থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/গিরিবালার জীবন-পঞ্জী
(১)
গিরিবালাকে জানিতাম। গ্রামের নদীটির বাঁকের মুখে বেত-ঝোপের ছায়ার অন্ধকার আশ্রয় করিয়া ছুটির সময় যখন সন্ধ্যাকালে বোয়াল মাছের সন্ধানে ছিপ ফেলিয়া বসিতাম, তখন সে ঘাটে প্রদীপ ভাসাইতে আসিত। একখানি গোল মুখ, টীকল নাক, তাহাতে একটি ছোট নোলক—নিতাই জেলের আট বছরের মেয়ে—নাম গিরিবালা; প্রতি সন্ধ্যায় সে নদীর স্রোতে ভাগ্যের প্রদীপ ভাসাইয়া মাটীর ছোট কলসীতে জল ভরিয়া মৃদুস্বরে ‘বন্দ মাতা সুরধনী’ গাহিতে গাহিতে ঘরে ফিরিয়া যায়;—গিরিবালার বাল্য-জীবনের এই বৈচিত্র্যবিহীন ইতিহাসটুকুই আমার জানা ছিল।
ইহার পর যাহা শুনিয়াছি তাহাই লিখিতেছি। দশ বৎসর যখন বয়স—তখন গিরিবালার বিবাহ হইল এবং সেই বৎসরেই পিত। নিতাই ও স্বামী সদানন্দ পদ্মায় মাছ ধরিতে গিয়া আর ফিরিল না। মায়ের সঙ্গে গিরিবালাও কাঁদিল। তাহার পর নিতাই মাঝির জাল শুকাইবার চালাখানিতে ঢেঁকি পাতিয়া মাতা ও পুত্রী পাড়ার লোকের ধান ভানিতে আরম্ভ করিয়া দিল।
(৩)
বৎসর চার-পাঁচ পর একদিন রায়বাবুদের আঙ্গিনায় আছ্ড়াইয়া পড়িয়া গিরিবালার মাতা কাঁদিয়া জানাইল যে, আজ একমাস হইতে রাত্রিতে তাহার ঘুম নাই। সমস্ত রাত্রি তাহার বাড়ীর চারিপাশে লোকের পায়ের শব্দ শোনা যায়, ভয়ে তাহার গা ছম্-ছম্ করিতে থাকে। তিন-পুরুষ আগে রায়বাবুরা ছিলেন গ্রামের জমিদার; জমিদারী এখন বাস্তুভিটায় সাড়ে সাত বিঘা জমিতে আসিয়। ঠেকিয়াছে। দেউড়ী এখনও আছে কিন্তু দারোয়ান নাই। তথাপি এখনও বদন রায় মহাশয়কে অনেক অভিযোগ শুনিতে হয়। কিছুদিন পূর্ব্বেও বিচার করিয়া জরিমানা ও নজর বাবদ কিছু প্রাপ্তি ছিল, কিন্তু সম্প্রতি ফজল মিঞা বাঁশচিটা ইউনিয়নের প্রেসিডেণ্ট হওয়াতে প্রাপ্তির পথ একেবারে রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। কাজেই এখন বিচার না করিয়। রায়বাবু শুধু পরামর্শ দিয়া থাকেন। দারোগাকে সকল কথা জানাইবার উপদেশ দিয়া তিনি বুড়ী মানদাকে বিদায় করিয়া দিলেন, দরকার হইলে তাহার পক্ষ হইয়া দারোগাকে দুই কথা বলিবেন, এ ভরসা দিতেও ত্রুটি করিলেন না।
এইবার মানদা বিপদে পড়িয়া গেল। দারোগা হাকিম। তাঁহার সহিত কি করিয়া কথা বলা যায়? অনেক ভাবিয়া একদিন সে এক কাঠা সরু ধানের চিঁড়া লইয়া গ্রামের চৌকিদার নছর সেখের শরণ লইল। উপঢৌকন পাইয়া খুসী হইয়া নছর সেখ দিনকয়েক রোঁদ হইতে ফিরিবার পথে নিতাই মাঝির বাড়ীর নিকটে হাঁক দিয়া গেল বটে, কিন্তু তাহাতেও গিরিবালার মাতার অস্বস্তির কারণ ঘুচিল না। অবশেষে বিনা পারিশ্রমিকে নছর সেখের ধান ভানিয়া ও গাছের মর্ত্তমান কলা উপহার দিয়া বুড়ী একদিন তাহাকে দারোগার নিকট লইয়া যাইতে নছর সেখকে রাজী করিল।
সুযোগও ঘটিয়া গেল। পাশের গ্রামেই দারোগা সাহেব তদন্তে আসিয়াছিলেন। নছর সেখকে অগ্রবর্ত্তী করিয়া কালী-গাইয়ের এক ঘটি দুধ হাতে বুড়ী গিয়া সেখানে উপস্থিত হইল। সম্মুখে আসামী ও ফরিয়াদী পক্ষের অনেকগুলি সাক্ষী যুক্ত করে দণ্ডায়মান; তাহাদের সম্মুখে সদ্যগঠিত ছোট বংশমঞ্চে দারোগা সাহেব বসিয়া, মঞ্চের সম্মুখ দিক্কার একটা খুঁটিতে বাঁধা একজোড়া মুরগী, পিছনের খুঁটিতে বিরাট কৃষ্ণকায় এক খাসী বাঁধা। গম্ভীর মুখে দারোগা সাহেব লিখিতেছিলেন। মুরগী ও খাসীর সহিত এক ঘটি দুধের তুলনা করিয়া বুড়ী মনে মনে শঙ্কিত হইল; পরক্ষণেই নছর সেখের ইঙ্গিত মাত্রে দারোগা সাহেবের দুই পা জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুপাতের সঙ্গে সঙ্গে বুড়ী আপনার বক্তব্য বলিতে আরম্ভ করিল।
দারোগা সাহেব অর্দ্ধেক শুনিয়াই কহিলেন, “মেয়ের বয়স কত?”
“এই ষোল বছর হুজুর! সোমত্ত—”
“এখন যাও। সরেজমিন তদন্ত কর্ব। হ্যাঁ, তারপর আসামীর দুই নম্বর সাক্ষী বাঁটু দপ্তরী।”
বাঁটু দপ্তরী আসিয়া সেলাম করিয়া দাড়াইল। নছর বুড়ীকে লইয়া গিয়া কানে কানে কহিল, “সাঁঝে বাড়ী থেকো জেলের বেটী, দারোগা সাহেব যাবেন।”
বুড়ী অকূলে কূল পাইয়া মা মনসার নামে পাঁচ পয়সার বাতাসা মানৎ করিয়া ঘরে ফিরিল। মায়ের মুখে সমস্ত শুনিয়া উচ্ছ্বসিত আনন্দে গিরিবালা খানিক কাঁদিল। তাহার পর বেড়ায় টাঙ্গানো সত্যনারায়ণের ছবির সম্মুখে গলবস্ত্র প্রণাম করিয়া কহিল, “লজ্জা-নিবারণ হরি! লজ্জা নিবারণ কর, ঠাকুর!”
তখন সন্ধ্যা। তুলসী-তলায় প্রদীপ দিয়া গললগ্ন বস্ত্রাঞ্চলে বার-বার মাটীতে মাথা ঠেকাইয়া গিরিবালা সম্ভবতঃ কোনে। প্রার্থনা জানাইতেছিল, এমন সময় দারোগা সাহেব আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলেন। জুতার শব্দে মুখ ফিরাইয়া দারোগাকে দেখিয়া গিরিবালা মুহূর্ত্তের মধ্যে ঘরের পিছনে অদৃশ্য হইয়া গেল। মানদা রান্নাঘর হইতে তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া আসিয়া দাওয়ায় একখানি মাদুর বিছাইয়া দিল। দারোগা সাহেব আসন লইয়া সমস্ত শুনিয়া গিরিবালাকে ডাকিলেন। পরণের ছোট কাপড়খানির চারিদিক সাম্লাইতে সাম্লাইতে সঙ্কুচিতা গিরিবালা আসিয়া দাঁড়াইল। দুই চক্ষুর সমস্ত শক্তিকে একত্র করিয়া সন্ধ্যার স্তিমিত আলোকেও দারোগা সাহেব ভালো করিয়া গিরিবালাকে দেখিয়া লইলেন। মেয়েটি দেখিতে নিতান্ত মন্দ নহে। তখন তাহার মনের গতিটা কোন্ দিকে বুঝিবার জন্য দুই-একটি প্রশ্ন করিতেই লজ্জায় মরিয়া গিরি একেবার ঘরের অন্ধকার বেড়ায় গিয়া মুখ লুকাইল। মানদা ক্রমাগত ঘরের মধ্য হইতে ঠেলিতে লাগিল, কিন্তু কোনোক্রমেই কন্যাকে বাহিরে পাঠাইতে পারিল না।
অগত্যা কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর দারোগা সাহেব উঠিলেন এবং মধ্যে মধ্যে সন্ধান লইবেন—মৃদু হাসিয়। এই প্রতিশ্রুতিটা দিয়। গেলেন। দারোগা চলিয়া গেলে বাহির হইতে নছর চৌকিদার আঙ্গিনায় প্রবেশ করিয়া কহিল, “বেঁচে গেলে জেলে-বৌ হাকিম তোমার সহায় হ’য়েছেন।”
বুড়ী নিশ্চিন্ত হইয়া দুই কর কপালে ঠেকাইয়া দেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম করিল, কিন্তু গিরি সেদিন আর শয্যা ছাড়িয়া উঠিল না।
(৩)
ইহার পর দিনকয়েক নানা স্থানে তদন্তে যাইবার পথে দারোগা সাহেব প্রতিশ্রুতি মত বুড়ী ও তাহার কন্যার সন্ধান লইতে আসিলেন। কিন্তু সন্ধানের মুখ্য বস্তুটি ঘোড়ার পায়ের শব্দ পাইলেই ঘরের পিছনের ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়া যে কোথায় অন্তর্হিত হইয়া যাইত, তাহা মানদাও আবিষ্কার করিয়া উঠিতে পারিত না। কন্যার এই অকৃতজ্ঞতায় বুড়ী লজ্জিত হইত ও কন্যার পক্ষ হইতে হাকিমের কাছে ক্ষমা চাহিয়া, তাঁহার জন্য প্রতিবারই ভগবানের আশীর্ব্বাদ ভিক্ষা করিত। বলা বাহুল্য, এই একঘেয়ে নীরস ক্ষমাভিক্ষা দারোগা সাহেবের বেশী দিন ভালো লাগিল না এবং বাঁশচিটার হাটের পথে তাঁহার গতিবিধি ক্রমে ক্রমে বিরল হইয়া আসিল।
ইহাতে অবশ্য গিরিবালার অবস্থার কোনো ইতর-বিশেষ হইল না; জীবন-ধারা যেমন বহিতেছিল তেমনই বহিয়া যাইতে থাকিল। সমস্ত দিন নানা কাজের মধ্যে আপনার অবস্থার কথাটি বিশেষ মনে থাকিত না, কিন্তু সূর্যাস্তের সঙ্গে-সঙ্গেই জগতের দুর্ভাবনা আসিয়া জুটীত এবং পৃথিবীটাকে মনে হইত একটি জীবন্ত প্রেতপুরী। সহসা একদিন গিরিবালার সমস্ত দুর্ভাবনার সমাপ্তি হইল।
সেদিন শ্রাবণের বর্ষণ প্রভাত হইতেই আরম্ভ হইয়াছিল। বর্ষার রাত্রি। প্রথম প্রহরেই পল্লীর বুকে নিশীথের নিস্তব্ধতা ঘনাইয়া আসিয়াছিল। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করিয়া গিরিবালার মাতার কুটীর-প্রাঙ্গণ হইতে সহসা এক আর্ত্ত চীৎকারধ্বনি উঠিল। শ্রাবণের বর্ষণ-রব ছাপাইয়া সে আর্তনাদ সুখ-সুপ্ত ভদ্রপল্লীকে পর্য্যন্ত ধ্বনিত করিয়া তুলিল এবং পল্লীর নিদ্রার জড়তা টুটিবার পূর্ব্বেই ভরা নদীর তরঙ্গ-কল্লোলে ডুবিয়া গেল।
গ্রামে যে একেবারে চাঞ্চল্য উপস্থিত হইল না, তাহা নহে। ওপারের ঝাউবনের অন্ধকারের অন্তরালে যখন গিরিবালাকে বহিয়া পান্সী অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে তখন পথের মোড়ে নছর চৌকীদারের ভীম গর্জ্জন শোনা গেল! এদিকে গণেশ মাঝির মুখে সংবাদ পাইয়া হারু ঘোযাল আসিয়া রায়বাবুকে ডাকিয়া তুলিয়া কহিলেন, “যা ভেবেছিলাম রায়বাবু, তাই হ’ল, নিতাই মাঝির মেয়েকে নিয়ে গেল!” রায়বাবু চক্ষু মুছিয়া রাম নাম জপিতে জপিতে বাহিরে আসিলেন। ক্রমে ক্রমে রায়-বাড়ীর বৈঠকখানায় গ্রামের ভদ্রসন্তানদের একটি ছোট সভা বসিয়া গেল। মাখন ভৌমিকের বয়স অল্প। সখের থিয়েটারে ক্রমাগত লক্ষ্মণের ভূমিকা অভিনয় করিতে করিতে বিপন্না স্ত্রীলোকের প্রতি তাহার একরকম মনত্ব-বোধ জন্মিয়াছিল, সভাস্ত একজন থানায় সংবাদ দিবার প্রস্তাব করিতেই সে কহিল, “থানায় খবর দেওয়া কিছু নয়। আমি যাচ্ছি, আপনারা আসুন!” হারু ঘোষাল ধমক্ দিয়া কহিলেন, “ওই কাজটি কোরো না বাবাজী! থিয়েটার কর্তে গিয়ে চিন্তে চাঁড়ালের পা’ ধ’রে ‘দাদা’ ‘দাদা’ ব’লে চেঁচাও, সেটা বরং সওয়া যায়, কিন্তু ছোট লোকের হাতে মার খেয়ে আর আমাদের মুখ হাসিও না।” ছোট লোকের হাতে মার খাওয়ার আশঙ্কায় আকস্মাৎ মাখন ভৌমিকের উৎসাহ দপ, করিয়। নিভিয়া গেল এবং অতঃপর থানায় সংবাদ দেওয়াই যে সর্ব্বাপেক্ষা সুযুক্তি সে বিষয় কাহারও মতদ্বৈধ রহিল না।
গিরিবালার চরিত্র সম্বন্ধে সত্য-মিথ্যা সর্ব্বপ্রকার আলোচনা হইয়। যখন ক্রমে ক্রমে থামিয়া গেল, তখন একদিন হঠাৎ সংবাদ আসিল যে, গিরিবালাকে বারখালির আমীর সেখের বাড়ীতে পাওয়া গিয়াছে। গ্রাম আবার চঞ্চল হইয়া উঠিল এবং যদিও হাট বার—তথাপি বাঁশচিটা ইউনিয়ানের প্রেসিডেণ্ট চামড়ার দালাল ফজল মিঞার বাড়ীর বাহিরের আঙ্গিনায় কৌতূহলী দর্শকের ভিড় জমিরা গেল।
ক্ষান্তবর্ষণ শ্রাবণ-দিবসের রক্তসন্ধ্যা সমস্ত আকাশকে আরক্ত করিয়া তুলিয়াছিল। সঙ্গী চৌকীদার দু’জনের কাঁধে হাত রাখিয়া টলিতে টলিতে গিরিবালা আসিয়া দাঁড়াইল। ব্যর্থ অশ্রুপাতের চিহ্ন তখনও তাহার কপোলে শুখায় নাই, জাগরণরক্তিম নিষ্প্রভ চক্ষু দু’টি তখনও সন্ধ্যার রক্তদীপ্তিতে জ্বলিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছিল। চারিপাশের চিরপরিচিত মূর্ত্তিগুলি গিরিবালা একবার দেখিয়া লইল, কিন্তু সেকালের মত আজ আর মাথায় ঘোমটা টানিয়া দিল না। ক্ষণিকের জন্য গ্রামের লোকের মনে হইল এ যেন সে গিরিবালা নহে। এই সময় জনতার পিছন হইতে ছুটিয়া আসিয়া উন্মাদের মত কন্যার বুকে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া মানদা চীৎকার করিয়া উঠিল, “তোর এ দশা কে করেছে গিরি!” উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে নিমেশ কালের জন্য মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া গিরিবালা অঙ্গুলি তুলিয়া আকাশের দিকে দেখাইয়া দিল, কথা কহিল না।
ফজল মিঞার হুকুমে আসামী আমীর সেখ হাজির হইল। ফজল মিঞাকে পায়ের নাগরা খুলিতে দেখিয়া আমীর সেখ দুই হাত জুড়িয়া কহিয়। উঠিল, “হুজুর, ও আমার ‘নেকার’ বিবি।”
সহসা এই কথা শুনিয়া গিরিবালা শিহরিয়া উঠিল এবং সমস্ত দেহভার ফজল মিঞার পদতলে নিক্ষেপ করিয়া অস্ফুটস্বরে কি কহিল, তাহা বোঝা গেল না। তাহার মাথায় হাত দিয়া সংক্ষিপ্ত একটি আশ্বাসবাণী উচ্চারন করিয়া ফজল মিঞা আমীর সেখকে থানায় লইয়া যাইতে হুকুম দিলেন। থানা বহুদূর, কাজেই সে রাত্রি ফজল মিঞার জিম্মায় গিরিবালাকে রাখিয়া মেম্বারেরা হাট করিতে চলিয়া গেলেন।
গভীর রাত্রে ফজল মিঞার গরুর গাড়ীর গাড়োয়ান কাদের শুনিতে পাইল, কে যেন তাহার মনিবের বাহিরের কোঠাঘরে মিনতির স্বরে কহিতেছে, “আপনার পায়ে পড়ি হুজুর, আপনি আমার ধর্ম্মবাপ।” তাহার পরই মেঘগর্জ্জনের সাথে সাথে শ্রাবণ-রাত্রির ধারা নামিয়া আসিল, আর কিছু শোনা গেল না।
ইহার পর থানা। অভিযোগ দণ্ডবিধি আইনের অনেকগুলি ধারা ঘেঁসিয়া গিয়াছে; মামলা সঙ্গীন আসামীর একরার লইতে হইবে। কাজেই গিরিবালাকেও একরাত্রি থানায় অপেক্ষা করিতে হইল। পরদিন প্রভাতে যখন চৌকীদারের সাথে সে গরুর গাড়ীতে গিয়া উঠিল, তখন থানার বারান্দায় চেয়ারে উপবিষ্ট দারোগা সাহেব এবং তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান শৃঙ্খলিত আমীর সেখ এই উভয়ের মধ্যে গিরিবালা কোনও প্রভেদ দেখিতে পাইল না।
(৪)
ইহার পর সাহেব ডাক্তার, লেডী ডাক্তার, পুলিশের বড় কর্ত্তা উকীল, মোক্তার কয়েকদিন ধরিয়া তাহাকে কত কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, স্বপ্নাবিষ্টের মত গিরিবালা তাহার উত্তর দিয়া গেল। কি বলিল তাহাও মনে রহিল না। কিন্তু কাঠগড়ায় দাড়াইয়া আসামী আমীর সেখ ও তাহার ছয়টী সহচরকে দেখাইয়া আপনার জীবনের কলঙ্কের প্রত্যেকটি কাহিনী সে অতি স্পষ্ট ভাষায় কহিয়া গেল, বলিতে কোথাও বাধিল না। গ্রাম হইতে যে দুই-একজন ভদ্রসন্তান মানদাকে লইয়া মামলা উপলক্ষে সহরে আসিয়াছিলেন, তাঁহারা নিতাই মাঝির কন্যার এই নির্লজ্জতায় স্তম্ভিত হইয়া গেলেন।
বিচার সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে। আদালতের বটতলায় মানদার গরুর গাড়ী গ্রামে ফিরিবার উদ্যোগ করিতেছিল, গিরিবালা ছুটিয়া আসিয়া দুই হাতে চলন্ত গাড়ীর চাকা ধরিয়া কাঁদিয়া কহিল, “আমাকে ফেলে যাস্নি মা! নিয়ে চল্!”
ইহার উত্তরে গাড়ীর মধ্যে একজন হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়। উঠিল, তাহাকে ধমক্ দিয়া হারু ঘোষাল গাড়ীর পর্দ্দা তুলিয়া দাঁত খিঁচাইয়। কহিলেন, “তা বটেই তো! বুড়ী তোমাকে নিয়ে এখন পরকাল খোয়াক্!”
গরুর গাড়ীর চাকা হইতে গিরিবালার শিথিল মুষ্টি খুলিয়া পড়িল, গাড়ী চলিয়া গেল।
লোকের মুখে এই পর্য্যন্তই শুনিয়াছিলাম, ইহার পর বিচিত্র পুঁথির বিবিধ তথ্যের নীচে পুরাতন কাহিনীটা একেবারেই চাপা পড়িয়া গিয়াছিল।
আজ সহসা গিরিবালার কথা মনে হইবার হেতু আছে। কাল বদ্লী হইয়া আসিয়। প্রাতে প্রাথমিক পরিদর্শনের কাজে বাহির হইয়াছিলাম, এমন সময় কে চীৎকার করিয়া উঠিল, “ছেড়ে দাও গো ছেড়ে দাও! আমার দেশের মানুষ যাচ্ছে, ছেড়ে দাও!” মুখ ফিরাইয়া দেখি একটি রমণী পাগ্লা গারদের মোটা লোহার শিক দুই হাতে ধরিয়া টানিতেছে। নিকটে আসিয়া দাঁড়াইলাম চিনিতে বিলম্ব হইল না। মাটিতে জানু পাতিয়া বসিয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া গিরিবালা জিজ্ঞাসা করিল, “ওগো আমার দেশের মানুষ, এমন কেন হ’ল?”
আমার ডাক্তারী বিদ্যায় আর এ প্রশ্নের উত্তর জুটিল না, নীরবে ফিরিয়া গেলাম।