বিষয়বস্তুতে চলুন

থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/তীর্থে

উইকিসংকলন থেকে

তীর্থে

(১)

 তীর্থ। অতি প্রাচীন; বিগ্রহ জাগ্রৎ, মন্দির প্রকাণ্ড, তাহার সম্মুখে প্রশস্ত চত্বর, চত্বরের মধ্যে নাটমন্দির। নাটমন্দিরে তেত্রিশজন ব্রাহ্মণ তেত্রিশখানি কুশাসনে সারবন্দী হইয়া বসিয়া গীতা, চণ্ডী ও শ্রাদ্ধের মন্ত্র একত্র মিলিয়া এক দুর্ব্বোধ্য শব্দলোকের সৃষ্টি করিয়াছে।

 বেলা আটটা। পাণ্ডাবাড়ীর ছেলেরা স্নান সারিয়া যাত্রী ধরিবার জন্য রাস্তার মোড়ে দাঁড়াইয়া বিড়ি ফুঁকিতেছে। জবা ফুলের মালা গলায়, মাথায় টেরী, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা বাগ্দীর দল ছুরি ধার দিতেছে। শনিবার। পাঁঠার দাম চড়িয়া গিয়াছে।

(২)

 বেলা নয়টা। তীর্থ-যাত্রীর আগমন আরম্ভ হইল। ছ্যাঁক্‌রা, ট্যাক্সি, রিক্সা, ব্রুহাম, ল্যাণ্ডো সর্ব্বপ্রকার বাহনে ভক্তেরা আসিতে লাগিলেন। “হেঁগ্‌, গো মা, একটা আধলা, লক্ষ্মী মা!” “লেংড়া কাণা কো—” “আরে এদিকে এদিকে! আমার দোকানে বস্‌বেন, আসুন!” “মালা চাই? পাঁঠা? কটা?” “কি মুখুয্যে, আমার সাবেক কালের খদ্দের তুমি টান্‌ছ!” “ওরে বাজা, বাজা! আরতির বাজনা বাজা!” পূজা আরম্ভ হইয়াছে।

 রামু মালীর ছেলের জ্বরবিকার, সে মায়ের বাড়ীতে পূজা দিতে আসিয়াছে। স্নান করিয়াছে এক ঘণ্টা, পূজা দিবার অবকাশ পায় নাই। পূজাটা নির্ব্বিঘ্নে দিতে পারিলে পুত্র নীরোগ হইয়া উঠিবে এই আশায় দাঁড়াইয়াছিল।

 “পথ ছাড়! পথ ছাড়!!” রামু সরিয়া পথ দিল। বিলাস হালদার আসিলেন, আজ তাঁহার পালি। গলার রুদ্রাক্ষের মালা। বাহুতে সোনার বিছা—তাহাতে গণ্ডা দুয়েক নানা আকারের কবচ। ললাটে রক্ত চন্দনের রেখা। রামু সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়। কহিল, “ঠাকুর আমার পূজোটা?” “দাঁড়িয়ে থাক্, ক’টাকার পূজো?” “পাঁচ সিকের।” “দাঁড়িয়ে থাক্।”

(৩)

 মন্দির। তাহার মধ্যে কালীমূর্ত্তি। দুই দিকে চর্ব্বির ঘৃতপ্রদীপ। জবাফুল আর বিল্বপত্রে মাতার আকণ্ঠ আবৃত। মূর্ত্তির মাথার উপরে বিজলী-বাতি, সম্মুখে প্রকাণ্ড পিতলের থালায় পয়সা আর সিকি পুঞ্জীকৃত।

 সোরগোল। “কোথা যাচ্ছেন? দ্বার-প্রণামী দিয়ে যান।” “বাবা নকুলনাথের নামে এক পয়সা।” “পঞ্চায়েতের পয়সাটা দিলেন না? নিন্ চরণামৃত, দিন পয়সাটা।” পড় বাছা, সর্ব্বমঙ্গল মঙ্গলাং, দক্ষিণে চার পয়সা, কল্যাণ হোক্‌!” “নাও বাছা, উঠে পড়, আমার যাত্রী দাঁড়িয়ে রয়েছে, তুমি একাই যে ঘণ্টাভর মাথা কুট্‌ছ!” বৃদ্ধা প্রবাসী সন্তানের কল্যাণে ভিক্ষা করিতেছিল, সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল। “এস গো এস, চটপট সেরে নাও। পড়, কালী কালী মহাকালীং—আচ্ছা হয়েছে। নাও সিঁদুর আর বেলপাতা, ছেলের মাথায় দিও। আর জোড়া পাঁঠা মানৎ করে’ যাও, ছেলে ভাল হ’য়ে যাবে। আর আমাকে খবর দিও, মানৎ শোধ দেওয়ার দিন আমি নিয়ে আসব।”

 বেলা দশটার সঙ্গে সঙ্গে বলির বাজনা বাজিল; অনেকগুলি মাথা নমস্কারের ভঙ্গীতে নত হইল সেই সঙ্গে দশ বারোটা পশু আতঙ্কে আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল।

 বলি হইয়া গেল, পূজা দেওয়া হইল না। আশঙ্কায় রামুর বুক কাঁপিয়া উঠিল। আগ্রহে মন্দিরের সিঁড়ির দুই ধাপ উপরে উঠিতেই পূজারী ধমক দিলেন, “আরে সর্ব্বনাশ! নেমে যাও, নেমে যাও! ভোগ রাগ হয়নি। কি সব অনাচার।”

 রামু অপ্রতিভ হইয়া নীচে নামিয়া নর্দ্দামার ধারে দাঁড়াইল। নর্দ্দামা দিয়া তখন রক্তগঙ্গা বহিয়া যাইতেছে।

(৪)

 "ওরে বাজা, বাজা, ভোগের বাজনা বাজা!

 ঢোল সানাই একসঙ্গে বাজিয়া উঠিল, ড্যাং নাক্ পোঁ।

 “সরে’ যা, সরে’ যা সব, ভোগ আস্‌ছে!”

 রামু নর্দ্দামার প্রান্ত ছাড়িয়া একেবারে চত্বরে আসিয়া দাঁড়াইল।

 ভোঁ ঘরর্! সবুজ রঙের প্রকাণ্ড হাওয়া গাড়ী।

 “কে এলেন বুঝি! সরে’ যা সব, দাঁড়া সরে’ দাঁড়া! আমার জপের মালাটা তুলে রাখ ঠাকুর!” বিলাস হালদার চত্বরে নামিলেন।

 নামিল অনবগুণ্ঠিতা ভূষণমণ্ডিতা নারীমূর্ত্তি। দীর্ঘ রজনী জাগরণে আরক্তনেত্র, পরিধানে শুভ্র গরদ, হাতে বেলফুলের মালা।

 “কুসুম বাইজি! কুসুম বাইজী এসেছেন! ভোগের থালা সরিয়ে পথ করে দাও ঠাকুর! আসুন! আসুন!!” বিলাস হালদার গাড়ীর নিকট আসিয়া দাঁড়াইলেন। পশ্চাতে ডালার দোকানীরা।

 “মায়ের পাঁঠা হবে তো? কটা?”

 “শ্রাদ্ধ করাবেন না চণ্ডীপাঠ?”

 আজ দিন ভাল আছে মা, একটা স্বস্ত্যয়নের যোগাড় করে’ দিই?

 গঙ্গা নাইবেন তো? না স্নান করে’ এসেছেন? তিলক হয়নি যে! ওরে চন্দন, রক্ত চন্দন আর ছাপগুলো আন, দরজার কাছ থেকে সবাইকে সরিয়ে দাও ঠাকুর। কার্পেটের আসন বিছিয়ে দাও।”

 সম্মুখে বিলাস হালদার, দুই পার্শ্বে পূজারী, পশ্চাতে চারিখানি থালায় পূজার উপকরণ বহিয়া চারিজন ব্রাহ্মণ। সুন্দরী মন্দিরে উঠিলেন।

 বেলা বারোটা। পশুর রক্তের ধারা শুকাইয়া কালো হইয়া গেছে, পুত্রের পথ্যের সময় উপস্থিত। রামু চঞ্চল হইয়া উঠিল।

 কুসুম বাইজী জপ করিতেছেন। জপ শেষের প্রতীক্ষায় বিলাস হালদার বারন্দায় দাঁড়াইয়া। চত্বরে মালী, বাগ্দী, পাঁঠাওয়ালা সাগ্রহে অপেক্ষা করিতেছে।

 মায়ের ভোগের অন্নব্যঞ্জনের উপর মাছি উড়িতেছে। কুসুম বাইজীর মানসিক কি আছে জানা যায় নাই, কাজেই ভোগ দেওয়া অসম্ভব।

 গুড়ুম! একটার তোপ।

 আর অপেক্ষা করা চলে না। দু’দিনের সঞ্চিত উপার্জ্জনের বিনিময়ে সংগৃহীত পূজার উপচার একটা খঞ্জ ভিখারীর হাতে তুলিয়া দিয়া নর্দ্দমা হইতে একটী রক্তচর্চ্চিত বিল্বদল তুলিয়া মাথায় ঠেকাইয়া রামু চলিয়া গেল। যাইবার সময় বার-বার মন্দিরের দিকে চাহিয়া রামু মালী যুক্তকরে প্রণাম করিতে করিতে মায়ের কাছে কি নিবেদন জানাইয়া গেল তাহা সেই জানে।