বিষয়বস্তুতে চলুন

থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/থার্ডক্লাশ

উইকিসংকলন থেকে

থার্ডক্লাশ

 হলুদ রঙ্গের একখানা গাড়ী। বোঁচ্‌কা-বুঁচ্‌কি, ভাঙা রঙ-ময়লা গণ্ডা পাঁচেক ট্রাঙ্ক, দশ বারোটা ঝুড়ি, গোটা বিশেক ক্যাম্বিসের ব্যাগ, খান চব্বিশ দেশী ও বিলাতী কম্বল, পাঁচ সাতখানা ছেঁড়া কাঁথা, অগণ্য হুঁকা-কলকে, পানের ডিবে ও জলের গেলাশ। তার মাঝে মাঝে জুতা—পম্পসু, চটি, ডার্ব্বি, নাগরাই, ক্যাম্বিস্, চীনেবাড়ী, তালতলা, ঠন্‌ঠনে, কটক, আগ্রা সকলেরই নূতন পুরাতন নমুনা একসঙ্গে।

 গাড়ীর ভিতরে মাথার কাছে লেখা, “চব্বিশ জন বসিবেক।” চব্বিশ জনের জন্য সাড়ে চারখানা বেঞ্চ। তার আধখানা কলেক্টর সাহেবের আর্দ্দালীর দখলে। বেঞ্চের ভিতরের ফাঁকে ফাঁকে লক্ষ কোটি ছারপোকা, আর তার উপরে একচল্লিশ জন স্ত্রী, পুরুষ, বালক, বৃদ্ধ, শিশু ঠাসাঠাসি। পাগড়ী, টুপী, তাজ, আলখাল্লা, গেরুয়া, নেংটী, শাড়ী, থান, রসগোল্লা পাড় ও কাশী পাড় কাপড়, পায়জামা ও আচকানের বিচিত্র সমন্বয়।

 দুর্গন্ধ পায়খানার দরজা দড়ি দিয়ে বাঁধা, হুক্ নেই। একটা বেঞ্চের নীচে একটা মরা ইঁদুর, আর একটা বেঞ্চের নীচে কতকগুলো অনেক দিনের পচা কলার খোসা। তামাক বিড়ি, সিগারেট, গাঁজা, নারিকেল ও ফুলেল তৈল, ময়লা কম্বল ও কাঁথা, কাবুলির বোঁচকা ও কলেক্টর সাহেবের আর্দ্দালীর ছিপিখোলা ‘রমের’ বোতল। সকলের দুর্গন্ধ একসঙ্গে।

 ভাদ্রের গ্রীষ্ম। ছোট ছোট ছেলেদের ক্রন্দন। একটু হাওয়ার জন্য একটি জানালা দিয়া একসঙ্গে তিন চারজন যাত্রীর মুখ বাহির করিবার প্রয়াস। এই অবস্থায় ঘোমটার আবরণে ঘর্মাক্ত যুবতী সতর্ক অঞ্চল বীজনে শীতল হইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতেছিল। কোণে একটা বুড়ী সমস্ত অঙ্গের সঙ্গে পা দুটী গুটাইয়া জ্বরের ঘোরে ধুঁকিতেছিল।

 টুং! টুং! টুং! ফুঁ!

 ষ্টেশন। ‘চাই মিঠাই’, ‘চাই পান-বিড়ি!’ ‘এই কুলি এধার!’

 ‘এধার কোথায়? দেখছ না ভর্তি? ওধার যাও!’

 ‘গার্ড সাহেব!’

 ‘ইউ ড্যাম্!’

 ‘ও টিকিটবাবু, উঠবো কোথায়?’

 ‘ইস্‌মে ওঠনা কেন?’

 ‘উঠতে দেয় না যে!’

 ‘কেন নেহি দেঙ্গে? গাড়ী উন্‌কো বাবার নাকি? উঠ জল্‌দি! হ্যালো গুড্‌মর্ণিং পেদ্রুজ!’ টিকিটবাবু গার্ডের গাড়ীর দিকে ছুটিলেন।

 ‘ওঠ, ওঠ, মহেশ, ঝাণ্ডি দেখাচ্ছে ওঠ!’

 ঘটাং!

 ‘ওরে বাপু, এর মধ্যে!’ ‘এই দুটো ষ্টেশন গো—সরাও তো বাবা তোমার গাঁটরীটা। ওঃ বড় গরম!’

 ‘ফুঁ!’

 যাত্রী বর্তমানে চুয়াল্লিশ।

 ‘ঘটাৎ! মাথায় টুপী, সাদা কোটপ্যাণ্ট, রক্তমুখ ফ্লাইং চেকার! শঙ্কিত যুবতী সরিয়া গেল। দু’পা সরিয়া তাহার গা ঘেঁসিয়া চেকার দাড়াইয়া সম্মুখের বৃদ্ধকে লক্ষ্য করিয়া হাঁকিল, টিকেট ডেখলাও!’

 ‘দেখাই সাহেব।’

 ‘জল্‌ডি নিকালো—এই হটো ড্যাম্!’ পায়ের কাছের হিন্দুস্থানী বালক সভয়ে সরিতে গিয়া পড়িয়া গেল।

 ‘টুমকো টিকিট?’

 ‘করতে পারিনি সাহেব, দাসপুর যাব।’

 ‘টিকিট নেহি কিয়া? লে আও রূপেয়া! জল্‌ডি নিকালো!’

 ‘দিচ্ছি সাহেব, এই সাত আনা।’

 ‘নেহি হোগা ডেও রূপেয়া!’

 লোকটি গামছার খুঁট খুলিয়া আরো চার আনা বাহির করিয়া দিল। এই ছিল তার মোট সম্বল।

 ‘আউর ডেও।’

 ‘আর কোথায় পাবো সাহেব? আট আনা টিকিটের দাম, এগারো আনা দিলাম— আর পয়সা নেই।’

 ‘আট আনা মাশুল, আউর আট আনা জরিমানা।’

 ‘এবারের মত মাফ কর সাহেব।’

 ‘বহুট্‌ আচ্ছা, এ্যাসা কব্‌ভি মট্‌ করো। এই হটো, যানে ডেও। এই মাগি’—বলিয়া ত্রস্ত যুবতীকে কনুই দিয়া ধাক্কা দিয়া বৃদ্ধার পা মাড়াইয়া সাহেব বাহির হইয়া গেল।

 ‘বাবা গো মলাম।’ বৃদ্ধার আর্ত্তনাদ।

 ‘সাহেব, আমার মাশুল নিলে, টিকিট?’

 ‘মট্‌ চীল্লাও!’ সাহেব অন্য গাড়ীতে ঢুকিল।

 ‘বলদপুর!’ ‘বলদপুর!!” ষ্টেশনের পোর্টার হাঁকিল। আবার সেই হট্টগোল। গাড়ীতে উঠিবার জন্য যাত্রীদের সেই দারুণ প্রয়াস! ষ্টেশন মাষ্টারের বিচিত্র হিন্দী, রেলের কুলির গালাগালি। থার্ডক্লাশের যাত্রীযূথের কোলাহল ও আর্ত্তনাদ।

 ‘এই ঘণ্টি দেও!’ ষ্টেশন মাষ্টার হাঁকিলেন।

 ‘দাঁড়াও বাবা! ও-সাহেব বাবা, একটু রাখ বাবা!’ বলিতে বলিতে পুঁটুলীহাতে এক বুড়ী আসিয়া গাড়ীর কাছে দাঁড়াইল।

 ‘হটো বুড়ী! ছোড় দিয়া।’

 বুড়ী মিনতি করিয়া কহিল, ‘আমার বিপিন বাঁচে না বাবা, সকালে এসেছিনু বদ্দিবাড়ী, অষুধ নিয়ে যাচ্ছি।’ বলিয়া সে গাড়ীতে উঠিতেই টিকিটবাবু তাহাকে ধরিলেন। গাড়ী ছাড়িয়া দিল। বুড়ী হাতের পুঁটুলী প্ল্যাটফ্রমে ছুঁড়িয়া দিয়া আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল, ‘ওরে বিপিন রে!’ গাড়ীর শব্দে বাকী কথাগুলি শোনা গেল না।

 গাড়ী চলিতেছে। গাড়ীর জানালাগুলি বন্ধ করিয়া দিলে কতক্ষণে অন্ধকূপ হত্যার পুনরাভিনয় হইতে পারে তাহাই ভাবিতেছি এমন সময় গাড়ী থামিল। তৃষ্ণার্ত যাত্রীর দল সমস্বরে চীৎকার করিয়া উঠিল, ‘পানি-পাঁড়ে, এই পাঁড়ে!’ সঙ্গে সঙ্গে আশে-পাশের পঞ্চাশটী জানালার মধ্য দিয়া দেড়শ’ শূন্য ঘটি, গেলাস, বাটি ও মগ বাহির হইয়া আসিল।

 ‘এই পানি-পাঁড়ে! এ-ধার!’

 কালো বাল্‌তি হাতে কৃষ্ণবর্ণ, নগ্নপদ টুপী মাথায় পানি-পাঁড়ে আসিয়া দাঁড়াইয়া দাঁত খিঁচাইয়া কহিল—‘এ-ধার! হুকুম্‌সে পানি মিলেগা?’ তারপর মৃদুস্বরে কহিল, “এক এক লোটা, দো—দো পয়সা।” বাঁ-হাতের মুঠা পয়সায় ভরিয়া, ডান-হাতে শূন্য বাতি লইয়া পানি-পাঁড়ে মহাশয় ফিরিয়া যাইতেছিলেন, এমন সময় কালেক্টর সাহেবের আর্দ্দালী তন্দ্রা ভাঙ্গিয়া হাঁকিলেন, “এই পাঁড়ে, পানি লে আও।” রক্তচক্ষু পাঁড়েজী মুখ ফিরাইলেন। তারপর দীর্ঘশ্মশ্রু, উষ্ণীষ-শোভিত আর্দ্দালীসাহেবকে দেখিয়া হাতের বাতি নামাইয়া রাখিলেন ও সুদীর্ঘ সেলাম করিয়া কহিলেন, “সেলাম হুজুর! থোড়া সবুর কি জিয়ে, টাট্‌কা পানি লে আতে হেঁ।”

 বীরদর্পে আর্দ্দালী সাহেব স্বস্থানে ফিরিয়া আসিয়া গোঁফে তা দিতে লাগিলেন।

 দশ মিনিট থাকিবার কথা; বিশ মিনিট হইয়া গেল গাড়ী ছাড়ে না। গ্রীষ্মের জালায় প্লাট‍্ফর‍্মে নামিলাম। পোর্টার আসিতেছিল।

 “ওহে, গাড়ী ছাড়তে এত দেরী হচ্ছে কেন বলতে পার?”

 “নেহি জান্‌তা।” পোর্টার চলিয়া গেল। টিকিট চেকার আসিতেছেন।

 “চেকারবাবু, গাড়ীর দেরী হচ্ছে কেন?”

 “কেডী সাহেবের লেডি (!) খানা খেতে গেছেন।

 “কেডী সাহেব কে?”

 “হোয়াট্ ফ্রট্ ইওর নোয়িং?” আমার জানিয়া কোন ফল নাই বুঝিয়া চুপ করিয়া রহিলাম।

 চেকার চলিয়া গেলেন।

 শূন্য বোতল ঘটর ঘটর করিতে করিতে সোডাপানিওয়ালা আসিতেছিল।

 “মিঞা, কেডী সাহেব কে বলতে পার?”

 “নীলগঞ্জের পাটের দালাল। সেকেন ক্লাশে আছেন।”

 কেডী সাহেবের ‘লেডি’ আসিলেন, ষ্টেশন মাষ্টার সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া গাড়ীতে তুলিয়া দিলেন। গার্ড সাহেব ষ্টেশন মাষ্টারকে জিজ্ঞাসা করিয়া নিশান তুলিলেন, গাড়ী ছাড়িল।

 আমার কাণে হঠাৎ বাজিল, বুড়ীর সেই আর্ত্তনাদ,— দোহাই বাবা, একটুখানি রাখ বাবা! ওরে বিপিন—বিপিন রে—!”