই সমস্ত দেশেও পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত হতে পারে যেখানে নিজ দেশে প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রলম্বিত কপিরাইট থাকলেও বিদেশী রচনার জন্য স্বল্প সময়ের নিয়ম প্রযোজ্য হয়।
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।