থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/প্রত্যর্পণ
যে তাহার নাম চাঁপা রাখিয়াছিল, সে মোটেই ভুল করে নাই। ফুলটির বর্ণের সহিত দেহের বর্ণের কোনও পার্থক্য ছিল না; কিন্তু চাঁপার অদৃষ্ট ছিল মন্দ। দশ বছর বয়সে গোপাল বৈরাগীর সঙ্গে তাহার বিবাহ হইয়াছিল, তেরো বৎসরে সে বিধবা হইল। তখন চাঁপার মা বাঁচিয়াছিল; আর একবার চাঁপাকে পাত্রস্থ করিবার চেষ্টা বুড়ী অনেকবার করিয়াছিল কিন্তু কন্যা রাজী হইল না। তারপর মা মরিয়া গেল। চাঁপাও নিরুদ্বেগে দিন কাটাইয়া সবে বিশ বৎসরে আসিয়া পৌঁছিয়াছে।
একেবারেই নিরুদ্বেগে দিন কাটাইয়াছে বলিলে মিথ্যা বলা হইবে। তাহার রূপের পূজারীর অভাব ছিল না; নবীন গোয়ালা হইতে আরম্ভ করিয়া ছিদাম বৈষ্ণব পর্য্যন্ত সকলেই এক আধবার তাহার অনুগ্রহ প্রার্থনা করিয়া ধমক্ খাইয়া গেছে। আজকাল আর বড় কেহ চাঁপার কাছে বিবাহের প্রস্তাব লইয়া আসিত না। একে চাঁপার ধর্ম্মবাপ গ্রামের জমিদার রাজীববাবুর শাসন, তাহার উপর চাঁপার তিরস্কার, এই দুইটী পদার্থ পাণিপ্রার্থীদের আক্রমণ হইতে তাহাকে রক্ষা করিতেছিল।
চাঁপা লেখাপড়া কিছু জানিত। গ্রামের প্রাইমারী বালিকা বিদ্যালয়ে লব্ধ বিদ্যাকে সে ক্রমাগত রামায়ণ মহাভারত পড়িয়া অনেকদূর অগ্রসর করিয়া লইয়াছিল। সকালে মুড়ি ভাজিয়া বৈকালে রূপগাঁর বাজারে সে মুড়ি বেচিত। রাত্রে ফিরিয়া তাহার সঙ্গিনী জমিদার বাড়ীর ঝি লক্ষ্মীবুড়িকে শ্রোত্রীর আসনে বসাইয়া মহাভারত পড়িত, এইরূপে চাঁপার দিন কাটিয়া যাইতেছিল।
সেদিন শ্রাবণের মেঘ অপরাহ্নেই সন্ধ্যা ঘনাইয়া তুলিয়াছে। চাঁপা তাড়াতাড়ি মুড়ি বেচিয়া বাড়ী ফিরিল। গৃহের বাহিরের আঙ্গিনায় নিম গাছের ঘন ছায়া অন্ধকার রচনা করিয়া রাখিয়াছে। আঙ্গিনায় পা দিয়াই চাঁপা দেখিল কে যেন বারান্দায় শুইয়া। অন্ধকারে স্পষ্ট কিছু দেখিবার উপায় ছিল না, চাঁপা, প্রশ্ন করিল, “কে ও?” কোন উত্তর আসিল না। তখন মুড়ির ডালাটি রাখিয়া একটি প্রদীপ হাতে করিয়া সে বাহিরে আসিল।
যে শুইয়াছিল তাহাকে চাঁপা কোনও দিন দেখে নাই। কুড়ি বাইশ বছরের যুবক চক্ষু মুদিয়া শুইয়াছিল, চাঁপা তাহার কাছে দাঁড়াইয়া আবার প্রশ্ন করিতেই যুবক চক্ষু মেলিয়া কহিল, “জল”।
চাঁপা জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে? কি হয়েছে?” যুবক শুধু কহিল, “জল! পিপাসা!” চাঁপা বুঝিল আগন্তুক অসুস্থ। ঘটীতে জল আনিয়া তাহাকে জলপান করাইয়া গায়ে হাত দিয়া দেখিল দারুণ জ্বর! জিজ্ঞাসা করিল, “কে তুমি? এখানে কি ক’রে এলে?”
যুবক যাহা বলিল, তাহার সংক্ষিপ্তসার এই যে, তাহার নাম বনমালী। মহেশতলায় যাইতে জ্বরের বেগ প্রবল হওয়াতে এইখানে শুইয়া আছে, জ্বর কমিলেই চলিয়া যাইবে। মহেশতলা রূপগাঁ হইতে দুই ক্রোশ। আত্মীয় থাকিলে সেখানে সংবাদ পাঠাইবে ভাবিয়া চাঁপা প্রশ্ন করিল, “সেখানে তোমার কে আছে?” যুবক শুধু কহিল, “কেউ না। মন্দির দেখ্তে যাচ্ছিলাম।”
চাঁপা একটু বিব্রত হইয়া কহিল, “তাইতো! এখানে তোমাকে কে দেখ্বে? কোথা থেকে বা এলে!”
যুবক কহিল, “কাউকে দেখতে হবে না। জ্বর কম্লেই আমি চ’লে যাব। তুমি যাও।” স্বরে একটু তীব্রতা ছিল, চাঁপা তাহা অনুভব করিল। সে আর কিছু জিজ্ঞাসা করিল না, “মাথার কাছে ঘটিতে জল রৈল পিপাসা হ’লে খেও।” বলিয়া চাঁপা ভিতরে চলিয়া গেল।
রাত ন’টায় চাঁপা একবার বাহিরে আসিল। বনমালী তখন জ্বরের ঘোরে অস্ফুটস্বরে প্রলাপ বকিতেছিল। চাঁপা প্রমাদ গণিল। বাহিরে এই অবস্থায় একটা মানুষকে কি করিয়া ফেলিয়া রাখা যায়? আর ভিতরেই বা অপরিচিত যুবাকে স্থান দেয় কি করিয়া? মানসিক অবস্থা যখন এইরূপ সেই সময়ে লক্ষ্মী আসিয়া উপস্থিত হইল। সমস্ত দেখিয়া সে কহিল, “তা আর কি করবে?” ‘কৃষ্টের জীব’ ফেল্তে তো পারবে না! বাইরের ঘরে মাচার উপর বিছানা ক’রে দাও। আহা কার বাছা যেন!
সেইটিই সুযুক্তি বোধ হইল; বিছানা করিয়া দুইজনে ধরাধরি করিয়া আনিয়া বনমালীকে ভিতরে শোয়াইয়া দিল। সারা রাত্রি ধরিয়া মাথায় জল ঢালিয়া আর পাখার বাতাস করিয়া চাঁপা যখন ঘুমাইয়া পড়িল তখন প্রভাত হইয়া গেছে।
সে দিন আর মুড়ি ভাজা হইল না।
(২)
সে দিনও জ্বর পূর্ব্ববৎই রহিল। চাঁপা প্রথম প্রথম একটু বিরক্তি বোধ করিতেছিল কিন্তু দুপুরে জ্বরের ঘোরে যখন বনমালী তাহার হাত দু’খানি ধরিয়া কহিল, “তুমি অনেক করেছ আমার জন্যে কিন্তু আমি বোধ করি বাঁচব না।” তখন অকস্মাৎ চাঁপার চক্ষু দুটি ছল্ ছল্ করিয়া উঠিল। মুহূর্তের মধ্যে নিজের সমস্ত শ্রম ও অসুবিধার কথা ভুলিয়া গিয়া সে কহিল, “ভয় কি? সেরে উঠবে। তুমি ঘুমোও, আমি বদ্দি ডেকে আন্ছি।”
বেলা তিনটায় মাখন কবিরাজ আসিয়া ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থা করিয়া গেলেন।
পাঁচদিন দোকান-পাট ফেলিয়া অক্লান্ত পরিশ্রমে চাঁপা বনমালীর সেবা করিল। কবিরাজ যেদিন আসিয়া কহিয়া গেলেন যে, ভয়ের কারণ আর নাই, সেদিন চাঁপা আনন্দে কাঁদিয়া ফেলিল। বনমালী তাহার হাত ধরিয়া কহিল, কাদছ কেন? আমি সেরে উঠেছি।”
চাঁপা হাত ছাড়াইয়া পথ্য আনিতে চলিয়া গেল।
অন্নপথ্য পাইবার পর বনমালী কহিল, “তুমি যা করেছ আমার জন্যে তার শোধ নেই। যদি ভগবান্ দিন দেন—”
চাঁপা কহিল, “সে সব আর এখন শুনতে পারিনে, হপ্তা ধরে দোকান বন্ধ, এখুনি যাব। তুমি বাইরে বেরিও না ঘরেই ব’সে থাক। আর এই ওষুধটা —” বলিয়া এক মোড়ক গুঁড়া তাহার হাতে দিয়া কহিল, “এটা দুপুরে তুলসী রস দিয়ে খেও। আমি স্নান সেরে তুলসী তুলে দিয়ে যাব’খন।”
সমস্ত দিন ধরিয়া বনমালী কত কি ভাবিল। এই দরিদ্র নারীর উপার্জ্জন সে কেবল বসিয়া বসিয়া ভোগ করিতেছে। এ অবস্থাটা সুখকর নহে। সন্ধ্যায় চাঁপা ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, "জ্বর আসে নি?” বনমালী কহিল, “না”। পরক্ষণেই কহিল, “দেখ আমি যেতে চাই!”
চাঁপার মুখখানা সহসা গম্ভীর হইয়া গেল। অন্ধকারে বনমালী তাহা দেখিতে পাইল না। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া সে কহিল, “তা বেশ, যাও না। তা আর আমায় জিজ্ঞেস কেন?” কথাটি ঠিক অনুমতির মত শোনাইল না দেখিয়া বনমালী চুপ করিয়া গেল। এক প্রহর রাত্রে যখন দুধ বার্লি লইয়া চাঁপা উপস্থিত হইল, তখনও তাহার মুখের কালো ছায়াটি কাটিয়া যায় নাই। বনমালী এক চুমুকে পাত্রটি নিঃশেষ করিয়া কহিল, “দেখ তুমি গরীব। আর কতদিন আমাকে পুষ্বে? সেইজন্য যেতে চাইছি। এখন ভাল হ’য়েছি, বোধ করি যেতে পার্ব।”
চাঁপা একবার বনমালীর মুখের দিকে চাহিল। তাহার যে যাওয়াই উচিত তাহাতে চাঁপারও কোনও সন্দেহ ছিল না কিন্তু মনের একটি কোণে একান্ত অসহায় অতিথিটির জন্য খানিকটা মমতা সঞ্চিত হইয়া উঠিয়াছিল, ‘চলিয়া যাও’ বলিতে মন সরিতেছিল না। অনেক ভাবিয়া কহিল, “দু’বেলা ভাত খেয়েই চ’লে যেও।”
"আচ্ছা” বলিয়া বনমালী শয্যা লইল।
(৩)
সে দিন বনমালী ধরিয়া বসিল যে বিকালেও তাহাকে ভাত দিতে হইবে। আপত্তি করিলে সে অন্য কিছু ভাবিয়া লইতে পারে ভাবিয়া চাঁপা কহিল, “বেশ!” কিন্তু তাহার মুখের ভাব বদলাইয়া গেল, সমস্ত দিন আর সে ভালো করিয়া বনমালীর সঙ্গে কথা কহিল না। বনমালী তাহা লক্ষ্য করিল। কয়েকদিন নিয়ত নারীর সংসর্গে থাকিয়া রমণীর চিত্ত-বিশ্লেষণের তাহার কিঞ্চিৎ ক্ষমতা জন্মিয়াছিল।
অপরাহ্নে উনুন জ্বালিয়া চাঁপা হাড়ি চড়াইয়াছে এমন সময় ভিক্ষার ঝুলি হাতে করিয়া এক বৈষ্ণব আসিয়া আঙ্গিনায় দাঁড়াইয়া অতি করুণকণ্ঠে কহিল, “দুটো চাল দাও মা, বৈষ্ণব, একাদশীর দিন। পারণ কর্ব্ব।” আজ একাদশী শুনিয়াই চাঁপার বুকের ভার যেন অনেকটা লঘু হইয়া গেল, বনমালীর দিকে ফিরিয়া সে কহিল, “আজ যে একাদশী তা তো ভুলেই গেছ্লাম।
বনলামী সমস্ত দিন ধরিয়াই চাঁপার ভাবভঙ্গী লক্ষ্য করিতেছিল। এ কথাটির উদ্দেশ্য কি বুঝিতে তাহার বিলম্ব হইল না, কহিল, “তাহ’লে, আজ আর ভাত খাব না। থাক্।”
চাঁপার মুখখানি প্রসন্ন হইয়া উঠিল, কহিল, “রুটি গ’ড়ে দেব, দুধ দিয়ে তাই খেও, কি বল?”
বনমালী নিতান্ত সুবোধ বালকের মত হহিল, “তাই দিও।”
ভিখারী সেদিন চাঁপার বাড়ী হইতে তিন দিনের উপযোগী সিধা লইয়া গেল।
পরদিন বনমালী আর বৈকালে ভাত খাইবার জন্য জিদ্ করিল না, শুধু বাজারে যাইবার সময় এক দিস্তা রঙ্গীন কাগজ আনিতে চাঁপাকে বলিয়া দিল। রাত্রে রঙ্গীন কাগজের দিস্তাটি হাতে করিয়া বনমালীর ঘরে আসিয়া চাঁপা জিজ্ঞাসা করিল, “আজ কি ভাত খাবে?”
এ প্রশ্নের উত্তর বনমালী অনেকক্ষণই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিল, কহিল, “না। এ কয়দিন থাক্ একেবারে পূর্ণিমার পরেই খাব।”
চাঁপা খুসী হইয়া গেল।
প্রভাতে উঠিয়া চাঁপা দেখিল যে তাহার ঘরের দাওয়ায় আট দশটি রঙ্গীন কাগজের খাঁচা, তাহার মধ্যে নানা রঙের পাখী। খাঁচা আর পাখীর নির্ম্মাণ কৌশল দেখিয়া সে আশ্চর্য্য হইয়া গেল। বেলা হইলে বনমালী যখন চোখ মুছিতে মুছিতে বাহিরে আসিল তখন চাঁপা কহিল, “কাল সারারাত জেগে বুঝি এইসব করেছ? এরপর যদি অসুখ করে তাহ’লে কে দেখ্বে বলতো?”
বনমালী সে কথার কোনও জবাব না দিয়া কহিল, “তুমিতো বাজারে যাবে, এগুলো নিয়ে যাবে।”
চাঁপা কহিল, “কি হবে?”
বনমালী কহিল, “বিক্রি! দু’দশ আনা যা হয় তাই লাভ। শুধু ব’সে ব’সে খাচ্ছি।”
চাঁপা বলিল, “তাই ব’লে তুমি রাত জেগে রোগ ক’রে আমাকে ভোগাবে? আর এ সব বইবে কে? আমি একা মানুষ মুড়ি দেখব না পাখী দেখব?”
বনমালী চুপ করিয়া গেল।
বৈকালে চাঁপা দেখিল যে, সূতার সঙ্গে খাঁচাগুলি ঝুলাইয়া বনমালী বাহির হইয়া যাইতেছে। সকাল বেলার কথাগুলি মনে পড়িল। তাড়াতাড়ি ছুটিয়া গিয়া কহিল, “তোমাকে আর যেতে হবে না। দু’দিন ভাত খেয়েছ আর আজ যাবে এক হাঁটু কাদা ভেঙ্গে বাজারে! এমন মানুষ আমি দেখিনি। দাও দেখি আমার হাতে।” বনমালী বিনা বাক্যে খাঁচার সূতাগাছি চাঁপার হাতে দিয়া কহিল, “বেশ সাবধান করে নিয়ে যেও। জোর হাওয়া লাগলে ছিঁড়ে যাবে।” চাঁপা মুড়ির ডালি মাথায় করিয়া হাতে খাঁচাগুলি ঝুলাইয়া চলিয়া গেল। সন্ধ্যায় ফিরিয়া চাঁপা হাসিতে হাসিতে কহিল, “এই নাওগো তোমার খাঁচার দাম। দু’টাকা ছ’আনা। বনমালী হাত সরাইয়া কহিল, “তুমি রাখ!” চাঁপা কহিল, “তোমার জিনিষ—”
বনমালী তাহাকে বাধা দিয়া একান্ত অসঙ্কোচে চাঁপার আঁচলের খোঁটায় পয়সাগুলি বাঁধিয়া দিয়া কহিল, “তুমি যদি না বাঁচাতে তবে এ খাঁচা কে গড়ত চাঁপা?
চাঁপা একবার মাত্র বনমালীর দিকে চাহিয়া রান্নাঘরে গিয়া ঢুকিল।
পরদিন হইতে বনমালী রীতিমত কাগজের ফুল পাখী পাতা গড়িতে লাগিয়া গেল। চাঁপা অবসর মত তাহার কাজে সাহায্য করিত। এইরূপে দিনকয়েক কাটিয়া গেল। একদিন বনমালী কহিল, “আচ্ছা একটা দোকানঘর ভাড়া কর্লে হয় না? মুড়ি মুড়কী থাকবে তার সঙ্গে থাকবে ফুল পাখী খেলনা। দিনের বেলা সেখানে ব’সেই কাজ করব।”
চাঁপা উৎসাহিত হইয়া কহিল, “সে খুব ভালো হবে। তুমি বেচা কেনা জান তো? অনেকে আবার ঠকিয়ে নেয়।”
বনমালী কহিল, “তুমি শুধু দাম ব’লে দাঁড়ি পাল্লা ঠিক ক’রে দেবে। আর সব আমি নিজে করব।”
ইহার পর দোকানে কি কি রাখিবে সে সম্বন্ধে অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত আলোচনা হইল। প্রতিবেশিনী মণি বৈষ্ণবীর মত দোকান করিবার ইচ্ছা চাঁপার অনেকদিন হইতেই ছিল কিন্তু একা মানুষের সাধ্য নয় বলিয়া এতদিন অভিপ্রায়টি কার্য্যে পরিণত হয় নাই। বহুদিনকার আকঙ্ক্ষার পূর্ণতা আসন্ন দেখিয়া সে অতিমাত্রায় উৎসাহিত হইয়া উঠিল, সারারাত এই উৎসাহের উত্তেজনায় তাহার ঘুম হইল না। তাহার মুড়ি মুড়কির দোকান কয় বৎসরে নবীন সরকারের মত মনোহারী দোকানে রূপান্তরিত হইতে পারে, তাহারও একটা সময় সে স্থির করিয়া রাখিল।
চাঁপার দোকান ঘর ভাড়া করা হইয়া গেছে। মাসিক ভাড়া সাড়ে পাঁচ টাকা। শুনিয়া চাঁপা প্রথমে একটু দমিয়া গিয়াছিল। বনমালী আশ্বাস দিয়া কহিল, “সাড়ে পাঁচ টাকা তো একদিনের কামাই চাঁপা। পূজোর বাজারে একদিনে কাগজের হাতী আর নৌকো বেচে তোমার বছরের ভাড়া তু’লে দেব।” চাঁপা হাস্যময় স্নিগ্ধ দৃষ্টিপাতে বনমালীকে পুরস্কৃত করিল।
রং বেরং কাগজের ফুল দিয়া বনমালী দুইদিন ধরিয়া ঘরখানি সাজাইয়া ফেলিল। দোকান সাজান হইলে চাঁপার সঙ্গে তাহার দুই একজন বান্ধবী সন্ধ্যাকালে দোকান দেখিতে আসিল। কি চমৎকার! সমস্ত ঘরখানিতে যেন হাজারখানেক রঙ্গিন প্রজাপতি উড়িয়া আসিয়া বসিয়াছে। শিল্পীকে প্রশংসা করিয়া মণি বৈষ্ণবী চাঁপার কাণে কাণে কহিল, “বড় ভাগ্যিরে তোর চাঁপা। দেখিস আবার হেলায় হারাস্ নি যেন!” চাঁপা লজ্জায় লাল হইয়া গেল।
সেদিন ফিরিতে তাহার রাত্রি হইল। সে একেবারে ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের নিকট হইতে দোকান খুলিবার দিন পর্যন্ত জানিয়া আসিয়াছে। মাথায় মুড়ীর ডালিতে দিস্তা খানেক খবরের কাগজ।
“এ কাগজ কি হবে চাঁপা?” বনমালী জিজ্ঞাসা করিল।
“ঠোঙ্গা গড়তে হবে যে। সবাই তো আর আঁচল পেতে মুড়ি নেবে না।” চাঁপা কহিল।
হাত বাড়াইয়া বনমালী কহিল, “দাও। রাতে ক’রে রাখব।”
“সারাদিন মেহনৎ করেছ, আবার সারারাত জাগতে চাও? তোমার সখ তো খুব!” এই বলিয়া চাঁপা একেবারে নিজের ঘরে গিয়া ঢুকিল।
আহারান্তে নিজের ঘরে চাঁপা ঠোঙ্গার জন্য কাগজ কাটিতে বসিয়া গেল। কাল দোকানের অন্যান্য আসবাব-পত্র যোগাড় করিতে হইবে। হাতে কাঁচি চলিতেছিল আর চাঁপার সমস্ত মন তখন মুড়ি মুড়কির দোকান হইতে আরম্ভ করিয়া নবীন সরকারের মনোহারী ও গোপাল গোয়ালার সন্দেশের দোকান আশ্রয় করিয়া ঘুরিতেছিল! বেশ স্পষ্টই সে দেখিতে পাইতেছিল যে, বনমালী রীতিমত মোটা সোটা হইয়া লাল খেরুয়ার বাঁধা খাতাখানিতে বড় বড় টাকার অঙ্ক ফাঁদিতেছে। দোকানের সম্মুখে পথের ধারে অসংখ্য খরিদ্দার আর পিছনে কুঞ্জলতার বেড়ায় ঘেরা ছোট বাড়ীখানির আঙ্গিনায় বসিয়া সোনার সূতায় গাঁথা তুলসীর মালা লইয়া সে জপ করিতেছে। আরো যে কত প্রকারের সুখস্বপ্নই শরতের মেঘের মত একে একে তাহার মনের উপর দিয়া ভাসিয়া যাইতে ছিল তাহার সংখ্যা নাই। সহসা চাঁপা চমকিয়া উঠিল। বনমালীর ছবি! খবরের কাগজে বনমালীর ছবি উঠিল কেমন করিয়া? তাড়াতাড়ি প্রদীপটীর কাছে আনিয়া ছবির নীচে লেখা কয়েক ছত্রে চাঁপা চোখ বুলাইয়া গেল। নিমিষে কোথা হইতে এক অন্ধকারের বন্যা আসিয়া তাহার দোকান-পসার বাড়ী-ঘর সব ভাসাইয়া লইয়া গেল; রহিল শুধু বনমালীর ছবি, কয়েক পংক্তি অক্ষর আর চাঁপা নিজে। পর মুহূর্ত্তেই দুই হাতে বুক চাপিয়া ধরিয়া একটা সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস টানিয়া চাঁপা কহিল, “উঃ!”
একখানি বাঙ্গালা খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের পৃষ্ঠায় বনমালীর ছবি, তাহার নীচে লেখা,—“আমার ভ্রাতা শ্রীমান্ বনমালী বসু আজ ছয়মাস হইতে নিরুদ্দেশ। আমার মাতা তাহার জন্য অন্ন-জল ত্যাগ করিয়াছেন, তাঁহার বাঁচিবার আশা নাই। শ্রীমান্ সামান্য কারণে রাগ করিয়া বাড়ী হইতে চলিয়া গিয়াছে। যিনি তাহার সন্ধান করিয়া দিবেন, তাঁহাকে পাঁচশত টাকা পুরস্কার দেওয়া হইবে!
শ্রীকানাইলাল বসু, বৰ্দ্ধমান।
রাত্রি শেষ হইতে যখন দণ্ডখানেক বাকী ছিল, তখনও চাঁপা কাগজখানি সম্মুখে করিয়া আবিষ্টের মত বসিয়াছিল। সহসা কাকের ডাকে তাহার সম্বিৎ ফিরিয়া আসিল। অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া সে কি ভাবিল, তাহার পর ভিন্ গাঁয়ে তাহার মামাতো ভাই পোষ্টাফিসের পিওন জলধরের সহিত সাক্ষাৎ করিতে চলিয়া গেল।
বনমালী যখন সবে হাত-মুখ ধুইয়া বারান্দায় মাদুর বিছাইয়া বসিয়াছে তখন চাঁপা ফিরিল। তখন বেলা হইয়াছে। বনমালী তাহার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “কি হ’য়েছে তোমার চাঁপা?” চাঁপা দাঁতে ঠোঁট চাপিয়া কহিল, “কিছু না।” তাহার পর মুড়ি ভাজিবার অছিলায় সে বাহির হইয়া গেল, ফিরিল সন্ধ্যার পর।
বনমালী অত্যন্ত উদ্বেগে সমস্ত দিন কাটাইয়া সন্ধ্যায় পথে দাঁড়াইয়া চাঁপার অপেক্ষা করিতেছিল, চাঁপাকে আসিতে দেখিয়াই কহিল, আজ সারাদিন না দেখে কেবলই ছুটোছুটি ক’রে বেড়াচ্ছি।” কথা শুনিয়া চাঁপার চোখে জল আসিল। আপনাকে কোনমতে সামলাইয়া সে জবাব দিল, “আজ রতন গাঁয়ে মুড়ির যোগান দিতে গেছলাম।”
বনমালী কহিল, “সারাদিন খাওনি তাহ’লে! হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও গে। ভাত-তরকারী ঢাকা আছে। আমি একবার দোকানটা দেখে আসিগে।” বনমালী চলিয়া গেল।
দাওয়ায় আঁচল বিছাইয়া চাঁপা ঘণ্টাখানেক গড়াইল, তার পর তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়া ভাত লইয়া বসিল।
বনমালী তাহারই জন্য ভাত রাঁধিয়া গিয়াছে। বিধাতার কি পরিহাস! অন্নের প্রথম গ্রাসটি কপালে ঠেকাইয়া মুখে দিতে গিয়াই সে ডুক্রিয়া কাঁদিয়া উঠিল। পরক্ষণেই ভাতের থালা ঢাকিয়া রাখিয়া সে উঠিয়া গেল।
সেদিন আর খাওয়া হইল না।
কয়দিন হইতে চাঁপা কেন এত বিমর্ষ আর গম্ভীর হইয়া আছে, বনমালী তাহা বুঝিতে পারিল না। চতুর্থ দিন আহারান্তে জিজ্ঞাসা করিল, “কৈ? আজ যে দোকান খুল্বে! সব আমাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দাও।”
চাঁপা একটি কথা বলিতে গিয়া থামিয়া গেল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শুধু কহিল, “সে আজ থাক্।”
“কেন? সামনে পূজোর মরশুম, এখন থেকে গুছিয়ে না নিলে তখন কি করবে? একটা যে দোকান তাতো খদ্দেরের জানা চাই।” বনমালী কহিল।
চাঁপা তুলসীতলায় গোবর লেপিতেছিল, হতাশা উদাস-স্বরে অতি মৃদু কণ্ঠে কহিল, “আর দোকান!”
বনমালী শুনিতে পাইল না, ফিরিয়া সেই প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করিল। চাঁপা দাঁড়াইয়া উঠিয়া কহিল, “দোকানের কথা জানেন নারায়ণ। তুমি আর আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।” বনমালী যদিও এ কথার অর্থ কিছু বুঝিল না, তথাপি চাঁপার মুখ দেখিয়া দ্বিতীয় প্রশ্ন করিবার প্রলোভন সম্বরণ করিয়া গেল।
বৈকালে তাহার ঘরের বারান্দায় মাথা নীচু করিয়া চাঁপা কাঁথা সেলাই করিতেছিল আর বনমালী বাহিরের ঘরের রোয়াকে পা ঝুলাইয়া বসিয়া অবিলম্বে দোকান খুলিবার পক্ষে বিবিধ যুক্তি দেখাইয়া অনর্গল বকিতেছিল। এমন সময় বাহিরের দরজার কাছে কে ডাকিল, “চাঁপা বোষ্টুমী বাড়ীতে আছ?” চাঁপা উত্তর দিবার পূর্ব্বেই একটি আধাবয়সী ভদ্রলোক এক বৃদ্ধাকে সঙ্গে লইয়া আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলেন। অকস্মাৎ ভ্রাতা ও জননীকে দেখিয়া বনমালী একেবারে বিমূঢ় হইয়া গেল। বৃদ্ধা বনমালীকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া ফোঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। চাঁপা কোন কথা না বলিয়া বনমালীর ঘরের বারান্দায় একখানি মাদুর বিছাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।
⁕ ⁕ ⁕ ⁕
বহিরে গরুর গাড়ী অপেক্ষা করিতেছিল। রাঁধিবার অছিলায় চাঁপা একটি হাঁড়িতে শুধু জল চাপাইয়া রান্নাঘরে উনুন জ্বালিয়া বসিয়াছিল। এমন সময় ঝড়ের মত বনমালী ঘরে প্রবেশ করিয়া কহিল, “আমি চল্লাম কিন্তু তুমি কেন আমার সঙ্গে চাতুরী করলে আমাকে সইতে পার না বল্লেই তো আমি চ’লে যেতাম।” বনমালীকে দেখিয়া চাঁপা উঠিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া দূরে গিয়া দাঁড়াইল, বনমালীর অভিযোগের উত্তরে একটী কথাও কহিল না। একবার তাহার দিকে চাহিল মাত্র। বনমালী সে সজল চক্ষুর ব্যথাতুর দৃষ্টির অর্থ বুঝিল না। শ্লেষের স্বরে কহিল, “পাচশো টাকার লোভ বুঝি!” ভ্রাতা যে তাহার সন্ধানের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করিয়াছিলেন তাহা সে জানিত।
বনমালীর কথা শুনিয়া চাঁপার চোখে আগুন জ্বলিয়া উঠিল, কি যেন সে বলিতে যাইতেছিল এমন সময়, “চাঁপা মা লক্ষ্মী কোথা?” বলিতে বলিতে বনমালীর মাতা গৃহে প্রবেশ করিলেন, পরে চাঁপাকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া কহিলেন, “আমি চলুম মা, তুমি বুড়ির হারানো ধন ফিরিয়ে দিয়েছ, তোমার অক্ষয় বৈকুণ্ঠ হ’বে। আর বলবার কিছুই নেই বুড়ীকে বাঁচিয়েছ; যে ক’টা দিন বাঁচ্ব নিত্য তোমার নামে নারায়ণকে তুলসী দেব। এই নাও, সংসারে কত দরকার কত রকম আছে, কাছে রাখ।” বলিয়া অনেক প্রকার আশীর্ব্বাদের সঙ্গে ছোট একটা পুঁটুলী তাহার হাতের মধ্যে গুঁজিয়া দিয়া চলিয়া গেলেন। চাঁপা অপলক নেত্রে চলন্ত গো-যানখানির দিকে চাহিয়া রহিল।
এমন সময় মণি বৈষ্ণবীর রাখাল মাণিক আসিয়া ডাকিল, “চাপা দিদি?” চাঁপার বাড়ীতে কে আসিয়াছে জানিবার জন্য মণি তাহাকে পাঠাইয়াছিল। মাণিককে দেখিয়া চাঁপার হুঁস হইল, একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া সে কহিল, “দয়াল হরি। হরি হে।” তারপর রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করিতে গিয়া হাতের মুঠায় ছোট পুঁটুলিটি চোখে পড়িল। খুলিয়া দেখিল একশত টাকার পাঁচখানি নোট। পুরস্কার! বিদ্রূপের হাস্যে চাঁপার ওষ্ঠ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, সে মাণিককে কহিল, “একটু দাঁড়াতো মাণিক! দেখি আমি গাড়ীটা কতদূর গেল!”
⁕ ⁕ ⁕ ⁕
গাড়ী তখন কেবল বাবুদের দীঘি ছাড়াইয়া গেছে এমন সময় পিছন হইতে হাঁপাইতে হাঁপাইতে ছুটিয়া আসিয়া মাণিক কহিল, “গাড়ী রাখ একটুখানি!” কানাইলাল মুখ বাহির করিয়া কহিলেন, “কে?” “আমি মাণিক ঘোষ। এই নিন্ চাঁপা দিদি পুঁটুলী ফিরিয়ে দিয়েছে” বলিয়া পুঁটুলীটি গাড়ীর মধ্যে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া সে বাঁকা পথে অদৃশ্য হইয়া গেল। বনমালী জিজ্ঞাসা করিল “কি ও দাদা?”
কানাই কহিল, “সেই পাঁচশো টাকার নোট দেখ্ছি ফিরিয়ে দিয়েছে।”
মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ে বিস্ফারিত হইয়া পরক্ষণেই বনমালীর চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিল।
চাঁপা আজও মাথায় করিয়া মুড়ি বেচে। সে দোকান ঘর তালা বন্ধ কিন্তু মাসে মাসে চাঁপা তাহার ভাড়া যোগাইয়া যায়, প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে সন্ধ্যাদীপ দেয়, কেন তাহা কেহ বলিতে পারে না।