ত্রিপুরার স্মৃতি/জগন্নাথ দীঘী ও পুরাণ রাজবাড়ী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন




জগন্নাথ দীঘী ও পুরাণ রাজবাড়ী

 কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ দিগ্বর্ত্তী “চৌদ্দগ্রাম" পরগণার দক্ষিণদিকে ন্যূনাতিরেক ৮ মাইল দূরে “তিষ্ণা" পরগণার মধ্যে “জগন্নাথ দীর্ঘী” নামে প্রসিদ্ধ এক সুবিস্তীর্ণ সরোবর পরিলক্ষিত হয়। উক্ত জলাশয় খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথিতযশাঃ ত্রিপুরাধিপতি কল্যাণ মাণিক্যের তনয় “জগন্নাথ দেব" নামক রাজকুমার খনন করাইয়াছিলেন। ইহার সম্বন্ধে ত্রিপুরেশগণের জীবনচরিত রাজমালায় এইরূপ উল্লেখ আছে।

“জগন্নাথ ঠাকুর অতি পুণ্যবান হয়।
তিষিণাতে দিল দীঘী পুণ্যের সঞ্চয়॥”

রাজমালা-গোবিন্দ মাণিক্য খণ্ড

 ত্রিপুররাজ্যের তৎকাল প্রসিদ্ধ প্রাচীন রাজধানী “উদয়পুর” এবং তদীয় পিতৃদেব কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত উক্তরাজ্যের সাময়িক রাজধানী “কল্যাণপুর” হইতে এই সুদূর অঞ্চলে আগমন পূর্ব্বক তিনি কি জন্য উল্লিখিত দীর্ঘিকা খনন করাইয়াছিলেন, ইহার উদেশ্য অবগত হওয়া যায় না। চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরার মধ্যবর্ত্তী সুদীর্ঘ পথপার্শ্বে দীর্ঘিকাটী পর্য্যবেক্ষণ করিয়া সম্ভাবিত হয় যে, পরিশ্রাস্ত পথিকগণের বিশ্রাম ও পিপাসা নিবারণার্থে এই স্থানে জলাশয়টী খনিত হইয়া থাকিবে।

 বর্ণিত জলাশয়ের আয়তন দৈর্ঘ্যে ১ মাইল। ইহার তুল্য এত স্থবিশাল দীর্ঘিকা ত্রিপুরাতে দ্বিতীয় আর নাই। প্রতি বৎসর চৈত্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উক্ত সরোবরে স্নানউপলক্ষে তাহার তীরবর্ত্তী ভূমিখণ্ডে এক মেলা হইয়া থাকে। তৎকালে এই স্থানে বহু লোক সমাগম হয় বলিয়া অবগত হওয়া যায়।

 পুরাণ রাজবাড়ী

 উল্লিখিত দীর্ঘিকা হইতে ন্যূনাধিক ৪ মাইল দূরে দক্ষিণদিকে, সামান্য পূৰ্ব্ব কোণে—“পুরাণ রাজবাড়ী” নামে প্রসিদ্ধ এক প্রাচীন জনপদ আছে। তন্মধ্যে যে সমস্ত বিকীর্ণ ও স্তূপীকৃত ইষ্টকরাশি দৃষ্টি পথে পতিত হয়, সেই সমুদয় জনৈক রাজার নিকেতনাদির বিধ্বস্ত অংশ বলিয়া প্রবাদ প্রচলিত আছে। সম্ভবতঃ এই কারণ বশতঃ উক্তস্থান “পুরাণ রাজবাড়ী” নামে প্রসিদ্ধ লাভ করিয়া থাকিবে।

 অত্রস্থ বিকীর্ণ ইষ্টকরাশি যে নৃপালের ভবনাদির ধ্বংসাবশিষ্ট অংশ বলিয়া কথিত আছে, তাঁহার সম্বন্ধে কোন কথা বলিতে কেহই সক্ষম নহে। কিন্তু এই স্থান জগন্নাথ দীঘী হইতে অধিক দূর না হওয়া বশতঃ এই রূপ সম্ভাবিত হয়—প্রাগুক্ত দীর্ঘিকার খননকারী কুমার জগন্নাথ দেব তদীয় অগ্রজ গোবিন্দ মাণিক্যের ত্রিপুররাজ্য শাসন কালে নিম্নলিপিত কারণ বশতঃ এই স্থানে আগমন পূর্ব্বক বাস করিয়া থাকিবেন।

 তদানীন্তন ধৰ্ম্মভীরু ত্রিপুরেশ গোবিন্দ মাণিক্য জীব হিংসা করা পাপ বিবেচনায় রাজ্য হইতে পশুবলিপ্রথা রহিত করিতে চেষ্টানন্বিত হন। তাঁহার এবংবিধ চিরপ্রথা উন্মুলিত করিবার প্রয়াস পর্য্যবেক্ষণ করিয়া প্রজাবর্গের অন্তঃকরণে অসন্তোষেব কারণ উৎপন্ন হয়। সেই সুযোগে তদীয় বৈমাত্ৰেয় ভ্রাতা রাজ্য-লোলুপ “নক্ষত্র দেব” তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া স্বযং রাজ্য অধিকার করিতে উদ্যত হন; এবং তদুদ্দেশ্যে তিনি বদ্ধপরিকর হইয়া “চন্তাই” উপাধিধারী ত্রিপুররাজ্যের সুবিখ্যাত ‘চতুর্দ্দশ দেবতা’র পূজককে স্বীয় পক্ষে আনয়ন পূৰ্ব্বক ষড়যন্ত্র আরম্ভ করেন। তাহার ফলে রাজ্যমধ্যে ধৰ্ম্মসংক্রান্ত ও রাষ্ট্রীয়-বিপ্লব-বহ্নি প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠে।

 পরিশেষে নক্ষত্র দেব এক তুমুল সংগ্রামে তদীয় অগ্রজ গোবিন্দ মাণিক্যকে পরাজিত করিয়া ১০৭০ ত্রিপুরাব্দে (১৬৬০ খৃষ্টাব্দে) “ছত্র মাণিক্য” নাম ধারণ পূৰ্ব্বক সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু তিনি অধিক কাল রাজত্ব করিতে সক্ষম হন নাই।

 জ্ঞাত হওয়া যায় যে, গোবিন্দ মাণিক্য রাজ্যভ্রষ্ট হইয়া চট্টগ্রামের পাৰ্ব্বত্য প্রদেশে গমন পূর্ব্বক তথায় বাস করিয়াছিলেন। তৎপ্রদেশের অন্তবর্ত্তী একটী গিরিশ্রেণীর পাদদেশে প্রবাহিত “কাসলং” নামক নদীর শাখা “মাইনী” নদীর তীরে কতিপয় ফল বৃক্ষ, সরোবর ও ইষ্টক-নিৰ্ম্মিত ভবনাদির ধ্বংসাবশেষ দৃষ্টিপথে পতিত হয়। তৎসমুদয় গোবিন্দ মাণিক্যের পূর্ববর্তী সপ্তদশম ত্রিপুরেশ “রত্নফা”র বাসস্থানের নিদর্শন বলিয়া ত্রিপুরার পর্বতনিবাসিগণ-মধ্যে কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। জনশ্রুতি এই—ছত্র মাণিক্যের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইলে গোবিন্দ মাণিক্য উদয়পুর পরিত্যাগ পূর্ব্বক উল্লিখিত স্থানে বাস স্থাপন করেন, এবং ঔরঙ্গজেবের পত্র অনুসারে ছত্র মাণিক্য কর্ত্তৃক ধৃত হইয়া সুলতান মহম্মদ সুজা তদীয় ভ্রাতৃসমীপে প্রেরিত হইবার আশঙ্কায় তথায়-ই গোবিন্দ মাণিক্যের আশ্রয় প্রার্থী হইয়াছিলেন।

 এবম্ভূত ভ্রাতৃবিরোধ জনিত রাষ্ট্রবিপ্লবের সময, গোবিন্দ মাণিক্যের সহোদর কুমার জগন্নাথ দেব-ও তদীয় বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ছত্র মাণিক্য-কর্ত্তৃক জন্মভূমি হইতে বিতাড়িত হইয়া থাকিবেন। এই কারণ বশতঃ রাজধানী হইতে দূরবর্ত্তী এই স্থানে আগত হইয়া তাঁহার বাসস্থাপন করা বিচিত্র নহে। কিন্তু ইহা অনুমান মাত্র, এই বিষয়ের কোন নিদর্শন নাই।