বিষয়বস্তুতে চলুন

তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/পঞ্চম অধ্যায়

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চম অধ্যায়

১৮৯১—১৮৯৩

আমার স্বপ্ন

‘একটি স্বপ্নে, রাত্রির অলৌকিক দর্শনে,...... তখন
ঈশ্বর মানবের কর্ণযুগল খুলিয়া দেন, এবং তাহাদের
চিত্তে তাঁহার শিক্ষা ও উপদেশ প্রতিষ্ঠিত করেন।’

 ১৮৯১ সনে আবার আমার সঙ্কটাপন্ন পীড়া হইয়াছিল, এবং বাঁচিবার আশা ছিল না। এবার আমি শয়ন করিতে পারিতাম, কিন্তু তিন সপ্তাহকাল সম্পূর্ণ অন্ধ হইয়া ছিলাম। ইহাতে আমার এই কল্যাণ হইল যে, আমি অন্ধদিগের প্রতি অধিকতর সমবেদনাপূর্ণ হইলাম, এবং পূর্ব্বাপেক্ষা আরও ভাল করিয়া বুঝিলাম, ঈশ্বর-প্রদত্ত দৃষ্টি-শক্তি আমাদের কি পরম সম্পদ্‌! আমি আপনাকে অত্যন্ত দুর্ব্বল ও নিরাশ্রয় মনে করিয়া, ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলাম, তিনি যেন তাঁহার পরিশ্রান্ত সন্তানকে তাঁহার নিকট ডাকিয়া লয়েন। ‘ঈশ্বর আমাকে ডাকিয়া লও’, এই প্রার্থনা করিতে করিতে এক রাত্রে আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম, এবং একটি স্বপ্ন দেখিলাম। এই স্বপ্নটা আমার খুব সত্য বলিয়া মনে হইয়াছে, এবং ইহাতে আমার অনেক উপকারও হইয়াছে। স্বপ্নের কথাগুলি আমার ঠিক মনে নাই, কিন্তু তাহার তাৎপর্য্য এইরূপ:—

আমার স্বপ্ন।

 কে একজন আসিয়া আমার বিছানার পাশে দাঁড়াইলেন। আমি তাঁহার দিকে তাকাইলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি কি আমাকে চিন না?’ আমি আবার তাঁহার দিকে তাকাইয়া বলিলাম, ‘হাঁ, আপনি যীশু’। তিনি বলিলেন, ‘হাঁ, আমি ইচ্ছা করি, তুমি আমার সঙ্গে আস।’ আমি বলিলাম, ‘আমার পা নাই, কাজেই হাঁটিতে পারিব না’। তিনি সকলই জানিতেন, এবং বলিলেন, ‘আমি তোমাকে সাহায্য করিব’।

 তিনি আমাকে এমন একটা স্থানে লইয়া গেলেন, যেখানে ছোট বড় অনেক পাহাড় এবং স্তূপীকৃত পাথর ছিল; কোনটা বা মসৃণ, কোনটা বা অমসৃণ, এবং কতকগুলি ছোট লাঠিও ছিল। তিনি বলিলেন, ‘আমি তোমাকে আমার নিকট লইয়া যাইবার পূর্ব্বে, তোমাকে এই সকল দুঃখ কষ্ট বহন করিতে হইবে।’ আমি বলিলাম, এই বড় জিনিষগুলি আমি উঠাইতে পারি না। তাহার পর হেঁট হইয়া একখানা লাঠি তুলিতে চেষ্টা করিয়া বলিলাম, আমি উহা উঠাইতে পারি। কিন্তু, তাহার সমস্ত গায় কাঁটা থাকায়, তখনই মাটিতে ফেলিয়া দিলাম। তখন তিনি বলিলেন, ‘ক্ষুদ্র জিনিষ বলিয়া মনে করিও না যে, সবচেয়ে কম আয়াসে তাহা বহন করা যায়; কিন্তু, তাহা হইলেও, তুমি সে-সকল বহন করিতে পারিবে, এবং সাহসের সহিতই পারিবে। একটি কথা স্মরণ রাখিও, এক এক বারে তোমাকে একটি করিয়াই লইতে হইবে, এবং আমি প্রতিবারেই তোমাকে সাহায্য করিব’। তিনি এই কথাগুলির পুনরুক্তি করিলেন, এবং আমাকে ইহাও বলিলেন যে, শীঘ্রই আমার অনেক আত্মীয়-বিয়োগ হইবে, বন্ধুরাও অনেকে অবিশ্বস্ত প্রমাণিত হইবে।

 আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। আমি জাগরিত হইয়া দেখিলাম, স্বপ্নের কথাটা বেশ সুন্দরভাবেই আমার চিত্তে মুদ্রিত হইয়া রহিয়াছে। ভোর বেলায় আমি ডাক্তার ‘আর্’ এবং ডাক্তার ম্যাক্‌কে তাহার কথা বলিলাম। ডাক্তার ম্যাক্ আমার হইয়া স্বপ্নের সকল কথাই লিখিয়া রাখিলেন, এবং আমরা অনেক সময়ই এই বিষয় আলোচনা করিতাম।

 আমার মনে হইল, মরণের জন্য প্রার্থনা করা আমার পক্ষে উচিত নহে। এখনও আমার দুঃখের ভিতর দিয়াই সেবা করিতে হইবে; সেই জন্য মরণের পরিবর্ত্তে আমি প্রার্থনা করিতে লাগিলাম, যীশু যেন আমাকে হৃদয়ের সহিত এই কথাই বলিতে শিখান, ‘তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক, হে পিতঃ, তাহা যেমনই হউক না কেন’।

 ১৮৯১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আমার একজন অতি প্রিয় বন্ধুর হঠাৎ মৃত্যু হইয়াছিল। সেই মহিলা বন্ধুটি মৃত্যুর পূর্ব্বরাত্রিতে তাঁহার অসুখের কথা জানাইয়া আমাকে একখানা চিঠি লিখিয়াছিলেন। চিঠিখানি আমার নিকট পৌঁছিবার পূর্ব্বেই তিনি যীশুর সঙ্গে গিয়া মিলিত হইয়াছিলেন। চিঠিখানা লিখিবার কয়েক ঘণ্টা পরেই তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল। তাঁহার শোক আমার পক্ষে দুর্ব্বহ। তাঁহাকে কেন ডাকিয়া নেওয়া হইল, এবং আমি পড়িয়া রহিলাম, ইহা আমার পক্ষে একটি কঠিন সমস্যা হইয়া রহিয়াছে।

 ডাক্তার ম্যাক্ খুব বিনয়ী ও সদাশয় লোক ছিলেন; তাঁহার সঙ্গে সেই মহিলাটির পরিচয় ছিল। তিনি আমাকে তাঁহার গুণাবলী আলোচনা করিতে উৎসাহিত করিয়াছিলেন। এরূপ হয়ত অল্প লোকেই করিত। ইহাতে আমার পক্ষে তাঁহার শোক বহন করা অপেক্ষাকৃত সহজ হইয়াছিল। এই বিষয়ে যীশু তাঁহার প্রতিশ্রুতি অনুসারে আমাকে সাহায্য করিয়াছিলেন। আমি তখনও ভাবিতে পারি নাই যে, আমার আর একজন বন্ধুকে হারাইবার সম্ভাবনা কত নিকটবর্ত্তী। কিন্তু বিধাতার মঙ্গলবিধানে তখন ইহা আমার নিকট প্রচ্ছন্ন ছিল।

 ১৮৯২ সনে আমি ক্রমে ক্রমে একটু ভাল হইয়া, আবার গাড়ীতে বেড়াইতে সমর্থ হইয়াছিলাম। সময় সময় আমাকে রোগীর চৌকীতে (invalid chair) করিয়া বাহিরে লইয়া যাওয়া হইত, এবং আমার পরিচিতেরা সকলেই আমাকে দেখিয়া বিস্মিত হইতেন।

 সেই বৎসরেই ডাক্তার ম্যাক্-এর খুব সঙ্কটাপন্ন ব্যারাম হইয়াছিল। আমি সেই সময় অসুস্থ ছিলাম বলিয়া, তাঁহাকে আবার দেখিতে পারিব এরূপ আশা করি নাই। মে মাসে একদিন তাঁহাকে আমার কামরায় প্রবেশ করিতে দেখিয়া, আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইয়াছিলাম। দেখিলাম, তাঁহার চেহারা কত পরিবর্ত্তিত হইয়াছে, এবং তাঁহাকে কেমন রোগা দেখাইতেছে! তিনি বলিলেন, ‘আমি মনে করিলাম, যদি আজই আমি তোমাকে দেখিতে না আসি, তাহা হইলে আর কখনও দেখা হইবে না। সেই জন্য ঈশ্বরের নিকট বল ভিক্ষা করিলাম।’ কি পবিত্র গম্ভীর সময়, তাঁহার সঙ্গে আবার দেখা হওয়া কি আনন্দকর ব্যাপার! তিনি যে আসিয়াছেন, ইহা বাস্তবিকই খুব প্রশংসনীয়। ক্ষণকাল বিশ্রামের পর যখন তিনি আমার সঙ্গে শান্তভাবে আলাপ করিতেছিলেন, তখন মনে হইল, আমার উপর একটু সূর্য্যরশ্মি আসিয়া পড়িল। তিনি অল্পক্ষণ থামিলেন, এবং তাহার পর আবার বলিলেন, ‘আমি ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিব, যেন তিনি দয়া করিয়া তোমার জন্য এমন একজন লোক প্রেরণ করেন, যিনি সূর্য্যালোকের মতন তোমার জীবনকে সমুজ্জ্বল করিতে ও তোমার যাত্রাপথকে আনন্দিত করিতে পারেন, এবং আর কিছু করিতে না পারিলেও, তোমার যন্ত্রণার একটু উপশম করিতে সমর্থ হন।’ (অথবা এইরূপ ভাবের কথা বলিলেন।) পরবর্তীকালে ঈশ্বর আশ্চর্য্যরূপে এই প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছিলেন।

 আমার প্রিয় বন্ধুর শেষ কথা ছিল এই:—‘আমার জন্য উদ্বিগ্ন হইও না। ঈশ্বর আমাদের উভয়েরই তত্ত্বাবধান করিবেন। এখন চলিলাম, আবার কাল প্রাতে দেখা হইবে।’ তাঁহার সঙ্গে আমার আর দেখা হয় নাই; ১৮৯২ সনের ১০ই জুলাই যীশু তাঁহাকে ডাকিয়া লইয়াছিলেন। ‘হে প্রিয়, আবার নবদিবাগমে অন্ধকারের তিরোভাব না হওয়া পর্য্যন্ত বিদায়।’

 ডাক্তার ম্যাক্ আমার একজন বিশ্বস্ত বন্ধু; ষোল বৎসরেরও অধিক কাল হইতে তাঁহার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। তাঁহার অভাব আমার নিকট দুঃসহ মনে হইয়াছিল। আমি বুঝিতে পারিতেছিলাম না যে, এই বিপদ্ হইতে আমার কোনও প্রকার মঙ্গল সংসাধিত হইতে পারে। ইহাতে যেন আমার অত্যধিক দুর্ব্বল দেহ নিষ্পিষ্ট হইয়া গেল। আমার স্বপ্নের কথা মনে হইল। ইহা যেন আমার পক্ষে আর একটি বড় পাথর; কিন্তু এই ক্ষেত্রেও যীশু আবার আমাকে সাহায্য করিয়াছিলেন, এবং উৎসাহিত করিয়াছিলেন।

 এই সময় আমি খুব কষ্ট পাইতেছিলাম; কারণ, আমার দক্ষিণ বাহুমূল রোগাক্রান্ত হওয়াতে ভীষণ যন্ত্রণা হইয়াছিল। ১৮৯৩ সনে ইহা ভাল হইয়াছিল। আমি আবার লিখিতে সমর্থ হইয়াছিলাম, এবং আমার স্বাস্থ্যও অপেক্ষাকৃত ভাল হইয়াছিল।