তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/ষষ্ঠ অধ্যায়
ষষ্ঠ অধ্যায়
১৮৯৩—১৮৯৬
আমার নিজ গৃহে প্রত্যাবর্ত্তন
‘তুমি তোমার উপদেশ দ্বারা আমাকে পরিচালিত করিবে।’
আমার মা ও বাবার সঙ্গে বাস করিবার জন্য আমি ১৮৯৩ সনের আগষ্ট মাসে বাড়ী আসিয়াছিলাম। কয়েক সপ্তাহ আমার শরীর বিশেষ ভাল ছিল না; তাহার পর একটু ভাল হওয়াতে আমি গাড়ী করিয়া বেড়াইতে সমর্থ হইয়াছিলাম, এবং অনেকবার রোগীর চৌকীতে করিয়া (invalid chair) আমাকে: সমুদ্রতীরে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। আমার আবার সমুদ্র দেখিবার একান্ত আগ্রহ হইয়াছিল বলিয়া, ঈশ্বর আমার সনির্ব্বন্ধ প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছিলেন।
১৮৯৪ সনের মে মাসে এক সপ্তাহের জন্য আমি গ্রামে গিয়াছিলাম, কিন্তু সেখানে গিয়া আমার শরীর বিশেষ ভাল ছিল না। ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ আমার মস্তিষ্কে রক্তবৃদ্ধিহেতু খুব অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছিলাম, এবং আমার দক্ষিণ বাহুমূলও খুব কষ্ট দিতেছিল। ডাক্তার ‘আর’ তখনও আমার চিকিৎসা করিতেছিলেন, এবং তিনি আমার প্রতি খুব সদয় ছিলেন।
১৮৯৫ সনের এপ্রিল মাসের শেষ পর্য্যন্ত একাদিক্রমে আমি পীড়িত ছিলাম। মে মাসে দুই সপ্তাহের জন্য আমাকে গ্রামে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। ডাক্তার ‘আর্’ মেলবোর্ণ পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন।
আমার ফিরিয়া আসিবার পর, আমার দক্ষিণ বাহুর কনুইর কাছে আবার ব্যারামের সূত্রপাত হইয়া সেই স্থানটা বিবর্ণ হইয়া গিয়াছিল। অপরাপর খারাপ উপসর্গ দেখিয়া আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম, শীঘ্রই অস্ত্রোপচার করিতে হইবে। ইহা জুন মাসের কথা। (আমার আত্মীয়েরা উদ্বিগ্ন হইবেন বলিয়া, আমি তাঁহাদিগকে এই সকল কথা কিছু বলি নাই।) আমার সমূহ বিপদ্ সমুপস্থিত; ডাক্তার ‘আর্’এখানে নাই, এবং অন্য চিকৎসককে ডাকিবার মতনও আমার সঙ্গতি নাই। ঈশ্বরালোক লাভ করিবার জন্য আমি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। আমার মনে হইতেছিল, হোমিওপ্যাথিক হাসপাতালে খবর লইয়া জানিব যে, সেখানে ভর্তি হওয়া আমার পক্ষে সম্ভবপর হইবে কি না।
যখন আমি কার্য্যসিদ্ধির জন্য এইরূপ প্রণালীর কথা ভাবিতেছিলাম, তখন ঈশ্বর সত্যই আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়া আমাকে পরিচালিত করিতেছিলেন! আমাকে দেখিবার জন্য, সেই দিন সন্ধ্যাকালে, আমার প্রিয় বন্ধু ‘এইচ্’ আসিয়াছিলেন। আমার রোগের এই বিশেষ উপসর্গের কথা তিনি জানিতেন না। আমি তাঁহাকে আমার সকল কথা বলিলাম। তিনি হাসপাতাল সম্বন্ধে আমার জ্ঞাতব্য সকল বিষয়ের সংবাদ অবিলম্বেই লইবেন, বলিলেন। পরদিন তিনি আমাকে চিঠি লিখিয়া জানাইলেন, যে-কোন দিন আমাকে হাসপাতালে ভর্ত্তি করা হইবে।
মিঃ ‘এইচ’ তাঁহার প্রিয় বন্ধু ডাক্তার ‘সি’কে আমার কথা বলাতে তিনি খুব আগ্রহান্বিত হইয়া আমাকে দেখিবার প্রস্তাব করিলেন। ডাক্তার ‘সি’ তাঁহার একজন ডাক্তার বন্ধু ‘এইচ’কে সঙ্গে লইয়া আমাকে একদিন দেখিতে আসিয়াছিলেন। তাঁহারা উভয়েই আমার অপরিচিত ছিলেন। আমাকে পরীক্ষা করিয়া তাঁহারা আমার চিকিৎসার ভার লইলেন। তাঁহারা আমার বাহুখানা রক্ষা করা যাইতে পারিবে বলিয়া কোন আশা দিলেন না। কিন্তু সপ্তাহ দুই এই ভাবে চলিতে পারে বলিলেন। ডাক্তার ‘এইচ্’ প্রতিদিন, এবং ডাক্তার ‘সি’ মাঝে মাঝে, আমাকে দেখিতে আসিতেন। ক্রমেই আমার বাহুর অবস্থা খারাপ হইতে লাগিল, এবং ২রা জুলাই তাঁহারা বলিলেন, আমার পক্ষে হাসপাতালে যাওয়াই ভাল; কারণ, যত শীঘ্র সম্ভব অস্ত্রোপচার করিতেই হইবে। হাসপাতালে যাইবার নামে আমি অত্যন্ত ভীত হইলেও, বাহ্যিক প্রসন্নতা রক্ষা করিতে চেষ্টা করিলাম, যেন আমার আত্মীয় বন্ধুরা উদ্বিগ্ন না হন।
৩রা জুলাই অপরাহ্ণ ৪ ঘটিকার সময় আমাকে হোমিওপ্যাথিক হাসপাতালে ভর্তি করা হইয়াছিল। ইহার অল্পক্ষণ পরেই মিঃ ‘এইচ’ আমাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন। ইহা তাহার পক্ষে খুব সদ্বিবেচনার কাজ হইয়াছিল; কারণ, তিনি জানিতেন, আমি হাসপাতালে আসার নামে কত শঙ্কিত ছিলাম। সায়ংকালে আমার বাহু পরীক্ষার জন্য দুইজন ডাক্তার আমার শয্যাপার্শ্বে উপস্থিত হইয়াছিলেন। তাঁহারা উভয়েই আমার অপরিচিত। যে-মুহূর্ত্তে আমি তাঁহাদের একজনকে দেখিলাম, তখনই মনে হইল, তিনিই ডাক্তার ম্যাকের প্রার্থিত আমার জীবনপথের সূর্য্যালোক।
আমার সকল ভয় চলিয়া গিয়াছিল। আমি পরিপূর্ণ সন্তোষলাভ করিয়াছিলাম। পরদিন আমাকে যখন অস্ত্রোপচার গৃহে (operating room) লইয়া যাওয়া হইয়াছিল, তখন আমি বাঁচি কি মরি উভয় অবস্থায়ই আমার কল্যাণ হইবে, এবং আমি নিরাপদে অবস্থিতি করিব মনে করিয়া সম্পুর্ণরূপে নিশ্চিন্ত ছিলাম।
দুই এক দিন পরে আমি আমার শুশ্রূযাকারিণী ধাত্রীকে (nurse) জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, ‘কে আমার উপর অস্ত্র-প্রয়োগ করিয়াছিলেন?’ তিনি বলিলেন, ‘ডাক্তার ‘বি’।’ তিনি আমার নিকট সূর্য্যকিরণরূপে প্রতিপাদিত হইয়াছিলেন।
ডাক্তার ও শুশ্রূষাকারিণীরা আমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলেন। সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় আমার দিন রাত্রি কাটিতেছিল, কিন্তু তাঁহারা খুব আগ্রহের সহিত আমার কর্ম্ম করিতেছিলেন। আমি তাঁহাদের যথেষ্ট প্রশংসা করিয়া শেষ করিতে পারি না।
আমি বাড়ী ফিরিবার পর ঘায়ের উপর প্রথম একটা, তাহার পর আরও তিনটা, স্ফোটক হইয়াছিল। খুব বেদনা হওয়াতে আমি অত্যন্ত দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিলাম। ডাক্তার ‘এইচ’ আবার আমার চিকিৎসা আরম্ভ করিলেন। তিনি আমার উপর এত সদয় ছিলেন যে, অনেক মাস ধরিয়া প্রতিদিনই আমাকে দেখিতে আসিতেন। তিনি এবং ডাক্তার ‘সি’ দুই জনেই আবার আমাকে হাসপাতালে যাইতে পরামর্শ দিয়াছিলেন, কিন্তু আমি তখন অত্যন্ত দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিলাম।
ডাক্তার ‘বি’কে দেখিবার আমার খুব ইচ্ছা ছিল; কিন্তু তাঁহাকে দিবার মতন যথেষ্ট অর্থ সংস্থান না থাকায়, আমি তাঁহাকে ডাকিয়া পাঠাইতে ইচ্ছা করি নাই। তিনি বার বার আমাকে বলিয়াছেন যে, তিনি আনন্দের সহিতই আমাকে দেখিতে আসিতেন, এবং আমি কেমন আছি তাহা ভাবিতেন।
১৮৯৫ সনের আগষ্ট মাসে আমার মস্তিষ্কের অসুখে আমি অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছিলাম, এবং ডিসেম্বর মাসের মধ্য ভাগের পূর্ব্বের কোন ঘটনা আমার স্মরণ নাই। সেই বৎসর এগার মাস আমি শয্যাশায়ী ছিলাম।