তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/দ্বিতীয় অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
১৮৭৬ — ১৮৮৩
বিশ্বাসী জীবনের সূত্রপাত ও কর্ম্ম
‘যে কাজ তোমার হাতে আসে, তাহা যথাশক্তি সম্পন্ন কর।’
ইহার পর চিকিৎসক যখন আমাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন, তখন তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস হয় যে মোটের উপর আপনি একটু ভাল হইবেন।’ কিসে আমার এই পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছে, তাহা আমি তাঁহাকে বলিলাম। তাহা শুনিয়া তিনি বলিলেন, “ইহাতে আমি সুখী হইলাম’। সেই সময় হইতে আমরা প্রকৃত বন্ধু হইলাম, এবং পরস্পরের জন্য প্রার্থনা করিতে মনস্থ করিলাম। তাহার পর আমি চলিয়া বেড়াইতে অক্ষম হইয়া পড়িলাম, এবং আমার হাতের অবস্থা আরও খারাপ হইল। ভীষণ যন্ত্রণায় যাহাতে আমাকে চীৎকার করিতে না হয়, সেই জন্য আমি অনেক সময় ঘরের দ্বার রুদ্ধ করিয়া গান করিতাম, এবং বার বার মূর্চ্ছিত হইয়া পড়িতাম।
আমি ধর্ম্মের পথে চলিতে মনস্থ করিয়াছি শুনিয়া, আমার শিক্ষয়িত্রী আনন্দিত হইলেন, এবং অল্প দিনের মধ্যেই যখন জানিতে পারিলেন যে, তাঁহার ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্রীই সেই পথের পথিক হইয়াছেন, তখন তাঁহার আরও আনন্দ হইল! আহা, আমরা একত্রে কি সুখেই দিন কাটাইয়াছি!
আবার আমার হাত একটু ভাল হইল, এবং আমি অল্প অল্প লিখিতেও পারিলাম। সেজন্য ১৮৭৬ সনের নভেম্বর মাসে আমি এস্ এস্ ইউনিয়নের লুকের সুসমাচার বিষয়ক পরীক্ষা দিলাম, এবং তাহাতে উত্তীর্ণ হইয়া আমার শিক্ষকের নিকট হইতে একটি প্রশংসাপত্র ও একখণ্ড বাইব্ল্ (a paragraph Bible) গ্রন্থ প্রাপ্ত হইলাম।
আমার জীবনে যাহাই ঘটুক না কেন, আমি যীশুর নিকট যাইতেছি, যেখানে কোন দুঃখ কি অবসাদ থাকিতে পারে না, এই বিশ্বাসে দুঃখের ভিতরেও আমার চিত্ত পরমানন্দে পূর্ণ ছিল, এবং আমি সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়া গিয়াছিলাম যে, আমার জীবনে বেদনা ও দুঃখের বোঝা ভিন্ন অপর কোন বোঝা আসিতে পারে, অথবা আসিবে, এবং আমাকে বহু সংগ্রাম করিতে হইবে।
১৮৭৭ সনে এক দিন অপরাহ্ণে, আমাদের রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের পর, আমাদের অত্যন্ত প্রিয়া শিক্ষয়িত্রী তাঁহার ক্লাসের সকল বালিকাদিগকে বলিলেন, শীঘ্রই তাঁহার বিবাহ হইবে, এবং আগামী রবিবারের পর তিনি আর স্কুলে আসিতে পারিবেন না। আমার নিকট ইহা একটি অভাবনীয় ঘটনা বলিয়া মনে হইল, এবং ইহাতে আমার প্রাণে দারুণ আঘাত লাগিল। যিনি আমার দেবীকে এত শীঘ্র পত্নীত্বে বরণ করিবেন, তাঁহার বিরুদ্ধে আমার মনটা তিক্ত হইয়া উঠিল। (ইহা হইতেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি এখনও আমার কত প্রিয়, এবং আমি তাহা হইতে বিযুক্ত হইতে অনিচ্ছুক)। তাঁহা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া আমি কি করিব? বিষণ্ণ চিত্তে, ক্লান্ত দেহে, দৃশ্যতঃ সমস্ত আলোক হইতে যেন বঞ্চিত ও হাতের বেদনায় ক্লিষ্ট হইয়া, ধীরে ধীরে আমি যখন বাড়ী ফিরিতেছিলাম, তখন অপর একজন শিক্ষয়িত্রী পশ্চাৎ হইতে আসিয়া অগ্রসর হইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার কি হইয়াছে? আমি তাঁহাকে সকল কথা বলিলাম। তিনি সস্নেহে আমার সঙ্গে আলাপ করিতে করিতে বলিলেন, “আমি আশা করি, এই পরীক্ষা তোমার আশীর্ব্বাদরূপে পরিণত হইবে, তুমি এই জন্য প্রার্থনা কর’। আমি বুঝিতে পারিলাম না এমন পরীক্ষা কিরূপে আশীর্ব্বাদে পরিণত হইবে, কিন্তু আমি যীশুকে আমার প্রার্থনা জানাইলাম, তিনি আমাকে সাহায্য করিলেন, এবং দেবীর বিচ্ছেদের জন্য আমাকে প্রস্তুত করিলেন। আমি তাঁহাকে পূর্ব্বের মতনই ভালবাসিতে লাগিলাম, কিন্তু তাহার প্রকৃতি একটু পরিবর্ত্তিত হইল। পরের রবিবার আমি শান্ত ভাবে তাঁহার নিকট হইতে বিদায় লইতে সমর্থ হইলাম, এবং আমি আমার প্রেমাস্পদ পরিত্রাতাকে কৃতজ্ঞতা জানাইলাম যে, তিনি আমার চক্ষু খুলিয়া আমার মহা ভ্রম দেখাইয়া দিয়াছেন।
মিঃ ডব্লিউ তাঁহার ক্লাসের সঙ্গে আমাদের ক্লাসও নিলেন। তিনি একজন খাঁটি ও উৎসাহী খ্রীষ্টান, এবং তাঁহার ক্লাসের সকল ছাত্রীর বন্ধু। আমি সেই ক্লাসের ছাত্রী হওয়াতে আনন্দলাভ করিয়াছি। কিন্তু দুঃখ হয় যে, আমার স্বাস্থ্য ভাল না থাকায়, আমি নিয়মিতরূপে স্কুলে উপস্থিত থাকিতে পারিতাম না। তাহার পর হইতে দুই এক সপ্তাহ পর পরই তিনি আমাকে দেখিয়া যাইতেন, এবং আমার একজন বিশ্বস্ত বন্ধু হইয়াছিলেন। আমাদের মধ্যে এমন অনেক সুমধুর কথাবার্ত্ত। হইয়াছিল; যাহাতে আমার অনেক উপকার ও কল্যাণ হইয়াছে। আমাদের তত্ত্বাবধায়ক মিঃ ডব্লিউ আমাকে রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের একটি ক্লাস নিতে অনুরোধ করিয়া ছিলেন; কিন্তু আমি তাহা রক্ষা করিতে শঙ্কিত হইলাম। আমার হাতের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ থাকা সত্ত্বেও, আমার স্বাস্থ্য একটু ভাল হওয়ায় মাঝে মাঝে আমি একটি ক্লাস নিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম, এবং ১৮৭৯ সনের মে মাসে একজন নিয়মিত শিক্ষয়িত্রীরূপে সাদরে গৃহীত হইয়াছিলাম। প্রথমে আমি যে ক্লাস পড়াইয়াছিলাম, তাহা ১২ হইতে ১৩ বৎসর বয়স্কা একটি বালিকাদের ক্লাস। পড়াইতে আমার আনন্দ হইত, ছাত্রীদিগকে আমি ভালবাসিতাম, এবং তাহাদিগকে আমার প্রেমাস্পদ পরিত্রাতার নিকট পৌঁছাইয়া দিবার চেষ্টায় নিজে অত্যন্ত উপকৃত ও কৃতার্থ হইয়াছিলাম। আমি সর্ব্বদা প্রার্থনা করিতাম, তাঁহারা যেন পরিত্রাতার নিকট উপস্থিত হইতে পারেন। যদিও আমার প্রার্থনার ফল আমি দেখিতে পাই নাই, তবুও আমি বিশ্বাস করি, অত্যন্ত দুর্ব্বল হস্তে সেই সময় যে-বীজ উপ্ত হইয়াছিল, নিশ্চয়ই তাহার উপর বিধাতার আশীর্ব্বাদ বর্ষিত হইয়াছে।
শিশু বিদ্যালয়ের আট বৎসর বয়স্কা বালিকাদের লইয়া একটি ক্লাস গড়িয়া উঠিয়াছিল। তাহার জন্য একজন শিক্ষকের প্রয়োজন হইল। আমি আমার একটি বন্ধুকে সেই ক্লাসটি নিতে অনুরোধ করিলাম; কিন্তু তিনি অপেক্ষাকৃত বয়স্কা বালিকাদের ক্লাস পড়াইতে পছন্দ করিলেন। অতএব তত্ত্বাবধায়ক মহাশয়ের অনুমতিক্রমে, বন্ধু আমার ক্লাস, আর আমি ছোটদের ক্লাস লইব, এরূপ স্থির করিলাম। অল্প দিনের মধ্যেই আমি তাহাদিগের প্রতি অনুরক্ত হইলাম। বালিকারাও আমার অত্যন্ত অনুরক্ত হইল। তাহারা পাঠে যথেষ্ট অনুরক্তি দেখাইয়া, তাহা শিক্ষা করিতে আগ্রহান্বিত হইল। আমরা পরস্পরকে ভালবাসিলাম। দুঃখের বিষয়, আমার স্বাস্থ্য আবার ভাঙ্গিয়া পড়িল, এবং হাত ও বাহুর ভীষণ যন্ত্রণা হওয়াতে, আমার পক্ষে দীর্ঘকালের বিশ্রাম আবশ্যক হইল।
১৮৮২ সনের প্রারম্ভে আমার স্বাস্থ্য একটু ভাল হইল, এবং আমার হাত বস্ত্র-বন্ধনীতে সকল সময় ঝুলাইয়া আমি একটু চলাফেরা করিতে পারিতাম। আমার মনে হইল, আমি আবার ক্লাস নিতে পারি। ইহাতে তত্ত্বাবধায়ক মহাশয়, শিক্ষয়িত্রীগণ, ছাত্রীবর্গ এবং সেই প্রদেশবাসিদিগের নিকট হইতে আমি এমন সাদর সম্ভাষণ পাইলাম যে, আর কখনও তাহা ভুলিতে পারিব না।
আমার শরীর খুব খারাপ হওয়াতে, ১৮৮৩ সনের জুন মাসে বাধ্য হইয়া আমাকে কর্ম্ম পরিত্যাগ করিতে হইল। এখন আমার পক্ষে আর কোন পরিশ্রমের কাজ, করা সম্ভবপর নয়। ইহা আমার পক্ষে কঠিন পরীক্ষা; কিন্তু ঈশ্বর আমার জন্য অন্য কর্ম্ম রাখিয়াছেন, এবং আমাকে অন্য প্রকার শিক্ষা দিতে চাহেন।
যে অল্প সময় আমি আমার ছাত্রীদের সঙ্গে ছিলাম, তাহার জন্যই আমি বার বার আমার স্বর্গীয় পিতাকে ধন্যবাদ প্রদান করিয়াছি। তাহারা আমার প্রতি যে ভালবাসা ও সহানুভূতি দেখাইয়াছে, তাহা তাহাদের বয়সের তুলনায় অত্যদ্ভূত বলিয়া মনে হয়। প্রথম শ্রেণীর একটি ও দ্বিতীয় শ্রেণীর দুইটি বালিকা সময় সময় আমাকে দেখিতে আসিত, ও মাঝে মাঝে আমাকে চিঠি লিখিত। আমাকে এরূপ আনন্দ দান করা, আমার প্রেমময় ত্রাণকর্ত্তার বিশেষ করুণার কাজ। আমি তাহাদের সঙ্গ ও চিঠিতে কত আনন্দ লাভ করিতাম! তাহাদের মধ্যে একজন আমার নিকট একখানা ছোট স্কুল-পাঠ্য পুস্তক আনিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘তোমার কি এই বইয়ের কথা মনে আছে?’ আমি বলিলাম, ‘না’। তখন সে বলিল, ‘সতর বৎসর পূর্ব্বে তুমি তোমার ক্লাসের প্রত্যেক ছাত্রীকে ইহার এক এক খণ্ড দান করিয়াছিলে। আমি কোন কিছুর পরিবর্ত্তেই ইহা হাতছাড়া করি নাই।’ আমি আমার সকল ছাত্রীকেই মাঝে মাঝে চিঠি লিখিতাম, অন্য ছাত্রীরা সেই সব চিঠির কথা উল্লেখ করিয়াছে। তাহাদের মধ্যে এই তিন জন এখন রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষয়িত্রীর কাজ করে! তাহারা যে সকলেই ঈশ্বরকে স্বীকার করতঃ ধর্ম্মপথে চলিতেছে, এবং বিশেষ অনুরক্তির সহিত তাহাদের কার্য্য সম্পাদন করিতেছে, ইহা কি পরম আনন্দের কথা! প্রার্থনা করি, ঈশ্বর দয়া করিয়া তাহাদিগকে আশীর্ব্বাদ এবং অপরের কল্যাণ ও সুখের কারণ করুন।