তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/প্রথম অধ্যায়
তবুও আমি তাঁহারই উপর
নির্ভর করিব
প্রথম অধ্যায়
১৮৭১—১৮৭৬
বর্দ্ধিষ্ণু ভীতি
তুমি আমাকে হাত ধরিয়া লইয়া চল,
এবং আমার পথ পছন্দ করিয়া দাও;
হে প্রভু, সে পথ যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন হউক না কেন,
তোমার পথেই আমাকে লইয়া চল, আমার পথে নহে।
এইচ্ বোনার
যদিও আমি বিগত ২৭ বৎসর কাল অত্যন্ত শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছি, তথাপি বর্তমানে আমি যেমন সম্পূর্ণ অক্ষম ও অসহায় পঙ্গু হইয়া পড়িয়াছি, পূর্ব্বে তেমন ছিলাম না। ১৮৮২ সন পর্য্যন্ত সময় সময় আমি আমার উভয় হস্তই, এবং ১৮৮৯ সন পর্যন্ত বাম হাতখানা ব্যবহার করিতে পারিতাম, এবং শরীর একটু ভাল থাকিলে, ১৮৮৭ সনের আগষ্ট মাস পর্য্যন্ত বেড়াইতেও পারিয়াছি। ১৮৭০ সনের প্রথম ভাগেই আমার দক্ষিণ হস্তে এই ব্যাধির সূত্রপাত হয়। তাহার পর হইতে কখনও বেদনার হাত হইতে আমি আর নিষ্কৃতি পাই নাই। আমার সমস্ত দক্ষিণ হস্তে—হাতের কব্জির উপর পর্য্যন্ত—সাদা সাদা তাল বাঁধিতে লাগিল, এবং তাহাতে অসহ্য বেদনা হইত। আমি একটুও ঘুমাইতে পারিতাম না, সকল সময়ই একটা অবসাদের ভাব থাকিত, ক্ষুধা একেবারেই ছিল না। অবশেষে আমার শরীর সম্পূর্ণরূপে ভাঙ্গিয়া পড়িল। ১৮৭২ সন পর্য্যন্ত নানাবিধ মুষ্টিযোগ প্রয়োগে আমার চিকিৎসা চলিতে লাগিল, কিন্তু তাহাতে আমার কোন উপকার হইল না, বরং শরীর আরও খারাপ হইল।
আমি বার বার অতীতের কথা স্মরণ করি এবং ভাবি, আমার কি পরম সৌভাগ্য যে আমি তখন জানিতে পারি নাই, আমার দুঃখের জীবন মাত্র আরম্ভ হইল। আমার ভবিষ্যতের কথা জানিতে পারিলে, চিত্ত নিরাশায় পূর্ণ হইয়া উঠিত; কারণ, তখন পর্য্যন্ত আমি পরিত্রাতাকে মহান্ পুরুষ বলিয়াই ভাবিতাম, কিন্তু তিনি যে আমার প্রেমিক পরিত্রাতা, বন্ধু, এবং শান্তিদাতা তাহা জানিতাম না। আমার অজ্ঞতাসত্ত্বেও তিনি আমাকে ভালবাসিতেন, এবং পরম যত্নে জীবনের অজানা পথে আমাকে লইয়া যাইতেছিলেন।
আমি সর্ব্বদাই লিখাপড়া করিতে—গদ্য পদ্য নকল করিতে, সঙ্গীতের অথবা বাইব্লের অংশ বিশেষ পাঠ করিতে,—অত্যন্ত ভালবাসিতাম। আমার বিশ্বাস ছিল যে, আমার প্রার্থনা কোন না কোন সময়ে পূর্ণ হইবেই হইবে, এবং আমার যাহ। সর্ব্বশ্রেষ্ঠ তাহাই ঈশ্বরকে দিতে হইবে। যখন আমি খুব ছোট ছিলাম, তখন রবিবার দিন দানাধারে দিবার জন্য সর্ব্বদাই একটি চক্চকে আনি (পেনি) চাহিতাম, (আমি নোংরা আনি পছন্দ করিতাম না)।
যাহাদের অর্থ আছে, তাহাদের প্রত্যেক লোকেরই আয়ের দশমাংশ দেবসেবায় দান করা কর্ত্তব্য, ইহা যে আমি পাঠ করিয়াছি তাহা আমার বেশ মনে আছে। এই কথা স্মরণ করিয়াই আমার অত্যন্ত দুঃখ হইত; কারণ, আমি হাত-খরচার জন্য যে সামান্য কিছু পাইতাম তাহার দশমাংশ অতি অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু আমি ভুলিয়া যাইতাম যে, দানের পরিমাণ নহে, পরন্তু দানের উদ্দেশ্যই, ঈশ্বরের সন্তোষের কারণ। অন্তরদর্শী ভগবান্ অন্তর দেখেন, এবং এক পেয়ালা শীতল জল বা বিধবার সামান্য দানও তাঁহার দৃষ্টি এড়াইতে পারে না। এই বিষয়ে আমার যে দুর্ব্বলতা ছিল, তাহাও তিনি জানিতেন। ঈশ্বর ক্ষমাশীল ও করুণাময়, তিনি সহজে রাগ করেন না। তিনি আমাকে ভালবাসিতেন, এবং জীবনপথে পরিচালিত করিতেন। আমার হাতের অবস্থা তখনও খুব খারাপ ছিল। তবুও কিন্তু আমি বাড়ীতে চলাফেরা করিতে পারিতাম।
১৮৭২ সনে আমি খুব পীড়িত হইয়া পড়ি। তাহার পর আমার হাতে ও বাহুতে বিসর্প রোগ (Erysipelas) দেখা দিল। আমি ডাক্তার ‘আর’এর চিকিৎসায় একটু ভাল হইবার পর, দুই হাতেই আমার আঙূল- হাড়া (whitlows) হইল। ইহাতে এত অসহ্য যন্ত্রণা হইল যে, আমি দিন রাত্রি কেবল পায়ের উপরই থাকিতাম; তাহাতে পায় ফোস্কা পড়িল। ইহার মধ্যে আবার কিছু দিন আমার মাথায় খুব যন্ত্রণা হইল (neuralgia)—তখন আমি আর চলিতে পারিতাম না। আমার শারীরিক যন্ত্রণা এত অধিক হইয়াছিল যে, আমি বার বার মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করিয়াছি। কিন্তু তখন ভাবি নাই যে, ঈশ্বর আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিলে কি হইত। তথাপি, তিনি আমাকে এত ভালবাসেন, এবং আমার প্রতি তাঁহার এত করুণা যে, তিনি আমার প্রার্থনা অপূর্ণ রাখিয়া আমাকে আবার দাঁড় করিয়া তুলিলেন।
১৮৭৫ সনে চিকিৎসক আমার ডান হাতের সমস্ত কয়টি এবং বাম হাতের দুইটি নখ তুলিয়া ফেলিলেন। তাহাতে ভীষণ যন্ত্রণা হইল। নখ তুলিবার পূর্ব্বে ক্লোরোফর্ম (chloroform) প্রয়োগ করিতে হইয়াছিল। ইহার পর আমার অবস্থা এত খারাপ হইল যে, আমাকে কয়েক সপ্তাহ শয্যাশায়ী হইয়া থাকিতে হইয়াছিল। তাহার পর একটু ভাল হইলে, আবার আমার বিসর্প রোগ (erysipelas) দেখা দিল। আমার দক্ষিণ হস্ত ও বাহুর অবস্থা ভীষণ হইল। ডাক্তার বলিলেন, আমার আরোগ্যলাভের কোন আশা নাই।
আমার আত্মার কল্যাণের জন্য আমি অত্যন্ত আকুল হইলাম। আমি জানিতাম যে, ঈশ্বরের সম্মুখীন হইবার জন্য আমি প্রস্তুত হই নাই। যে-কোন ধর্ম্মপুস্তক আমার হাতে আসিত, তাহাই পাঠ করিয়। আপনাকে প্রস্তুত করিবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলাম। কিন্তু ইহা আমার অত্যন্ত ভুল হইল। আমি সর্ব্বদা আবেগপূর্ণ প্রার্থনা করিতাম, অপরের প্রতি ভাল ও সদয় ব্যবহার করিতে চেষ্টা করিতাম, এবং পারিলেই তাহাদিগকে সাহায্য করিতাম। চলাফেরা করিতে পারিলেই, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্ম্মপুস্তক বিতরণ করিতাম। তাহা আমার খুব ভাল লাগিত। আমি যে এতটা অন্ধ হইয়াছিলাম, তাহা নিতান্তই অদ্ভুত মনে হয়। সাধু কর্ম্মে আমাকে সাহায্য করিতে ও সান্ত্বনা দান করিতে পারিবে!
যখন চলাফেরা করিতে পারিতাম, তখন কোন প্রকারে আপনাকে সুখী মনে করিতাম। কিন্তু তখনও প্রকৃত সুখ পাই নাই। রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী আমার আদর্শ দেবীমূর্ত্তি ছিলেন। মনে হইত, যদি আমি তাঁহার মতন ভাল হইতে পারি, তাহা হইলে আমি সুখী হইব, ও আমার কোন ভয় থাকিবে না। আমি তাঁহাকে কত ভালবাসিতাম! আমি অনেক সময় খুব প্রত্যূষে শয্যা হইতে উঠিয়া, অদূরে অবস্থিত তাঁহার বাসভবনের নিকট গমন করিতাম, এবং তাঁহার বাড়ীর সম্মুখে কিছুকাল পায়চারি করিতাম। এরূপ করিতে করিতে যদি জানালার ফাঁকে তাঁহাকে দেখিতে পাইতাম, তবে সেই দিনের মতন পরিতৃপ্ত হইয়া বাড়ী ফিরিতাম।
১৮৭৬ সনে আমি ডাক্তার ম্যাক্-এর নিকট গিয়াছিলাম। তিনি একজন খাঁটি খ্রীষ্টান। তিনি আমাকে পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, ডাক্তার ‘আর’ যে বলিয়াছেন “আরোগ্যলাভের কোন আশা নাই”, তাহা তাঁহারও সত্য বলিয়াই আশঙ্কা হয়। তিনি যে কিরূপ আবেগের সহিত আমাকে ইহা বলিয়াছিলেন, তাহা আমি কখনও ভুলিব না। তাঁহার কথা শুনিয়া মনে হইল, তিনি আমার একজন প্রকৃত বন্ধু; আমি তাঁহাকে আমার দুঃখের কথা কিছু বলিলাম। স্বয়ং ঈশ্বরই আমার হাত ধরিয়া আমাকে আমার বিশ্বস্ত বন্ধুর নিকট লইয়া গিয়াছিলেন।
যদিও আমার হাতের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হইল, এবং বস্ত্র-বন্ধনী দ্বারা (sling) তাহা ঝুলাইয়া রাখিতে হইত, তবুও কিছুদিন পরে আমার স্বাস্থ্য একটু ভাল হইল। তাহার পর হাতও একটু ভাল হইল, আর ঝুলাইয়া রাখিতে হইত না, এবং সময় সময় একটু ব্যবহার করিতেও পারিতাম।
আমার এত ঘন ঘন অসুখ করিত যে, আমার পক্ষে নিয়মিত রূপে রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের কাজ করা অসম্ভব হইল; কিন্তু আমি সর্ব্বদাই আমার পরম প্রিয় শিক্ষয়িত্রীর চিঠি পাইতাম। তাঁহার যে চিঠি পাঠে আমি যীশুকে পরিপূর্ণ ভাবে গ্রহণ করিতে সংকল্প করিয়াছিলাম, তাহা হইতে একটু উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি:
সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬
প্রিয় এইচ.—তুমি ঈশ্বরের সেবা করিবে কি সাংসারিক জীবের ন্যায় বৈষয়িক পথে চলিবে, ইহা নির্দ্ধারণ করিবার যথেষ্ট সময় সমুপস্থিত হইয়াছে বলিয়া কি তুমি মনে কর না? এই কথা স্মরণ রাখিও যে, পার্থিব সুখ আপাত মধুর হইলেও, তাহাতে আত্মার ক্ষুধা মিটে না, এবং দুঃখ বিপদে তাহা কোন কাজে লাগে না।
তাহার পর, তুমি চিন্তা করিয়া দেখ যে, ঈশ্বর এবং যীশু তোমার কি করিতে পারেন। এই কথাও স্মরণ কর যে, তিনি কি ভাবে তোমার পাপের শাস্তি ভোগ করিয়া, দেহত্যাগপূর্ব্বক পুনরুত্থিত হইয়া ঈশ্বরের আশ্রয় লাভ করিয়াছেন, এবং পাপীর উদ্ধারের সাহায্য করিতেছেন; এবং তুমি যদি তাঁহার শরণাপন্ন হও, তাঁহাতে নির্ভর কর, এবং তাঁহাকে তোমার মুক্তিদাতা বলিয়া বিশ্বাস কর, তাহা হইলেই তিনি তোমাকে গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছেন, ও তজ্জন্য অপেক্ষা করিতেছেন।
তাঁহার শরণাপন্ন হইয়া দেখ, তিনি কি মধুময়। আমাদের মতন তিনিও নানা প্রলোভনে প্রলুব্ধ হইয়াছিলেন বলিয়াই, এমন দয়ালু ও বিশ্বস্ত প্রধান পুরোহিতরূপে মানবীয় দুর্ব্বলতায় ব্যথিত হইয়া পড়েন।
এখনই স্থির কর, তুমি কাহার সেবা করিবে; কারণ, বর্ত্তমান মুহূর্ত্তই একমাত্র উপযুক্ত সময়, ইহাই মুক্তির শুভ মুহূর্ত্ত। এই বিষয়টি মীমাংসা করিতে বিলম্ব করিও না; কারণ, তুমি জান না যে, এক দিনে অথবা এক ঘণ্টায় কি ঘটিতে পারে, এবং যীশুকে স্বীকার না করা পর্য্যন্ত তুমি প্রকৃত সুখ শান্তি লাভ করিতে পার না।
তাঁহারই সম্পাদিত কাজে সরল বিশ্বাস স্থাপন করিয়া, তুমি যেমন আছ ঠিক্ সেই অবস্থাতেই তাঁহার নিকট এস।
তোমাদের সকলের জন্য ঈশ্বর-চরণে আমার এই প্রার্থনা, যেন তোমরা সকলে পরিত্রাণ লাভ করিতে পার।
তোমার স্নেহের
এল্ এম্ ম্যাক্ ই
এই চিঠিখানা পাঠ করিয়া আমি স্পষ্টই বুঝিতে পারিলাম, ইহা আমার প্রেমময় মুক্তিদাতার প্রেরিত সুসমাচার।
যীশু ব্যাকুল হইয়। আমার মুক্তির জন্য অপেক্ষা করিতেছেন, এই বিশ্বাসে তাঁহার উপর নির্ভর করা ভিন্ন আমার আর কিছু করণীয় ছিল না।
অল্পদিন পরে আমি নিম্নলিখিত চিঠিখানা পাইয়াছিলাম: প্রিয় এইচ,—রবিবার দিন আমাদের উপদেশের বিষয় ছিল ‘তুমি কতকাল কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে, ইত্যাদি’। তুমি অনুপস্থিত ছিলে বলিয়া, স্বতঃই তোমার কথা আমার মনে হইয়াছিল, এবং বিস্মিত হইয়া ভাবিয়াছিলাম যে, তুমি কোন্ পথে চলিবে তাহা কি নির্ব্বাচন করিয়াছ? আমি আশা করি, তুমি তাহা করিয়াছ।
স্নেহের এইচ, মনে রাখিও, নির্দ্ধারণে ইতস্তত করা, যীশু যে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য ব্যস্ত তাহা প্রত্যাখ্যান করার তুল্য দূষণীয়।
তুমি যদি এ বিষয়ে কোন মীমাংসা না করিয়া থাক, তাহা হইলে এখনই কর। আর দেরি করিও না।
তোমার স্নেহের
এল্ এম্ ম্যাক্
আমি সেই দিনই নির্দ্ধারণ করিয়াছিলাম। কিন্তু, নিজের শক্তিতে নহে। আমার সম্পূর্ণ দুর্ব্বলতা অনুভব করিয়া, আমি প্রার্থনা করিলাম, ‘হে পরমেশ্বর, আমাকে রক্ষা কর। আমি এত পীড়িত এবং এরূপ দুর্ব্বল যে, আমি আমাকে কোন সাহায্য করিতে অসমর্থ।’ বলিলাম, তাঁহারই সব করিতে হইবে। এই নির্দ্ধারণের পর, আমি খুব আনন্দিত বোধ করিলাম, এবং সেই সময়ের জন্য আমার কষ্ট ও গ্লানি যেন প্রায় ভুলিয়া গেলাম।
আমি অমূল্য রত্ন লাভ করিলাম, আমার চিত্ত উৎফুল্ল হইয়া উঠিল।