থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/চণ্ডীমণ্ডপ
চণ্ডীমণ্ডপ
প্রকাণ্ড একটি বেলগাছ। তাহার ছায়ায় মোহন ঠাকুরের চণ্ডীমণ্ডপ। সম্মুখে আঙ্গিনা, প্রথম রাত্রির পরিষ্কার জ্যোৎস্নায় ধব্ ধব করিতেছে।
কোজাগরের পরের দিনের রাত্রি। চণ্ডীমণ্ডপে সেদিন মোহনপুরের সমাজপতিদের বার্ষিক বৈঠক। সামাজিক দুষ্কৃতিকারীদের বিচার ও দণ্ডদানের সভা।
দেবীর আসনের চৌকীতে তখনও সিন্দুর জ্বল্ জ্বল্ করিতেছে। সেই আসনকে কেন্দ্র করিয়া কুশাসন এবং পাটি বিছাইয়া সমাজপতিরা বসিয়াছেন। প্রাঙ্গণে প্রকাণ্ড নিমের গুড়ি জ্বলন্ত, তাহার পাশে চিমটা হাতে দীর্ঘদেহ বংশী গোপ তামাক জোগাইতেছে। চণ্ডীমণ্ডপে ডাবা থেলো ও বাঁধা হুঁকা অস্থাবর সম্পত্তির মত হস্ত হইতে হস্তান্তরে ঘুরিতেছে, পণ্ডিত মহাশয় মহিষ-শৃঙ্গের কৌটা খুলিয়া ঘন ঘন নস্য লইতেছেন! কাশি এবং হাঁচির শব্দে চণ্ডীমণ্ডপ মুখর।
“না হে চক্কোত্তি, আর সওয়া যায় না। দিন-কাল ক্রমেই খারাপ হয়ে আস্ছে। তোমরা গাঁয়ে থাক, রাঘবও রয়েছে— তোমাদেরই দেখা-শোনা উচিত, এখন হাল ছেড়ে দিলে শেষে সাম্লাতে পার্বে না।”
“দেওয়ানজী যা বললেন ঠিক! কিন্তু রাঘব কর্বে কি? মোহন ঠাকুরের ছেলে হ’লেই ত হয় না, বয়সটা কি তার? আপনি থাকুন একটা মাস, দেখুন কি করি!”
সাহেবপুরের রেশমকুঠির দেওয়ান হরি মুখুয্যে ম্রেজাইয়ের বোতাম খুলিয়া স্ফীতোদর বাহির করিয়া কহিলেন, “বুঝি তো সব দাদা, কিন্তু চাকর আর কুকুর। এই পনেরটা দিন ছাড়া সাহেব ছুটি মঞ্জুর করে না তার কি? গাঁয়ে থাক্তে গেলে চাকুরী ছাড়তে হয়, একবার ভাবি—”
ন্যায়রত্ন মহাশয় কহিলেন, “সর্ব্বনাশ! তুমি আছ তবু মোহনপুরের গাজনাতলায় ঢাক বাজে হে মুখুয্যে। চাকুরী তো তোমার একার নয়, দশ জনের। দশ জন খাচ্ছে। পাল-পর্ব্বণে অতিথ বোষ্টম সেবা হচ্ছে। গোয়াল মালীরা টিঁকে আছে। দীর্ঘজীবী হ’য়ে থাক, বাবা!”
হরি মুখুয্যে ন্যায়রত্ন মহাশয়ের পায়ের ধূলা লইয়া কহিলেন, “এটা কি একটা কথা, পণ্ডিত মশায়? আপনাদের আশীর্ব্বাদই সব, দশ জনের বরাতেই হচ্ছে, আমি তো নিমিত্ত।”
দেওয়ানজী ম্রেজাইয়ের বোতাম আঁটিয়া দিলেন!
চণ্ডীমণ্ডপের সম্মুখে আঙ্গিনায় সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া দাঁড়াইল এক বৃদ্ধ।
“কে, সাধুচরণ?”
নিজের অপরাধের গুরুত্ব সে জানিত। কাঁপিতে কাঁপিতে কহিল, “আজ্ঞে, বাবাঠাকুর!”
“ওরে বেটা হারামজাদা!”— শশাঙ্ক ঘোষাল হাঁকিলেন।
“খড়ম পেটা ক’রে তাড়াও ব্যাটাকে গাঁ থেকে; ধর্ম্ম নষ্ট করলি”—ন্যায়রত্ন মহাশয় নস্য লইলেন। সাধুচরণ কাঁপিতে লাগিল।
দেওয়ানজী ডাকিলেন, রাঘব কোথায় হে? কি করা যাবে এর, এস দেখি শুনি।”
স্বর্গীয় মোহন ঠাকুরের সন্তান রাঘব ঠাকুর। বছর ত্রিশেক বয়স। মাথায় বাবরী, বলিষ্ঠ সুপুষ্ট দেহ। কপালে সিন্দুরের ত্রিপুণ্ড্র, হাতে মোটা বাঁশের লাঠি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। বয়সে সকলের ছোট বলিয়া সকলের পশ্চাতে এক কোণে বসিয়া কলিকায় তামাক খাইতেছিলেন। সম্মুখে আসিয়া কহিলেন, “বিচার আপনারা করুন, খুড়োমশাই। আপনাদের যা মত হবে আমার ও—”
“তা কি হয়? দেওয়ানজী কহিলেন, মোহন ঠাকুরের ছেলে তুমি বাবাজী! বয়সে যাই হও মোহনপুরে তোমার কথাই আগে।"
রাঘব ঠাকুরের গম্ভীর তীব্রকণ্ঠে ধ্বনিত হইল, “সাধুচরণ!”
রাঘব ঠাকুরের দিকে ভয়ে সাধুচরণ চাহিতে পারিল না, চণ্ডীমণ্ডপের পৈঠায় মাথা রাখিয়া আর্ত্তনাদ করিয়া কহিয়া উঠিল, “আর কর্ব না, বাবাঠাকুর! এবারকার মত—”
“বেটা হারামজাদা! এবারকার মত! মোহনপুরের জেলে তুই বেটা তোর পান্সীতে মূর্গী রেঁধে খেল সাহেব! মোহনপুরের মুখে কালী দিলি বুড়োকালে হারামজাদা!”
সাধুচরণ রাঘব ঠাকুরের সম্মুখে নতনেত্রে দাঁড়াইয়া কাঁপিতে লাগিল মাত্র।
ন্যায়রত্ন মহাশয় নস্যদানী রাখিয়া খড়ম তুলিয়া লইলেন। সাধুচরণ আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল, “প্রাচিত্তির কর্ব, বাবাঠাকুর!”
“প্রাচিত্তির। পয়সা পাবি কোথা রে? কে কে ছিলি সে পান্সীতে?”
কাঁপিতে কাঁপিতে আরও পাঁচজন নত মস্তকে কম্পমান দেহে সাধুচরণের পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইল।
জগু, মানকে, বৈকুণ্ঠ, বিপিন আর শ্যামাদাস!
“মূর্গী আর পেঁয়াজের গন্ধ বড় ভাল রে হতভাগারা! আবার তুলসীর মালা রেখেছিস্!”
জগু, মাণিক, বিপিন প্রভৃতি সমস্বরে কহিল, আর হবে না, বাবাঠাকুর!”
“আর যদি কখনও হয় তো, দেখছিস্ লাঠি, পাঁজর ভেঙ্গে দেব। গত বচ্ছর সনাতনের কথা মনে আছে তো? যা সব! এবার কালীপূজোর দিন পাঁচ মন মাছ জোগাতে হবে তোদের ছ’জনকে, দাম পাবিনি।”
ছয়টি প্রাণী সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া কৃতজ্ঞতা জানাইল।
“তোদের পাড়াশুদ্ধ ছেলে-মেয়েকে এখানে পাঠাবি সেদিন দু’বেলা প্রসাদ পাবে। যা বেটারা! আজ রাত ভোর কীর্তন ক’রে কাল সকালে স্নান ক’রে আস্বি, একটু শান্তি দিয়ে দেব। রাঘব ঠাকুর লাঠি কোলের উপর রাখিয়া আসন লইলেন।
বৃন্দাবন বিশ্বাস আসিয়া দাঁড়াইল। অপরাধ গুরুতর। কায়স্থ পরিচয়ে পানীয় জল দিয়া সে এক সদ্ ব্রাহ্মণের ধর্ম্ম নষ্ট করিয়াছে, অভিযোগ এইরূপ। “পের্নাম হই—” বৃন্দাবন যুক্তকরে প্রণাম করিল।
“কি রে বেন্দা? বামুন কায়েতকে জল খাওয়াতে সাধ হয় কণ্ঠি নিলেই পারিস্। এসব দুর্ম্মতি কেন রে বেল্লিক!” রাঘব ঠাকুরের কথা শুনিয়া নতশিরে বৃন্দাবন দাঁড়াইয়া রহিল, জবাব দিল না।
‘বেটা! অধার্ম্মিক চণ্ডাল!’ ন্যায়রত্ন মহাশয় চীৎকার করিয়া খড়ম ছুঁড়িলেন। বাঁ হাতে ললাটের রক্তধারা চাপিয়া বৃন্দাবন বসিয়া পড়িল। পর মুহূর্ত্তেই উঠিয়া খড়মখানিতে মাথা ঠেকাইয়া সসম্ভ্রমে সেখানিকে চণ্ডীমণ্ডপের রোয়াকে তুলিয়া দিল।
“আর কে আছিস্?” রাঘব ঠাকুর হাঁকিলেন। প্রাঙ্গণের অন্ধকার কোণ হইতে জন কয়েক লোক উঠিয়া আসিল। তাহাদের অঙ্গ কম্পমান, মুখ পাংশু।
“বাবাঠাকুর! বাবাঠাকুর!! উন্মাদের মত একটি স্ত্রীলোক ছুটিয়া আসিল।
“বাবাঠাকুর!”
“আরে ছুঁস্নি, ছুস্নি, বাগ্দী-বৌ! হোথা থেকেই বল্।”
বাগ্দী-বৌ ছাড়িল না, রাঘব ঠাকুরের পা জড়াইয়া ধরিল। সমস্ত অঙ্গ অশুচি হইয়া গেল, রাঘব ঠাকুর ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। “দিলি ছুঁয়ে সন্ধ্যাবেলায়!”
বাগ্দী-বৌ তথাপি পা ছাড়িল না—“বাঁচান, বাবাঠাকুর!”
“আরে উৎপাৎ, হ’ল কি বল্ দেখি তোর?”
“মান-সরম্ভম সব গেল, বাবাঠাকুর! শেষ বেলায় ঘাঠে গিয়েছিল নারাণী। নেয়ে আস্বার পথে ও-গাঁয়ের রহিম সর্দ্দারের বেটা বলে কি না— মেয়ে তো আমার কলসী ফেলে পালিয়ে এসেছে। নজ্জায় মাথা কাটা গেল, বাবাঠাকুর।”
চণ্ডীমণ্ডপ শুদ্ধ সমাজপতিরা হুঁকা রাখিয়া উঠিয়া পড়িলেন। আঙ্গিনায় বংশী গোপের হাতের চিম্টা ঝন্ ঝন্ করিয়া বাজিয়া উঠিল। বৃদ্ধ সাধু মাঝির ন্যুব্জ দেহ সহসা ঋজু হইয়া গেল। ক্ষতস্থানে খানিকটা ছাই লেপিয়া বৃন্দাবন উঠিয়া দাঁড়াইল। বাম হস্তের বংশ-যষ্টি দক্ষিণ হস্তে ধরিয়া রক্তচক্ষু রাঘব ঠাকুর তিন লম্ফে প্রাঙ্গণ অতিক্রম করিয়া গেলেন, অপরাধীর দল বিনাবাক্যে তাঁহার অনুসরণ করিল, চণ্ডীমণ্ডপের অঙ্গন শূন্য হইয়া গেল।
ন্যায়রত্ন মহাশয় শ্যামা বাগ্দীনীর হাত ধরিয়া তুলিয়া কহিলেন—
ভয় করিসনে বাগ্দী-বৌ! আমরা আছি। কার ঘাড়ে ক’টা মাথা দেখে নেব। আজ রাতে দেওয়ানজীর বাড়ীতে নারাণীকে নিয়ে এসে শুয়ে থাক্বি। রামু, জগাই, বৈকুণ্ঠ যা বাগদী-বৌয়ের সঙ্গে—মা-বেটিকে সাথে ক’রে দেওয়ান-বাড়ীতে পৌঁছে দে।”
⁕ ⁕ ⁕ ⁕
ইহার পর চল্লিশ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। মোহন ঠাকুরের চণ্ডীমণ্ডপ দেনার দায়ে কয়েক হাত ঘুরিয়া শেষে ‘দি মোহনপুর ড্রামেটিক ক্লাবে’ পরিণত হইয়াছে।
কোজাগরের পরের দিন সন্ধ্যা। আগামী দীপান্বিতার দিন। বারোয়ারী কালীতলায় মেবার-পতনের অভিনয় হইবে, তাহারই মহলা চলিতেছিল।
ক্লাব-ঘরে জন বিশেক লোক বালক এবং যুবক। কয়েক জোড়া তবলা, ডুগি, গুটি দুই হার্ম্মোনিয়াম, একখানা বেহালা ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত; বেড়ার গায়ে খানকয়েক স্বদেশী ও বিদেশী অভিনেতার বিচিত্র মুখভঙ্গীর ছবি, গুটিকয়েক বাবরী চুল, জরিদার চাপকান ও একখানা বড় আয়না।
হার্ম্মোনিয়ামে সুর দিয়া চপল কহিল, “আচ্ছা ‘সি-সার্পে’ ধ’রে দাওতো দেখি।” জনকয়েক বালক মুখের জ্বলন্ত বিড়ি মাটিতে নামাইয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, ‘মেবার পাহাড়, মেবার পাহাড়, যুঝেছিল যেথা প্রতাপ বীর।
“ও কি হচ্ছে অনঙ্গ! চিতোর বলছ অমন ক’রে যে! তোমার ‘ফিলিং’ হচ্ছে না মোটে। চোখটা একটু বোঁজ—মিঠে রকমের। ঘাড়টা একটু কাৎ কর, বাঁ পা’টা একটু সাম্নে। ব্যাস্। অনেকটা হ’য়েছে! মনে ভাবতে থাক তুমি সত্যিকার অমরসিংহ, তা’হলে ঠিক ‘পস্চার’ আসবে। ওরে একটা সিগারেট দে।”
“মাষ্টার মশাইকে একটা সিগারেট দিয়ে যা কমল। আচ্ছা নাচগুলোতে আমাদের খুব সাক্সেস হবে, না? কি বলেন, মাষ্টার মশাই?” অনন্ত উত্তরের প্রতীক্ষায় ব্যাকুলভাবে মাষ্টারের দিকে চাহিল।
মাষ্টার আশ্বাস দিয়া একবার গা মোড়া দিতে দিতে বলিলেন, “খুব সম্ভব। আমরা কল্কাতায় ছোক্রা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান, আর তোমাদের জেলে ছুতোর পাড়া থেকেই তিনটে প্লের নাচের ছেলে জুটে যায়, তাও বিনি পয়সায়! কি? ডাব? না, খাব না গলা ধ’রে যাবে, তার চেয়ে চা আনো।”
“ওরে চায়ের জল চাপিয়ে দে।” তিন চারজন সমস্বরে আদেশ দিল।
একটি যুবক হাঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া উপস্থিত।
অনঙ্গ কহিল, “কি প্রেম-কোরক, হাঁফাতে হাঁফাতে আস্ছিস্ যে?”
“আর শুনো না, অনঙ্গ-দা! বুড়োরা সব বৈঠক বসিয়েছে, বল্ছে জাত গেল, ধর্ম্ম গেল! যত ছেলে মালী ছোট জাতের ছেলে নিয়ে নাকি আমাদের কারবার, তাদের হাতের জল খেয়ে চা খেয়ে উচ্ছন্ন যাচ্ছি! হাঃ! হাঃ!”
প্রেম-কোরক হাসিতে হাসিতে বসিয়া পড়িল।
“ফুল্স্! ছোট জাত! আর ওরা সব বড় জাত! ওরাই তো সর্ব্বনাশ কর্লেন জাতটার! ও সব গোঁড়ামি—”
অনঙ্গ রুখিয়া উঠিল।
চপল হার্ম্মোনিয়ামে সুর দিয়া কহিল, “ছোট জাতই আমরা চাই, তারা থাকলেই জাত থাকবে।”
“ধা ধিঙ্গাড় ধা, ধিঙ্গাড় ধা ধা” বোল আওড়াইয়া সুধাংশু তবলায় চাটি দিয়া কহিল, “একবার তেরে কেটে তাক ক’রে দিতে পার না অনঙ্গ-দা?
“আর দু’টি বচ্ছর সবুর কর সুধাংশু, মোহনপুরের চেহারা একদম বদলে দেব, দেখে নিও।” অনঙ্গ সিগারেট ধরাইল।
অঙ্গনে আসিয়া দাঁড়াইল বিপিন মালী। তাহার দৃষ্টি শঙ্কিত।
“কিরে, বিপিন, অত শুকনো যে?”
“আজ্ঞে বাবু কি বলব, আপনাদের চরণে আছি।
“ব্যাপার কি বলতো দেখি। আবার বুঝি সমাজে ‘ঠেকা’ করেছে, না?”
“না, বাবু। বাড়ীর মেয়েদের তো ঘাটে যাওয়া বন্ধ হ’ল, বাবু। কাল আমার বোনকে ঘাটের পথে ইসারায় ও পাড়ার কবির সেখ ডাক্ছিল, আজ আমার মেয়ের হাত ধ’রে টেনেছে। আর ভয় দেখিয়েছে যদি বোনকে তাদের বাড়ী না পাঠাই তবে বাড়ীতে চড়াও করবে।”
“তুই কি করেছিস?”
“গরীব মানুষ, আমি কি করব, বাবু? আপনারা একটা বিহিত করুন।”
“চৌকীদারকে বলিস নি?”
“বলেছিনু। সে গা’ করলে না। থানায় যেতে বলে। সে তো আবার দশ কোশ পথ, ঘর ফেলে যাই কি ক’রে? আপনারা আছেন বাপের মত—” হাউ হাউ করিয়া বিপিন মালী কাঁদিয়া উঠিল।
“এই তোমাদের গাঁয়ের একটা মস্ত ‘ড্রব্যাক’—কাছে থানা নেই।” বলিয়া মাষ্টার মহাশয় চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলেন।
“সেটা ঠিক! যে রকম অবস্থা থানা কাছে না থাক্লে চলবার আর উপায় নেই। কাগজে এসব নিয়ে লেখালেখি করবারও দরকার হ’য়ে পড়েছে দেখছি। শেষে কোনদিন গুণ্ডাগুলো আমাদেরই মাথা ফাটিয়ে দিয়ে যাবে। আচ্ছা তুমি যাও বিপিন, বাড়ীতেই থেকো, কোথাও যেয়ো না। মেয়েদের আর ঘাটে জল আনতে পাঠিও না। কাল সকালে একবার এসো। ভেবে-চিন্তে যা হয় করা যা’বে। হঠাৎ তো কিছু করা যায় না।”
বিপিন চলিয়া গেল। আধ ঘণ্টা পরে সমবেত কণ্ঠস্বরে সমস্ত পল্লী মুখর হইয়া উঠিল—
“জ্বলিল যেখানে সেই দাবাগ্নি
—সে রূপ-বহ্নি পদ্মিনীর।
ঝাঁপিয়া পড়িল সে মহা আহবে
যবন-সৈন্য ক্ষত্রবীর।"