থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/নিধিরামের বেসাতি
নিধিরামের বেসাতি
(১)
চৈতালীর আবাদ শেষ করিয়া নিধিরাম কলিকাতা আসিত, তাহার পর বর্ষা নামিতেই দেশে ফিরিত, এই কয়টি মাস প্রত্যহ দেখিতাম একচক্ষু নিধিরাম পাঠক মাথায় একটি ছোট লাল টীনের বাক্স চাপাইয়া হাঁকিয়া যাইতেছে, “চাই–ই চীনা-আ সিঁদুর।” আর তাহার পশ্চাতে নগ্নকায় শিশুর দল বাদল মিত্রের গলির তন্দ্রালস মধ্যাহ্নকে সচকিত করিয়া চীৎকার করিতেছে, “চাই—ই কানা ইঁদুর।” কবে ছন্দরসিক কোন্ শিশুকবি সিন্দুরওয়ালা নিধিরামের এই অপূর্ব্ব স্তববাণী প্রথম উচ্চারণ করিয়াছিল তাহা কেহ জানে না। সম্ভবতঃ স্বয়ং কবিরও সে কথা মনে নাই, কিন্তু দীর্ঘকাল ধরিয়া প্রতি বৎসর নব নব শিশু-কণ্ঠ একই ভাষায় নিধিরামকে অভ্যর্থনা করিয়া আসিতেছিল। এই বিরূপ সম্বৰ্দ্ধনায় নিধিরাম কোনও দিন রাগ করে নাই, প্রত্যুত্তরে মূষিকের অনুকরণে শব্দ করিয়া তাহার শিশু-বন্ধুগণকে খুসী করিয়াছে, দেখিয়াছি।
বিশ বৎসর ধরিয়া এইরূপই চলিতেছিল, সহসা একদিন এই নিয়মের ব্যতিক্রম দেখিয়া নিধিরাম আশ্চর্য্য হইয়া গেল। গলির মধ্যে একস্থানে গুটিকয়েক শিশু জটলা করিতেছিল, নিধিরাম সেখানে আসিয়া গলার স্বর উঁচু করিয়া হাঁকিল, “চাই—ই চীনা-আ সিঁদুর!” দূর হইতে দুই-একটি কণ্ঠে পরিচিত প্রতিধ্বনি শোনা গেল বটে, কিন্তু প্রত্যহের মত তাহা জমাট বাঁধিয়া উঠিল না।
শিশুর দল নীরবে পরম সম্ভ্রমের সহিত একজনকে ঘিরিয়া দাড়াইয়া তাহার কথা শুনিতেছিল। নিধিরাম নিকটে আসিয়া দাড়াইল। কথা কহিতেছিল একটি বালিকা। কোমরে নীলাম্বরী শাড়ীর অঞ্চল জড়াইয়া হাত নাড়িয়া সে প্রতিপন্ন করিতেছিল যে, কাণাকে কাণা এবং খোঁড়াকে খোঁড়া বলিতে নাই এবং যদি কেহ বলে, তবে তাহার সহিত বক্তার জন্মের মত আড়ি এবং পুতুলের বিবাহে সে তাহাকে কদাচ নিমন্ত্রণ করিবে না। সমাজ-চ্যুতির এই নিদারুণ শাস্তির ভয়ে পরিচিত কণ্ঠধ্বনি শুনিয়াও শিশুর দল আজ নীরব হইয়াছিল, নিধিরাম তাহা বুঝিল এবং বক্তাকে একবার ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া নিঃশব্দে ফিরিয়া গেল।
সন্ধ্যায় ফিরিবার পথে গলির মোড়ে নীলবাড়ীর দরজায় দ্বিপ্রহরের শিশু-সভার এই নেত্রীটির সহিত নিধিরামের সাক্ষাৎ পরিচয় হইল। নিধিরামকে দেখিয়াই বিনা ভূমিকায় বালিকা কহিল, “তুমি বুঝি আর জন্মে কাণাকে কাণা ব’লেছিলে, সিঁদুরওয়ালা?” বলা বাহুল্য জন্মান্তরের কথা নিধিরামের স্মরণ ছিল না। শুধু এই নবাগতার সহিত আলাপ জমাইবার অভিপ্রায়ে সে কহিল, “হা মা লক্ষ্মী।”
“না বলেছে তাই এ জন্মে তুমি কাণা হ’য়েছ, না?” বলিয়াই সে এক প্রচণ্ড অভিশাপ বাণী উচ্চারণ করিল, যদু, মধু ছোট্কু, নিমাই সব্বাই আর-জন্মে কাণা হ’বে! তোমাকে খেপায় কি না।”
নিধিরাম দাতে জিভ কাটিয়া কহিল, “ও কথা বল্তে নেই মা লক্ষ্মী!” ‘মা লক্ষ্মী’ এইবার রুখিয়া উঠিয়া কহিল, “বলব একশো বার বল্ব! তারা কেন তোমাকে কাণা বল্বে?” বলিয়াই একটু থামিয়। সে প্রশ্ন করিল, “তুমি বামুন?”
নিধিরাম কহিল, “হ্যা।”
প্রশ্নকর্ত্রীর চক্ষে সংশয় ফুটিয়া উঠিল, সে কহিল, “দেখি পৈতে?” নিধিরাম ছিন্ন ম্রেজাইয়ের মধ্য হইতে মলিন উপবীতগুচ্ছ বাহির করিয়া দেখাইল। বালিকা কহিল, “কাল রাধুর ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে। তুমি মন্তর পড়াবে?”
নিধিরাম তৎক্ষণাৎ পৌরোহিত্য স্বীকার করিয়া কহিল, "পড়াব।”
“আমরা কিন্তু গরীব মানুষ, দক্ষিণে দিতে পারব না, বুঝলে?” বলিয়া পরম গাম্ভীর্য্যের সহিত বালিকা কহিল, “এইটি পার হ’লেই আমি বাঁচি। আর দু’টিকে এক রকমে বিয়ে দিইছি। মাগো ছেলেমেয়ে মানুষ করা যে কি কষ্ট!” এই বলিয়া পুতুলের ডালাখানি নিধিরামের হাতে দিয়া সে কহিল, দেখ্ছ, মেয়ের আমার মুখখানা রোদে একেবারে শুকিয়ে গেছে। এখন আবার জল দিয়ে রাখ্তে হবে, নৈলে পাড়ার লোকে বৌ দেখবার সময় খোঁটা দিয়ে বলবে, বৌ কূচ্ছিৎ।” এমন সময় ভিতর হইতে আহ্বান আসিল, "সরু?”
“মাগো মা! দেখছ? দু-দণ্ড আপন ছেলেমেয়ের কথা কইবার যো নেই!” বলিয়া বালিকা উঠিয়া দাড়াইল। পুতুলের ডালা তাহার হাতে দিয়া নিধিরাম কহিল, “তবে আসি মা লক্ষ্মী!”
“আমি লক্ষ্মী নইগো, সরস্বতী। আমাকে মা সরস্বতী ব’লে ডাক্বে বুঝলে?” এই বলিয়া বালিকা ভিতরে ঢুকিল। নিধিরামের সহিত সরস্বতীর পরিচয়ের সূত্রপাত হইল এই প্রকারে।
(২)
এই মুখরা মেয়েটিকে সহসা নিধিরামের অত্যন্ত ভাল লাগিয়া গেল! ক্রমে ক্রমে কালীঘাটের পুতুল, গালার চুড়ী, দু-এক টুক্রা জরির কাপড় নিধিরামের সিঁদুরের বাক্সে আশ্রয় পাইয়া অবশেষে সরস্বতীর খেলাঘরে স্থানলাভ করিতে লাগিল। প্রত্যহের আনন্দহীন একঘেয়ে কেনাবেচার মধ্যে এই মেয়েটির সঙ্গে দু’দণ্ড কথা কহিয়া নিধিরাম আনন্দ পাইত; সময় সময় নীলবাড়ীর জানালার রোয়াকে সিন্দুরের পেট্রা কোলের উপর রাখিয়া নিধিরাম সরস্বতীর সহিত তাহার মাটির ছেলেমেয়েদের সুখদুঃখের কথা কহিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাইয়া দিয়াছে; ভিন্ন পল্লীতে গিয়া বেসাতি বেচিলে দশটা পয়সা রোজগার হয়, এ কথা মাঝে মাঝে মনে হইয়াছে বটে, তথাপি তাহার প্রগলভা বান্ধবীর কথার মোহ সে কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই। অথচ সে কথাগুলি একান্তই নিরর্থক এবং কোনো দিন নিধিরামেরও কোনও কাজে লাগিবার তাহার সম্ভাবনা ছিল না।
বর্ষা নামিলে নিধিরাম দেশে গেল।
সেবার দেশে মারাত্মক রকমের একটা ব্যাধির উৎপাত আরম্ভ হইয়াছিল, তাহার আক্রমণ হইতে নিধিরাম ও নিষ্কৃতি পাইল না। মাস ছয় ভুগিয়া একদিন মাঘের দ্বিপ্রহরে নিধিরাম তাহার সিন্দুরের লাল বাক্সটি মাথায় করিয়া সরস্বতীর বাড়ীর দরজায় আসিয়া হাঁকিল, “চাই—ই চীনা-আ সিঁদুর।” আগেরকার মত আর কেহ ছড়-দাড় করিয়া নামিয়া দ্বার খুলিয়া বাহিরে আসিল না। দ্বিতীয়বার হাকিতে নীচের ঘরের একটা জানালা খুলিয়া গেল। জানালায় সরস্বতীকে দেখিয়াই এক গাল হাসিয়া নিধিরাম জিজ্ঞাসা করিল—“বুড়ো বেটার কথা মনে ছিল সরু-মা?” সরস্বতী ঘাড় নাড়িয়া জবাব দিল। নিধিরাম আশ্চর্য্য হইল, সরস্বতী তো কথা না বলিয়া থাকিবার পাত্রী নহে! জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার ছেলেমেয়ে সব ভাল আছে সরু-মা।” এইবার সরস্বতী কথা কহিল, “সে সব আমি রাধুকে বিলিয়ে দিইছি।” ইহার পর আর কোনও প্রশ্ন করিবার সূত্র নিধিরাম খুঁজিয়া পাইল না। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করিয়া অনেক ভাবিয়া সে কহিল, “একবার বাইরে আস্বে মা?” সরু কথা কহিল না, পিছন হইতে সরস্বতীর কনিষ্ঠ ভাইটি কহিয়। উঠিল, “মা বলেছে দিদি আর বাইরে যাবে না! দিদি বড় হ’য়েছে কি না।” ওঃ! তাই! এইবার নিধিরামের চক্ষে সরস্বতীর পরিবর্ত্তন ধরা পড়িল। এক বৎসর সে সরস্বতীকে দেখে নাই। কিন্তু বর্ষ পূর্ব্বে গৃহযাত্রার দিন সে যে মুখর। চঞ্চলা বালিকার নিকট হইতে বিদায় লইয়া গিয়াছিল তাহার সহিত এ মেয়েটীর প্রভেদ বিস্তর। ইহার সহিত কি ভাষায় কোন্ উপলক্ষে কথা কহিবে তাহা সহসা নিধিরাম স্থির করিয়া উঠিতে পারিল না। ইতস্ততঃ করিয়। বাড়ী হইতে যে পাটালী গুড় আনিয়াছিল তাহার পুটুলীটি জানালা গলাইয়া সরস্বতীর হাতে দিয়। নিধিরাম কহিল, "বাড়ী থেকে এনেছি সরু-মা, নিয়ে যাও।” তাহার পর নিজ গৃহ সম্বন্ধে দুই-একটি অসম্বন্ধ কথা কহিয়া নিধিরাম চলিয়া গেল, গ্রামের কারিকরের দ্বারা যে বিচিত্র বর্ণের কাঠের পুতুলগুলি গড়িয়া আনিয়াছিল, সেগুলি আর বাক্স হইতে বাহির করিবার অবকাশ হইল না।
পরদিন নিধিরাম প্রত্যহের বেসাতি লইয়া নীলবাড়ীর জানালায় দাড়াইল, নীচের ঘরে তক্তপোষের উপর বসিয়া সরস্বতী লেখাপড়া করিতেছিল, নিধিরাম মৃদুস্বরে প্রশ্ন করিল, “কি পড়ছ সরু-মা?” সরস্বতী মুখ তুলিয়া নিধিরামকে দেখিয়া হাসিয়া কহিল, "কথামালা।” পরক্ষণেই প্রশ্ন করিল, “মা জিজ্ঞেস করেছে গুড়ের দাম কত?” প্রশ্ন শুনিয়া নিধিরাম থাকিয়া গেল; তাহার পর শুষ্ক-মুখে কহিল, “দিদিমাকে বোলো সরু-মা, আমার ঘরের তৈরী গুড়, পয়সা লাগেনি।” সরস্বতী কহিল “আচ্ছা।”
ইহার পর আর দুই দিন সে পথে নিধিরাম আসিল না। তৃতীয় দিনের মধ্যাহ্নে নিধিরাম যথারীতি নীলবাড়ীর জানালায় দাড়াইয়। ডাকিল, সরু-মা!” সরস্বতী শ্লেট হইতে মুখ তুলিয়া একেবারে প্রশ্ন করিল, “দু’দিন কেন আসনি?” নিধিরামের মুখ উল্লাসে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, তাহা হইলে সরু-মা তাহার কথা মনে রাখিয়াছে! অনুপস্থিতির একটি মিথ্যা কারণ নির্দ্দেশ করিয়া নিধিরাম অতি সতর্ক মৃদুস্বরে কহিল, “সরু-মা! একখানা বই এনেছি, পড়বে?” বলিয়া জানালা দিয়া একখানা বটতলার কৃত্তিবাসী বাঁধানো রামায়ণ চারিদিক চাহিয়া সরস্বতীর চৌকীর উপর রাখিয়া দিল। সরস্বতী ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ছবি আছে?”
নিধিরাম হাসিয়া কহিল, “অনেক! রাম রাবণ, হনুমান সবার ছবি। আমি পড়তে জানিনে সরু-মা, তুমি আগে প’ড়ে নাও, তারপর আমাকে প’ড়ে শোনাবে।”
সরস্বতী কহিল, “আচ্ছা। তুমি আবার কাল আসবে?”
নিধিরাম একটি সমুজ্জল আনন্দ-হাস্যের সহিত সম্মতি জানাইয়া চলিয়া গেল।
✶ ✶ ✶ ✶
সরস্বতী রামায়ণ পড়িত আর নিধিরাম সিন্দুরের পেট্রা কোলের উপর রাখিয়া জানালার রোরাকে বসিয়া শুনিত। মধ্যে যে ইটের দেয়ালের ব্যবধান ছিল, শ্রোতা ও পাঠিকার কাহারও তাহা মনে ছিল না। সহসা একদিন ব্যবধান বাড়িয়া গেল।
পাঠ যখন অযোধ্যাকাণ্ড পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছে, তখন একদিন নিধিরাম আসিয়া দেখিল, যে সরস্বতীর পরিবর্তে নীচের ঘরে তক্তপোষের উপর দুইটি ভদ্রলোক পরিষ্কার বিছানায় বসিয়া তামাক টানিতেছেন। নিধিরাম ডাকিল, “চাই—ই চীনা-আ সিঁদুর।” দোতলায় একটা জানালা খুলিয়া গেল, সরস্বতী দাড়াইয়া বাম হাত মুখে দিয়া ডান হাত নাড়িয়া ইঙ্গিতে জানাইল যে, সে আজ পড়িবে না। নিধিরাম যে পথে আসিয়াছিল সেই পথেই ফিরিয়া গেল। গলির মোড়ে সরস্বতীর সখী রাধারাণী ওরফে রাধু নিধিরামকে সংবাদ জানাইল যে, সরস্বতীর বিবাহ আসন্ন এবং পাত্র পক্ষ দেখিতে আসিয়াছেন। সরু-মার বিবাহ! তারপর শ্বশুর-বাড়ী! সে কতদূর! নিধিরাম একবার ফিরিয়া দূরে নীলবাড়ীর দোতালার রুদ্ধ বাতায়নের দিকে চাহিয়া মন্থরপদে চলিয়া গেল।
তিন চারি দিন ঘরে কাটাইয়া আবার সেই পেট্রা মাথায় করিয়া নিধিরাম গলির মোড়ে আসিয়া একদিন হাঁকিল, “চাই—ই চীনা-আ সিঁদুর।”
সে দিন নীলবাড়ীতে নহবৎ বাজিতেছে, নিধিরাম অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিল, উপরের খোলা জানালার ধারে আজ আর আসিয়া কেহ দাড়াইল না।
পর দিন হইতে পুনরায় যথারীতি নিধিরামের কণ্ঠস্বর গলির সর্ব্বত্র ধ্বনিত হইতে লাগিল, শুধু নীলবাড়ীর সম্মুখ দিয়া নীরবে সে চলিয়া যাইত, শত চেষ্টাতেও কণ্ঠে কথা ফুটিতে চাহিত না।
(৩)
নিত্যকার মত সেদিনও নিধিরাম নীরবে চলিয়া যাইতেছিল, এমন সময় নীলবাড়ীর জানালা হইতে একটি শিশু ডাকিল “দাড়াও সিঁদুরওয়ালা! দিদি তোমাকে ডাক্ছে।” নিধিরামের বুক কাঁপিয়া উঠিল। ফিরিতেই সে দেখিল নীচের ঘরের জানালায় সরস্বতী দাঁড়াইয়া। নিধিরাম আনন্দ-গদ্গদ স্বরে কহিয়া উঠিল, “কবে এলে সরু-মা? আমি তো জানিনে তাই—”
সরস্বতী সংক্ষেপে কহিল, "আজ!” ইহার পর নিধিরাম ঘণ্টা খানেক ধরিয়া নিজেই অবিশ্রান্ত কত কথা কহিয়া গেল। শেষে কহিল, “তোমার সিঁদুরের কৌটোটা আন তো সরু-মা। খুব ভাল উজ্লি সিঁদুর আছে।”
সরস্বতীর সোনার কৌটা সিঁদুরে ভরিয়। নিধিরাম সেদিনকার মত চলিয়া গেল। তাহার পর হইতে ক্রমে ক্রমে বিচিত্র বর্ণের কাঠের কৌটায় সিঁদুরের উপঢৌকন আসিতে আরম্ভ হইল, সেই সঙ্গে তরল আলতা হইতে শুরু করিরা শাঁখের কঙ্কন পর্যন্ত এয়োতির কোনও সরঞ্জামই বাদ পড়িল না।
সেবার বর্ষায় আর নিধিরাম দেশে গেল না।
আশ্বিনে পূজার পূর্ব্বে সরস্বতী যেদিন শ্বশুর-গৃহে যাত্রা করিল, নিধিরামও সেই দিন দেশে গেল। বর্ষায় বাড়ীতে উপস্থিত না থাকিবার জন্য আর্থিক ক্ষতি হইয়াছে এই বলিয়া স্ত্রী হইতে আরম্ভ করিয়া কনিষ্ঠ পুত্র পর্যন্ত নিধিরামকে যথেষ্ট ভর্ৎসনা করিল কিন্তু আর্থিক ক্ষতির প্রকাণ্ড অঙ্কটি তাহাকে মোটেই বিচলিত করিল না।
✶ ✶ ✶ ✶
ফাল্গুনের বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার গাছের ডালে রং ধরিয়াছে। নিধিরাম কলিকাতায় ফিরিল।
সরস্বতী শ্বশুরবাড়ী হইতে ফিরিয়াছে কি না সে জানিত না। নীলবাড়ীর সম্মুখে দাড়াইয়া হাঁকিল, “চাই–ই চীনা-অ। সিঁদুর।” কোন সাড়া আসিল না। নিধিরাম গলির পথে ফিরিয়া গেল কিন্তু কি ভাবিয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া কণ্ঠস্বর উচ্চে তুলিয়া ডাকিল, “চাই–ই চীনা-আ সিঁদুর!”
অতি ক্ষীণ পদধ্বনি যেন শোনা গেল। নিধিরাম কম্পিত বক্ষে জানালার ধারে আসিয়া প্রতীক্ষায় দাড়াইল। জানালা খুলিয়া সরস্বতীর ছোট ভাইটি কহিল, “তোমাকে এ পথে আসতে মা বারণ ক’রে দিয়েছে সিঁদুরওয়ালা!”
অজ্ঞাতে কোনও অপরাধ করিয়া ফেলিয়াছে ভাবিয়া নিধিরামের মুখ শুকাইল। আম্তা আম্তা করিয়া সে কহিল “কেন?”
এমন সময় দরজা খুলিয়া গেল। দ্বারে আসিয়া দাড়াইল স্নানমুখী শুভ্রবেশা নিরাভরণা সরস্বতী। নিধিরাম চমকিয়া উঠিল তাহার পর মাথার পেট্রা মাটিতে নামাইয়া তাহার উপরে বসিয়া পড়িয়া অর্থহীন উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে সম্মুখে চাহিয়া রহিল।
নীলবাড়ীর দরজা বন্ধ হইয়া গেল।
সম্বিৎ পাইয়া নিধিরাম যখন ফিরিয়া চলিল, তখন তাহার মাথার সিঁদুরের পেট্রা বিশ মণ ভারী হইয়া গিয়াছে।
ইহার পর আর সাত দিন সে গলিতে কেহ নিধিরামকে দেখে নাই। অবশেষে একদিন হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনিয়া জানালা খুলিলাম। নিধিরামের মূর্ত্তি দেখা গেল। সিঁদুরের পেট্রার পরিবর্ত্তে তাহার মাথায় একটা প্রকাণ্ড ফলের ঝাঁক। তাহার গুরুভারে অবনত হইয়া বৃদ্ধ নিধিরাম পাঠক ঘর্ম্মাক্ত কলেবরে নীলবাড়ীর সম্মুখ দিয়া গলির পথে হাঁকিয়া যাইতেছে—“ফল চাই মা, পাকা ফল।"