বিষয়বস্তুতে চলুন

থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/পরের ছেলে

উইকিসংকলন থেকে

 বুড়া শম্ভূ সরকার স্বগ্রাম ঝাউডাঙ্গাতে পাঠশালা খুলিয়া গত চল্লিশ বৎসর যাবৎ গুরুমহাশয়ের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন; এই দীর্ঘকালের মধ্যে শুধু পূজার কয়েকদিন ছাড়া আর কেহ তাঁহার পাঠশালার দুয়ার বন্ধ দেখে নাই। তাই সেদিন হঠাৎ পাঠশালার দরজায় তালা বন্ধ দেখিয়া পাড়ার লোক আশ্চর্য্য হইয়া গেল।

 সন্ধ্যায় দুই একজন প্রতিবেশী কৌতূহলী হইয়া সরকার মহাশয়ের সন্ধান লইতে আসিলেন। সরকার মহাশয় তখন বহুকালের পুরাতন ক্যাম্বিসের ব্যাগের মধ্যে তাঁহার তিনখানি কাপড় ও দুইটি ম্রেজাই পাট করিয়া গুছাইয়া তুলিতেছিলেন। প্রতিবেশীরা জিজ্ঞাসা করিলেন, “একি, সরকার মশাই?”

 “চল্‌ছি দাদা, আর পার্‌ছিনে! দিনকয়েক ঘুরে আসি। মধু দাসকে ব’লে গেলাম, সে পাঠশালা দেখবে। বাড়ী ঘর যেমন আছে থাকুক্! আর কি হবে এসব!” বলিয়া ব্যাগটি তুলিয়া তাহার ওজন পরীক্ষা করিলেন, তারপর নামাইয়া রাখিয়া কহিলেন, “রতন বৃত্তি পেয়েছিল দাদা!” বলিয়া একটি দীর্ঘ-নিঃশ্বাসের সঙ্গে একখানি ভাঁজ করা কাগজ পার্শ্ববর্তী ভদ্রলোকের হাতে তুলিয়া দিলেন। তিনি সেখানিতে একবার চোখ বুলাইয়া কহিলেন, “এখানি আবার রেখেছেন কেন? দেখে মিছিমিছি মন খারাপ করা।"

 বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি কাগজখানি লইয়া কহিলেন, “না থাক্‌!” তারপর বলিলেন, “বুড়োকে মনে রেখো ভাই সব, ফিরে আসলে আবার দেখা হবে! আর দেরী করবনা, দুর্গা শ্রীহরি! সিদ্দিদাতা গনেশ!” বলিয়া বেতের মোটা লাঠিটার মাথায় ব্যাগ ঝুলাইয়া লাঠিগাছ কাঁধে করিয়া কহিলেন, “শুধু একটা কথা দাদা আমি মধুকে ব’লে গেলাম তোমারাও মনে করিয়ে দিও, ছেলেগুলোকে যেন মারধোর না করে। কে কবে যাবে কে জানে? দু’দিনের জন্য আর কেন—দুর্গা শ্রীহরি!” শম্ভু সরকার বাহির হইয়া গেলেন।

 রাম দত্ত কহিলেন, “পুত্রশোকে রাজা দশরথ মরেছিলেন, শম্ভু সরকার তো ছার। আহা রতন ছেলেটি বড় ভাল ছিল।”

 শম্ভু সরকারের স্ত্রী রতনের জন্মের পরদিনই ইহলোক হইতে বিদায় লইয়াছিলেন। শম্ভু সরকার আর বিবাহ না করিয়া নিজেই রতনের মায়ের স্থান অধিকার করিলেন। ক্রমে রতন বড় হইয়া পাঠশালায় ঢুকিল। এবার সে প্রাইমারী বৃত্তি-পরীক্ষা দিয়াছিল কিন্তু ফল বাহির হইবার মাসখানেক পূর্ব্বেই একদিনের জ্বরে হঠাৎ সে মৃত্যুলোকে প্রস্থান করিল। অসীম ধৈর্য্যের সহিত শম্ভূ সরকার এই আঘাত সহিয়া গেলেন, পাঠশালা রীতিমত চলিতে লাগিল কিন্তু যেদিন পরীক্ষার ফল ও সেই সঙ্গে পুত্রের বৃত্তি প্রাপ্তির সংবাদ বাহির হইল, সেদিন পুত্রশোক তাঁহাকে নূতন বাজিল। ঘরে আর কোনমতেই মন বসিতেছিল না; পাঠশালায় গিয়া যে স্থানটিতে রতন বসিত সেই দিকে দৃষ্টি পড়িত সকলের আগে, আর বুকের মধ্যে ধড়াস্ করিয়া উঠিত; কাজেই আজ শম্ভু সরকার ষাট বৎসর বয়সে জীবনে প্রথম গ্রাম ছাড়িয়া বাহিরে বাহির হইলেন।

(২)

 মাস-পাঁচেকের মধ্যে তীর্থভ্রমণ শেষ হইল, সম্বলও ফুরাইয়া আসিল। তখন সরকার মহাশয় স্থির করিলেন যে চাকুরী করিবেন; কিন্তু ভগ্নদেহ বৃদ্ধকে কাহারও কাজে লাগিল না। অগত্যা পদব্রজে দেশে ফিরিবার সঙ্কল্প করিয়া শম্ভু সরকার যাত্রা করিলেন।

 কান্তপুর আসিয়া প্রথম দিন সন্ধ্যা হইল। বাবুদের অতিথিশালায় রাত্রিযাপন করিয়া প্রাতঃকালে যখন সরকার মহাশয় ইষ্টমন্ত্র জপিতেছিলেন সেই সময়ে একটি ছেলে আসিয়া পরম কৌতূহলের সঙ্গে শম্ভূ সরকারের দিকে চাহিয়া রহিল, তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করিল, “তুমি কে?” ছেলেটিকে সরকার মহাশয়ের ভালো লাগিল, তিনি মন্ত্রজপ ছাড়িয়া তাহার হাত ধরিয়া কহিলেন “তুমি কে আগে বল।” সে কহিল, “আমি রতন।” রতন শম্ভূ সরকারের বুকের মধ্যে ধক্ করিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিলেন, “তুমি কার ছেলে?”

 "বাবার ছেলে” রতন জবাব দিল। শম্ভু সরকার রতনের হাত ধরিয়া কহিলেন, “আমিও বাবার ছেলে, আমার নাম শম্ভু সরকার।” রতন তাড়াতাড়ি কহিল, “তুমি শম্ভু? বাবা যে তোমাকে ডাকছে! চল।” বলিয়াই শম্ভু সরকারের হাত ধরিয়া টানিল। সরকার মহাশয় বুঝিলেন যে শিশু ভুল করিয়াছে, তথাপি উঠিয়া কহিলেন, “চল যাই।” তখনকার মত তাঁহার মন্ত্রজপ বন্ধ রহিল।

 বড়বাবু ফরাসে বসিয়া তামাক টানিতেছিলেন, এমন সময় রতন শম্ভু সরকারের হাত ধরিয়া উপস্থিত হইয়া কহিল, “বাবা, তুমি যে ডাকছিলে, এনেছি।”

 বড়বাবু হাসিয়া কহিলেন, “কাকে এনেছিস্ রে?”

 “তুমি যে বললে শম্ভু সরকার!” রতন কহিল।

 “আপনার নামও বুঝি শম্ভু সরকার, তাই খোকা আপনাকে টেনে এনেছে। আমি আমাদের নায়েব শম্ভু সরকারকে খুঁজছিলাম। যাহোক আপনি বসুন।” শম্ভু সরকার আসন লইলেন। তারপর কথাবার্তায় শম্ভু সরকার তাঁহার জীবনের সমস্ত কাহিনী আদ্যোপান্ত বলিয়া গেলেন, “শেষে কহিলেন, শেষ-জীবনে যদি কোথাও আশ্রয় পাই, তাহ’লে দিন ক’টা একরকমে কাটিয়ে দিই।”

 বড়বাবুর দয়া হইল। কহিলেন, “এখানে থাকতে পারেন, আপত্তি নেই। খোকাকে একটু দেখবেন শুনবেন। দশ টাকা নাইনে, খোরাক পোষাক-পোষাবে?”

 শম্ভু সরকার উচ্ছ্বসিত হইয়া কহিয়া উঠিলেন, “খুব! খুব!! পরম দয়াল আপনি” ইত্যাদি।

(৩)

 প্রাতে ও সন্ধ্যায় ঘণ্টা দুই করিয়া পড়াইবার বাঁধা সময় ছিল। কিন্তু ছাত্র ও শিক্ষক কেহই এই নিয়মের ধার ধারিতেন না। দিনের বারোঘণ্টার মধ্যে অর্দ্ধেক সময় রতন শম্ভু সরকারের ঘরেই কাটাইত, অবশ্য পড়াশুনার কাজে নহে। সুদীর্ঘ জীবনকালের মধ্যে যত প্রকার অদ্ভুত পশু-পক্ষীর সহিত শম্ভু সরকারের পরিচয় হইয়াছিল, তাহাদের সকলের কাহিনী সবিস্তারে তিনি তাঁহার এই শিশু ছাত্রটির নিকট বর্ণনা করিতেন, রতন খেলা ভুলিয়া পরম কৌতূহলের সহিত তাহা শুনিয়া যাইত। রতনের খেলার সাথীর সংখ্যাও কমিয়া আসিয়াছিল; মাষ্টার মহাশয়কে ছাড়িয়া অন্যত্র খেলিতে যাইতে তাহার মন সরিত না। অগত্যা সরকার মহাশয় নিজেই তাহার সহিত খেলিতে আরম্ভ করিয়া দিলেন। ষাট এবং ছয় এই উভয় সংখ্যার মধ্যে যে ব্যবধান আছে, সরকার মহাশয়ের আচরণে তাহা আর মনে করিবার কোনও উপায় রহিল না। তিনি কখনও ঘোড়া হইয়া তাঁহার শিশু ছাত্রটিকে পিঠে করিয়া ছুটিতেন, কখনও তাহার কাঠের গাড়ীখানিতে দড়ি বাঁধিয়া কাছারি বাড়ীর আঙ্গিনায় অসংখ্য কৌতূহলী দৃষ্টিকে উপেক্ষা করিয়া পরন নির্ব্বিকার চিত্তে টানিয়া লইয়া বেড়াইতেন। এইরূপে বৎসর খানেক কাটিয়া গেল।

 ইতিমধ্যে শম্ভু সরকার দেশে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন, পত্রের উত্তরে জানিলেন যে, বাড়ীর আঙ্গিনায় জঙ্গল জমিয়াছে এবং বাহিরের পাঠশালা ঘরের জীর্ণ দশা; আগামী বর্ষায় যদি টিকিয়া যায়, তবে বহুভাগ্য বলিতে হইবে। সংবাদ শুনিয়া তাঁহার কিছুমাত্র চাঞ্চল্য দেখা গেল না, তিনি তাঁহার শিশু ছাত্রটির অধ্যাপনায় পূর্ব্বের মতই মগ্ন হইয়া রহিলেন।

 রতন সময়ে বাড়ী আসে না, অধিকাংশ সময় মাষ্টারের ঘরেই কাটাইয়া দেয়; ইহা কিন্তু রতনের মাতার একান্ত অপ্রীতিকর ছিল, এক-আধবার আপত্তির আভাস কর্ত্তাকেও দিয়াছিলেন কিন্তু কর্ত্তা তাঁহার স্বাভাবিক ঔদাস্য বশতঃ সে কথায় কর্ণপাত করেন নাই। এদিকে ছেলে পর হইয়া যাইতেছে এই আশঙ্কা মাতাকে ক্রমেই অধীর করিয়া তুলিতেছিল। সেদিন গৃহিণী সঙ্কল্প করিয়াছিলেন যে, কথাটির একেবারে শেষ মীমাংসা করিয়া ফেলিবেন। কর্ত্তার আহার শেষ হইতেই তিনি কহিলেন, “ছেলেকে তো মাষ্টারের হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তি ব’সে আছ! পড়া-শুনা করে কিনা তার খবরটা কি নিয়ে থাক? না মাস মাইনে গুণে দিয়েই খালাস!”

 কর্ত্তা কহিলেন, “মাষ্টার ভাল, আমি বরাবর দেখছি।”

 অনেক জিনিষ পুরুষলোক দেখিতে পায় না কিন্তু স্ত্রীলোকের চক্ষে পড়ে, এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করিয়া গৃহিণী কহিলেন, “আচ্ছা একবার পরখ করেই দেখনা, ছেলে তো তোমারই।”

 রতনের ডাক পড়িল এবং অনতিবিলম্বে পরীক্ষা আরম্ভ হইয়া গেল; রতন অনায়াসে ধারাপাত ও বোধোদয় আদ্যোপান্ত আবৃত্তি করিয়া গেল। কর্ত্তা সহায্যে কহিলেন, “দেখছ!”

 পুত্রের কৃতিত্বে মায়েরও যে আনন্দ না হইয়াছিল তাহা নহে, কিন্তু তখন উল্লাস প্রকাশ করাটা সমীচীন মনে করিলেন না এবং তখনকার মতন নীরব হইয়া গেলেন।

 সন্ধ্যায় গৃহিণী আবার কথা পাড়িলেন কিন্তু অন্য ভাবে সেদিন রতনের সমবয়সী ও বাড়ীর যদু ইংরাজী বলিতেছিল, রতন কিছু বুঝিতে না পারিয়া ফ্যাল্ ফ্যাল্ করিয়া তাহার দিকে চাহিয়াছিল, সে কথাটি কর্ত্তাকে জানাইয়া গৃহিণী কহিলেন, “দেখ একটু ইংরিজী শেখা তো খোকার দরকার। বড় হ’লে সাহেব-সুবোর সঙ্গে কথা কইতে হবে তো!”

 কর্ত্তার কাছে কথাটি মূল্যবান মনে হইল। পাশ না দিক, বড় মানুষের ছেলের ইংরাজী না শিখলে চলে না এ ধারণা তাহারও ছিল। রতনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “খোকা, তুমি ইরেজী পড় না?” রতন কহিল, “না বাবা। মাষ্টার মশাই তো পড়ান নি।”

 কর্ত্তা কথা কহিলেন না, গৃহিণী কহিলেন, “মাষ্টার মশাই না পারেন তুমি খোকার ইংরিজী পড়াবার জন্যে নতুন মাষ্টার ঠিক কর। ছেলেকে আমার মূর্খ ক’রে রাখতে পারবে না।”

 রতন নীরবে মায়ের কথা শুনিল, তাহার পর মনে মনে ইংরাজী ভাষার মুণ্ডপাত করিতে করিতে চলিয়া গেল।

(৪)

 পরদিন প্রাতে যখন রতন গত রাত্রির কাহিনী সবিস্তারে সরকার মহাশয়ের নিকট বর্ণনা শেষ করিল, তখন শম্ভু সরকারের দুই চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিয়াছে। তিনি অতি মৃদুস্বরে আপন মনে কহিলেন, “মায়া! মায়া! পরের ছেলে!”

 রতন কথা কহিল না। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শম্ভু সরকার জিজ্ঞাসা করিলেন, “হ্যা রে রতন, তুই ঠিক শুনেছিস গিন্নিমা নতুন মাষ্টার আনতে চেয়েছেন?”

 “হ্যাঁ, মাষ্টার মশাই। আমি কিন্তু পড়ব না, আমি মামাবাড়ী চলে যাব।” রতন ঠোঁট ফুলাইয়। কহিল।

 সরকার মহাশয় রতনের মাথায় হাত বুলাইয়া অনেক চেষ্টা করিয়া কহিলেন, “পড়বি বৈইকি বাবা, তা নৈলে কি বিদ্যে হয়?” পরক্ষণেই আবার প্রশ্ন করিলেন, “আচ্ছা গিন্নি-মা আর কি বললেন? আর বাঙ্গলা পড়তে হবে না? কথামালা, আখ্যানমঞ্জরী এসব তো পড়াই হয়নি, তুই বললিনে কেন?” “আমি বলিনি মাষ্টার মশাই।” রতন অসঙ্কোচে কহিল।

“তাই বল্, তা নইলে কি আর গিন্নিমা ইংরিজী পড়তে বল্লেন? আচ্ছা আমি তাকে বুঝিয়ে বলব।” গিন্নি -মাকে একটু বুঝাইয়া বলিলেই তিনি বুঝিয়া যাইবেন ভরসায় শম্ভু সরকার একটু স্বস্তি লাভ করিলেন; তারপর কেবল বোধোদয়খানা খুলিয়া উদ্ভিদের সংজ্ঞা নির্দ্দেশ করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময় কর্ত্তা ডাকিলেন, “সরকার মশাই!” আহ্বান শুনিয়া আপনার অজ্ঞাতেই শম্ভু সরকার কাঁদিয়া উঠিলেন।

 কর্ত্তা আসন লইয়া দুই-একটি সাধারণ কথার পর বলিলেন, “খোকা তো এদিকে মন্দ শেখেনি দেখলাম। কিন্তু জানেন তো ইংরেজী শেখাও একটু দরকার। এখন থেকেই অল্প-স্বল্প কিছু পড়াশুনা করলে সহজেই কতকটা শিখে ফেলবে। আপনি কি বলেন?” কর্ত্তা ঘুরাইয়া বলিলেও শম্ভু সরকার ইঙ্গিতটা স্পষ্ট বুঝিলেন, মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে কহিলেন, “আজ্ঞে সে অতি যথার্থ কথা, রাজভাষা শেখাই তো উচিত।” “আপনি তাহ’লে একটু দেখবেন ও গ্রামের ইস্কুলের মাষ্টারেরা কেউ যদি—” বলিয়াই কর্ত্তা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি বুঝি ইংরেজী জানেন না?”

 কোনো সময় ইংরেজীর অক্ষর পরিচয় শম্ভু সরকারের হইয়াছিল, কিন্তু সেটাকে ইংরেজী জানা বলা যায় কি না তাহা তিনি তাড়াতাড়ি স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না, কহিলেন, “আজ্ঞে বাবু, আমরা সেকেলে মানুষ।”

 কথাটা শেষ করিবার অবকাশ না দিয়। কর্ত্তা উঠিয়া কহিলেন, “আচ্ছা আপনিও দেখবেন, আমিও খোঁজ নিচ্ছি।” কর্ত্তা বাহির হইয়া গেলে সরকার মহাশয় রতনকে ছুটি দিলেন। রতন বোধোদয়ের পাতা হইতে মুখ না তুলিয়াই অত্যন্ত ভারী গলায় জিজ্ঞাসা করিল, “আর পড়াবেন না মাষ্টার মশাই?”

 সরকার মহাশয় রতনকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া কহিলেন, “পড়াব বৈকি বাবা? এখন যাও ধারাপাতটা একটু দেখগে, আমি ডাক্‌ব’খন।”

 রতন খিড়কির পুকুরের পৈঠায় ধারাপাত খুলিয়া অনেকক্ষণ বসিয়া রহিল কিন্তু মাষ্টার মহাশয় ডাকিলেন না। বেলা বাড়িলে সে ধারাপাতখানি বন্ধ করিয়া মাষ্টার মহাশয়ের ঘরের দরজার কাছে উঁকি দিয়া দেখিল যে, মাষ্টার মহাশয় চক্ষু বুঁজিয়া শুইয়া আছেন। রতন তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ করিবার অভিপ্রায়ে দ্বারের পাশে দাড়াইয়া পড়িতে লাগিল, “এক কড়া পোয়া-গণ্ডা, দুই কড়া আধ-গণ্ডা।” শম্ভু সরকার ঘুমান নাই, ডাকিলেন, “আয় রতন!” রতন ভিতরে আসিয়া দাড়াইলে সরকার মহাশয় কহিলেন, “আমি একটু তালবাড়ীতে যাচ্ছি রতন, বেলা পড়লে ফিরব। এ বেলা খাবনা, বলে দিস্।” চাদরখানি কাঁধে ফেলিয়া শম্ভু সরকার বাহির হইয়া গেলেন।

 তালবাড়ী হইতে শম্ভু সরকার যখন ফিরিলেন, তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। বড়বাবু বাহিরেই বসিয়াছিলেন, জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাষ্টার পেলেন সরকার মশাই?” শম্ভু সরকার আম্‌তা আম্‌তা করিয়া কহিলেন, “আজ্ঞে না।” বলিয়াই হাতের বহিখানা চাদরের নীচে লুকাইয়া একেবায়ে আপনার ঘরে গিয়া ঢুকিলেন।

 বলাবাহুল্য, সরকার মশায় সত্য কথা বলেন নাই। তালবাড়ীর মাইনর স্কুলের সকল মাষ্টারেরই বড় বাড়ীর ছেলেটির উপর লোভ ছিল। শম্ভু সরকার একজনের সঙ্গে কথাবার্তাও প্রায় শেষ করিয়া ফেলিয়াছিলেন কিন্তু বৈকালে তাহাকে শেষ কথা না দিয়াই চলিয়া আসিয়াছেন। রতন অপরের কাছে পড়িবে ভাবিতেই তাঁহার মনে হইল যেন জগতের সহিত হৃদয়ের যে যোগসূত্রটি ছিল তাহা একেবারে ছিন্ন হইবার উপক্রম হইয়াছে।

 রাত্রি গভীর হইয়া আসিতেছে। তালবাড়ী হইতে যে ফাৰ্ষ্ট বুকখানা কিনিয়া আনিয়াছিলেন, শম্ভূ সরকার তাহা খুলিয়া নূতন করিয়া ইংরাজী শিখিতে বসিলেন। রাত্রি প্রায় শেষ হইয়া আসিল তথাপি শম্ভু সরকারের ইংরেজী জ্ঞান কিছুমাত্র অগ্রসর হইল না। অক্ষরগুলি ক্রমাগতই ভুল হইতে লাগিল। বার-বার তন্দ্রা আর ক্ষীণ স্মৃতিশক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া শম্ভু সরকার ক্লান্ত হইয়া একটি দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গে বহি বন্ধ করিলেন এবং অনতি কাল মধ্যে পরিশ্রান্ত বৃদ্ধ গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িলেন।

 প্রভাতে রতন আসিয়া ফিরিয়া গিয়াছে, নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে মাষ্টার মহাশয়কে ডাকে নাই। বেলা যখন দশটা তখন হঠাৎ বড়বাবুর খাস মুন্সির ডাকে শম্ভু সরকার ধড়ফড়, করিয়। বিছানায় উঠিয়া বসিলেন, “উঃ বড্ড বেলা হয়েছে দেখছি যে!” মুন্সি মহাশয় কহিলেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবু অনেক্ষণ থেকেই আপনাকে ডাকছেন।”

 “বাবু ডাকছেন! দুর্গা শ্রীহরি!” শম্ভু সরকার তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া বাহির হইলেন।

 কাছারি-ঘরের বাহিরে চৌকিতে বাবু বসিয়া, তাহার সম্মুখে কে ও! তালবাড়ীর বিনোদ মাষ্টার! সরকার মহাশয়ের মুখখানি একেবারে পাংশু হইয়া গেল। বড়বাবু, সরকার মহাশয়কে ডাকিয়া কহিলেন, “আপনি এঁকেই বুঝি কাল ব’লে এসেছিলেন? তা এঁর দ্বারাই চলবে।” শম্ভু সরকার বিনোদ মাষ্টারের দিকে একবার চাহিলেন, সে দৃষ্টিতে যে জ্বালা ছিল তাহাতে সত্যযুগ হইলে বিনোদ মাষ্টার ভষ্ম হইয়া যাইতেন। বাবু সে দিকে লক্ষ্য না করিয়া কহিলেন, “আপনি রতনের ইংরাজী একটা বই কিনে এনে দিন আজই, বুঝলেন?”

 শম্ভু সরকার মাথা নোয়াইয়া ‘যে আজ্ঞে’ বলিয়াই সোজা নিজের ঘরের দিকে চলিয়া গেলেন।

 সন্ধ্যায় শম্ভু সরকার আপনার জীর্ণ তক্তপোষখানার উপর বসিয়া দূরে কাছারির বারান্দায় যেখানে রতন তাহার নূতন মাষ্টারের নিকট হইতে ইংরাজী বর্ণমালার পাঠ লইতেছিল, সেই দিকে চাহিয়া ছিলেন। রতন বার-বার মুখ তুলিয়া সরকার মহাশয়ের ঘরের দিকে চাহিতেছিল আর সরকার মহাশয়ের চক্ষু আর্দ্র হইয়া উঠিতেছিল। অনেক্ষণ নীরবে বসিয়া থাকিয়া শেষে কি ভাবিয়। শম্ভু সরকার উঠিয়া গেলেন।

 বড়বাবু বাগানে পায়চারী করিতেছিলেন, শম্ভু সরকার আসিয়া যুক্তকরে কহিলেন, “বাবু আমাকে বিদায় দিন। আরও দুই একটা কথাও বলিতে যাইতে ছিলেন কিন্তু গলার স্বর সহসা অত্যন্ত কাঁপিতে লাগিল, ভালো করিয়া আওয়াজ বাহির হইল না।

 বড়বাবু সহজভাবেই কহিলেন, “যেতে চাইছেন? কোথায় যাবেন?”

 “যে দিকে দু’চক্ষু যায়, আর কটা দিনই বা? একরকম কেটেই যাবে” শম্ভু সরকার কহিলেন।

 “তা বেশ। সন্ধ্যার পর কথা হবে।” শম্ভু সরকার তখনকার মত ফিরিয়া গেলেন।

 রাত্রি প্রহর-খানেকের সময় সরকার মহাশয়ের ডাক পড়িল। তাহাকে ছাড়িয়া দিতে তিনি বিশেষ দুঃখ বোধ করিতেছেন, এই প্রকারের গুটিকয়েক মামুলী কথা বলিয়া দশখানি দশ টাকার নোট শম্ভু সরকারের হাতে দিয়া বড়বাবু কহিলেন, “আপনার পারিশ্রমিক যৎকিঞ্চিৎ দিলাম।” নোট কয়খানি হাত পাতিয়া লইতে তাহার হাত কাঁপিয়া গেল। কোনক্রমে আত্মসম্বরণ করিয়া নোট কয়খানি ছেঁড়া জামার পকেটে ফেলিয়া শম্ভু সরকার বাবুকে প্রণাম করিয়া কহিলেন, “কাল ভোরেই বেরোব। একবার রতনকে দেখে যাব।"

 বড়বাবু কহিলেন, “সে তো ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণ বুঝি।” সরকার মহাশয় তাড়াতাড়ি কহিলেন, “ঘুমুচ্ছে? আহা! তবে থাক। সারাদিন তো বিশ্রাম নেই।”

 রাত্রি প্রভাতের পূর্ব্বেই শম্ভু সরকার তাঁহার সেই পুরাতন ব্যাগের হাতলে ছেঁড়া গামছা জড়াইয়া ছাতির ডগায় ঝুলাইয়া বাহির হইলেন। পথে উঠিয়া একবার পিছন ফিরিয়া দোতলায় রতনের রুদ্ধ-বাতায়ন শয়নকক্ষের দিকে চাহিয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, “মায়া! মায়া! পরের ছেলে!” তাহার পরক্ষণেই দ্রুতবেগে চলিতে আরম্ভ করিলেন। অনির্দ্দিষ্ট দীর্ঘপথে আজ নূতন করিয়া শম্ভু সরকারের যাত্রা আরম্ভ হইল।

 মাস খানেক পর একদিন বড়বাবুর সম্মুখে বসিয়া রতন বিনোদ মাষ্টারের নিকট অধীত বিদ্যায় পরীক্ষা দিতেছিল সেই সময় পিয়ন রতনের এক পার্শেল আনিয়া উপস্থিত করিল। বড়বাবু কৌতূহলী হইয়। পার্শেল খুলিলেন। মধ্যে প্রায় একশ’ টাকা দামের একটি সোনার ঘড়ি আর একটুকরা কাগজে লেখা ‘বাবা’ রতনের জন্য।’ প্রেরক শ্রীশম্ভূনাথ সরকার। কোন ঠিকানা নাই।

 অনেকক্ষণ ঘড়িটার দিকে চাহিয়া থাকিয়া রতনের হাতে ঘড়িটা দিয়া বড়বাবু নীরবে বসিয়া রহিলেন। হঠাৎ তাঁহার চোখে ছবির মত ভাসিয়া উঠিল একদিনের কথা—বুড়া শম্ভু সরকার বাহিরের আঙ্গিনায় হামাগুড়ি দিয়া ঘোড়া হইয়। ছুটিতেছেন, আর রতন তাঁহার পিঠে সওয়ার হইয়া বসিয়া আছে!