বিষয়বস্তুতে চলুন

থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/দেশদ্রোহী

উইকিসংকলন থেকে

দেশদ্রোহী

 অমরেশ সসম্মানে বিএ পাশ করিয়া গভর্ণমেণ্ট স্কুলে মাষ্টারী জুটাইয়া লইয়াছিল। সমস্ত রাত্রি জাগিয়া এম-এ পরীক্ষার বই পড়া ও সন্ধ্যায় স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে খেলা করা ছাড়া তাহার আর কোনও কাজ ছিল না।

 স্বদেশ-প্রেমের বন্যায় তখন সহরের সরকারী স্কুল কলেজগুলি টলমল্ করিতেছিল। একদিন খ্যাতনামা ব্যারিষ্টার মিঃ দত্তকে ভগীরথ করিয়া এই বন্যা সহসা দশঘরা গ্রামে প্রবেশ করিল। মিঃ দত্তের নাম আমরা পূর্ব্বেই শুনিয়াছিলাম। সংবাদপত্রে তাঁহার অসাধারণ ত্যাগের কাহিনী সে প্রায় প্রত্যহই পড়িত। তাঁহার ত্যাগ ও চরিত্র অমরেশকে তাঁহার অনুরাগী করিয়াছিল। মিঃ দত্তের আগমনের বার্ত্তা তাহাকে চঞ্চল করিয়া তুলিল।

 সাহা বাবুদের বাগান বাড়ীতে মিঃ দত্ত বিশ্রাম করিতেছেন। সম্মুখের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে অগণ্য নরমুণ্ড। তাহাদের মধ্যে গান্ধী-টুপী মাথায় হলুদ রংএর ব্যাজ পরিয়া স্বেচ্ছাসেবকের দল শান্তি রক্ষা করিতেছিল। অমরেশ পাশ কাটাইয়া যেখানে মিঃ দত্ত অনুরাগীগণ পরিবৃত হইয়া স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সহিত পরামর্শ করিতেছিলেন, সেই ঘরে প্রবেশ করিয়া নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল। একজন কহিয়া উঠিল, “এই যে অমরেশবাবু নিজেই এসেছেন!” অমরেশ সে কথায় কাণ দিল না, সে মিঃ দত্তকে দেখিতে লাগিল ত্যাগী কর্ম্মবীরের এই তো যোগ্য বেশ। খদ্দরের সংক্ষিপ্ত পরিধান আর একখানি মোটা চাদর; অবিন্নস্ত সুদীর্ঘ কেশরাশি। মিঃ দত্ত অমরেশের প্রশংসমান দৃষ্টি লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, “বলুন, আপনার কথাই বল্‌ছিলাম। আপনাকে আমাদের চাই।”

 অমরেশ আসন লইয়া কহিল, “আমি কি কাজে লাগতে পারি?”

 "সমস্ত কাজে। আপনাকে আমি গুরুতর কাজের ভার দেব। আজ আপনারা যদি না আসেন, তবে এই হতভাগ্য অন্ধ দেশবাসীকে কে দৃষ্টি দেবে? এই অত্যাচার জর্জ্জর, বুভুক্ষু জীবন্মৃত মানুষগুলোর মধ্যে নবজীবন সঞ্চারের জন্য দেশমাতা আপনাদের ডাকছেন। আপনারা সাড়া দেবেন না?” তাহার পর জালিয়ানওয়ালাবাগের কাহিনী হইতে আরম্ভ করিয়া উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষ পর্য্যন্ত দেশের যাবতীয় ঘটনা মিঃ দত্তের ভাষায় এমন করুণ হইয়া ফুটিয়া উঠিতে লাগিল যে, অমরেশ অশ্রু ত্যাগ না করিয়া থাকিতে পারিল না। মিঃ দত্তের কথা শেষ হইলে সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া আবেগ গদ্‌গদ স্বরে কহিল, “আমি সম্পূর্ণ ভাবে আজ আমাকে আপনার হাতে সমর্পণ কল্লাম। দেশের কল্যাণের জন্য আমার দ্বারা যা সম্ভব হ’তে পারে আপনি মনে করেন, আমি তা কর্ব্ব। আপনি শুধু আদেশ দেবেন।”

 মিঃ দত্ত কহিলেন, “আমি তোমাকে দেশমাতৃকার নামে গ্রহণ করলাম। একটা কথা আমি তোমাকে এখানেই জানাচ্ছি—তোমার অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট হবে না। তবে আমার দেশ দরিদ্র, তোমার সেবা উপযুক্ত মূল্যে সে কিনতে পারবে না। তবে যতদূর সম্ভব হয়—"

 অমরেশ বাধা দিয়া কহিল,—“আমার চিন্তা আমি করিনে। ঘরে মা আছেন, তাঁর প্রয়োজন স্বল্প। তিনি যেন আমার জন্য কষ্ট না পান দেখবেন। ”

 মিঃ দত্ত কহিলেন, তাঁকে দেখবার ভার আমার। চল বাইরে লোকজন অপেক্ষা কর্চ্ছে।"

 মিঃ দত্ত সভাস্থলে আসিয়া দাঁড়াইলেন, পুরনারীরা লাজ ও পুষ্পাঞ্জলি বর্ষণ করিলেন। “বন্দেমাতরম” শব্দে দশঘরা গ্রামখানি ধ্বনিত হইয়া উঠিল।

 তাহার পর সর্ব্বসমক্ষে অমরেশকে আনিয়া দাঁড় করাইয়া, স্বহস্তে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করিয়া মিঃ দত্ত তাহাকে স্থানীয় জনমণ্ডলীর নেতৃপদে অভিষিক্ত করিলেন। জনতা জয়ধ্বনি দিল।

 এম-এ পরীক্ষার বইগুলি বাক্সে বন্ধ করিয়া ও ডেপুটীগিরির নমিনেশনের চিঠিখানি ছিঁড়িয়া ফেলিয়া অমরেশ সন্ধায় স্বগ্রামে আসিয়া উপস্থিত হইল। মাতা পূর্ব্বেই সংবাদ শুনিয়াছিলেন, অমরেশকে দেখিয়া কহিলেন, “তুই চাকরী ছেড়ে এলি অমর? সব ভেবে-চিন্তে দেখেছিস্ তো? বাপের কিছু দেনা-পত্তর আছে তাও তো জানিস্?”

 অমরেশ কহিল, "ভেবোনা মা, দেশমাতার আশীর্ব্বাদে সমস্ত মঙ্গল হবে। যে বিরাট ত্যাগের আদর্শ আজ দেখে এলাম, তা দেখে কি আর নিজের ক্ষুদ্র চিন্তা নিয়ে থাকা সম্ভব? তুমি আশীর্ব্বাদ কর।”

 অমরেশ মাতার পদধূলি লইয়া মাথায় মাখিল।

   

 ইহার পর একদিন মাত্র আমি অমরেশকে দেখিয়াছি। গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ী আসিয়াছিলাম। সন্ধ্যা হইতে কালবৈশাখীর ঝড় শুরু হইয়াছিল, রাত্রি দ্বিপ্রহর—তখনও ঝড় থামে নাই। বাহিরের ঘরে বিছানায় শুইয়া সেক্‌স্‌পিয়র পড়িতেছিলাম, সহসা ডাক শুনিলাম, “সতু বাড়ীতে আছ?”

 “কে?”

 “আমি অমরেশ।”

 অমরেশ এই দুর্যোগে! দরজা খুলিলাম। ভিতরে আসিয়। যে মনুষ্যমূর্ত্তি দাড়াইল, অতি পরিচিত ব্যক্তিও প্রথম দৃষ্টিতে তাহাকে অমরেশ বলিয়া চিনিতে পারিত না। তাহার চমৎকার বর্ণ তামাটে হইয়া গিয়াছে। মাথায় এক ঝার চুল; তাহা বাহিয়া তখনও জল পড়িতেছিল। গায়ে একটি ছিন্ন মলিন পিরাণ, তাহার হাতায় এক টুকরা হলুদ-রংএর কাপড়ে লেখা “বন্দেমাতরম্”। পরণের কাপড়খানার নিম্নার্দ্ধ জল এবং কাদায় মাখা। হাতে একগাছা লাঠী। তাহার এই অবস্থা দেখিয়া আমার চ’খে জল আসিতেছিল। অমরেশ আমার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “দুঃখ করোনা সতু! এই বিধাতার বিধান! কঠোর তপস্যা ছাড়া দেশের মুক্তির কোনো পথ নেই।”

 বলিয়া অমরেশ মাটিতে বসিয়া পড়িল। আমি কহিলাম, “সব শুনছি, কাপড় ছাড় আগে।” “উহু! কাপড় ছাড়বার সময় নেই! দুটো খেতে দিতে পার কিনা দেখ।”

 বৌদিদিকে ডাকিয়া তুলিয়া, রান্নাঘরে যাহা অবশিষ্ট ছিল আনিয়া দিলাম। অমরেশ খাইতে বসিয়া বলিতে লাগিল, “আজ চার দিন খাইনি সতু! সতেরো তারিখে হোসেনগঞ্জের মিটিং ক’রে কামারদয় আসি। সেখান থেকে নৌখালি, তারপর আজ প্রাতে রওনা হ’য়ে এই তোমার এখানে—”

 “সর্ব্বনাশ! নৌখালি থেকে বরাবর এখানে! চল্লিশ মাইল পথ!”

 “কত মাইল তাতো গুণিনি ভাই, মায়ের নামে চলে এসেছি। আবার ভোরেই রূপকাঠি পৌঁছুতে হবে।”

 কথা কহিতে পারিলাম না। আমাদের গ্রাম হইতে রূপকাঠি অন্ততঃ বিশ মাইল। এই বিশ মাইল পথ এই দুর্য্যোগ মাথায় করিয়া যে সচ্ছন্দে যাইতে সাহস করে, তাহাকে সাধারণ মানুষ কখনও বলা যাইতে পারে না। বাধা দিলে সে মানিবে না জানিতাম, তথাপি কহিলাম, “রূপকাঠি কি কাল সকালে গেলে চল্‌বে না?” অমরেশ লাঠিগাছটা তুলিয়া লইয়া কহিল, “তা হয় না সতু। কাল সকালে মিঃ দত্তের বোট রূপকাঠির ঘাটে পৌঁছবে। তার আগে আমায় গিয়ে পৌঁছতে হবে। অভ্যর্থনা, সভা, তাঁর আহার-বিশ্রাম সব আয়োজনই আমাকে কর্ত্তে হবে।”

 “একঘণ্টা জিরিয়ে যাও, বৃষ্টি ধরুক!” আমি কহিলাম।

 অমরেশ উঠিয়া দাড়াইয়া আমার হাত ধরিয়া কহিল, “মনে কিছু করোনা সতু, তোমার কথা রাখতে পারলাম না, ঝড়-বৃষ্টি মানলে চলবে না। ক্লাইভের যে সেনারা বাঙ্গলা জয় করেছিল, তারা মেঘ-বৃষ্টির দিকে চায়নি, চেয়েছিল সম্মুখে। আজ যদি তাদের হাত থেকে দেশকে ফিরিয়ে নিতে হয়, তবে আমাদেরও সামনে চাইতে হবে, উপরে কিংবা পিছনে চাইলে চলবে না। সামনের পথই সোজা পথ।” বলিয়াই অমরেশ বাহির হইয়া নিদাঘ-নিশীথের অন্ধকারে মিশিয়া গেল! বৈশাখী মেঘের গর্জ্জনের সাথে একটি অতি তীব্র স্বর দূর হইতে শুনিতে পাইলাম।

 “মায়ের নাম নিয়ে ভাসানো তরী যেদিন ডুবে যাবেরে!”

 ইহার পর আর অমরেশের সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই। কিন্তু তাহার সম্বন্ধে সকল সংবাদ আমি শুনিয়াছি।

 গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে অমরেশ দেশসেবা-ব্রতের পুণ্যকথা কীর্ত্তন করিয়া ফিরিতে লাগিল। তাহার নিষ্ঠা, বিশ্বাস ও চরিত্র-মহিমায় আকৃষ্ট হইয়া দলে দলে লোক যখন উপদেশ লইতে আসিত, তখন সে মৃদু হাসিয়া কহিত, “আমি কেউ নই। সেবা-ব্রতের দীক্ষা নিতে চাও, তবে আদর্শ পুরুষের শরণ লও।” এইরূপে ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া বীজবপনের জন্য সে মিঃ দত্তকে সহর হইতে আহ্বান করিয়া আনিত। এইরূপে বৎসরের মধ্যে অমরেশ মিঃ দত্তকে লক্ষ লক্ষ লোকের রাষ্ট্রীয় গুরুপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিল।

 সহসা একদিন পুলিশ আসিয়া বক্তৃতা-মঞ্চ হইতে অমরেশকে আপসারিত করিয়া লইয়া গেল। অমরেশ সমবেত বিক্ষুব্ধ জনমণ্ডলীকে সম্বোধন করিয়া কহিল, “ভাই সব, আমি চল্‌লাম। তোমরা যে ব্রত নিয়েছ, তা জীবন দিয়ে সফল কর! অভাব অভিযোগ প্রয়োজন সব মিঃ দত্তকে জানাবে। তাঁর উপদেশ ও নির্দ্দেশে চলবে, সিদ্ধি নিশ্চয় হবে।”

 রাজদ্রোহের অপরাধে অমরেশের তিন বৎসর জেল হইল। অমরেশ মৃদু হাসিয়া কহিল, “বন্দেমাতরম্।” জেলে যাইবাব পূর্ব্বে একখানি কাগজের টুক্‌রায় মিঃ দত্তের উদ্দেশে লিখিল, “মাকে দেখবেন।” তাহার পর অমরেশ জেলের গাড়ীতে উঠিল। স্বেচ্ছাসেবকেরা জয়ধ্বনি করির। ফিরিয়া গেল।

   

 দীর্ঘ তিন বৎসর। ইহার মধ্যে কত পরিবর্ত্তন হইয়া গিয়াছে। দেশ-সেবার ধারা, দেশ-প্রেমের সংজ্ঞা সমস্ত বদলাইয়া গিয়াছে। নূতন নূতন দল গড়িয়া উঠিয়াছে। তাহাদের কার্য্য অভিনব, কার্য্যধারা নূতন।

 এই নূতন ভাবের আবেষ্টনের মধ্যে একদিন বর্ষার প্রভাতে ক্ষয়কাশির আক্রমণে জীর্ণ দেহ লইয়া অমরেশ জেল হইতে বাহির হইয়া আসিল। বাহিরে পরিচিত কাহাকেও দেখিল না। সহরের এক হোটেলে বিশ্রাম করিয়া সন্ধ্যার গাড়ীতে সে বাড়ী ফিরিল।

 ভোরে বাড়ীর দরজায় ঘা দিয়া সে ডাকিল, “মা!” সাড়া আসিল না। কিছুক্ষণ পরে হুঁকা হাতে নবীন পোদ্দার বাহির হইয়া আসিলেন।

 অমরেশ আশ্চর্য্য হইয়া কহিল, “আপনি?” পোদ্দার হুঁকা নামাইয়া রাখিয়া করজোড়ে নমস্কার করিয়া কহিল, “এজ্ঞে কি—কি করি আর! বামুনের ভিটে মোছলমানে নিলেম ডেকে নেবে, তাকি দেখতে পারি? তাই দু’শ আটাশ টাকাতেই নিলাম। তার বড় লাভ হয়নি; দেখুন না, দক্ষিন পোতার ঘরে একরকম তো কিছু ছিলই না। পুকুরের ঘাটে—”

 অমরেশ বাধা দিয়া কহিল, “মা?—”

 বৃদ্ধ একটু বিব্রত হইল, তারপর মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে কহিল, “এজ্ঞে তিনি তো ভট্‌চাজ বাড়ীতে—”

 অমরেশ কথা না বলিয়া ভট্টাচার্য্য বাড়ীর পথ ধরিল। পোদ্দারের প্রথম কথাতেই বুঝিয়াছিল যে, পিতার ঋণের দায়ে বাস্তুভিটা বিক্রয় হইয়া গিয়াছে। ভট্টাচার্য্য-গৃহিণী আঙ্গিনায় ছড়া-ঝাঁট দিতেছিলেন, অমরেশকে দেখিয়া ম্লান মুখে কহিলেন, “এস বাবা, কবে এলে?” অমরেশ প্রণাম করিয়া কহিল “আজই। মা কোথায়?”

 ভট্টাচার্য্য-গৃহিণী কহিলেন, হাত-মুখ ধোও, বিশ্রাম কর।” অমরেশের মনে শঙ্কা ঘনাইয়া আসিল, সে প্রশ্ন করিল “মা কোথায়।”

 ভট্টাচার্য্য-গৃহিণী উচ্চৈস্বরে কাঁদিয়া উঠিয়া অমরেশের প্রশ্নের জবাব দিলেন। অমরেশ করতলে মুখ ঢাকিয়া আচ্ছন্নের মত বসিয়া রহিল।

 দ্বিপ্রহরে মায়ের মৃত্যুর কাহিনী অমরেশ সমস্তই শুনিল। পুত্রের কারাদণ্ডের সংবাদ পাইয়া বিধবার মূর্ছারোগের সূত্রপাত হইতে আরম্ভ করিয়া পাওনাদারের তাগিদ, অবশেষে বাস্তুভিটা বিক্রয়, শেষে উন্মাদ প্রায় জননীর অন্নজল ত্যাগ এবং মৃত্যু সমস্ত কথাই ভট্টাচার্য্য-গৃহিণী সবিস্তারে কহিয়। গেলেন। অমরেশ নীরবে শুনিয়া গেল মাত্র।

   

 অমরেশ কলিকাতায় আসিয়া দেখিল যে, সে দিনের সে কলিকাতা আর নাই। স্কুল কলেজে পূর্ব্বের মতন ছাত্রেরা যাতায়াত করিতেছে। যে বস্তুটির বিরুদ্ধে তিন-চার বৎসর পূর্ব্বে নিদারুণ বিদ্রোহ বিচিত্র কণ্ঠে ধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছিল, সেই কাউন্সিলের দিকে লক্ষ্য করিয়া দেশের রাষ্ট্রীয় আন্দোলনের স্রোত ছুটিয়া চলিয়াছে। যাঁহাদের ত্যাগের আদর্শ তাহাকে একদিন অনুপ্রাণিত করিয়া তুলিয়াছিল, তাঁহাদের মোটরগাড়ী রীতিমত বেলা দশটার হাইকোর্টে গিয়া পাচটায় ফিরিয়া আসিতেছে।

 সঙ্গে সম্বল বিশেষ কিছু ছিল না। শিয়ালদায় এক হোটেলে প্রত্যহ একবেলা খাইয়া সে মিঃ দত্তের সঙ্গে দেখা করিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু তাহার নেতৃত্ব তখন মক্কেলের নিবিড় অরণ্যে ও অগণ্য প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে স্থান লাভ করিয়া দুর্লভ দর্শন হইয়া গেছে, সাক্ষাৎ সহসা মিলিল না।

 কিন্তু তাঁহাকে অমরেশের চাই-ই। অর্থ সাহায্যের জন্য নহে মায়ের মৃত্যুর জবাব দিহির জন্য।

 একদিন সুযোগ ঘটিল। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেখিয়া সে এক পরামর্শ বৈঠকে গিয়া উপস্থিত হইল। আগামী নির্ব্বাচনের জন্য সভা বসিয়াছিল। জোর বিতর্ক চলিতেছিল সহসা অমরেশ প্রবেশ করিয়া তারস্বরে কহিল, “মিঃ দত্ত! বাইরে আসুন!”

 মিঃ দত্ত ভ্রূ কুঞ্চিত করিলেন। একজন সদস্য উঠিয়া কহিলেন, “তুমি কে হে ছোক্‌রা? যাও—বেরিয়ে যাও!”

 অমরেশ মিঃ দত্তের দিকে চাহিল, তিনি কথা কহিলেন না। রুদ্ধ আক্রোশে ফুলিতে ফুলিতে অমরেশ বাহির হইয়া আসিল।

 হোটেলে ফিরিয়া দেখিল পূর্ব্বের স্কুলের চাকুরীতে পুনরায় ফিরিয়া ভর্ত্তি হইবার জন্য তাহার দরখাস্তখানি প্রত্যাখ্যাত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। অমরেশ শূন্য দৃষ্টিতে বাহিরে চাহিয়া রহিল। বাহিরের রাস্তার তখন অসংখ্য মোটরকারে স্বেচ্ছাসেবকের দল দেশনায়ক মিঃ দত্তের জন্য ভোট ভিক্ষা করিয়া তারস্বরে জয়ধ্বনি করিয়া ছুটিতেছিল।

 পরদিন কলেজ স্কোয়ারে বিরাট নির্বাচন-সভায় রক্তচক্ষু, জীর্ণ-বেশ, উপবাসী অমরেশ যখন আসিয়া দাঁড়াইল, তখন মিঃ দত্ত কেবল মাত্র বক্তৃতামঞ্চে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছেন। বক্তৃতা আরম্ভ হইতেই তীরবেগে ছুটিয়া গিয়া অমরেশ তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া উন্মাদের মত চীৎকার করিয়া উঠিল,—

 “ভণ্ড—প্রতারক পশু—”

 অধীর জনতা রুখিয়া উঠিল, দেশদ্রোহী গুপ্তচর—”

 মুহূর্ত্ত মধ্যে অমরেশের দুর্ব্বল দেহ আঘাতে রক্তাপ্লুত হইয়া ভূমিতে লুটাইয়া পড়িল।

 পরদিন সবিস্তারে স্বদেশদ্রোহী অমরেশ কর্ত্তৃক দেশনায়কের বধ-চেষ্টার কাহিনী সমস্ত সংবাদপত্রে তীব্র ভাষায় প্রচারিত হইয়া গেল।

 দেশদ্রোহী অমরেশ মধ্যরাত্রেই জীবন দিয়া তাহার দেশদ্রোহের প্রায়শ্চিত্ত শেষ করিয়াছিল, কাজেই এ কথার প্রতিবাদ করিবার আর কেহ ছিল না।