তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/তৃতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
১৮৮৩ — ১৮৮৮
দক্ষিণ হস্তের অপসারণ
প্রভু যীশু, আমি তোমার নিজ হাত হইতে
এই বেদনার দান গ্রহণ করি;
ইহাকে সাহসের সহিত বহন করিবার শক্তি
তুমিই প্রদান করিবে।
দুর্ব্বল আমি সর্ব্ব প্রকার চেষ্টায় অক্ষম, অতএব
বিমল আনুগত্যে আমাকে তোমার বক্ষে
শান্ত হইয়া বিশ্রাম করিতে দাও।
এফ্ আর্ হ্যাভারগেল
আমার যে প্রিয় ডাক্তার বন্ধু (ডাক্তার ম্যাক্) ১৮৭৬ সন হইতে আমাকে চিকিৎসা করিয়া আসিতেছিলেন, তাঁহাকে শারীরিক অসুস্থতার জন্য বাধ্য হইয়া কর্ম্ম পরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল। তিনি স্কটলণ্ডে চলিয়া গেলেন। আমাদের বিদায়-গ্রহণটা খুব গাম্ভীর্য্যপূর্ণ হইল। আমরা উভয়েই খুব অসুস্থ, আমাদের এই পৃথিবীতে আর দেখা না-ও হইতে পারে; কিন্তু আমরা জানিতাম, আমাদের ‘স্বদেশে’, পিতার গৃহে, আবার মিলন হইবে। তিনি অপর একজন চিকিৎসকের উপর তাঁহার রোগীদের ভার দিলেন। তিনি আমাকে দেখিয়া বলিলেন, আমার যখন আরোগ্যলাভের আশা নাই, তখন আমার ভার তাঁহার না নেওয়াই ভাল। ইহাতে প্রমাণিত হইয়াছিল যে, ‘ঈশ্বরের পথই সর্ব্বোৎকৃষ্ট’। তিনি আমাকে দুঃখ যাতনার অগ্নি-পরীক্ষার ভিতর দিয়া এক অজানা পথে লইয়া চলিয়াছিলেন। এই সময় পথটা আমার পক্ষে মসৃণ ছিল না; পরন্তু, বন্ধুর ও ঝটিকাসঙ্কুলই ছিল।
তিনি আমাকে ডাক্তার ‘জি’র নিকট যাইতে বলিলেন। তিনি কিছুকাল আমার চিকিৎসার পর বলিলেন, আমার আর বেশী দিন বাঁচিবার সম্ভাবনা নাই। ‘ভগবৎ কৃপাই আমার পক্ষে যথেষ্ট ছিল’। তাহার পর আমি ডাক্তার ‘ডি’র নিকট গিয়াছিলাম। তিনি আমার দক্ষিণ হস্ত ও বাহুর চামড়া তুলিয়া ফেলিলেন। ইহাতে আমার ভীষণ যন্ত্রণা হইল, কিন্তু তিনি বলিলেন, কয়েক দিন পরেই ইহা সম্পূর্ণরূপে সারিয়া যাইবে, এবং বেদনা লাঘব করিবার জন্য তিনি একটা আরক দিবেন; কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমার হাতের অবস্থা আরও খারাপ হইল। সমস্ত হাতে ঘা হইল, এবং দুইদিনের মধ্যে তাহা আমার সমস্ত স্কন্ধে বিস্তৃত হইয়া পড়িল। তখন তিনি বলিলেন, হাতখানা কাটিয়া ফেলিতে হইবে, তাহা না হইলে আমি এক সপ্তাহও বাঁচিব না। যীশু আমার অসহ্য দুঃখের কথা জানিতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্ট। আমার হিক্কা চলিতে লাগিল। তাহাতে আমি এত দুর্ব্বল হইয়া পড়িলাম যে, আমাকে একখানা দোদুল্যমান চৌকীতে দিনরাত বসিয়া থাকিতে হইত, বিছানায় শুইতে পারিতাম না।
ইহার পূর্ব্বে আমি যীশুকে কখনও এত কাছে পাই নাই। মনে হইত, আমি তাঁহার উপর ভর দিয়া অবস্থিতি করিতেছি, আর তিনি আমার মাথাটি কোলে রাখিয়াছেন। তাহা না হইলে, আমি এই যন্ত্রণা সহ্য করিতে পারিতাম না। ইহা পঙ্গুর কল্পনা নহে!
আমি আরও ৬ জন চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করিয়াছিলাম। ডাক্তার ‘এস্’ তিনজনকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছিলেন। তিনি তখন পর্যটক বক্তারূপে মেল্বোর্ণে উপস্থিত ছিলেন। একজন বলিলেন, আমি দুই সপ্তাহ বাঁচিতে পারি; অন্যেরা বলিলেন, যদি আমার বাহুখানা তখনই কাটিয়া না ফেলা হয়, তবে ৭৮ দিন মাত্র বাঁচিব। আমি এইরূপ চিন্তা প্রাণে পোষণ করিতে না পারিয়া বলিলাম, আমার বরং মরাই ভাল। (ইহা ১৮৮৬ সালের আগষ্ট মাসের কথা)। তাহার পর একটা গাড়ীতে করিয়। আমাকে ডাক্তার ‘আর’এর নিকট লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। তিনি বহু বৎসর আমার অকৃত্রিম বন্ধু প্রতিপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি আমাকে আরোগ্যলাভের অতি সামান্য আশাই দিলেন, এবং বলিলেন, হাতখানা বাঁচাইবার কোনই আশা নাই, তবে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া দেখিবেন। এই ব্যারামটা বড় জটিল—ইহাতে সমূহ ধৈর্য্যের প্রয়োজন, সময় অনেক লাগিবে। এবং কোন প্রকার বাহ্য ঔষধ প্রয়োগে বিশেষ লাভ হইবে না। আমি তাঁহাকে আমার অবস্থার কথা বলাতে, তিনি অনেক টাকা নিবেন না, ইহাই আমাকে বলিলেন।
যাহাতে সকল সময় আমাকে দেখিবার সুবিধা হয়, সেই জন্য কয়েক মাস তাঁহার চিকিৎসাধীন হইয়া থাকার পর, তিনি আমাকে তাঁহার বাড়ীতে থাকিতে অনুরোধ করিলেন। ১৮৮৪ সনে ক্রমে আমার অবস্থার একটু উন্নতি হইল, এবং বাহুর ক্ষতটাও সারিয়া গেল। আমার স্বপক্ষে যে সমস্ত অসংখ্য প্রার্থনা করা হইয়াছিল, তদুত্তরে আমার জন্য অবলম্বিত উপায়সমূহের উপর ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ বর্ষিত হইয়াছিল। ক্রমাগত পাঁচ বৎসর কাল যে বস্ত্রবন্ধনী আমি ব্যবহার করিতেছিলাম, ১৮৮৫ সনে তাহা ছাড়িয়া দিয়া বাহুখানা একটু ব্যবহার করিতে সমর্থ হইয়াছিলাম। ডাক্তার ‘আর’ অত্যন্ত ধৈর্য্যের সহিত আমার প্রতি খুব সদয় ব্যবহার করিতেছিলেন। আমার প্রেমময় ত্রাণকর্তা কেমন যত্নে ও প্রেমে আমাকে পরিচালিত করিয়াছেন ভাবিয়া, আমি তাঁহার চরণে কৃতজ্ঞ ছিলাম।
১৮৮৬ সনে আমার আবার সঙ্কটাপন্ন পীড়া হইয়াছিল— জীবনের আশা ছিল না। এই কথা শুনিয়া আমি আনন্দিত হইয়াছিলাম। ভীষণ যন্ত্রণার হস্ত হইতে মুক্ত হইয়া আমি আমার স্বগৃহে চলিয়া যাইব মনে করিয়া আমার খুব আনন্দ হইয়াছিল। আমি ইহাকে মৃত্যু বলিয়া ভাবি নাই। ২৩শে ফেব্রুয়ারী প্রাতে, ডাক্তার আমার কামরায় আসিলেন, এবং বিদায়-সম্ভাষণ জানাইয়া বলিলেন, তিনি দুপ্রহরে ফিরিয়া আমাকে দেখিতে পাইবেন বলিয়া আশা করেন না। আমি তাঁহাকে কিছু বলিতে পারিলাম না; শুধু একটু হাসিয়াছিলাম। তিনি অত্যন্ত বিষণ্ণবদনে আমাকে বলিলেন, ‘সত্যই কি তুমি আনন্দিত হইয়াছ’? বাস্তবিকই আমি বড় আনন্দিত হইয়াছিলাম। ডাক্তার কি একটা জিনিস লইতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন বলিয়া, ঘণ্টাখানেক পরেই ফিরিয়া আসিলেন। তিনি উপরে আমাকে দেখিতে গেলেন; তখন তাঁহাকে বলা হইল যে, আমার আসন্নকাল সমুপস্থিত। (আমার সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল, এবং তাহারা কি বলিতেছিল, তাহা শুনিতেছিলাম।) তাহারা যখন আমার দিকে তাকাইতেছিল, তখন ডাক্তার বলিলেন, ‘আমি একবার tubeটা (নল) ব্যবহার করিয়া দেখিব। ইহাতে হয়ত তাহাকে বাঁচান যাইতে পারিবে’। অবস্থা অত্যস্ত খারাপ হইলেও, তাহা করা হইল। পরদিন সকালে আমি একটু ভাল বোধ করিলাম; কিন্তু তখনও বিপদ কাটিয়া যায় নাই বার বার নল ব্যবহার করাতে ক্রমে আমার অবস্থা একটু ভাল হইল।
মৃত্যুর এত কাছে গিয়াও দুঃখক্লেশ ভোগের জন্য আবার আমাকে ফিরিয়া আসিতে হইল বলিয়া, আমি অত্যন্ত নিরাশ হইয়া পড়িলাম। ইহা আমার পক্ষে বড় ক্লেশকর বোধ হইয়াছিল। কিন্তু যীশুই ডাক্তারকে নলের কথা মনে করাইয়া দিয়াছিলেন, ইহাতে আমার একটুও সন্দেহ নাই। আমার পৃথিবী হইতে চলিয়া যাইবার সময় আসে নাই। দুঃখক্লেশের দ্বারা প্রভুর সেবা করিবার জন্য আমাকে তাঁহার প্রয়োজন আছে। আমি শুইয়া শুইয়া এই কয়টি ছত্রের কথা চিন্তা করিব এবং ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিব, যেন তাঁহার ডাকের জন্য প্রসন্নচিত্তে প্রতীক্ষা করিয়া অবস্থিতি করিতে পারি। এই কবিতাটি আমার সান্ত্বনার কারণ হইয়াছিল:
“হে প্রভু, যখন তোমার ইচ্ছা ঠিক তখনই ডাকিয়া লইও।
জীবনের মধ্যাহ্নে, কি সন্ধ্যায়,
অথবা, দিবসে কি রাত্রিতে, যখন তোমার ইচ্ছা হয়,
ঠিক তখনই তাহা আমার পক্ষে কল্যাণকর হইবে।
হে স্বামি, যখন তোমার ইচ্ছা হয়, ঠিক তখনই তুমি বলিও,
‘হে আমার প্রিয়, তুমি উত্থান কর, এবং আমার নিকট এস’;
যখন তোমার ইচ্ছা হয়, ঠিক তখনই তোমার স্বর্ণদ্বার খুলিও,
তাহা শীঘ্রই হউক, কি বিলম্বেই হউক।”
তাহারা নল ব্যবহার করিতেছিল, এবং আমার শরীরে ফোস্কা উৎপাদক মলমের প্রলেপ দিতেছিল। তিন সপ্তাহকাল আমি পানাহার করিতে পারি নাই; এমন কি, ঔষধ পর্যন্ত সেবন করিতে পারি নাই,—অনাহারে মৃতপ্রায় হইয়া পড়িয়াছিলাম। চিকিৎসকেরা আসিয়া দেখিয়া যাইতেন। কিন্তু তাঁহারা বুঝিতে পারিতেছিলেন না যে, এই অবস্থায় আমি কেমন করিয়া বাঁচিয়া রহিয়াছি। তাঁহারা সকলেই ভাবিলেন, ইহা একটি অলৌকিক ঘটনা; যেহেতু, কোন মানবীয় শক্তি আমাকে জীবিত রাখিতেছে না, পরন্তু ‘ঈশ্বরের শক্তিতেই জীবন রক্ষিত হইতেছে’। তিনিই আমার মহান্ চিকিৎসক—দয়াল যীশু। আমি এতটা সারিয়া উঠিলাম যে, আমি আবার বেড়াইতে সমর্থ হইয়াছিলাম, এবং সময় সময় বাহিরে যাইতাম।
পথে চলিতে চলিতে কেহ আমাকে থামাইয়া বলিত, ‘আমি শুনিয়াছিলাম যে তোমার মৃত্যু হইয়াছে’: কেহ বা বলিত, ‘আমার বিশ্বাস হয় না যে, তুমিই এই”।
১৮৮৭ সনে আমার অবস্থা খুব খারাপ হইয়াছিল। বাহুর ক্ষতস্থান পচিতে আরম্ভ করিল, এবং আমাকে বাধ্য হইয়। জুলাই মাসে কনুইর নীচ পর্যন্ত হাতখানা ডাক্তার ‘আর’ দ্বারা কাটাইয়া ফেলিতে হইয়াছিল। ডাক্তার ‘জে’ তখন ক্লোরোফরম প্রয়োগ করিয়াছিলেন। ডাক্তার ম্যাক্ ফিরিয়াছেন; কিন্তু তখনও তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন, এবং পারিলেই আমাকে দেখিয়া যাইতেন।
আমার বাহুখানা হারাইতে আমি সম্পূর্ণ ইচ্ছুক, এমন কি কৃতজ্ঞ ছিলাম, এবং বলিতে পারিতেছিলাম, ‘পিতা, এইরূপই হউক’।
আমার বাহুখানা কাটিয়া ফেলিবার ঠিক ছয় সপ্তাহ পরে, আগষ্ট মাসে, আমার বাম পায়েও এই ব্যারাম দেখা দিল। ইহাতে আমার মনে ভীষণ আঘাত লাগিল; কারণ, আমার মনে হইল যে, পা খানাও হারাইতে হইবে; যেহেতু, এই ব্যাধির বিস্তৃতি খুব দ্রুত চলিতেছিল। আমি প্রার্থনা করিলাম, যেন ধৈর্য্যের সহিত স্থির হইয়া এই নিদারুণ যন্ত্রণা সহ্য করিতে পারি; এমন কি, একটু আর্ত্তনাদও না করি। ঈশ্বর আমার প্রার্থনা সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ করিয়াছিলেন। আমি শয্যাশায়ী হইয়া কয়েক মাস এমন একটা কামরায় আবদ্ধ ছিলাম, যেখানে চিত্তবিনোদনের কোন ব্যবস্থা ছিল না। আমি শুধু একটা ইটের উচ্চ দেয়াল দেখিতে পাইতাম। সমস্ত পর্দ্দাটা তুলিয়া দিলে, সামান্য একটু আকাশও দেখিতে পাইতাম। অত্যধিক গরম বলিয়া, জানালায় একটা ভিজা কম্বল ও ঝুলাইয়া রাখা হইত। এমন পরিপূর্ণ ভাবে আমার প্রার্থনা পূর্ণ হইয়াছিল যে, জাগ্রত অবস্থায় কখনও আমি আর্ত্তনাদ করিতাম না। প্রাণ সন্তোষে ভরপূর ছিল; এমন কি, আবশ্যক হইলে পা খানা হারাইতেও আমি ইচ্ছুক ছিলাম। এরূপ অবস্থা আমার পক্ষে বিস্ময়কর। ঈশ্বর নিশ্চয়ই দয়াল।
আমার বাহুখানা কর্তিত হইবার পর, ছয় মাস যাইতে না যাইতেই, ১৮৮৭ সনের ১৭ই ডিসেম্বর, হাঁটুর নীচ পর্য্যন্ত পা খানা কাটিয়া ফেলিতে হইয়াছিল। ডাক্তার ম্যাক্ ক্লোরোফরম প্রয়োগ করিয়াছিলেন। আমার ভীষণ পরীক্ষা সমুপস্থিত। বুঝিতে পারিতেছিলাম না যে, কেন আমার প্রতি এরূপ বিধান হইল। যীশুকে আমার সকল কথা বলিলাম। দুইটি অস্ত্র-প্রয়োগই সুসম্পন্ন হইয়াছিল; ক্ষতস্থান সম্পুর্ণরূপে শুকাইয়া গেল।