বিষয়বস্তুতে চলুন

তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/অষ্টম অধ্যায়

উইকিসংকলন থেকে

অষ্টম অধ্যায়

২৪ নম্বর রোগীর শয্যা

 ’বিরামহীন কালস্রোত ভাসিয়া চলিয়াছে; কিন্তু তাহার মধ্যেও যে-সকল লোক অসহায় ও নিরাশ্রয় হইয়া রহিয়াছে, তাহাদিগকে স্নেহ ও যত্নে পালন করা আবশ্যক।’

 হাসপাতালে বাস করা কালীন একদিন আমার মনে হইতেছিল, ২৪ নম্বর রোগীর শয্যাকে (যে শয্যায় আমি শায়িত আছি) আমার মনে করা, এবং এই শয্যায় যেকোন রোগী শয়ন করিবে তাহাদের প্রতি জনের জন্য প্রার্থনা করা, কেমন আনন্দকর হইবে! আমাকে বাড়ী নেওয়া হইলে, আমি এই ভাবে প্রার্থনা করিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম; কিন্তু, আমার অসুখ খুব বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়াতে এবং মতিভ্রম ঘটাতে অনেক দিন তাহা করিতে পারি নাই।

 পরম পিতা পরমেশ্বর সকলই জানিতেন। ইহা তাঁহারই ইচ্ছাতে হইয়াছিল; কারণ, আমার শরীর যদি ভালই থাকিত, তাহা হইলে এই সময় আমি ডাক্তার ‘বি’-র কোন সাহায্য পাইতাম না—যাহা আমার পক্ষে পরম কল্যাণকর হইয়াছে।

 পুনরায় জ্ঞানলাভ করিয়া, আমি আবার প্রার্থনা করিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম, এবং রোগীদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশার্থ আমি কিছু লিখিয়াও ছিলাম! কেহ কেহ আমাকে বলিল, তুমি ত তাহাদিগকে জান না’! আমি জানি না সত্য, কিন্তু তাহারা ত রোগে কষ্ট পাইতেছে! ইহাই তাহাদিগের প্রতি আমার ভালবাসা দেখাইবার যথেষ্ট কারণ। আমরা সকলেই (বিশেষতঃ পঙ্গুরা) ভালবাসা এবং সমবেদনার কাঙ্গাল, এবং আমার তাহা দিবারও শক্তি আছে। পক্ষান্তরে, ইহাতে আমার এই উপকারও হয় যে, অন্যের কথা ভাবিতে যাইয়া আমার নিজের দুঃখ বিপদের কথা মনে থাকে না, এবং নিজ জীবনে প্রাপ্ত করুণার স্মৃতি আমাকে অধিকতর কৃতজ্ঞ করে।

 অত্যধিক যন্ত্রণায় অনেক সময় যখন আমার চক্ষুতে নিদ্রা আসিত না, এবং কি প্রকারে আমি তাহা সহ্য করিব ভাবিয়া কুল পাইতাম না, এমতাবস্থায় আমার চিত্ত আমার শয্যায় (২৪ নম্বর শয্যা) অবস্থিত রোগিণীর নিকট ছুটিয়া যাইত। আমি আশ্চর্যান্বিত হইয়া ভাবিতাম, রোগিণীটি যুবতী কি বৃদ্ধা? তাহার কি খুব যন্ত্রণা হইতেছে? তাহার আরোগ্যলাভের কি সম্ভাবনা আছে? তিনি কি যীশুকে প্রেমাস্পদ বন্ধু ও শান্তিদাতারূপে জানেন? ইত্যাদি। এই সকল চিন্তা করিতে করিতে আমার প্রাণ তাহার জন্য প্রার্থনায় পূর্ণ হইয়া উঠিত। আমি নিজের যন্ত্রণা শান্ত ভাবে বহন করিতেছি, কিন্তু আমার নিজের বোঝা কত হাল্‌কা মনে হয়, যখন আমি অপরের দুঃখের কথা স্মরণ করি, যাহাদের অনেকেই আমার অপেক্ষাও অধিকতর কষ্ট পাইতেছে! তাহার পর, চীনে ও ভারতবর্ষে আমার বিশেষ প্রচারক বন্ধুরা আছেন, যাঁহাদের জন্য আমার প্রার্থনা করিতে এবং যাঁহাদিগকে বার বার চিঠি লিখিতে হয়। ইহা আমার একটি বিশেষ অধিকার। আমার গৃহে এক দল প্রচারক বন্ধুদের একখানা ছবি আছে; তাঁহাদের মধ্যে ছয় জন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আসিয়া আমার সঙ্গে দেখা করিয়াছিলেন। তাঁহাদের আগমনে স্বদেশ ও বিদেশের প্রচার কার্য্যের উপর আমার অনুরাগ জন্মিয়াছে। আমি তাঁহাদের অনেক চিঠি পত্র পাইয়াছি। এই সকল চিঠিপত্র শুধু আমার নয়, কিন্তু আমার অনেক বন্ধুদেরও নিকট, খুব আদরণীয়, এবং ইহাতে আমরা যে-সকল বিশেষ অধিকার ও সুবিধা লাভ করিতেছি, তাহাতে আমাদিগকে অধিকতর কৃতজ্ঞ করে। আমি ‘অখ্রীষ্টানদিগের নিকট তাঁহার মহিমা ঘোষণা করিতে পারিতেছি না’, কিন্তু যাঁহারা সেই কার্য্য করিতেছেন, অথবা অন্য ভাবে প্রভুর কার্য্য করিতেছেন, তাঁহাদের জন্য আমি প্রার্থনা করিতে পারি, এবং তাহা আমি করিব।

 ‘আমার নিকট প্রার্থনা কর, আমি তাহার উত্তর দিব’ (Jer. xxxiii 3)। ‘তোমার ক্রন্দন শুনিয়া তিনি তোমার প্রতি সুপ্রসন্ন হইবেন; তিনি তোমার প্রার্থনা শুনিবেন, এবং তাহার উত্তর দিবেন’ ((Isa xxx 19)। ইহা আমার অনেক অধিকারের মধ্যে একটি। ঈশ্বর আমার কথা শুনিবেন। যাঁহারা বাহিরের প্রচার-ক্ষেত্রের কাজে ব্যস্ত, ঠিক তাঁহাদের মতন, আমরা যাহারা গৃহে রহিয়াছি আমাদেরও অনেক করিবার আছে। অসুস্থ হইয়া হাসপাতালে বাস করিবার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত আমি ইহা বুঝিতে পারি নাই। আমার জীবন বড় অকর্ম্মণ্য বলিয়া বোধ হইত। আমি কি করিতে পারি? এই চিন্তা আমাকে বিশেষ সান্ত্বনা দিয়াছিল যে, হাসপাতালের যে-বিভাগে আমি বাস করি, সেখানে আমার আলোক বিকীর্ণ করিবার উদ্দেশ্যে, এবং আমার দুঃখ কষ্ট ধৈর্য্যের সহিত বহন ও ব্যথার পূজা দ্বারা ঈশ্বরের সেবা করিয়া, তাঁহার করুণাই যে আমাকে আনন্দিত পরিতুষ্ট এবং সুখী করিবার পক্ষে যথেষ্ট, ইহা প্রমাণ করিবার জন্য, আমার মতন লোকেরও তাঁহার প্রয়োজন আছে। এই কাজ কঠিন। কিন্তু ঈশ্বরের পক্ষে সকলই সম্ভবপর (Matt. xix 26)। তাঁহার সাহায্য ভিন্ন আমি কিছুই করিতে পারি না (John xv 5)। যখন আমি যীশুর অনুরক্ত হই, এবং তাঁহার উপর নির্ভর করি, তখন সকলই শুভজনক হয়। কিন্তু, মুহূর্ত্তকালও যদি আত্মশক্তির উপর নির্ভর করিয়া কোনও কাজ করি, তাহাতেই অকৃতকার্য্য হই। আনন্দিত, সন্তুষ্ট, সুখী হইতে এবং সকল অবস্থায় শান্তি, পরিপূর্ণ শান্তি, লাভ করিতে হইলে—

 আমাকে অবশ্যই ঈশ্বরকে সর্ব্বান্তঃকরণে ভালবাসিতে হইবে।

 আমাকে অবশ্যই তাঁহার বাণীতে বিশ্বাস করিতে হইবে।

 আমাকে অবশ্যই আমার সকল ভার তাঁহার হাতে অর্পণ করিতে হইবে।

 আমাকে অবশ্যই ভীত না হইয়া সর্ব্বকালে তাঁহাকে বিশ্বাস করিতে হইবে।

 আমাকে অবশ্যই বিশ্বাস করিতে হইবে যে, তিনি আমার সকল পাপ ক্ষমা করিয়াছেন।

 আমাকে অবশ্যই বিশ্বাস করিতে হইবে যে, তিনি আমার সকল অভাব দূর করিবেন।

 আমাকে অবশ্যই বিশ্বাস করিতে হইবে যে, তিনি আমার প্রার্থনাসকল শুনিবেন এবং পূর্ণ করিবেন।

 আমাকে অবশ্যই বিশ্বাস করিতে হইবে যে, তিনি আমাকে কোনও ভাল বস্তু হইতে বঞ্চিত করিবেন না। (Luke xii. 24, 30.)

 আমি ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিয়াছি। তিনি অতীতে তাহা শুনিয়াছেন, এবং যত দিন আমি তাঁহার নিকট প্রার্থনা করিব, তিনি তাহা শুনিবেন ও পূর্ণ করিবেন।

(Jer, xxxiii. 3; Phil. iv. 6, 11.)