তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/চতুর্থ অধ্যায়
আমার বাহুখানা কর্তিত হইবার পর, ছয় মাস যাইতে না যাইতেই, ১৮৮৭ সনের ১৭ই ডিসেম্বর, হাঁটুর নীচ পর্য্যন্ত পা খানা কাটিয়া ফেলিতে হইয়াছিল। ডাক্তার ম্যাক্ ক্লোরোফরম প্রয়োগ করিয়াছিলেন। আমার ভীষণ পরীক্ষা সমুপস্থিত। বুঝিতে পারিতেছিলাম না যে, কেন আমার প্রতি এরূপ বিধান হইল। যীশুকে আমার সকল কথা বলিলাম। দুইটি অস্ত্র-প্রয়োগই সুসম্পন্ন হইয়াছিল; ক্ষতস্থান সম্পুর্ণরূপে শুকাইয়া গেল।
চতুর্থ অধ্যায়
১৮৮৮-১৮৯১
নূতন পরিস্থিতি
হে প্রভু যীশু, তোমার প্রদত্ত এই বেদনার দান
আমি গ্রহণ করিলাম;
যে তোমাকে ভালবাসে, সে কখনও তাহা
গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিবে না।
আমি যে সর্ব্ব প্রথম আজই তোমার উপর
নির্ভর স্থাপন করিলাম, তাহা নহে;
আমার চিত্ত হইতে, তোমার প্রতি, কখনও
অবিশ্বাসের ‘না’-বাণী উত্থিত হয় নাই।
নববর্ষের প্রথম দিন আমাকে নীচের তলায় লইয়া যাওয়া হইয়াছিল; সেই স্থানটা অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা বলিয়া আমার খুব ভাল লাগিয়াছিল। ফেব্রুয়ারী মাসে আমার শ্বাসকষ্ট হইল; তাহার পর হাঁপানি, গলার কুঞ্চন এবং শোথ হইল। আমি এত দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিলাম যে, আমার আর বাঁচিবার আশা ছিল না। আমি কথা বলিতে, কিংবা মুহূর্তকালের জন্যও শয্যাশায়ী হইয়া থাকিতে পারিতাম না। নলটা আমার গলায় সবলে প্রবেশ করাইয়া, দিনে দুই তিন বার আমার গলা প্রসারিত করা হইত। বার বার আমার উপরে ফোস্কা উৎপাদনের মলম (blister) প্রয়োগ করা হইত, এবং আমি একটা নলের ভিতর দিয়া অল্প পরিমাণে পথ্য গ্রহণ করিতে পারিতাম। ঊনত্রিশ মাস কাল, দিন রাত্রি, আমাকে ঠেকনা দিয়া একটা চৌকীতে বসাইয়া রাখা হইয়াছিল। ডাঃ ‘আর্’ আমাকে একটু আরাম দিবার জন্য অত্যন্ত মনোযোগ ও সহৃদয়তার সহিত যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। অনেক মাস পরে আমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস একটু সহজ হইয়াছিল, কিন্তু তখন পর্য্যন্তও আমি শুইতে, অথবা কথা বলিতে পারিতাম না; তবে, বাম হাতে লিখিতে পারিতাম। আমার রোগ-প্রতিকারের জন্য যে-সকল উপায় অবলম্বিত হইতেছিল, তাহার উপর ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ ছিল, আমার প্রতি তাঁহার স্নেহ মমতা ছিল, এবং তিনি আমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া চলিয়াছিলেন। তিনি আমাকে সাহায্য করিবার ও আরাম দিবার জন্য অনুক্ষণ আমার সঙ্গে থাকিতেন, এবং আমাকে স্থির ও শান্ত রাখিতেন।
এই সময় আমার বন্ধু মিঃ এইচ্, মিস্ লিজী ফ্র্যাঙ্ক্স্কে আমার কথা বলিয়াছিলেন, এবং তাঁহাকে আমার নিকট চিঠি লিখিতে অনুরোধ করিয়াছিলেন। (আমি যত দিন রোগে কষ্ট পাইতেছিলাম, ততদিন তিনি ও তাঁহার ভগ্নী আমার প্রকৃত বিশ্বস্ত ও নিত্যবন্ধু ছিলেন, এবং তাঁহাদের অনুরাগপূর্ণ কার্য্যকরী সহানুভূতি দ্বারা আমাকে সাহায্যদানে আনন্দিত করিয়াছিলেন।) আমি কুমারী ফ্র্যাঙ্ক্স্এর অনেক চিঠি পাইয়াছিলাম। এই সময় (১৮৮৮) সেই সকল আমার সুখ ও স্বস্তির কারণ হইয়াছিল। বড় দিনের ছুটীতে যাইবার অব্যবহিত পূর্ব্বে, ডিসেম্বর মাসে, তিনি আমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়া ছিলেন। আমাকে তখনও বসিয়াই থাকিতে হইত, কিন্তু সময় সময় ফিস্ ফিস্ করিয়া কথা বলিতে পারিতাম। তাঁহার আসাতে আমি খুসী হইয়াছিলাম। বিদায় নিবার সময় তিনি বলিয়া গেলেন, “বালারত হইতে ফিরিয়া আসিয়া আমি অনেক সময় তোমাকে দেখিতে আসিব”। কিন্তু তাহা আর হইল না। এই তাঁহার প্রথম আসা, এবং আমি কেবল সেদিনই তাঁহাকে দেখিয়াছিলাম। তাঁহার এই সাক্ষাৎকারের কথা স্মরণ করিয়া আমি বার বার ঈশ্বর-চরণে কৃতজ্ঞতা জানাইয়াছি। বাস্তবিক, যাহাতে তিনি বহু লোকের আনন্দের কারণ হইতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই যেন ঈশ্বর দুঃখের ভিতর দিয়া তাঁহার সেবা করিবার জন্য তাঁহাকে মনোনীত করিয়াছিলেন। তিনি বহু বৎসর নিয়মিতভাবে আমাকে চিঠি লিখিয়াছিলেন। আমি কত আনন্দের সহিত তাঁহার প্রেমপূর্ণ চিঠির প্রতীক্ষা করিয়া থাকিতাম! এবং যে-সকল বন্ধুদিগকে আমি তাঁহার চিঠি দেখাইতাম, তাঁহারা জিজ্ঞাসা করিতেন, “তুমি কি এই সপ্তাহে কুমারী ফ্র্যাঙ্ক্সের চিঠি পাইয়াছ”? তাঁহার হইয়া বিতরণ করিবার উদ্দেশ্যে, তিনি পঙ্গুদের (invalids) জন্য লিখিত তাঁহার ছাপান চিঠিও আমাকে পাঠাইতেন।
তাঁহার চির ‘বাসগৃহে’ গমন করিয়া নিত্য কালের জন্য প্রভুর সহিত মিলিত হইবার পূর্ব্বে, অক্টোবর মাসে, আমি তাঁহার প্রেমপূর্ণ শেষ চিঠি পাইয়াছিলাম। তিনি একখানা ছোট কার্ড পাঠাইয়াছিলেন; তাহাতে ‘তাঁহার পন্থাই নিখুঁত’ এই উপদেশ-বাক্যটি লিখা ছিল। আমি উহা এখন শয্যার পাদদেশে ঝুলাইয়া রাখিয়াছি। আমাদের উভয়ের নিকট ইহা যীশু-প্রেরিত উপদেশ বলিয়াই প্রমাণিত হইয়াছে। আমি মাঝে মাঝে তাঁহাকে চিঠি লিখিতাম; কিন্তু সর্ব্বদাই ইহা অনুভব করিতাম যে, তিনি আধ্যাত্মিক জীবনে আমার অপেক্ষা অনেক উন্নত। ঈশ্বরের মনোনীত ও প্রিয় বলিয়া ঈশ্বর তাঁহাকে পরীক্ষা করিয়াছেন, এবং তিনিও পরীক্ষার অনলে বিশুদ্ধ হইয়া স্বর্ণের মতন উজ্জ্বল হইয়াছিলেন।
১৮৮৯ সনের ৭ই ফেব্রুয়ারী হঠাৎ আমার বাম হাতে সেই ব্যাধির সূত্রপাত হইয়া, তাহা খুব শীঘ্রই বিস্তৃত হইয়া পড়িল, এবং ভয়ানক যন্ত্রণ। হইল। পচন আরম্ভ হওয়াতে, ব্যারাম প্রকাশের ৭ দিন পরেই, অর্থাৎ ১৪ই ফেব্রুয়ারী, বাধ্য হইয়া আমার হাতখানা কাটাইয়া ফেলিতে হইল। ডাঃ ম্যাক্ অনেক মাস পর্যন্ত প্রতিদিনই আমাকে দেখিতে আসিতেন। আমার মতন পঙ্গুর—যাহার হাত নাই, শুধু একখানা পা আছে—পক্ষে ডাঃ ম্যাক্-এর আগমন কত আনন্দের কারণ ছিল! আমার মনে হইত, যেন অবসন্ন হইয়া পড়িব, এবং সময় সময় যন্ত্রণা সম্পূর্ণ অসহনীয় বোধ হইত। আমি একাকী তাহা বহন করিতে পারিতাম না, কিন্তু আমি কখনও একাকী নহি। চিরন্তন পরমেশ্বর আমার আশ্রয়; তাঁহার নিত্য হস্ত আমাকে ধারণ করিয়া রাখিয়াছে Deut. xxxiii 27। সকালে, দুপুরে, সন্ধ্যায় সকল সময় তিনি আমার অবলম্বন।
জুন মাসে, একদিন আমি আমার বাইব্ল্ হইতে কিছু পাঠ করিবার চেষ্টা করিতেছিলাম, এমন সময় মিঃ এইচ্ আসিয়া উপস্থিত হইলেন, এবং বলিলেন, আমার চোখের পক্ষে এই বইখানার অক্ষরগুলি অত্যন্ত ছোট। সন্ধ্যার সময় আমার নামে একটা পার্শেল আসিল। তাহা খুলিয়া যখন দেখিলাম, তাহার মধ্যে একখানা বড় অক্ষরে ছাপান শিক্ষকদের বাইব্ল্ আছে, তখন আমি আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া গেলাম। অক্ষরগুলি বড় হওয়াতে আমি অনায়াসে বইখানা পড়িতে পারিতাম, এবং আনন্দে কাঁদিয়া ফেলিলাম। এই অমূল্য গ্রন্থখানা পাইয়া আমি যখন দেখিলাম, তাহাতে লিখা রহিয়াছে, “কুমারী এইচ্কে তাহার প্রাচীন বন্ধু ও সহকর্মী ডব্লিউ এইচ্ হইতে”, তখন আমার অপার আনন্দ হইল। আমার পরিত্রাতার চরণে এই মনে করিয়া অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হইলাম যে, তিনি আত্মীয় বন্ধুগণের মধ্য দিয়া তাঁহার কত প্রসাদ আমাকে প্রদান করিয়াছেন!
১৮৮৯ সনের নভেম্বর মাসে বাম বাহুর গোড়ার দিকে একটি, এবং পরে আরও অনেকগুলি, ফোঁড়া হইয়াছিল। কয়েকটা অস্ত্র করিতে ও একখণ্ড হাড় বাহির করিয়া ফেলিতে হইয়াছিল। আবার পচন আরম্ভ হওয়াতে, কনুইর ওপরের দিকটা কাটিয়া ফেলিতে হইয়াছিল। অস্ত্রপ্রয়োগটা বেশ ভাল ভাবেই হইল, এবং শীঘ্রই ঘা সারিয়া গেল। এই সময় ডাক্তার ম্যাক্ আমার নিকট ছিলেন। ইহা আমার নিকট একটা কঠিন পরীক্ষা হইয়াছিল। আমি বুঝিতে পারিতেছিলাম না, কেন আমার মতন অকর্ম্মণ্য লোক এখানে পড়িয়া থাকে, আর যাহারা এখানে কত কল্যাণ-কর্ম্ম সম্পন্ন করিতেছে, তাহারা চলিয়া যায়! সাধারণ লোকেরা বলে, ‘যে-ঈশ্বর তোমার প্রতি এমন নিষ্ঠুর ব্যবহার করেন, তাঁহাকে তুমি কেমন করিয়া ভালবাস?’ কেহ কেহ বলে, ‘ঈশ্বর সত্যই তোমাকে খুব ভালবাসেন। কারণ, যাহাকে তিনি ভালবাসেন, তাহাকে দুঃখ দিয়াই শুদ্ধ করেন। ইহা ক্রোধের ব্যবস্থা নহে, পরন্তু প্রেমেরই।
১৮৮৯ সনে আরও দুই বার আমার উপর অস্ত্র প্রয়োগ করা হইয়াছিল। সত্যই, যেন দুঃখের অগ্নি-কটাহে ফেলিয়া আমাকে পরীক্ষা করা হইতেছিল। কিন্তু তিনি (ঈশ্বর) অনবরত আমাকে বলিতেছিলেন, তুমি ভীত হইও না... আমি তোমার ঈশ্বর: আমি তোমাকে সবল করিব: সত্যই আমি তোমাকে সাহায্য করিব: সত্যই আমি তোমাকে তুলিয়া ধরিব।’ (Isa, XLI. 10)। তিনি তাঁহার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়াছেন। ঈশ্বর মিথ্যা কথা বলিতে পারেন না। আমি যীশুর নিকট প্রার্থনা করিব, তিনি আমাকে সাহায্য করিবেন, এবং আনন্দিত করিবেন; কারণ, তিনি আমাকে খুব ভালবাসেন।
১৮৯০ সনে আমি অনেকটা ভাল বোধ করাতে লিখিতে চেষ্টা করিবার জন্য আকুল হইয়া পড়িলাম। আমি একজন কারিগরকে জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইয়াছিলাম, তিনি আমার জন্য একটি কলম তৈয়ার করিতে পারিবেন কি না। তিনি আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, তাহা করা অসম্ভব হইবে; কোন প্রকারে তৈয়ার করিতে পারিলেও তাহা আমি ব্যবহার করিতে পারিব না। ইহাতে আমি নিরাশ হইয়া পড়িলেও, একেবারে আশাহত হইলাম না। আমার মনে হইল, নিশ্চয়ই এরূপ করা সম্ভবপর হইবে, এবং একটা পথ বাহির করিবার জন্য যীশুর নিকট প্রার্থনা করিলাম।
মে মাসে খুব নির্ম্মল ও পরিষ্কার এক দিনে ডাক্তার ‘আর’ আমাকে একখানা বগি গাড়ীতে আস্তে আস্তে বেড়াইয়া আনিতে অনুমতি দিয়াছিলেন। আমার বন্ধু মিঃ ‘সি’ আমাকে লইতে আসিবার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত, আমি ইহার কিছুই জানিতাম না। রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী আমার প্রিয় বন্ধু মিসেস ডব্লিউ-র নিকট আমাকে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। বহু বৎসর তিনি পঙ্গু হইয়া শয্যাশায়িনী ছিলেন। এই মিলন আমাদের উভয়ের পক্ষেই খুব আনন্দজনক হইয়াছিল। কিন্তু, ইহার পর আর আমাদের মিলন হয় নাই; কারণ, ইহার পর বৎসরই ঈশ্বর তাঁহাকে বিশ্রাম দিবার জন্য তাঁহার ক্রোড়ে ডাকিয়া লইয়াছিলেন। আমি সর্ব্বদা প্রার্থনা করিতাম, যেন আর একবার আমি তাঁহাকে দেখিতে পারি। ঈশ্বর তাহা পূর্ণ করিয়াছিলেন। আমি যখন প্রত্যেকটি মূল্যবান প্রতিশ্রুতির কথা বলি, তখন তিনি তাহা শোনেন, এবং আমার প্রার্থনার উত্তর দেন।
আমার অবস্থা পূর্ব্বাপেক্ষা খারাপ হইল। তাহার কিছু দিন পরেই আবার একটু ভাল হইল; কিন্তু তখনও আমি শুইতে পারিতাম না। লিখিবার জন্য আমার প্রাণে খুব একটা আগ্রহ হওয়াতে, কি প্রকারে আমার উপযুক্ত একটি কলম আমি লাভ করিতে পারি, সেই জন্য আমি এই দীর্ঘকাল প্রার্থনা করিতেছিলাম।
একদিন হঠাৎ আমার মনে হইল, যদি আমি একটি কম্পাস, ও কোটরবিশিষ্ট অংশে ঠিক ভাবে লাগে এমন একটা স্ক্রু পাই, এবং তাহার সন্ধিস্থলটা ব্যবহার করিতে পারি, তাহা হইলে ভাল হয়। দ্বিতীয় সমস্যা হইল, ভাল সন্ধিস্থলবিশিষ্ট একটা কম্পাস সংগ্রহ করা; এবং তাহার পর, আমি যে-প্রকার বিশেষ বক্রতার সহিত তাহা সংবদ্ধ করিতে চাই, সেইরূপ কে করিয়া দিবে?
আমি পুনরায় কারিগরকে ডাকাইয়া পাঠাইলাম; কিন্তু সে আমার ইচ্ছামতন কম্পাসটা ঠিক করিয়া দিতে রাজী হইল না; বলিল, ইহাদ্বারা উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে না, এবং এইরূপ চেষ্টা করাও নির্ব্বোধের কাজ। আমি বলিলাম, ‘যদি আমি ইহা সংলগ্ন করাইয়া লইতে পারি, তাহা হইলে আমি তোমাকে চিঠি লিখিব।’ আমি জানিতাম, ইহাদ্বারা উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে। কারণ, যীশু কি আমাকে বলেন নাই যে, ইহার জন্য কি প্রয়োজন? এই জন্য যাহা কিছু আবশ্যক, সমস্তই তিনি পাঠাইতেছিলেন; কিন্তু আমি তখনও তাহা জানিতে পারি নাই।
পরদিন একজন ভদ্রলোক আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন; তাঁহাকে আমি বহু বৎসর দেখি নাই। তিনি পূর্ব্বদিন মাত্র এক কাগজ কলম বিক্রেতার দোকান হইতে আমার ঠিকানা জানিতে পারিয়াছিলেন। আমি তাঁহাকে দেখিয়া অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়াছিলাম, এবং তাঁহাকে বলিয়াছিলাম, “ঠিক আপনাকেই আমার প্রয়োজন। আপনি কি আমাকে উত্তম সন্ধিস্থলযুক্ত একটি কম্পাস যোগাড় করিয়া দিতে পারিবেন?” তিনি আমার এইরূপ অভিবাদনে ও প্রশ্নে যে বিস্মিত হইলেন, তাহাতে আশ্চর্য্যান্বিত হইবার কোন কারণ নাই। যাহা হউক, আমি কি চাই তাহা তাঁহাকে বুঝাইয়া বলাতে তিনি বলিলেন, আমার যাহা প্রয়োজন সকলই তিনি দিবেন; এবং একজন বীক্ষণযন্ত্র-নির্মাতাকে (optician) আমার লিখিবার উপযোগী করিয়া কম্পাসটি দৃঢ়সংলগ্ন করিয়া দিতে অনুরোধ করিয়াছিলেন। তিনি তখন খুব ব্যস্ত থাকায় নিজে তাহা করিতে না পারিয়া, তাঁহার একজন বন্ধুদ্বারা তাহা করাইয়া দিলেন। যদিও এই কলমটির ব্যবহারে একটু ধৈর্য্য ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন হইত, তথাপি ইহাতে আমার কাজের বিশেষ সুবিধা হইল। আমার এই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়াতে, ভগবানের এবং আমার সকল সাহায্যকারীদের নিকট আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হইয়াছিলাম। আমার প্রার্থনা পূর্ণ হইয়াছিল। (Jer. xxxiii. 3.)।
ইহা বড় আশ্চর্য্যের বিষয় যে, আমি এই কলমটির সাহায্যে কত লিখিতে সমর্থ হইয়াছিলাম!