তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/নবম অধ্যায়
নবম অধ্যায়
চলচ্ছক্তিহীন রোগীদের (Invalids) প্রতি আমার বাণী
‘ঈশ্বর আমাদের আশ্রয় এবং শক্তি—বিপদে একমাত্র উপস্থিত সহায়।’
আমার বাম বাহুখানা কর্ত্তিত হইবার পর, আমার অসহায়তার কথা মনে করিয়া আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছিলাম। ইহাতে আমার অবস্থা আরও খারাপ হইল; অন্যদেরও অসুখী করা হইয়াছিল। ইহাতে আমি বুঝিতে পারিলাম, আমি কেমন স্বার্থপর। আমার কত জ্ঞাতি কুটুম্ব বন্ধুগণ এবং ডাক্তার, এমন কি কত অজ্ঞাত লোকও আছেন, যাঁহারা আমার উপর সদয়! এই সকল সুবিধা থাকিতে, আমার পক্ষে অন্ততঃ ধৈর্য্যের সহিত এই দুঃখ বহন এবং যথাসম্ভব প্রফুল্লতা রক্ষা করাই উচিত। যদি আমার এই সকল সুবিধা না থাকিত, তাহা হইলে আমার অবস্থা আরও কত খারাপ হইত! আমি সাহস রক্ষা করিয়া চলিতে সঙ্কল্প করিলাম, এবং ভগবানের সাহায্যে জয়ী হইয়াছিলাম ও বুঝিয়াছিলাম যে, আমার দুঃখ কষ্ট বহন করা অনেক পরিমাণে সহজ হইয়াছে। (Rom. viii. 37; I Cor. xv. 57.) লোকে আমাকে অনেক সময় জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি এই অবস্থায় কি করিয়া হাসিতে পার?’ কেহ বা বলে, ‘আমি ত সমস্ত সময় রাগ ও বিরক্তি প্রকাশ করিতাম।’ আমি তাহাকে বলি, ‘না, তুমি এরূপ করিতে না। যদি তুমি আমার অবস্থায় থাকিতে, তাহা হইলে, তুমি দিনে দিনে, নিমেষে নিমেষে, তোমার প্রয়োজনানুরূপ শক্তি লাভ করিতে।’ আমি স্বভাবতঃ কর্ম্মঠ; যখন সমর্থ ছিলাম, তখন আমি কখনও অলস বা শান্ত হইয়া থাকিতাম না। আমি অনেক সময় শুনিয়াছি, যখন আমার হাত পা ছিল, তখন আমাকে পাঁচ মিনিট কাল স্থিরভাবে বসাইয়া রাখা অসম্ভব হইত। কিন্তু, তাহা সত্ত্বেও, ঈশ্বর আমার স্বাভাবিক প্রকৃতি পরিবর্তিত করিয়া, শোয়া বসা সকল অবস্থায় আমাকে সুখী ও সন্তুষ্ট রাখিয়াছেন। ‘ঈশ্বরের শক্তিতে রক্ষিত’—ইহা খুব সত্য কথা। যখন আমার যন্ত্রণ। অত্যন্ত তীব্র হইত, তখন আমি প্রার্থনা করিতাম, আমি যেন বিরক্ত না হই, অথবা চীৎকার না করি। তিনি আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছেন, এবং তাহার অপেক্ষাও অধিক দিয়াছেন। ঈশ্বর আমাকে আনন্দিত করিবার জন্য আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধব দিয়াছেন। আমার রোগ-যন্ত্রণা উপশম করিবার জন্য ডাক্তার যে-সকল উপায় অবলম্বন করিয়াছেন, তাহাতে তাঁহার আশীর্ব্বাদ আছে, এবং তিনি আমাকে আরও অনেক প্রকারে সুখসুবিধা দিয়াছেন। ‘যাহা হইতে সকল সুখ পাওয়া যায়, সেই সর্ব্বসুখদাতা পরমেশ্বরের স্তব স্তুতি গান কর।’ আমার কি পরম সৌভাগ্য যে, আমি আমার সকল দুঃখ যন্ত্রণ। লইয়া ঈশ্বর-চরণে প্রার্থনা করিতে পারি! এবং অনুভব করিতে পারি যে, আমাকে সাহায্য, আশ্রয় এবং সান্ত্বনা দিতে তিনি সমর্থ,—শুধু সমর্থ নহেন, পরন্তু, ইচ্ছুক ও প্রস্তুত! তিনি বলিতেছেন, ‘দেখ, আমি সর্ব্বদাই তোমার সঙ্গে আছি।’ ‘আজ আমি তোমার গৃহেই বাস করিব। আমাতে তুমি বাস কর, এবং আমি তোমাতে বাস করি ’
’শাখা দ্রাক্ষালতার সহিত যুক্ত না থাকিলে যেমন ফলপ্রসূ হয় না, আমা হইতে বিযুক্ত থাকিলে তোমাদের দশাও ঠিক্ সেইরূপই হয়’। (John xv 4, 5)
যদি আমি যীশুর সহবাসে আনন্দ পাই, তাহা হইলে, সকল সময় তাঁহার ইচ্ছা পালন করিতেও আমার আনন্দ হইবে। যীশু সঙ্গে থাকিলে, আমার যে-কোন স্থানে যাওয়া ও যাহাকিছু করা, সকলই সম্পূর্ণ নিরাপদ্। ‘আমি কোনও অমঙ্গল আশঙ্কা করি না, কারণ, তুমি আমার সঙ্গে আছ’। জীবনের পরীক্ষায় আমি ইহা সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া বুঝিয়াছি। ভিন্ন ভিন্ন অস্ত্রোপচারের পর ডাক্তারগণ সময় সময় আমাকে বলিয়াছেন, ‘তুমি খুব শান্ত ও স্থির ছিলে, একটুকুও ভীত হইয়াছ বলিয়া মনে হয় নাই”। আমি পূর্ব্বে খুব ভীরু ছিলাম সত্য, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও প্রত্যেক অস্ত্রোপচারের সময় আমি খুব শান্ত ছিলাম, এবং কোন অমঙ্গলের আশঙ্কায় ভীত হই নাই। ইহার একমাত্র কারণ এই যে, আমি যীশুর সাহায্যাকাঙ্ক্ষী হওয়াতে তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, ‘ভয় করিও না, আমি তোমার সঙ্গে আছি’। ‘সাহস রক্ষা কর’। ‘ভীত হইও না’। ‘কোনও বিপদ্ তোমার নিকট আসিতে পারিবে না’।
আমাকে সংজ্ঞানাশক ঔষধ (chloroform) দিবার অব্যবহিত পূর্ব্বেই হঠাৎ আমার চিত্তে যীশুর এই সকল বাণী ও অন্যান্য কথা উদিত হইয়াছিল, এবং এই জন্যই আমাকে শান্ত দেখাইতেছিল। ঠিক সেই সময় যীশু আমার সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলিয়াছেন, ‘পরিশ্রান্ত ও ভারাক্রান্ত নর নারী আমার নিকট এস, আমি তোমাদিগকে শান্তি প্রদান করিব’। আমি যীশুকে বলিলাম, আমি পরিশ্রান্ত ও ভারাক্রান্ত, এবং অত্যন্ত অবসন্ন ও অসহায় হইয়াছি। তখন তিনি আমাকে শান্তি, বিশ্রাম, আনন্দ, আত্মার অন্ন পানীয় প্রদান করিলেন, এবং তিনি আমাকে এমন খাদ্যের সন্ধান বলিয়া দিলেন, যাহার কোন খবর পৃথিবীর লোকেরা জানে না। এই সমস্তই বিনা মূল্যে প্রাপ্ত। যীশু আমার কি পরম বন্ধু! কাল যেমন বন্ধু ছিলেন, আজও তেমনি আছেন, এবং চিরকাল এইরূপই থাকিবেন। আমার এইরূপ অনেক পার্থিব প্রিয় বন্ধু আছেন, যাঁহারা তাঁহাদের দয়ার কার্য্য এবং প্রেমপূর্ণ সহানুভূতি দ্বারা আমাকে সাহায্য ও আনন্দিত করেন। যীশু তাঁহাদিগকে অবিলম্বেই বলিবেন, ‘যেহেতু তোমরা আমার সন্তানদের মধ্যে ক্ষুদ্রতম সন্তানের প্রতি এই সদয় ব্যবহার করিয়াছ, সেই হেতু তাহা আমাকেই করিয়াছ’। আমি প্রতিদিন আমার পার্থিব বন্ধুগণের জন্য ঈশ্বর সমীপে কৃতজ্ঞতা নিবেদন করি। কিন্তু, কত সময় আমাদের নিকটতম ও প্রিয়তম বন্ধুগণ আমাদের কাছ হইতে চলিয়া যান! তাঁহারা আমাদের সঙ্গে চিরকাল থাকিতে পারেন না।
‘আমার চারিদিকে পরিবর্তন ও ধ্বংসের লীলা চলিতেছে, ইহার মধ্যে হে অপরিবর্তনীয়, তুমি আমার সঙ্গে থাক।’
যদি এইরূপ না হইত, যদি আমাদের জন্য এই পৃথিবীতে বিপদ্ ও পরীক্ষা, এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন বাত্যা-বিক্ষুব্ধ দিনের সমাবেশ না হইত, তাহা হইলে আমরা বিশ্রাম, শান্তি ও প্রকৃত সুখের মর্ম্ম বুঝিতে পারিতাম না,—জীবনে সুদিনের আগমনের যে সার্থকতা, তাহাও আমাদের অজ্ঞাত থাকিয়া যাইত। ‘পৃথিবীতে তোমরা মহা দুঃখ পাইবে।’ যদি জগৎ দুঃখপূর্ণ না হইত, তাহা হইলে আমরা শ্রেষ্ঠতর দেশের অনুসন্ধান করিতাম না। আমি অনেক সময় মনে মনে ভাবি, যন্ত্রণা, অবসাদ, দুঃখ এবং উদ্বেগ হইতে মুক্ত হইতে পারিলে আমাদের কত আনন্দ হইবে—তখন আমরা এমন স্থানে অবস্থিতি করিতে পারিব, যেখানে অশ্রুজল নাই, মলিন মুখ নাই, কিন্তু যেখানে কেবলই শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে; সর্ব্বাপেক্ষা সৌভাগ্যের কথা এই যে, সেখানে আমরা যীশুকে দেখিব। তখন আমি পরিতৃপ্ত হইব, এবং অতীত পরীক্ষার সকল কথা ভুলিয়া যাইব। এখনও যখন আমি আমার অতীত জীবনের কথা চিন্তা করি, তখন আমার ব্যাধি-যন্ত্রণা এবং নানাবিধ পরীক্ষার মধ্যেও আমি এত দিন কি আশ্চর্য্যভাবে পরিচালিত ও রক্ষিত হইয়াছি, তাহা ভাবিয়া বিস্ময়ে অভিভূত হই। মঙ্গল এবং দয়া আমার জীবন-পথের নিত্য সঙ্গী হইয়াছে। ‘ঈশ্বর সেখানে ছিলেন’।
‘এমন বিস্ময়কর প্রেম, এমন স্বর্গীয় প্রেম, আমার
জীবন, মন, প্রাণ, আত্মা সকলই দাবি করিতেছে।’
‘হে প্রভু, আমার জীবন গ্রহণ কর, এবং তাহা
তোমার নামে উৎসর্গীকৃত করিয়া দাও।’
‘হে আনন্দময় পরিত্রাতা, আমি উত্তরোত্তর
তোমার মতন হইবার জন্য প্রার্থনা করিতেছি;
আমি প্রার্থনা করিতেছি, যেন তোমার শক্তি
কপোতের মতন আমাতে বাস করে।
তুমি ত আমার সকল দুর্ব্বলতার কথা,
এবং আমার সকল উদ্বেগের কথা জান;
যখন আমি তোমার মূল্যবান্ প্রতিশ্রুতি
উল্লেখ করিয়া প্রার্থনা করি,
তখন আমার প্রত্যেকটি প্রার্থনা শুনিও,
এবং তাহা পূর্ণ করিও।
হে আনন্দময় পরিত্রাতা, আমি তোমার নিকট
এমন স্পষ্ট এবং উজ্জ্বল বিশ্বাস প্রার্থনা করিতেছি,
যাহার জ্যোতি গভীর তমসাচ্ছন্ন রজনীর অন্তরালেও
তোমার মহিমা দেখিতে সমর্থ হয়।
আমি দীনতার জন্য প্রার্থনা করিতেছি—
কৃপা করিয়। আমাকে দীনহীন কর,
দীনতা-বসনে আচ্ছাদিত হইয়া তোমার ইচ্ছা ভিন্ন
অপর কোন ইচ্ছা যেন আমার না থাকে!
আনন্দময় পরিত্রাতা, আমি প্রার্থনা করিতেছি,—
আমার নিত্য প্রার্থনা এই,—আমি যেন
এই জীবন সম্পূর্ণরূপে তোমাকে উৎসর্গ করিতে পারি,
যাহাতে আমাকে আরও তোমার মতন করিবে!
যখন আমি তোমার মূল্যবান্ প্রতিশ্রুতি
উল্লেখ করিয়া প্রার্থনা করি,
তখন আমার প্রত্যেকটি প্রার্থনা শুনিও,
এবং তাহা পূর্ণ করিও।’
মুক্তিদাতা শুধু যে আমার প্রার্থনা শোনেন ও পূর্ণ করেন, এমন নহে; পরন্তু, তিনিও আমার জন্য প্রার্থনা করেন। ইহা জানা আমার পক্ষে পরম সান্ত্বনার বিষয়। ‘আমি তাহাদের জন্য প্রার্থনা করি’ (John xvii, 9 to 26)। ‘তুমি তাহাদিগকে পৃথিবী হইতে লইয়া যাইবে, এই জন্য আমি প্রার্থনা করি না। কিন্তু, আমি প্রার্থনা করি, তুমি তাহাদিগকে দুর্গতি হইতে মুক্ত রাখিবে।’ “পিতার নিকট আমাদের এক জন পক্ষসমর্থক আছেন— তিনি পুণ্যবান্ যীশু।” (I John ii. 2)। আমার যাহাতে বিশ্রামের অভাব না হয়, তজ্জন্য পরিত্রাতা তাঁহার মহিমাতে আমার স্বপক্ষে বলেন, এবং যদি আমি তাঁহার উপর নির্ভর ও তাঁহার আদেশ পালন করি, তাহা হইলে তিনি আমাকে শান্তিদান করিবেন, এবং শান্তিতে রক্ষা করিবেন, এই প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। তিনি আমার বাসস্থান নির্ম্মাণ করিতে গিয়াছেন, এবং শীঘ্রই আসিয়া আমাকে তাঁহার নিকট লইয়া যাইবেন। ‘যেন আমি নিত্যকালই আনন্দ লাভ করিতে পারি।’ আমাকে সময় সময় জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি কি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত? আমার নিকট ইহা অদ্ভূত ও অসঙ্গত প্রশ্ন বলিয়া মনে হয়। আমি মৃত্যুর কথা ভাবি না। মৃত্যুর কথা ভাবিলে আমার মনে হয়, আমি নিদ্রিত হইতে যাইতেছি; যখন জাগরিত হইব, তখন আমার কোন বেদনা, অবসাদ, দুঃখ ও বিপদ্ থাকিবে না। আমাকে ‘বাড়ী’ লইয়া যাও, রাজভবনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া চিরদিনের জন্য আমাকে এক রাজপুত্রের মতন রাখ, এইরূপ ভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছার হাতে আত্মসমর্পণ করা, আমার নিকট অত্যন্ত অদ্ভূত বলিয়া মনে হয়। আমি বাড়ী যাইতে ইচ্ছুক সত্য; কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছার সম্পুর্ণ অনুগত হইয়া, সম্ভবপর হইলে আরও কিছু কাল, এখানে থাকিতে চাই, যেন দুঃখবহনের দ্বারা প্রভুর সেবা করিতে পারি, এবং বলিতে সমর্থ হই, ‘আমার ইচ্ছা নহে, কিন্তু, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।’ ‘প্রভুর নিকট যাহা ভাল মনে হয়, তাহাই তাঁহাকে করিতে দাও।’ ‘আমি তাঁহার উপর নির্ভর করিব, এবং ভীত হইব না।’ তাঁহার অসীম জ্ঞানে ভুল করা অসম্ভব, এবং তাঁহার দয়া এত অধিক যে, তাঁহার পক্ষে আমার অথবা তাঁহার অপর কোন সন্তানের প্রতি কোন সময় নিষ্ঠুর হওয়া সম্ভবপর নহে। আমার প্রয়োজনানুসারে তিনি আমাকে নিমেষে নিমেষে শান্তি প্রদান করিবেন। ‘আমি অনেকের নিকট আশ্চর্য্যের বিষয় হইলেও, তুমি কিন্তু আমার চির আশ্রয়।’ (Psalm Lxxi, 7.)
আমার এই ক্ষুদ্র আত্ম-জীবনী খানার লেখা আরম্ভ করার পর হইতে আমি প্রমাণিত করিয়াছি যে, অক্ষয় পুরুষ আমার কেমন চির আশ্রয়, এবং যীশু, আমার প্রিয় যীশু, কেমন চিরবন্ধু হইয়া রহিয়াছেন,—বিশেষতঃ রুগ্ন ও আর্ত্তদের দুঃখ বিপদের দিনে। অনেক দিন ধরিয়া, বৎসরের পর বৎসর, আমার দিন রাত্রি অবসাদের ভিতর দিয়াই কাটিয়াছে, এবং এমন শারীরিক যন্ত্রণার ব্যবস্থা হইয়াছে, যাহা বহন করিতে পারিব বলিয়া মনে করি নাই। আমি শারীরিক যন্ত্রণা ধীর ভাবে বহন করিবার জন্য বহু বৎসর যে সংগ্রাম করিয়া আসিতেছি, তাহা পরিত্যাগ করিবার জন্য অনেক বার আমার চিত্তে কুবুদ্ধি জাগ্রত হইয়া আমাকে প্রলুব্ধ করিয়াছে, এবং তীব্র যাতনায় আর্ত্তনাদ করিতে বলিয়াছে। কিন্তু, আমি যীশুকে তাহা বলিয়াছি, এবং তাঁহার বল ভিক্ষা করিয়াছি; তিনি আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছেন, এবং জাগ্রত অবস্থায় ধীরভাবে বেদনা বহনের শক্তি দিয়াছেন,—যদিও নিদ্রিত অবস্থায় আমি আর্তনাদ করি বলিয়া অপরের নিকট হইতে শুনিয়াছি। সময় সময় আমি বিষাদগ্রস্ত হইয়াছি, শারীরিক দুঃখের জন্য ততটা নহে, যতটা অন্যান্য কষ্টের জন্য; কিন্তু আমি কখনও পরিত্যক্ত হই নাই,—না, এক মুহূর্ত্তের জন্যও নহে। ‘ঈশ্বরের সমস্ত আশ্বাস-বাক্য সত্য, এবং তাহাতেই স্বস্তি!’ তাঁহার আশ্বাস-বাক্য কখনও বিফল হয় না। ‘আমি তোমাকে কখনও অভাবগ্রস্ত করিব না, অথবা তোমাকে পরিত্যাগ করিব না।’ (Josh. I. 5)
রাত্রির গভীরতম অন্ধকার প্রভাতের পূর্ব্বাভাস সূচনা করে। খুব কালো মেঘ চারিদিকে আকাশ আচ্ছন্ন করিয়াছিল, এবং কিছু সময়ের জন্য একটু আলোকের রেখাও দেখা যাইতেছিল না। কিন্তু, একদিন আমি যখন বিশেষ বিপদে পথ নির্দ্দেশের জন্য প্রার্থনা করিতেছিলাম, তখন এই কয় ছত্র কবিতা আমার মনে হইয়াছিল।
তুমি একজন রাজার নিকট আসিতেছ,
অনেক প্রার্থনা লইয়া তাঁহার কাছে আগমন কর;
কারণ, তাঁহার দয়া ও শক্তি এত অধিক যে,
কাহারও প্রার্থনা তাঁহার নিকট অত্যধিক
বিবেচিত হয় না।
তখনই, আমি নিজের এবং অপরের জন্য এক বিশেষ সুবৃহৎ আবেদন লইয়া উপস্থিত হইয়াছিলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমার প্রেমময় পিতা আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিবেন। কি ভাবে আমার প্রার্থনা পূর্ণ হইবে, সেই সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্রও ধারণা ছিল না। আমি যে প্রার্থনা করিয়াছিলাম, সেই কথা এই সময় কোন মানুষই জানিত না; কিন্তু, তখন হইতেই ঈশ্বর তাহা পূর্ণ করিতেছিলেন। ‘মানুষেরা যখন কথাবার্ত্তা বলিতে থাকিবে, তখনও আমি তাহা শুনিব’ (Isa. LXV 24). কয়েক মাস চলিয়া না যাইবার পূর্ব্বে, আমি ইহা বুঝিতে পারি নাই, এবং তিনি শুধু আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছেন, তাহা নহে, পরন্তু আমি যাহা চাহিয়াছি তাহার ছয় গুণ দান করিয়াছেন। কাল মেঘগুলি করুণা-সিক্ত ছিল, এবং আমার নিজের এবং অন্যের উপরও আশীর্ব্বাদ বর্ষণ করিয়াছে। যে ঈশ্বর হইতে সর্ব্ববিধ কল্যাণ প্রবাহিত হইতেছে, আমি তাঁহার কত স্তব স্তুতি করিয়াছিলাম, এবং আমার বন্ধুদিগকেও কত ধন্যবাদ প্রদান করিয়াছিলাম! আমাদের সকল আশঙ্কা হইতে বাস্তবিকই তিনি অধিকতর সদয় ছিলেন। ‘ঈশ্বরের সকল নিয়মই নিখুঁত।’ ‘কোন বিষয়ে উদ্বিগ্ন হইও না, কিন্তু সকল বিষয়েই কৃতজ্ঞচিত্তে প্রার্থনা এবং যাচ্ঞা দ্বারা তোমার অনুরোধ ঈশ্বরকে জানাও।’ (Phil. iv. 6)
এই সময় ঈশ্বরকে আমার বিশেষ অনুরোধ জানাইতে হইয়াছিল। আমার পা খানার অবস্থা খুব খারাপ হইয়া পড়িয়াছিল, এবং তাহা রক্ষা করিবার সম্ভাবনা অতি অল্পই ছিল। আমার মস্তিষ্কের অবস্থাও কয়েক মাস ধরিয়া ভাল যাইতেছিল না, বড় কষ্ট পাইতেছিলাম। আমি ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলাম, আমার পা খানা বাঁচাইবার জন্য আমার হিতৈষী চিকিৎসক যে-সকল উপায় অবলম্বন করিতেছেন, তদুপরি যেন তাঁহার শুভাশীর্ব্বাদ বর্ষিত হয়, এবং আমার চৈতন্য যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। আমার এই প্রার্থনা পূর্ণ হইয়াছিল! কোনও প্রকার অস্ত্র-প্রয়োগ ভিন্ন কখনও আমার এত দীর্ঘ কাল কাটে নাই, এবং প্রায় দুই বৎসর আমার চৈতন্য বিলুপ্ত হয় নাই। ইহা আমার পক্ষে বিস্ময়কর, এবং ডাক্তার ‘বি’র পক্ষে বিজয়-বার্ত্তা। ডাক্তার ‘বি’ আমার বিশ্বস্ত বন্ধু এবং আমার সূর্য্যালোক। এখনও যথাসম্ভব সর্ব্বপ্রকারে আমাকে আমার দুঃখ বহন করিতে, এবং আমি যাহাতে নিত্য প্রমাণ করিতে সমর্থ হই যে, ঈশ্বর আমার প্রার্থনা শ্রবণ ও তাহার উত্তর প্রদান করেন, তদ্বিষয়ে সাহায্য করিতেছেন। ‘আমার নিকট প্রার্থনা কর এবং আমি তোমাকে তাহার উত্তর দিব’। (Jer, xxxiii, 3).
আমি চেয়ারে বসিতে না পারিলেও, ‘যে-কোন অবস্থায় থাকি না কেন তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকিতে অভ্যস্ত হইয়াছিলাম।’ আমি বিছানায় শুইতে পারি, এবং এত অনুগ্রহ লাভ করিয়াছি, এই জন্য আমি সত্যই কৃতজ্ঞ,—সমস্তই ঈশ্বরের ভালবাসা ও করুণার নিদর্শন। আমার ভাগ্যে অনেক নূতন বন্ধু জুটিয়াছিল; তাঁহারা আমায় আনন্দ ও উৎসাহপূর্ণ চিঠি লিখিয়াছিলেন। যদিও তাঁহারা কখনও আমাকে দেখেন নাই, তথাপি আমরা পরস্পরে প্রেমপূর্ণ সহানুভূতি-সূত্রে আকৃষ্ট হইয়াছিলাম, এবং অপর বন্ধুরা তাঁহাদের উৎসাহ-সঞ্চারক সঙ্গ ও চিঠি দ্বারা প্রতিপন্ন করিয়াছিলেন যে, তাঁহারা কেমন খাঁটি, বিশ্বস্ত, প্রাচীন এবং পরীক্ষিত বন্ধু হইয়া রহিয়াছেন, তাঁহারা প্রত্যেকে এবং সকলে আমার জীবনে আনন্দ দিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছেন। সেই চেষ্টার মূলে ছিল যীশুর প্রতি প্রেম।
বাস্তবিকই আমি ভগবানের অনেক প্রসাদ লাভ করিয়াছি,—তাহা অসংখ্য। আশ্বাস-বাক্যানুসারে প্রার্থনার উত্তর আসে, কোন ভাল বস্তু অপ্রাপ্য থাকে না। “প্রার্থনা কর, তুমি প্রাপ্ত হইবে’। সকল অভাব পরিপূর্ণ করা হইবে। ‘আমার কোন অভাব থাকিবে না’। ‘আমার ঈশ্বর তোমার সকল অভাব দূর করিবেন’। (Phil. iv. 19.)
‘ঠিক আজিকার মতন;
কালি হবে কালিকার অভাব পূরণ;
আজি চাহি পিতঃ, ঠিক্ আজিকার মতন।’
কোন কোন বোঝা অপসারিত, এবং অপরগুলি লঘু করা হয়। ঈশ্বর আমাদের সমস্ত দুঃখ কষ্ট দূর করিবার আশা দেন না। তিনি বলেন, ‘এই পৃথিবীতে তোমরা দুঃখ পাইবে, কিন্তু এই বলিয়া আনন্দিত হও যে, আমি সংসার জয় করিয়াছি’। ‘আমাতে তোমরা শান্তি পাইতে পারিবে’ John xvi. 33.)। ‘তুমি তাহাদিগকে এই পৃথিবী হইতে লইয়া যাইবে, ইহা আমার প্রার্থনা নহে; কিন্তু আমার প্রার্থনা এই যে, তুমি তাহাদিগকে অশুভ হইতে রক্ষা করিবে’ (John xvii. 15). ‘আমার করুণা তোমার পক্ষে যথেষ্ট (2 cor, xii 9), আমাদিগকে শক্তিশালী ও পরিচালিত করিতে যদি ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে থাকেন, তাহা হইলে ভয়ের কোন কারণ থাকে না। যদি আমরা তাঁহার হস্তে সমস্ত চিন্তার বোঝা অর্পণ ও তাঁহাতে সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করি, তাহা হইলে তিনি সেই সমস্ত বহন করিতে প্রস্তুত আছেন।
সকল অজ্ঞাত বিষয়ের চাবি ঈশ্বরের হাতে আছে,
ইহাতে আমি আনন্দিত আছি।
যদি অন্য কাহারও হাতে চাবি থাকিত,
কিংবা তিনি বিশ্বাস করিয়া তাহা আমাকে দিতেন,
তাহা হইলে হয়ত আমি বিষাদগ্রস্ত হইতাম ৷
আগামী কল্যকার উদ্বেগসকল যদি শান্তি-বর্জ্জিত হইয়া
এখনই উপস্থিত থাকিত, তাহা হইলে কি হইত?
আমি বরং পছন্দ করি, তিনি ঊষার দ্বার খোলেন,
এবং নবালোকের আগমনের সঙ্গে এই কথা বলেন,
‘আমার ইচ্ছাই সর্ব্বোত্তম।’
আমার প্রকৃত ঝাপ্সা দৃষ্টি
আমাকে নিরাপদে রাখে। কারণ,
আমার কুজ্ঝটিকাময় যাত্রাপথে
অন্ধের ন্যায় চলিতে চলিতে
আমি তাঁহার স্পর্শ অনুভব করি, এবং
তাঁহাকে বলিতে শুনি,
‘আমার সাহায্য সুনিশ্চিত।’
আমি তাঁহার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানি না,
কিন্তু ইহ। আমি জানি,
আমার উপর তাহার প্রসন্ন দৃষ্টি আছে,
এবং যতদিন এখানে আছি
তাঁহারই করুণার আশ্রয়ে আছি।
ইহাই যথেষ্ট। ইহাতেই আমার সকল অভাব দূর হয়,
কাজেই আমি নিশ্চিন্ত মনে আছি;
কারণ, আমি যাহা দেখি, তিনি তাহা দেখেন
এবং তাঁহার যত্নে আমি পরিত্রাণ পাইব—
নিত্য সুখী থাকিব। (সঙ্কলিত)
দুর্ব্বলতা এবং পরীক্ষার মধ্যে অভাবে পড়িয়াই আমরা সম্যক্ উপলব্ধি করিতে সমর্থ হই, আমাদের প্রেমাস্পদ এবং দয়ার্দ্র মুক্তিদাতা আমাদিগকে রক্ষা করিতে, সান্ত্বনা দিতে, সাহায্য করিতে, সবল করিয়া তুলিতে, কেমন ব্যস্ত। তিনি আমাদের সকল দুর্ব্বলতার কথা জানেন। আমাদের উদ্বেগ, তাপ, দুঃখ, অনেক পাপ মলিনতা এবং বিফলতার কথাও তাঁহার অবিদিত নাই। তিনি ইহাও জানেন যে, আমাদের কৃত ও অকৃত বহু পাপের (sins of omission and commission) কথা স্মরণ - পথে উদিত হইয়া কত বার জীবন-সংগ্রাম পরিত্যাগ করিতে আমরা প্রলুব্ধ হইয়াছি। কিন্তু, তাহা সত্ত্বেও ‘যদি আমরা আমাদের পাপ স্বীকার করি, তাহা হইলে সেই বিশ্বস্ত ও ন্যায়বান্ প্রভু আমাদের পাপ ক্ষম। করতঃ আমাদের মলিনতা ধৌত করিয়া দেন’। (1 John i. 9). তিনি জানেন, আমাদের অভিসন্ধি বিশুদ্ধ কি না; মানুষের মতন তাঁহার বিচার কর্ম্মফলের উপর নির্ভর করে না।
‘যীশু আমার কেমন আশ্চর্য্য মুক্তিদাতা!’
আমার এমন সান্ত্বনা আছে,
যাহা সংসারের লোকের নাই—
সমস্ত পথেই যীশু আছেন;
যদিও ঝাড়ো মেঘ জমিয়াছে, এবং বিপদ ঘনাইয়াছে,
সমস্ত পথেই যীশু আছেন। (সঙ্কলিত)
জনৈক বন্ধু উপনিবেশ পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবার সময়, আমার প্রাণে একটি সুন্দর চিন্তা জাগ্রত করিয়া দিয়া গেলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘যখন তুমি অত্যন্ত দুর্ব্বল বোধ কর, তখন আমার চিঠির উত্তর দিবার জন্য কষ্ট স্বীকার করিও না। তোমার যে সংবাদ দিবার প্রয়োজন তাহা ঈশ্বরকে জানাইও, তিনি আমার নিকট তাহা জানাইয়া দিবেন’। তাহার পর হইতে আমি অনেকবার এইরূপ করিয়াছি, এবং আমার প্রেরিত সংবাদের উত্তর পাইয়াছি। কখনও বা চিঠিতে, কখনও বা লোক মারফতে, এবং সকল সময়ই আমাকে প্রফুল্ল রাখিবার জন্য যাহা চাহিয়াছিলাম, ঠিক তাহাই পাইয়াছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ঈশ্বর আমার এই সামান্য অনুরোধ রক্ষা করিয়াছেন, যাহাতে প্রমাণিত হয়, যাহারা বিশ্বাসভরে প্রার্থনা করে, তিনি সকল সময়ই তাহাদের অতি নিকটে আছেন। ‘তুমি প্রভুকে ডাকিবে, তিনি তাঁহার উত্তর দিবেন; তুমি তাঁহার নিকট কাঁদিবে, তখন তিনি বলিবেন, এই যে আমি উপস্থিত।” (Isa. Lviii.. 9.)
আমাদের মরধামের বন্ধুগণ আমাদিগকে সাহায্য করিতে খুব ইচ্ছুক হইলেও, সকল সময় তাহা করা তাঁহাদের পক্ষে সম্ভবপর বা সুবিধাজনক হয় না। তাঁহারা সকল সময় আমাদের সঙ্গে থাকিতে পারেন না। কিন্তু আমাদের মুক্তিদাতার সেই ইচ্ছা এবং সামর্থ্য দুই-ই আছে। তিনি সকল সময়েই আমাদের খুব নিকটে। আমি রাত্রির নীরবতায় যীশুর সঙ্গে কথা বলিতে ভালবাসি। একাকী তাঁহার সঙ্গ করিয়া, আমি অনেক সময় তাঁহার হাতের কোমল স্পর্শ অনুভব করিয়াছি। সেই স্পর্শ খুব সত্য, এবং আশ্চর্য্যরূপে আমার সকল দুঃখ শান্ত করিয়াছে। ‘যখন তিনি শান্তি প্রদান করেন, তখন কে আর উদ্বেগের সৃষ্টি করিতে পারে?’ (John xxxiv. 29).
আমার মনের বড় সাধ, সকল পঙ্গুরাই জীবনের অভিজ্ঞতায় জানুক যে, যীশু তাহাদের কেমন সান্ত্বনা-দাতা। দুঃখ ও উদ্বেগের মাত্রা যত বেশী হয়, ততই তিনি কাছে আসিয়া, অধিকতর আগ্রহের সহিত, উত্যক্ত চিত্ত ‘শান্ত হউক’, বলিয়া আমাদিগকে সাহায্য করেন। কি আশ্চর্য্যজনক মুক্তিদাতা! প্রফুল্লতাও একটি মহাপ্রসাদ! ইহা প্রতিবেশীদের নিকট আমাদের দেয়। যদি আপদে বিপদে আমরা শুধু বিরক্ত ও উত্যক্ত হইয়া হা হতোস্মি করি, তাহা হইলে তাহাতে শুধু আমরাই যে অসুখী হই, তাহা নহে, পরন্তু তাপরকেও অসুখী করি। খ্রীষ্টও নিজেকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন নাই। তাঁহার মতন দুঃখ কি আর কাহারও ছিল। কিন্তু, তাহা সত্ত্বেও তিনি ইচ্ছা করিতেন, যেন অপরকে সুখী করিতে পারেন। কত বার তিনি তাঁহার শিষ্যদিগকে বলিতেন, ‘খুব প্রফুল্লিত হও’, ‘আনন্দ কর’! আমাদের সর্ব্বদাই ঈশ্বরে আনন্দিত হওয়া উচিত; কিন্তু আত্মশক্তিতে তাহা সম্ভবপর হয় না। সাধু ‘জন’ বলেন, ‘আমি খ্রীষ্টের সাহায্যে তাঁহার শক্তিতে শক্তিশালী হইয়া সকল কর্ম্মই করিতে পারি। (Phil. iv. 13).। আমি পরীক্ষা দ্বারা জানিয়াছি, সকল বিষয়ের ভাল দিকটা দেখিয়া আনন্দিত এবং সন্তুষ্ট থাকা কি পরম সৌভাগ্যের বিষয়! সর্ব্বাপেক্ষা ভারী বোঝাও কত লঘু এবং সহজে বহনীয় বলিয়া মনে হয়! প্রেমময় পিতার হস্ত হইতে গ্রহণ করিলে প্রত্যেকটি দুঃখ, বিপদ্ ও যাতনা আমাদের মহা কল্যাণরূপে পরিণত হইবে। পৃথিবীতে যীশুর প্রেমে যদি আমরা দুঃখ কষ্ট বহন না করি, তাহা হইলে স্বর্গের মুকুট হইতে আমরা বঞ্চিত থাকিব। ‘আমার মঙ্গলের জন্যই আমি ক্লিষ্ট হইয়াছি, যাহাতে তোমার বিধি কি তাহা আমি বুঝিতে সমর্থ হইব’ (Psalm cxix. 17)। আমি নিদারুণ বেদনায় ক্লিষ্ট হইয়াছি, এবং নানাবিধ বহু দুঃখ বিপদ্ও আমার উপর দিয়া চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু এই সকল পরীক্ষার মধ্যেও অন্তর আমার একটা গূঢ় শান্তিতে পূর্ণ আছে। সংসার এই শান্তির খবর জানে না, শান্তি দিতেও পারে না। আমি সমস্ত জীবন করুণা ও মঙ্গলের স্রোতে ভাসিয়া চলিয়াছি, এবং অচিরেই আমি আমার প্রভুর গৃহে চিরকালের জন্য বাস করিবার অধিকার লাভ করিব। সেখানে দুঃখ কষ্ট বা উদ্বেগ নাই, এবং আমি যীশুর সঙ্গে ‘নিত্য শান্তিতে থাকিব’
‘কেবলমাত্র কৃপাতেই পরিত্রাণ লাভ করিয়াছি,
এবং ইহাই আমার একমাত্র অজুহাত;
যীশু সমস্ত মানবজাতির জন্য দেহ রক্ষা করিয়াছেন।
যিশু আমার জন্য দেহরক্ষা করিয়াছেন। এবং এখন আমি প্রতীক্ষা করিতেছি। তিনি আমাকে সাবহিত থাকিতে ও প্রতীক্ষা করিতে বলিয়াছেন, কিন্তু অনেক সময় আমি বিস্মিত হইয়া ভাবি, আমার প্রভুর আগমনে এত বিলম্ব হইতেছে কেন? ‘হে পিতা, তোমার নিকট ইহা ভাল বিবেচিত হইয়াছে, তবে তাহাই হউক।’ এখানে আরো কিছু দিনের আঁধার, আরো কিছু দিনের দুঃখ, তাহার পর তিনি তাঁহার পরিশ্রান্ত সন্তানের নিকট আসিবেন।
যীশু আমার জন্য দেহত্যাগ করিয়াছেন।
মূল ইংরেজীতে নিম্নলিখিত চতুর্দ্দশটি ছত্রের প্রত্যেকটির আদ্য অক্ষর যোগে “যীশু আমার জন্য দেহত্যাগ করিয়াছেন” এই বাক্যটি রচিত হইয়াছে।
১। তাঁহার দয়াতেই মুক্তভাবে সমর্থিত। ২। চিরন্তন পরমেশ্বরই আমার আশ্রয়স্থল।
৩। নিশ্চয়ই আমি তোমার সঙ্গে মিলিত হইব।
৪। আমার নিয়ে চিরন্তন বাহু প্রসারিত।
৫। হে প্রভু, আমাকে তোমার পথ দেখাও।
৬। ঈশ্বরের নিকটবর্ত্তী হও, তাহা হইলে, তিনি তোমার নিকটে উপস্থিত হইবেন।
৭। আমি, আমিই তিনি, যিনি তোমার সমস্ত পাপ বিদূরিত করিবেন।
৮। হে প্রভু, তোমার প্রেমপূর্ণ দয়া অতি চমৎকার!
৯। তুমিও প্রভু পরমেশ্বরে আনন্দ কর।
১০। প্রভু পরমেশ্বরকে ভয় কর, এবং তাঁহাকে সত্যেতে সেবা কর।
১১। একজনই, খ্রীষ্ট, তোমার প্রভু।
১২। প্রভু পরমেশ্বরে বিশ্রাম কর, এবং ধৈর্য্যের সহিত তাঁহার জন্য প্রতীক্ষা কর।
১৩। আমার দয়া তোমার পক্ষে যথেষ্ট।
১৪। আমি প্রতিদিনই তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিব, কখনও আমি তোমাকে পরিত্যাগ করিব না।
তাঁহার প্রেমপূর্ণ দয়া বিস্ময়কর। তাঁহার প্রতিশ্রুতি কখনও লঙ্ঘিত হয় না। যীশু অতীতে, বর্ত্তমানে ও ভবিষ্যতে চিরকালই এক। আমার প্রভু ও আমার ঈশ্বর।
ভগবানের সঙ্গীত শিক্ষাদান
‘সংসার-বিমুক্ত এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার লোক ভিন্ন অপর কোন মানুষই এই সঙ্গীত শিক্ষা করিতে পারিল না।’— Rev. xiv,3.
এমন কতকগুলি সঙ্গীত আছে, যাহা শুধু উপত্যকাভূমিতেই (দুঃখের দিনেই) শিক্ষা করিতে পারা যায়। কোনও কলা সেই সকল শিক্ষা দিতে, ও কোন সঙ্গীত-বিশারদ তাহা প্রকাশ করিতে, সমর্থ নহে, এবং সুরের কোন নিয়মের সহায়তায় তাহা বিশুদ্ধভাবে গীত হইতে পারে না। সেই সকল গানের স্বর-মাধুর্য্য অন্তঃকরণে। তাহারা স্মৃতির ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গীত। অতীতের অন্ধকারময় দুঃখে সঙ্গীতের মূল ভাব উৎপন্ন হয়; দুঃখ ক্লেশ হইতে তাহারা অতীতের পক্ষে ভর করিয়া ঊর্দ্ধে উত্থিত হয়। যে জাতি নির্ব্বাসনের দুঃখ ভোগ করে নাই,তাহাদের পক্ষে কি স্কট্লণ্ডদেশীয় সঙ্গীত ‘হায় কেন আমি আমার দেশ পরিত্যাগ করিয়াছিলাম’ গান করা সম্ভবপর? যে-সকল দুঃখ বিপদ্ নির্ব্বাসিতদিগকে অনেক সাগর পার হইয়া চলিতে বাধ্য করিয়াছিল, একমাত্র তাহাদের স্মৃতি হইতেই এইরূপ সঙ্গীত উত্থিত হইতে পারে। সাধু ‘জন’ বলেন, স্বর্গেও এমন একটি সঙ্গীত গীত হইবে, যাহা শুধু ইহলোকের মনুষ্যদের দ্বারাই পূর্ণভাবে গীত হইতে পারিবে—ইহা মুক্তির গান। ইহা সুনিশ্চিত যে, ইহা একটি বিজয়ের গান— যীশু, যিনি আমাদিগকে মুক্ত করিয়াছেন, তাঁহার বিজয়– সঙ্গীত। এই বিজয়ের ভাব বন্ধনের স্মৃতি হইতেই উৎপন্ন হইতে পারে। আমার আত্মা যেমন সুমিষ্টভাবে এই সঙ্গীত গান করিতে পারে, কোনও স্বর্গীয় দূত তদ্রূপ করিতে সমর্থ নহে। আমার ন্যায় গান করিতে হইলে, তাহাদিগকেও আমার মতন নির্ব্বাসনের ভিতর দিয়া যাইতেই হইবে—ইহা তাহারা করিতে অক্ষম। আর্ত্ত ভিন্ন কেহ এইরূপ গান শিখিতে পারে না।
অতএব, হে আত্মন্, তুমি তোমার পিতার নিকট হইতে সঙ্গীত-শিক্ষা প্রাপ্ত হইতেছ। অদৃশ্য ধর্ম্মসঙ্গীত-গায়ক-দলভুক্ত হইবার জন্য তিনি তোমাকে শিক্ষা দিতেছেন। এই স্বর্গীয় মহা সঙ্গীতের এমন সকল অংশ আছে, যাহা তুমি ভিন্ন আর কেহ গাহিতে পারিবে না। এমন সকল তান আছে, যাহা দেবদূতগণের পক্ষে অত্যন্ত নিম্নস্তরের। এই মহাসঙ্গীতের এমন সকল উচ্চ তান থাকিতে পারে, যাহা তোমার স্বরগ্রামের অতীত, একমাত্র দেবদূতগণেরই আয়ত্তাধীন। কিন্তু, এমন গভীরতা আছে যাহা তোমারই আয়ত্তাধীন,—একমাত্র তুমিই তথায় পৌঁছিতে সমর্থ। তোমার পিতা তোমাকে দুঃখের বিদ্যালয়ে রাখিয়া,দেবদূতেরা যে-গান করিতে পারে না, তাহাই তোমাকে শিখাইতেছেন। আমি মানুষকে বলিতে শুনিয়াছি যে, তোমাকে পরীক্ষা করিবার জন্যই তিনি দুঃখ পাঠান; না, তাহা সত্য নহে,— তিনি তোমাকে শিক্ষা দিবার জন্য, এবং স্বর্গীয় গায়কদলের উপযুক্ত করিবার জন্যই দুঃখ পাঠান। অন্ধকারের মধ্যে তিনি তোমার সঙ্গীত রচনা করেন; দুঃখের উপত্যকায় তিনি তোমার সুর বাঁধিয়া দেন; সংশয়ের অবস্থায় তিনি ভিন্ন ভিন্ন সুরের সম্মিলনে তাহা গভীর করেন; ঝড় ঝঞ্ঝায় তিনি কারুণ্য-রসকে আরও পুষ্ট করেন; দুঃখের বর্ষায় তিনি তোমার স্বরকে মিষ্টতর করেন, নিরাশা ও অবসাদের অবস্থায় তিনি বাক্যকে নিয়ন্ত্রিত করেন। ভয় হইতে আশায় পরিবর্ত্তনে তিনি আলোক ও অন্ধকারকে পূর্ণতা প্রদান করেন। হে আমার আত্মন্, তুমি তোমার দুঃখের শিক্ষালয়কে হেয় জ্ঞান করিও না। ইহার প্রভাবে তুমি বিশ্ব-সঙ্গীতে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিবে।
রেভাঃ জিও মেথিসন, ডি.ডি.
(একজন অন্ধ পাদরী)
প্রার্থনা
এখনও প্রার্থনার উত্তর পাও নাই—যে প্রার্থনা প্রাণের মর্ম্মভেদী বেদনা হইতে বহু বৎসর তোমার কণ্ঠে ধ্বনিত হইয়াছে? তোমার বিশ্বাস কি ম্লান হইতেছে—আশা কি চলিয়া যাইতেছে, এবং তুমি কি মনে করিতেছ, তোমার চোখের জল ব্যর্থ হইয়াছে? এই কথা বলিও না যে, পিতা তোমার প্রার্থনা শোনেন নাই; তোমার প্রার্থনা পূর্ণ হইবেই হইবে—কোনও সময়ে—কোনও স্থানে।
এখনও প্রার্থনার উত্তর পাও নাই? তুমি যখন পিতার চরণে
তোমার এই একমাত্র প্রার্থনা প্রথম নিবেদন করিয়াছিলে,
তখন তোমার মনে হইয়াছিল, ইহা এত জরুরী যে,
তুমি চাহিবার সময় পর্য্যন্তও প্রতীক্ষা করিতে পার না।
তাহার পর হইতে যদিও বহু বৎসর চলিয়া গিয়াছে,
তবুও তুমি নিরাশ হইও না,
প্রভু তোমার প্রার্থনা পূর্ণ করিবেনই,
কোনও সময়ে—কোনও স্থানে।
এখনও প্রার্থনার উত্তর পাও নাই?
না, বলিও না তোমার প্রার্থনা অপূর্ণ রহিয়াছে;
হয়ত তোমার যাহা করণীয়,
তাহা এখনও সম্পূর্ণরূপে করা হয় নাই;
প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গেই তাহা পূর্ণ করিবার কাজ
আরম্ভ হইয়াছে,
এবং ঈশ্বর যাহা আরম্ভ করিয়াছেন,
তাহা তিনিই শেষ করিবেন;
প্রাণে যদি পূজার দ্বীপ প্রজ্বলিত রাখিতে পার,
তাহা হইলে তুমি তাঁহার মহিমা নিশ্চয়ই দেখিবে—
কোনও সময়ে—কোনও স্থানে।
এখনও প্রার্থনার উত্তর পাও নাই?
বিশ্বাস উত্তর হইতে বঞ্চিত হইতে পারে না!
তাহার পদযুগল সুদৃঢ় পাহাড়ে প্রতিষ্ঠিত,
প্রবল ঝড়েও সে অকুতোভয়ে দণ্ডায়মান থাকে,
ভীম রবকারী বজ্রনির্ঘোষও তাহাকে ভীত করিতে পারে না;
সে জানে, সর্ব্বশক্তিমান্ তাহার প্রার্থনা শুনিয়াছেন,
এবং উচ্চৈঃস্বরে বলে, ইহা পূর্ণ হইবেই—
কোনও সময়ে—কোনও স্থানে।
—রবার্ট ব্রাউনিং