বিষয়বস্তুতে চলুন

তবুও আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করিব/সপ্তম অধ্যায়

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম অধ্যায়

১৮৯৬

আরও বাধা বিঘ্ন অতিক্রম

“আমি যীশুর বলে বলীয়ান্ হইয়া সকল কর্ম্মই করিতে সমর্থ”

 ১৮৯৬ সনের জানুয়ারী মাসে আবার আমার পূর্ণ জ্ঞান হইয়াছিল, এবং তাহার অল্প পরেই প্রতিদিন আমি একটু একটু বসিতে পারিতাম। ইহার পর আমার দক্ষিণ পদ বিবর্ণ হইয়া যায়, ও তাহাতে খুব বেদনা হইয়াছিল। এই পা খানা রক্ষা করা যাইবে বলিয়া ডাক্তার ‘এইচে’র বড় আশা ছিল না। আমার আবার সমূহ বিপদ্ উপস্থিত, আমি প্রার্থনা করিয়াছিলাম যে, ইহা যেন রক্ষিত হয়।

 ঠিক্ এই সময় মার্চ্চ মাসে আমার জনৈক মহিলা বন্ধু লিখিয়াছিলেন যে, ডাক্তার ‘বি’র সঙ্গে তাঁহার দেখা হওয়াতে তিনি তাঁহাকে আমার কথা বলিয়াছিলেন (পূর্ব্বে তাঁহাকে আমার কথা বলেন নাই)। ডাক্তার ‘বি’ আমার প্রতি খুব অনুরাগ দেখাইয়া তাঁহাকে আমার ঠিকানা জানাইবার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন। আমি এ কথা শুনিয়া আনন্দিত হইয়াছিলাম, এবং অবিলম্বে তাঁহাকে আমার ঠিকানা জানাইয়াছিলাম। ঈশ্বর আমাকে আশ্চর্য্য পথে লইয়া যাইতেছেন। বড় আশ্চর্য্যের বিষয় যে, তার পর দিনই হঠাৎ ডাক্তার ‘বি’ আমাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন। অনেকক্ষণ তাঁহার সঙ্গে আমার কথা বার্ত্তা হইয়াছিল; তিনি আমার চিকিৎসার ভার লইতে প্রস্তুত হইলেন। আমি আমার অবস্থার কথা তাঁহাকে জানাইলাম, তাহাতে তিনি বলিলেন যে, বন্ধুভাবেই আমার চিকিৎসা করিবেন। পরন্তু, ডাক্তার ‘এইচ’কে এ কথা বলাতে তিনিও সুখী হইয়াছিলেন। কাজেই আমি আনন্দের সহিত ডাক্তার ‘বি’র প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছিলাম। তাহার পর থেকে তিনি সর্ব্বদাই আমার চিকিৎসা করিয়া আসিতেছেন, এবং তাহা সফলতার সহিত সম্পন্ন করিয়াছেন। আমার পা খানা এখনও ভাল আছে। বিবর্ণতা চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও খুব বেদনা আছে। আমি এক বারও অজ্ঞান হ‍ই নাই। অথবা আমার উপর আর কোনও অস্ত্রোপচার হয় নাই। আমার মস্তিষ্ক ও অন্যান্য স্থানে বেদনা আছে সত্য, কিন্তু আমার জটিল ব্যারামের তুলনায় তাহা সামান্য।

 তিনি অনেক কাল হইতে আমার নিকট অবিচলিত সূর্য্যকিরণ হইয়া রহিয়াছেন, এবং এখনও তেমন আছেন। তিনি যে অনেক সময় শুধু আমার শরীরের যন্ত্রণা দূর করেন তাহা নহে, কিন্তু তাঁহার হাসিমুখের উৎফুল্ল কথা দ্বারা বার বার আমাকে নূতন আশায় অনুপ্রাণিত করেন—সকল দিক দিয়া তিনি আমার একজন খাঁটি বন্ধু। ভগবানের এইরূপ করুণা তাঁহার দৈনন্দিন প্রেমের পরিচয় দেয়, এবং ইহাও জানাইয়া দেয় যে, বহু বৎসরের প্রতীক্ষার পর কি ভাবে প্রার্থনার উত্তর আসে। ১৮৯৬ সনে ডাক্তার ‘এইচ’ও মাঝে মাঝে আমাকে দেখিতে আসিতেন।

 যদিও আমি অনেক কষ্ট পাইয়াছি, বহু আপদ্‌ বিপদের ভারী বোঝা বহন করিয়াছি, এবং নিরাশায় অনেক বার মুহ্যমান হইয়াছি, তবুও কিন্তু আমার প্রেমময় রক্ষাকর্ত্তা এক মুহূর্ত্তের জন্যও আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই। কেন যে তিনি আমাকে ঝটিকাচ্ছন্ন বন্ধুর পথে পরিচালিত করিয়া আনিয়াছেন, তাহার মর্ম্ম উপলব্ধি করা সুকঠিন হইলেও, আমি এই বিষয়ে সংশয়শূন্য যে, তিনি প্রেমেই আমাকে সর্ব্বদা পরিচালিত করিয়াছেন।

 পিতা আমাকে ভালবাসেন। তাঁহার দয়াতেই ডাক্তার ও বন্ধুদের চিত্তে আমার প্রতি খুব ভাল ও সদয় ব্যবহার এবং নানা ভাবে আমাকে সাহায্য করিবার ইচ্ছা জাগ্রত হুইয়াছে। আমার দুঃখ নিবৃত্তি এবং তাহার গুরু ভার লঘু করিবার জন্য যে-সকল উপায় অবলম্বন করা হয়, তাহার উপরও পিতার শুভ আশীর্ব্বাদ বর্ত্তমান।

 আমি বলিতে পারি, “নিশ্চয়ই দয়া ও মঙ্গলভাব আমার জীবনের নিত্য সঙ্গী হইয়া রহিয়াছে।”

তিনি আমাকে সঙ্গে লইয়া চলিয়াছেন

 ‘শ্যামল গোচারণ-ভূমিতে?’ না, সর্ব্বদা নহে; কিন্তু যিনি আমাকে সর্ব্বাপেক্ষা ভাল করিয়া জানেন, তিনি তাঁহার দয়াতেই মাঝে মাঝে আমাকে দুঃখ কষ্টের মধ্যে পাতিত করেন,—যেখানে শুধু গভীর অন্ধকারই বর্তমান। সূর্য্যকিরণ হইতে—উত্তপ্ত, সুকোমল এবং উজ্জ্বল সূর্য্যকিরণ হইতে—লইয়। যান, তমসাচ্ছন্ন রজনীতে। আমি দুঃখ ও ভয়ে পুনঃপুনঃ মুহ্যমান হইয়া পড়িতাম, যদি আমি না জানিতাম যে, তিনি আমার হাত (বাহু) ধরিয়া রহিয়াছেন; অতএব, সবুজ ক্ষেত্রেই থাকি, আর মরুভূমিতেই যাই, সকল অবস্থায়ই আমি তাঁহার উপর নির্ভর রাখি,— যদিও সকল সময় আমি তাহা বুঝিতে না পারি।

 ‘এবং স্থির স্রোতস্বতীর তীরে?’ না, সর্ব্বদা এইরূপ হয় না; সময় সময় অবসাদজনক ঝড় আমার চতুর্দ্দিকে প্রবাহিত হয়, এবং আমার মাথার উপর দিয়া উত্তাল তরঙ্গমালা চলিয়া যায়; কিন্তু, যখন প্রচণ্ড বেগে ঝড় আঘাত করে, এবং আমি সাহায্যপ্রার্থী হইয়া উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করি, তখন আমার প্রভু নিকটে দাঁড়াইয়া আমার প্রাণের কাণে কাণে মৃদুস্বরে বলেন, ‘দেখ, এই যে আমি’। ঝড়ের বিকট গর্জনের উর্দ্ধে আমি তাঁহাকে বলিতে শুনি, ‘এই অন্ধকারের পরপারে সুন্দর দিন অবস্থিত, এবং তোমার সকল যাত্রা-পথেরই পরিচালক আমি।’

 অতএব, উন্নত এবং সুন্দর শৈল-শিখরে, অথবা সূর্য্যালোকবিরহিত অন্ধকারময় উপত্যকাভূমিতে, যেখানেই আমি বাস করি না কেন, তাহাতে কি আসে যায়? তিনি সেই স্থানেই অবস্থিত আছেন, এবং ইহা অপেক্ষা বড় কথা এই যে, আমার সকল গন্তব্যপথেই তিনি আমাকে দুর্ব্বল ভঙ্গপ্রবণ যষ্টির উপর নির্ভর করিতে দেন না, পরন্তু নিজের হাত বাড়াইয়া দেন, যাহা আমার প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট। সুতরাং, যেখানেই তিনি লইয়া যাউন, আমি নিশ্চিন্তমনে সেখানে যাইতে পারি। এবং অতঃপর স্বর্গে আমি জানিতে পারিব, কেন তিনি তাঁহার পূর্ণ জ্ঞানে আমাকে এই ভাবে পরিচালিত করিয়াছেন।

(ক্ষুদ্র পত্রী হইতে সংগৃহীত)

 ইহা বাস্তবিকই বিস্ময়কর যে, ঈশ্বর কেমন সযত্নে ও সপ্রেমে আমাকে পথ দেখাইয়া লইয়া চলিয়াছেন।

 সর্ব্বাপেক্ষা দুর্ব্বিষহ পরীক্ষাসকলের মধ্যে আমার দক্ষিণ বাহুর কনুইখানা হইতে বঞ্চিত হওয়া অন্যতম; কারণ, ইহার সাহায্যে আমি সহজে লিখিতে শিক্ষা করিয়াছিলাম, এবং স্বয়ংসাধিত বীণাও (auto harp) একটু বাজাইতে পারিতাম। আমার নিজের চিত্ত-বিনোদনের জন্য ছিদ্রীকৃত মোটা কাগজ হইতে বুক-মার্ক কাটিতে এবং কাঁটা কিংবা চামচের সাহায্যে খাদ্য গ্রহণ করিতে, পারিতাম। কিন্তু, কনুইখানা না থাকিলে, কিছু করা অসম্ভব বলিয়াই মনে হইয়াছিল।

 সে যাহা হউক, হাসপাতালে থাকাকালীন আমি এই সঙ্কল্প করিয়াছিলাম যে, যদি এই যাত্রা বাঁচিয়। উঠি, তাহা হইলে, আর কিছু না হইলেও, লিখিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিব, এবং এই জন্য তাঁহার আলোক-প্রার্থী হইয়াছিলাম। খুব অসুস্থ থাকায়, ১৮৯৬ সনের ফেব্রুয়ারী পর্য্যন্ত আমার বিশেষ কোন উদ্বেগ হয় নাই; তাহার পর একটু ভাল বোধ করাতে আমার লিখিতে ইচ্ছা হইয়াছিল। যে সকেট্স্ (sockets—সন্ধিস্থলের কোটর) গুলি আমার ছিল, এবং যেমন অবস্থায় ছিল, তদ্দ্বারা আমার কোনও কাজ হইবে না, এবং নূতন সকেট্স্ ক্রয় করিবার মতন যথেষ্ট টাকাও আমার ছিল না। আমি কারিগরকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, পুরাতন ‘সকেট্স্’গুলি পরিবর্তিত করিয়া দিতে পারিবে কি না? প্রত্যুত্তরে সে বলিল, তাহা পারিবে না; কিন্তু পুরাতন ‘সকেট্স্’গুলি যথাসম্ভব কাজে লাগাইয়। কাজটা সস্তায় করিয়া দিতে পারিবে। তাহার উপযুক্ত অর্থও এখন আমার হাতে ছিল না। আমি তাহাকে এই কথা না বলিয়া, কিছু অগ্রিম টাকা দিলাম, এবং একটা ‘সকেট্’ করিয়া দিবার আদেশ প্রদান করিলাম। কিন্তু উহা নির্ম্মিত হইবার পূর্ব্বেই আমার হাতে এত টাকা আসিয়া জুটিল যে, তাহাতে দুইটার মূল্য দেওয়া চলে। আবার প্রার্থনার উত্তর পাইয়াছিলাম। আমার একজন সুচতুর দয়ালু বন্ধু আমার কলম, চামচ ও অন্যান্য যন্ত্রাদি পরিবর্ত্তিত করিয়া দিয়াছিলেন, এবং আমার জন্য একটি নূতন কাঁটা প্রস্তুত করিয়াছিলেন। ঠিক্ ভাবে বক্রতার নক্সা করা বড় কষ্টকর কাজ। আমি শীঘ্রই লিখিতে শিখিয়াছিলাম। কিন্তু, ইহা বড় কঠিন, এবং ইহাতে আমি বড় ক্লাস্ত হইয়া পড়ি; যেহেতু, আমার কনুই নাই এবং তাহার উপরের অবশিষ্ট অংশটাও অত্যন্ত ছোট। তথাপি, আমার কলমের দিকে তাকাইলেই মনে হয়, ‘ঈশ্বর প্রেমস্বরূপ’, এবং তিনি প্রার্থনা শোনেন ও তাহার উত্তর দেন। আমি মাঝে মাঝে নিজে খাদ্য গ্রহণ করিতে পারি, কিন্তু সর্ব্বদা পারি না; কারণ, তাহা লিখার অপেক্ষা কঠিন। যখন আমি বসিতে সমর্থ হই, তখনই একটু লিখি, এবং ইহা আমার সকল শ্রেষ্ঠ আনন্দের অন্যতম। ঈশ্বর প্রেমস্বরূপ।

 হাসপাতালে থাকাকালীন সেখানকার ডাক্তার বলিয়াছিলেন, একখানা কৃত্রিম পা হইলে আমার খুব উপকার হইবে, এবং হয়ত বা তাহাতে আমার ডান পা খানাও রক্ষা করা যাইতে পারিবে। ইহা বহু ব্যয়সাধ্য বলিয়া, তখন আমি আর এ সম্বন্ধে কিছু বলি নাই; কিন্তু ১৮৯৬ সনের ১লা ফেব্রুয়ারী যখন আমার ডান পায়ের অবস্থা খুব খারাপ হইয়াছিল, সেই সময় একজন কারিগর স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া অল্প মূল্যে একখানা কৃত্রিম পা প্রস্তুত করিয়া দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিল। তখন আমি আমার ডান পা খানা রক্ষা করিবার জন্য আমার দুইজন বন্ধু মিঃ এইচ্‌, এবং কুমারী এইচ্‌ কে এই কথা বলিয়াছিলাম। তাঁহারা এবং আরও কয়েক জন সহৃদয় বন্ধু, জুন মাসে আমার জন্য একখানা কৃত্রিম পা করাইয়া দিলেন। আমি ইহার জন্য বাস্তবিকই খুব কৃতজ্ঞ। ইহা খুব আরামপ্রদ, খুব হাল্‌কা এবং আমার একটি মূল্যবান সম্পদ। বসিয়া থাকালীন আমার কনুইর উপরের অবশিষ্ট অংশটা (stump) খুব বিশ্রাম পায়। আমি আশা করিতেছি, হয়ত ঈশ্বরকৃপায় পঙ্গু-যষ্টির (crutches) সাহায্যে কোন দিন আমি একটু হাটিতে সমর্থ হইব। ইহাতে ডাক্তার ‘বি’ আমাকে খুব উৎসাহিত করেন, অন্ততঃ ঘরের চারিদিকে হাটিতে বলেন। যদি তাহা না-ও করিতে সমর্থ হই, তবুও আমি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট; কারণ, আমি জানি, ঈশ্বর আমাকে কোনও ভাল জিনিষ হইতে বঞ্চিত করিবেন না, এবং যদি তিনি আমাকে হাটিতে অক্ষম করেন, তবে তাহা তাঁহার মঙ্গল ইচ্ছায়ই হইবে। অসংখ্য করুণার জন্তু আমার কৃতজ্ঞ হইবার অনেক বিষয় আছে। আমি বার বার তাহা গণনা করিতে চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু উহা অসম্ভব। যদিও আমি স্বাস্থ্য শক্তি এবং হাত পা হইতে বঞ্চিত, তবুও তাঁহার করুণা অসংখ্য। পূর্ব্বাপেক্ষা যীশু এখন আমার অধিকতর প্রিয়; এইরূপ প্রিয় তিনি কখনও ছিলেন না। তিনি আমাকে শান্তি ও প্রকৃত সুখ প্রদান করেন; তিনি কখনও আমা হইতে দূরে থাকেন না, অথবা আমাকে পরিত্যাগ করেন না; তিনি আমাকে তাঁহার কথা বলেন, আমিও তাঁহাকে আমার কথা বলি। ‘যীশুর সঙ্গে একটু আলাপে, সকল প্রকার বিপদ্ পরীক্ষা ঠিক হইয়া যায়’। ‘শীতে, গ্রীষ্মে, রৌদ্রে, বৃষ্টিতে তাহার প্রেম এবং ভালবাসা সর্ব্বদা একই রূপ।’ ‘প্রভুর উপর তোমার ভার অর্পণ কর, তিনি বল দিবেন।’ ‘তিনি জানেন, ভালবাসেন এবং যত্ন করেন।’ নিয়মানুযায়ী প্রার্থনার প্রয়োজন হয় না। আমার ছোট বড় সকল দুঃখের কথা তাঁহাকে বলিলেই হইল। তিনি সর্ব্বদাই প্রস্তুত আছেন, এবং আমার প্রার্থনা শুনিবেন ও তাহা পূর্ণ করিবেন, এইরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। আমি প্রার্থনার কতকগুলি আশ্চর্য্য উত্তর পাইয়াছি। কোন কোনটার উত্তর খুব তাড়াতাড়ি, আবার কোনটার উত্তর অনেক মাস, এমন কি, অনেক বৎসর প্রতীক্ষার পরও, পাইয়াছি। কখনও আমি যাহা চাহিয়াছিলাম, ঠিক্ তাহাই পাইয়াছি, আবার অনেক সময় তাহ। সম্পূর্ণ ভিন্ন আকারেও আসিয়াছে। কাজেই মাঝে মাঝে আমি ভাবিয়াছি, আমার প্রতি এইরূপ ব্যবহার অতি নিষ্ঠুরতার কার্য্য হইয়াছে। ঈশ্বর কি আমার প্রার্থনা ভুলিয়া গিয়াছেন? কেন আমার জন্য এত দুঃখভোগের বিধান? কু-বুদ্ধি কেমন করিয়া দুর্ব্বলতার সুযোগ গ্রহণ পূর্ব্বক আমাদের চিত্তে এই সমস্ত চিন্তার উদ্রেক করে! আমার মনে হয়, প্রার্থনাপূর্ণ অন্তরে, প্রার্থনার শান্ত উপত্যকায়, ঈশ্বর-চরণে এইরূপ চিন্তাসকল উপস্থিত করাই তাহাদের প্রতিরোধের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র উপায়। তিনি আমার সকল দুঃখ বেদনা ও অবসাদের কথা জানেন, এবং অনেক সময় আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিলে যে মঙ্গলের পরিবর্তে আমার অমঙ্গলই হইবে, তাহাও জানেন। ‘যাহারা তাঁহার হাতে নিজেদের সকল ভার ছাড়িয়া দেয়, তিনি তাহাদিগকে তাঁহার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ দানই প্রদান করেন।’ তবুও আমি নির্ব্বোধের মতন মনে করিয়াছি, তিনি নিষ্ঠুর, আমাকে ভালবাসেন না, এবং কতবার আমার নিজের ভার তাঁহার উপর ছাড়িয়া দিতে সম্পূর্ণ ইচ্ছুক হই নাই! তিনি বলেন, ‘আমার দৃঢ় বাহুর উপর ভাল করিয়া ভর দেও’। অতীতে অনেক সময় তাঁহার সাহায্য ভিন্ন কাজ করিতে চেষ্টা করিয়া সর্ব্বদাই বিফলমনোরথ হইয়াছি, এবং বুঝিয়াছি যে, আমি সম্পূর্ণ দুর্ব্বল, কিন্তু তাঁহার করুণা সকল সময়েই যথেষ্ট। এখন আমি যীশুকে আঁকড়াইয়া ধরিয়াছি। তাঁহার সাহায্য ভিন্ন কোন বিপদ্ কি দুঃখ আমি এক মুহূর্তের জন্যও বহন করিতে পারি না, এমন কি, মুহূর্ত্তের জন্যও তাহা সহ্য করিতে পারি না। দিবা নিশি সকল সময়ই তাঁহাকে ‘প্রার্থনার শান্ত উপত্যকায়’ পাওয়া যায়।

নিঃসঙ্গ, পরিশ্রান্ত, শোকে জর্জরিত মানব আত্মা তথায় ভ্রমণ করিতে এবং শান্তিলাভ করিতে পারে; অথবা, সেই পবিত্র প্রার্থনার উপত্যকায় জীবন-সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হইতে সমর্থ হয়। অহো, প্রার্থনার শান্ত ও সুমিষ্ট উপত্যকা! সেই উপত্যকা ঐশ্বরিক শান্তির সুগন্ধে ভরপূর।

শোকে ও যন্ত্রণায় কতবার আমি অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছি! এইরূপ অবস্থায় আমি প্রার্থনার সাহায্য অবলম্বন করি, এবং আমার দুঃখ পরীক্ষা বহনে ধৈর্য্য প্রাপ্ত হই। একবার আমি যখন কাহারও বাক্যবাণে বিদ্ধ হইয়াছিলাম, তখন আমার একজন প্রকৃত বন্ধু বলিয়াছিলেন, ‘এই প্রার্থনায় তোমার মনোকষ্ট দূর হইবে—যীশু যেমন প্রার্থনা করিয়াছিলেন তেমনি প্রার্থনা কর, “হে পিতঃ, তাহাদিগকে ক্ষমা কর, কারণ, তাহারা কি করিতেছে তাহা জানে না”।’ কখনও কখনও দেখা যায়, অপরকে আঘাত দিবার যাহাদের কোনও ইচ্ছা নাই, তাহারাই অজ্ঞাতসারে চিন্তাহীন বাক্য ও কর্ম্ম দ্বারা অপরের কি গভীর মনোবেদনার কারণ হয়! আমি সত্যভাবে প্রমাণ পাইয়াছি, কেমন করিয়া এইরূপ প্রার্থনা করা মাত্রই মনোবেদনা দূর হইয়া যায়। যীশু তাঁহার শত্রুদের জন্য প্রার্থনা করিয়াছেন, কিন্তু আমাদের মধ্যে কদাচিৎ কেহ সেইরূপ সর্ব্বান্তঃকরণে তাহা করিতে পারে; যাহাদিগকে আমরা ভালবাসি, অথবা যাহাদের প্রতি আমরা অনুরক্ত, তাহাদের জন্যই আমরা প্রার্থনা করিতে পারি। এইরূপ প্রার্থনায় সত্যই আনন্দ আছে। কিন্তু, যাহারা আমাদিগকে নির্যাতন করে, অথবা কষ্ট দেয়, তাহাদের জন্য আমরা কতবার প্রার্থনা করি?