থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/দুলাল
দুলাল
(১)
স্বর্গীয় পিতার একটি গুণ পূর্ণভাবেই পুত্র দুলালচন্দ্রে বর্ত্তিয়াছিল। দুলালের পিতা চরণদাস বৈরাগী একজন সুকণ্ঠ গায়ক ছিল। তাহার রচিত মান-মাথুরের পালা আজও সাতপাড়া অঞ্চলে গাওয়া হয়। এখনও কোন বড় ওস্তাদ সে অঞ্চলে আসিলে মজলিসে বসিয়া ইতর-ভদ্র সকলেই স্বর্গীয় চরণদাসের কথা তুলিয়া দুটা গল্প করে।
দুলালকে তিন বছরেরটি রাখিয়া চরণ মারা যায়। সে আজ চার বছরের কথা। ইতিমধ্যে দুলালের মা শ্যামা বৈষ্ণবী গোবিন্দ বৈরাগীর সহিত কণ্ঠি বদল করিয়া আবার নূতন গৃহে সংসার পাতিয়াছে। তাহাতে দুলালের কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি ছিল না। সে আগেকার মতই চারবেলা ভাত খায়, সমস্ত দিন বাড়ী-বাড়ী নাম কীর্ত্তন ও মান-মাথুরের এক-আধখানা ভাঙ্গা গান গাহিয়া বেড়ায়। গোবিন্দ প্রহার করিয়াও দুলালকে তার মুড়ী-মুড়কীর দোকানে কাক তাড়াইবার কাজে লাগাইতে পারে না।
এই প্রহার পিতার আমলে তাহার ভাগ্যে ঘটিয়াছে কিনা সে কথা তাহার মনে পড়ে না, তবে এখন এটা নিত্যকার ব্যাপারে দাঁড়াইয়াছে; কাজেই প্রহার তার সহিয়াও গিয়াছে। সমস্ত দিনের পর শুস্কমুখে বাড়ী ফিরিয়া চারটি ভাত ও এক ঘটি জল খাইয়া মা’র আঁচলে মুখ মুছিয়া সে শয্যা লয়, পরদিন ঘুম ভাঙ্গিলে আবার একবাটি ভাত, গুড় ও তেঁতুলের সহিত উদরস্থ করিয়া প্রহরকালের জন্য দৈনন্দিন সঙ্গীতকলার অনুশীলনে বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া বেড়ায়।
কিন্তু সহসা একদিন এই নিশ্চিন্ত জীবন-যাত্রায় বাধা পড়িল।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরিয়া দুলাল দেখিল উঠানে জলচৌকীর উপর ভদ্রবেশধারী একটি লোক, সম্মুখে তার মা ও গোবিন্দ; উভয়ে দাঁড়াইয়া পরম নিবিষ্ট চিত্তে সে লোকটির সহিত বাক্যালাপ করিতেছে। ভদ্রলোক দেখিলেই প্রণাম করিতে হয়, খুব শৈশবেই চরণ তাহাকে এ কথা শিখাইয়াছিল। সে আসিয়া টিপ করিয়া আগন্তুকের পায়ের কাছে প্রণাম করিল। আগন্তুক দুলালের মাথায় হাত রাখিয়া কহিলেন, “বাঃ, বেশ সভ্য তো তোমার ছেলেটি, বোষ্টমী!”
শ্যামা কোনো কথা বলিবার পূর্ব্বেই ক্ষুধার্ত্ত দুলাল মা’র আঁচল টানিয়া কহিল, “ভাত দে মা।”
ভদ্রলোক কহিলেন, “আহা, যাও যাও ভাত দাও গে, কথা তো হয়েই আছে, সন্ধ্যা হ’লেই আগাম টাকাটা দিয়ে যাবো’খন।”
শ্যামা দুলালের হাত ধরিয়া চলিয়া গেল।
ভদ্রলোকটা কলিকাতার ‘সুরেন্দ্র থিয়েট্রিক্যাল যাত্রা পার্টি’র ম্যানেজার। তিনি এদিকে তাঁর শ্যালিকার গৃহে বেড়াইতে আসিয়াছিলেন। কাল সন্ধ্যায় সেখানে হরিসংকীর্তনে দুলালের গান শুনিয়াছিলেন। এত অল্প বয়সে এমন মিষ্ট কণ্ঠে তান-লয়-শুদ্ধ গান তিনি আর কখনো শোনেন নাই। তাই গান শুনিয়া ছেলেটির প্রতি তার লোভ হয় এবং সন্ধান লইয়া গোবিন্দের সঙ্গে শামার গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। গোবিন্দের মোটেই আপত্তি নাই। তবে শ্যামা? শ্যামাও মাসিক এক-কুড়ি টাকা মাহিনা শুনিয়া অবাক্ হইয়া গেল—তবু ছেলে দূরে চলিয়া যাইবে, এ কল্পনায় মন তার বেদনায় আর্দ্র হইয়া উঠিল। কিন্তু টাকা! এক মাসের মাহিনা নগদ হাতে পাইবে, তা ছাড়া ছেলের ভবিষ্যতের একটা হিল্লে হইয়া যাইবে! মনকে বুঝাইয়া শ্যামা দুঃখ ভুলিবার চেষ্টা করিল।
মা’র মুখে অন্যত্র যাইতে হইবে শুনিয়া দুলাল শঙ্কিত দৃষ্টিতে মা’র দিকে চাহিয়া যখন কহিল, “মা, আমি যাব না” তখন এ কথায় শ্যামার মনে আবার সেই বেদনা জাগিয়া উঠিল। গোবিন্দ রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াইয়া কহিল, “তুমি উঠে এসোনা। বাবু কি বলছেন, টাকাক’টি নেবে কিনা?”
এক-কুড়ি টাকা চট্ করিয়া ফেলিয়া দিতেও শ্যামার মন সরিল না। দুলালের দিকে না চাহিয়া সে বাহিরে আসিল এবং আরো কিছুক্ষণ কথা-বার্ত্তার পর নোট দু’খানি আঁচলে বাঁধিয়া আগন্তুকের পা ধরিয়া কহিল, “আপনি আমার বাপ! ওটি বৈ আমার আর কেউ নেই। দেখবেন, আপনার, হাতেই ওকে তুলে দিচ্ছি।”
আগন্তুক গোপাল বণিক সহাস্যে কহিলেন’ “ছ’মাস পরে চিনতে পারবে না বোষ্টুমী, তোমার ছেলেকে।” শ্যামা তথাপি বার-বার করিয়া বলিয়া দিল; তাহার ছেলে কি কি খাইতে ভালবাসে কি তার সাধ, এই সবের মস্ত ফর্দ্দ সে দিতে চলিল। গোপাল বণিক ধৈর্য্য-সহকারে সব কথা শুনিয়া কহিলেন, “কিছু ভেবো না, দু’বেলা ভাত-মাছ তো আছেই—তাছাড়া লুচী-মেঠায়ের ছড়াছড়ি। পূজোর পর ছেলে এলে তার মুখেই সব শুন্তে পাবে গো!” শ্যামা আশ্বস্ত হইল, দুলাল কিন্তু সারারাত মাকে জড়াইয়া ধরিয়া কেবলই কহিতে লাগিল, “আমি যাবো না মা আমি যাবো না।” গোবিন্দ দু’বার তার চুল ধরিয়া টানিয়া তা’কে রাজী করিবার চেষ্টা করিল। শ্যামা কহিল, “আহা মেরো না—আমি বুঝিয়ে বল্চি।”
শ্যামা অনেক করিয়া বুঝাইল, মিঠাই, মোণ্ডা, কেমন রঙীন ঝক্মকে সাজ-পোষাক, কত আদর! তার উপর কলিকাতা সহর—কত গাড়ী-ঘোড়া, কত বড় বড় বাড়ী, লোকজন! এত প্রলোভনের কথা শুনিয়াও দুলাল কহিল, “সেখানে যে তুমি নেই!”
শ্যামা অঞ্চলে চোখ মুছিল। দুলাল কহিল, “তুমি যা’বে সঙ্গে?” শ্যামা এ কথার একটা জবাব খুঁজিয়া পাইল, কহিল, তুই আগে যা, তারপর আমাকে চিঠি দিলেই আমি যাবো।” এ ব্যবস্থায় দুলাল রাজী হইল।
পরদিন প্রাতে গোপাল বণিকের হাতে পায়ে ধরিয়া অনেক মিনতির সহিত ছেলেকে দেখিবার অনুরোধ করিয়া কাঁদিতে কাদিতে শ্যামা দুলালকে বিদায় দিল। রাত্রির কথা ভুলিয়া প্রাণপণ শক্তিতে দুলাল মা’র অঞ্চল-প্রান্ত মুঠা করিয়া ধরিয়াছিল—গোবিন্দ আসিয়া মুঠা খুলিয়া দুলালকে টানিয়া গাড়ীতে বসাইয়া দিয়া গাড়োয়ানকে বলিল, “গাড়ী ছাড়্।” গাড়ী চলিতে আরম্ভ করিল। দুলাল কাঁদিতে কাঁদিতে গাড়ী হইতে মুখ বাড়াইয়া কহিল, “কাল চিঠি দেবো মা—চ’লে আসিস্!”
গাড়ী পথের বাঁকে অদৃশ্য হইয়া গেল! শুধু একটা আর্ত্ত ভগ্ন কণ্ঠস্বর বাতাসকে নিমেষের জন্য ভারাক্রান্ত করিয়া তুলিল।
(২)
চিৎপুর রোডের উপর তিন-তলা বাড়ী। তেতালার একটা ঘরের বাহিরে বড় সাইনবোর্ডে লেখা—“সেই সুপ্রসিদ্ধ সুরেন্দ্র থিয়েট্ৰিক্যাল যাত্রা-পাটি। স্বত্বাধিকারী শ্রীসুরেন্দ্রনাথ সাহা। ম্যানেজার শ্রীগোপালচরণ বণিক।” গৃহের অভ্যন্তরে অনেকগুলি ছেঁড়া মাদুর বিছানো। তাহার উপর মাঝে মাঝে বালিশ, ছিন্ন আবরণ-শূন্য। ইতস্ততঃ অনেকগুলি বই। অধিকাংশই যাত্রার পালা, খান-কয়েক সচিত্র প্রেমলিপি, থিয়েটার সঙ্গীত, পাঁচালী ও কবির লড়াই। ঘরের কোণে গুটি কয়েক বাক্স, তাহাদের গায়ে নানা বর্ণের লেবেল আঁটা। বাক্সগুলির উপর কয়েক জোড়া তবলা ও খঞ্জনী; দেয়ালের উপর দিকে খান-কয়েক নগ্ন নারীর বিলাতী ছবি, একটা কুলুঙ্গিতে একটি গনেশের সিঁদুর মাখা মাটির মূর্ত্তি। মূর্ত্তিটার পাশে ন্যাক্ড়া জড়ানো একটি গাঁজার কলিকা। দেওয়ালের নীচের দিকে ও গৃহের প্রত্যেকটি কোণ পাণের পিকে বিচিত্রিত। তখন বেলা এক প্রহর। মেঝেয় বসিয়া কয়েকজন অভিনেতা আয়নার সামনে বিচিত্র-ভাবের মুখভঙ্গী করিতেছিল।
গৃহের কোণে একটি ছিন্ন তাকিয়ায় বুক রাখিয়া স্বত্বাধিকারী মহাশয় গড় গড়ার নল মুখে দিয়া দৈনিক জমা-খরচের খাতা পরীক্ষা করিতেছিলেন।
এই সময়ে দুলালকে লইয়া ম্যানেজার বাবু গৃহে প্রবেশ করিয়া স্বত্বাধিকারী মহাশয়কে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “দেখুন, এনেচি। তৈরি করে’ নিতে পারলে “ভড়ের সীতা-নির্ব্বাসন” একেবারে কাণা।"
স্বত্বাধিকারী মহাশয় গড়্গড়ার নল ছাড়িয়া উঠিয়া বসিয়া কহিলেন, “এ যে একেবারে খোকা দেখচি। পারবে কি?”
“পরখ করেই নিন্ না।"
—“আচ্ছা, একটা গাও তো থোকা।” দুলালের অত্যন্ত ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছিল। সে কহিল, “বড্ড খিদে পেয়েছে।”
ম্যানেজার বাবু, চাকর ডাকিয়া দু’ পয়সার মুড়ি আনিবার আদেশ দিয়া কহিলেন, “আসছে খাবার—তুমি ততক্ষণ একটা গেয়ে ফ্যালো তো।”
দুলাল ভূমিতলে বসিয়া হাত নাড়িয়া একটা পদ কীর্ত্তন আরম্ভ করিল। নিত্যকার মত আজকে গানে প্রাণ তার লুটাইয়া পড়ে নাই, তবু স্বত্বাধিকারী ও অভিনেতার দল বিমুগ্ধ হইল। স্বত্বাধিকারী বলিলেন, “চলবে। ভালই চলবে। তবে রাখ্তে পারলে হয়।” তারপর দুলালের গৃহের সংবাদ শুনিয়া কহিলেন, “না, পালাবার ভয় নেই। আজ থেকেই তালিম দিন। কুশের পাটটায় গান আছে, আর দু’একটা চণ্ডীদাসের পদ জুড়ে দিলে ছোক্রার সুবিধে হবে।” সেই দিন হইতেই দুলালের শিক্ষার বন্দোবস্ত হইয়া গেল।
বৈকালে দুলাল জানালা দিয়া বাহিরের জগতটাকে দেখিয়া লইল। এই কলিকাতা সহর! লোকজন, গাড়ী-ঘোড়া! দুলালের এ-সব মোটে ভাল লাগে না। গাঁয়ের সঙ্গীদের কথা মনে পড়িতে লাগিল। আর মনে পড়িল সেই বাবলা গাছের সারি, সেই বাঁশঝাড় ও গাব গাছের অন্তরালে তাদের সেই ক্ষুদ্র গৃহখানি! অদূরে এক স্যাকরার দোকানে বসিয়া একটি ছোকরা বাঁশী বাজাইতেছিল, কি করুণ সুর! দুলালের মনটা উদাস হইয়া উঠিল।
মা’র কথা মনে পড়িল! মা এখন কি করিতেছে? সেকথা মনে হইতেই দুই চোখ জলে ভরিয়া উঠিল। বাহিরের বিশ্ব সে জলে ভাসিয়া কোথায় যে অদৃশ্য হইয়া গেল—আর অশ্রুর আবছায়ার মধ্যে মা’র মূর্ত্তি সহস্ররূপে তার সামনে ঘুরিয়া ফিরিতে লাগিল! জানালার গরাদে দুই গাল চাপিয়া অস্পষ্ট স্বরে সে সে ডাকিল, “মা, মা, মাগো!”
কতক্ষণ কাঁদিয়া সে ম্যানেজারবাবুর কাছে গিয়া কহিল, “আমি থাকতে পারবো না এখানে, মা’র কাছে যাব।”
ম্যানেজার বাবু তখন দু’পয়সার ফুলুরীর সঙ্গে বৈকালিক চা পান করিতেছিলেন, দুলালের কথা শুনিয়া মুখ বিকৃত করিয়া কহিলেন, “সোনার চাঁদ আর কি! যা, ওপর-তলায় বস্গে এখনি মাষ্টার আসবে।” বিষণ্ণ ম্লান মুখে দুলাল চলিয়া গেল।
সন্ধ্যায় মোশন-মাষ্টার আসিয়া দুলালকে নানা ভাবে পরীক্ষা করিয়া স্বত্বাধিকারীকে কহিলেন, “ছেলেটা খুব ভালই মিলেছে বাবু টিঁকে থাক্লে অস্চে পূজোয় ‘নরমেধ যজ্ঞ’ খুব ভাল উৎরে যাবে।”
দুলালের শিক্ষা শুরু হইল। সেই সঙ্গে দু’বেলা চার পরসার মুড়ি-মুড়কী জলখাবারেরও বন্দোবস্ত হইয়া গেল। ম্যানেজার বাবু দুলালকে রাস্তায় বাহির হইতে বিশেষভাবে নিষেধ করিয়া দিলেন। ‘সুরেন্দ্র থিয়েট্রিক্যালের’ প্রতিদ্বন্দ্বী ‘নিতাই অপেরা’র ঘর রাস্তার মোড়ে। সে দলের অভিনেতারা সর্ব্বদাই সন্ধান লইয়া বেড়াইতেছে। এমন একটা রত্নের সন্ধান পাইলে তারা তাকে গ্রাস করিয়া ফেলিবে! গত বৎসর তাদের একটি ছেলেকে ভাঙ্গাইয়া নূতন পঞ্চাঙ্ক নাটক ‘সমুদ্র-মন্থন’কে এরা একেবারে জখম করিয়া দিয়াছিল!
দুলালকে সতর্ক করিয়া ম্যানেজারবাবু দরোয়ান, চাকর ও অভিনেতাদিগকে এই বালকটির দিকে বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি রাখিবার জন্য আদেশ প্রচার করিলেন। ইঁট-কাঠের আবেষ্টনে অনেকগুলি দৃষ্টির শৃঙ্খলে পল্লীর দুলাল বন্দী রহিল। মন তার সারাদিন পড়িয়া থাকিত তার সেই গ্রামের মাঠ-ঘাটের মধ্যে! বেলা দশটায় ভাত খাইতে বসিয়া প্রথম যে অন্নের গ্রাসটি সে মুখে তুলিত, সেটা প্রত্যহই অশ্রুজলে অভিষিক্ত হইত। যেদিন মা’র কথা বেশী করিয়া মনে হইত, সেদিন অন্ন আর মুখেও রুচিত না। ইতিমধ্যে ম্যানেজারবাবুকে অনুরোধ করিয়া সে মা’র কাছে একখানা চিঠি পাঠাইয়াছিল। ম্যানেজারবাবু একখানা সাদা পোষ্টকার্ড লিখিয়া বিনা মাশুলেই সেখানা পোষ্ট করিয়াছিলেন। দুলাল জানিত যে পত্রপাঠ মাত্র মা এখানে আসিবে। কাজেই দিনকয়েক বিনা বাক্যব্যয়ে সে শিক্ষা গ্রহণ করিতে লাগিত। কিন্তু চিঠি পাইবার দিন হইতে দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শুনিলেই ছুটিয়া গিয়া জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া দেখিত এবং পর মুহূর্ত্তেই মুখখানা ছোট করিয়া ফিরিয়া আসিত।
এমনিভাবে দেড় মাস কাটিয়া গেল। প্রত্যহ প্রত্যুষের আশা সন্ধ্যায় একেবারে বিলীন হইয়া যাইত। তথাপি দুলাল মা’র আগমন সম্বন্ধে নিরাশ হইতে পারিল না। এই আশা ও নৈরাশ্যের অবকাশে দুলালের শিক্ষা সমাপ্ত হইল।
(৩)
পূজা আসিতেছে। যাত্রার দলের নূতন পালা “সীতার বনবাস” নাটকের বিজ্ঞাপন বড় বড় রক্তাক্ষরে চারিদিকে প্রচারিত হইয়া গেল। জোড়াসাঁকোর বারোয়ারিতলায় এই যুগান্তকারী নাটকের প্রথম অভিনয় হইবে, স্থির হইয়া গিয়াছে।
অভিনয়ের দিন প্রাতঃকালে দুলাল কাঁদিতে কাঁদিতে ম্যানেজারের কাছে উপস্থিত হইয়া কহিল, “আমি মা’র কাছে যাব।” ম্যানেজার তাহার কথা শুনিয়া দাঁত-মুখ খিঁচাইয়া কহিল, “তুমি বেশ ত’ ছোক্রা! আজ প্লে, আর তুমি যাবে মা’র কাছে! আব্দার আর কা’কে বলে!” দুলাল বুঝিল যাওয়া হইবে না!, চক্ষু মুছিতে মুছিতে সে চলিয়া গেল।
রাত্রে অভিনয় আরম্ভ হইল। স্বত্বাধিকারী দেখিল ম্যানেজার মিথ্যা বলে নাই। কুশের অভিনয়ে দুলাল যে দক্ষতার পরিচয় দিতেছিল তা অপূর্ব্ব। তাঁহার যাত্রার ইতিহাসে এমনটি দেখা যায় নাই! শ্রোতার দলও মুগ্ধ হইয়াছিল এবং প্রত্যেক বারই দুলালের আগমনের সঙ্গে করতালিধ্বনিতে তাহাকে উৎসাহিত করিতেছিল। দুলালের চরম কৃতিত্ব ফুটিল শেষ দৃশ্যে,—রামায়ণ-গানের অবসানে যখন সীতা আসিলেন এবং কুশবেশধারী দুলাল যখন “এই যে মা” বলিয়া সীতাকে জড়াইয়া ধরিল। শ্রোতাদের চক্ষু সে মিলন-দৃশ্যে ছল-ছল করিয়া উঠিল। বাষ্পরুদ্ধ-কণ্ঠে অভিনয়ের কথা কয়টি উচ্চারণ করিয়া ফোঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল, "মা, মা, মাগো।"
তাহার এই ক্রন্দনে আর ভগ্ন কণ্ঠস্বরে কিছুকালের জন্য শ্রোতৃমণ্ডলী যাত্রার আসর ভুলিয়া যেন কোন্ সুদূর অতীত লোকে গিয়া উপস্থিত হইল। স্বত্বাধিকারী হইতে বেহালাদার পর্য্যন্ত দুলালের এই শেষ দৃশ্যের অভিনয়ে আশ্চর্য্য হইয়া গেলেন। তাঁহাদের জীবনে যাত্রার আসরে এমন জীবন্ত অভিনয় করিতে তাহারা আর কাহাকেও দেখেন নাই!
গান ভাঙ্গিল। চিকের আড়াল হইতে একটি রমণী একখানা বহুমূল্য শাল কুশের জন্য পাঠাইয়া দিলেন। পুরুষদের দলেও দু’একজন পুরস্কার দিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। তখন দুলালের ডাক পড়িল। কিন্তু খুঁজিয়া কোথাও তাহাকে পাওয়া গেল না।
অভিনয় শেষে দুলাল সাজ-ঘরে আসিয়া পোষাক ছাড়িয়া অপরের অলক্ষিতে একেবারে পথে আসিয়া দাঁড়াইল। তার সমস্ত অন্তর মা’র বুকে ফিরিয়া যাইবার জন্য অধীর আকুল হইয়া উঠিয়াছিল। যাত্রার দলের সাজ-ঘর, ম্যানেজার ও মাষ্টারের প্রশংসা, শ্রোতাদের উৎসাহ-বাণী- এ সব কিছু নয়, কিছু নয়, কিছু নয়। প্রশ্ন করিতে করিতে সে একেবারে ষ্টেশনে আসিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু পয়সা চাই—টিকিট কিনিতে হইবে। নইলে তো চড়িতে দিবে না! উপায়? প্লাটফর্ম্মের এদিক-ওদিক বৃথা ঘুরিয়া ক্লান্ত-পদে গিয়া সে একটা বেঞ্চের উপর বসিয়া পড়িল। দুই চোখ মুদিয়া আসিতেছিল—সে ঘুমাইয়া পড়িল। তখন ষ্টেশনের প্লাটফর্ম্ম জনশূন্য হইয়া আসিয়াছে!
দুলাল স্বপ্ন দেখিতেছিল, সে যেন মা’র কাছে ফিরিয়া আসিয়াছে, মা’র বুকে মাথা রাখিয়া বলিতেছে, “আমি যাবো না, আর যাবো না মা।" মা তাকে বুকে টানিয়া বলিতেছে “না, বাবা, না, আর তোমায় যেতে দেবো না।" সহসা মাথায় আঘাত পাইয়া সে উঠিয়া বসিল। চোখ চাহিয়া দেখে, সম্মুখে দাঁড়াইয়া ম্যানেজার আর চাকর ভোলা। তারা খোঁজ করিয়া একেবারে ষ্টেশনে আসিয়া উপস্থিত। ম্যানেজারকে দেখিয়াই দুলালের মুখ শুকাইয়া গেল। সে কাঁদিয়া কহিল, আমি মা’র কাছে যাবো।
চোখ রাঙাইয়া দুলালের কাণ ধরিয়া তাকে বেঞ্চ হইতে নামাইয়া ম্যানেজার কহিল, “হতভাগা কম ভোগান ভুগিয়েচো! যাওয়াচ্ছি মা’র কাছে...” বলিয়া টানিতে টানিতে তাকে ঘোড়ার গাড়ীতে উঠাইয়া চিৎপুর রোডের দিকে গাড়ী হাঁকাইয়া দিল।
যাত্রার দলে যে আসে সেই দু’দশ দিনে পোষ মানিয়া যায়—আর এ ছেলেটা বাগ মানিবে না! অধিকারী মহাশয় রাগে গম্গম্ করিতেছিলেন। এই সময় ম্যানেজারের সহিত ঘরে প্রবেশ করিয়া দুলাল নতমুখে অপরাধীর মত দাঁড়াইল। দেখিবামাত্র পা হইতে চটি খুলিয়া অধিকারী তাহাকে প্রহার করিলেন। দুলাল বিনা বাক্যে সে প্রহার পিঠ পাতিয়া গ্রহণ করিল। তারপর একটা ছেঁড়া মাদুরের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া কাঁদিতে কাঁদিতে ঘুমাইয়া পড়িল।
সারাদিন না খাইয়া ঘুমে কাটাইয়া সে সন্ধ্যায় যখন উঠিল, তখন মাথা বিষম ভার বোধ হইতেছে। দুই চোখ রাঙা হইয়া উঠিয়াছে, জ্বালা করিতেছে! শরীর এমন যে নড়িবার সাধ্য নাই! গা তাতিয়া আগুন। প্রবল জ্বর! অত্যন্ত তৃষ্ণা পাইয়৷ছিল, জলপানের জন্য নীচে সিঁড়ির উপর পড়িয়া গিয়া দুলাল কাঁদিয়া উঠিল। ম্যানেজার ও দুই-একজন অভিনেতা আসিয়া তাকে তুলিয়া ঘরে লইয়া গেলেন। রাত্রে কুড়ি গ্রেণ কুইনিন খাওয়াইয়াও ম্যানেজার দুলালের জ্বর ছাড়াইতে পারিলেন না। শেষ রাত্রি হইতে দুলাল গান গাহিতে শুরু করিল,—
“এই তো এসেছিল মা—
এবার আমায় কর না কোলে—
বনবাসের বড় জ্বালা মা।"
পাড়ার একটা ডিপেন্সারির কম্পাউণ্ডার আসিয়া দেখিয়া বলিয়া গেল, বিকার।
সন্ধ্যায় দুলালের গান থামিল, সঙ্গে সঙ্গে সেও ইহজীবনের মত ম্যানেজার ও অধিকারী মহাশয়ের নিকট হইতে শেষ-বিদায় লইয়া গেল।
গ্রামের তিন ক্রোশের মধ্যে এক জায়গায় পূজার সময় দুলালের সেই যাত্রার দলের বায়না ছিল। ছেলে দুলালও সঙ্গে আসিবে—তা’কে তা’র অতি প্রিয় খাদ্য নূতন ধানের চিঁড়া খাওয়াইবে বলিয়া শ্যামা আর একটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে চিঁড়া কুটিতেছিল। এমন সময় পিওন শ্যামা বৈষ্ণবীকে এক মণি-অর্ডার আনিয়া দিল।
মণি-অর্ডারে কমিশন-বাদ দুলালের প্রাপ্য মাহিনা ন’ টাকা ছ’ আনা অধিকারী মহাশয় পাঠাইয়া দিয়াছেন। শেষের ছত্রে লেখা আছে, জ্বর-বিকারে ২৭শে ভাদ্র দুলাল মারা গিয়াছে।
শ্যামা টাকা কয়টা ছুড়িয়া ফেলিয়া চিঁড়ার কাঠাটি বুকে করিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, "ওরে দুলো— দুলাল...!”
পিওন চলিয়া গেল।