থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/বছিরের দরগা
এর একটু ইতিহাস আছে।
বিশু জন্মিয়াছিল বাগ্দীর ঘরে। কিন্তু তার মা ও পাড়া-প্রতিবেশী সকলেরই নিশ্চিত ধারণা ছিল যে, সে ছিল পূর্ব্ব জন্মে ব্রাহ্মণ, কোন পাপে বাগ্দীর ঘরে আসিয়া এবারে জন্ম লইয়াছে। এই ধারণার কারণও ছিল, পাঁচ বৎসরে পড়িয়াই বিশু একদিন বলিল, “আমি মাছ খাব না।” মা প্রথমে প্রহারের চোটে তাকে সঙ্কল্পচ্যুত করিবার চেষ্টা করিল কিন্তু বিশু টলিল না। অগত্যা মাকেও এই জেদী ছেলের জন্য নিজের পরমপ্রিয় খাদ্য মৎস্য ত্যাগ করিতে হইল। আরও একটু বড় হইলে বিশু জেলে-বাড়ী হইতে একটা ছোট ঢোলক জোগাড় করিয়া সেটাকে গলায় ঝুলাইয়া পাড়ায় পাড়ায় “জয় রাধা গোবিন্দ” “ভজ গৌরাঙ্গ” গহিয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিল। মা বিরক্ত হইল; বিশুর সমবয়সী কেষ্ট ঘোষাল-বাড়ী গরু চরাইয়া মাসে নগদ এক টাকা উপার্জন করে, অথচ তার ছেলে মায়ের দুঃখ বোঝে না। কিন্তু কিছু বলিবার উপায় নাই! ভগবানের নাম কীর্ত্তন—তাহাতে বাধা দিলে মহাপাপ! কাজেই নিরুপদ্রবে বালক বিশ্বনাথ প্রত্যহ সকালে সন্ধ্যায় বাড়ী বাড়ী হরিনাম কীর্ত্তন করিয়া বেড়াইতে লাগিল।
ইহার পর বিশু যে কাজে হাত দিল, তাহাতে সে যে পূর্ব্বজন্মে ব্রাহ্মণ ছিল এই সত্য নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হইয়া গেল। এমন কি পাঠশালায় পণ্ডিত তারণ চক্রবর্ত্তী পর্য্যন্ত বলিয়া গেলেন, “দেখো বাগ্দী-বৌ, এই জলজীয়ন্ত বামুনের কথা। তোমার ছেলে ম’রে আবার বামুন হবে।
মা কাণে হাত দিয়া কহিল, “ষাট্ ষাট্!" ব্যাপারটা এই। বিশু রথ দেখিতে ভিন্গায়ে গিয়া এক নূতন বিষ্ণুমন্দির নির্মাণের কাজ দেখিয়া আসিয়াছিল। দেখিতে দেখিতে মাথায় তাহার খেয়াল গজাইয়া উঠিল। বাড়ী আসিয়া মাকে কহিল, “আমি হরিমন্দির গড়্ব তুই পয়সা দে।” মন্দির গড়িতে কতটা পরসার দরকার তাহ। হাতে গণিয়া ও কুড়ি হিসাবে বিশুকে বুঝাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া বিরক্ত হইয়া বিশুর মা বিড়াল তাড়াইবার লাঠি দিয়া বিশুর পিঠে দু’ঘা বসাইয়া দিল।
ইহাতেও বিশুর সংঙ্কল্প টলিল না। ভোর না হইতেই সে একটা ঝাঁকা মাথায় করিয়া গ্রামের বাহিরের ভাঙ্গা শিবমন্দির হইতে সুরকী সংগ্রহ আরম্ভ করিল। দেব-স্থানের মাটি পায়ে লাগিবে বলিয়া মা প্রথমে তাহাকে যথেষ্ট ভর্ৎসনা করিল; অবশেষে প্রহার। বিশু চড়-চাপড় বিনা বাক্যবয়ে গ্রহণ করিয়া পুনরায় স্বকার্য্যে মন দিল। এইবার বিশুর মা চক্রবর্ত্তী মহাশয়ের শরণ লইল; তিনি তাহাকে আশ্বস্ত করিয়া বলিয়া দিলেন, “খুব সাবধান বাগ্দী-বৌ, ভগবান ওকে দিয়ে তার কাজ করাচ্ছেন। বাগ্ড়া দিস্নে।” ইহার পর বিশুর মা আর পুত্রের সঙ্কল্পে বাধা দিল না।
(৪)
সুরকী আনিল। কিন্তু বিশুর কল্পনা যতখানি উঁচু ছিল, সুরকীর দেয়াল তত উঁচু হইয়া উঠিল না। মাটি, কাদা, তুয় ও সূরকীর অপূর্ব্ব মিশ্রণে দেয়াল উঠিল দুই হাত। বিশুর মুখখানি ছোট হইয়া গেল। কলসগাঁয়ের মন্দিরের মত হইল না তো! রাত্রে বিশু মাকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, "অমনি একটা মন্দির গ’ড়ে দে না।” মা পুত্রকে ভরসা দিয়া বলিল, “ছোট জাতের ছোট মন্দিরই ভালোরে বিশু। ডাক্লে ঠাকুর এখানে আসবেন।”
পরদিন বিশু প্রাণপণে ঠাকুরকে তাহার ঢোলকের বাজনার সঙ্গে আহ্বান আরম্ভ করিল। ঠাকুর আসিলেন কিনা জানি না কিন্তু পাড়ার মাতব্বর বৃন্দবন ঠাকুর আসিয়া জানাইয়া গেলেন যে, দিন-রাত ঢোলক বাজাইলে তিনি বিশুর কাণ ধরিয়া চৌকীদারের নিকট লইয়া যাইবেন। চৌকীদারের ভয়ে মা বিশুর ঢোলক কাড়িয়া লইল। অগত্যা বিশু কোথা হইতে ছোট একটি আঙ্গুরের বাক্স কুড়াইয়া আনিয়া তাহাতেই তাল দিয়া ঢোলকের কাজ চালাইতে লাগিল আর মনে মনে কেবলই ঠাকুরকে তাহার ছোট মন্দিরটিতে নিমন্ত্রণ করিতে লাগিল।
সেদিন পূর্ণিমা। বৃন্দাঠাকুরের বাড়ীতে রাস-মহোৎসব উপলক্ষে ঠাকুর আসিয়াছেন, সমস্ত দিন বিশু গান গাহিল, “একবার এস এস হে! ” সন্ধ্যাকালে ঘণ্টাখানেক ঠাকুরবাড়ীর পুরোহিতের ভঙ্গীতে বসিয়া ঠাকুরকে তার ছোট মন্দিরে আসিবার জন্য অনেক মিনতি করিয়া বলিয়া দিল এবং রাত্রে যে ঠাকুর আসিবেন তাহাতে আর মনে বিন্দুমাত্র সংশয় রাখিতে পারিল না। কারণ পূর্ণিমার রাত্রেই ঠাকুর আসেন, এ কথাটি তাকে বলিয়াছিল তার মা।
মা বাতাসী তখন নাসিকাধ্বনি সহকারে ঘুমাইতেছিল, বিশু ঠাকুরের আগমনের প্রতীক্ষায় ঘুমাইতে পারে নাই। উৎসব-বাড়ীতে যখন কীর্তনের প্রারম্ভিক মৃদঙ্গধ্বনি উঠিল, তখন বিশু অতি সন্তর্পণে উঠিয়া দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিল। পদশব্দ শুনিয়া পাছে ঠাকুর পলায়ন করেন এই ভয়ে হামাগুড়ি দিয়া তাহার মন্দিরে উঁকি দিয়া দেখিল – মন্দির শূন্য। নিরাশ হইয়া ফিরিয়া গিয়া সে শয্যা লইল এবং সকালে মাকে জানাইল যে, ছোট মন্দিরে ঠাকুর আসিতে পারেন না, কাজেই তাহাকে বড় মন্দির গড়িতেই হইবে। বড় মন্দির গড়িতে হইলে যে পদার্থ-টির সর্ব্বাগ্রে প্রয়োজন তাহাও বিশু শুনিল এবং সেই বস্তুটা সংগ্রহ করিবার জন্য পরদিন বারো বছরের ছেলে বিশু মাসিক তিন টাকা মাহিনায় কলসগাঁয়ের বাবুর বাড়ীর বাগানের কাজে ভর্ত্তি হইয়া গেল। কিন্তু এক ক্রোশ দূরে থাকিয়াও বিশু তাহার মন্দিরের কথা ভুলিল না। প্রতি শনিবার ছিল তাহার ছুটি—সেদিন সে আসিয়া মন্দিরে দীপমালা দিয়া পাচ পয়সার বাতাসার লোভ দেখাইয়া পাড়ার বাগ্দী ছেলেগুলিকে জড় করিত। মধ্যরাত্রি পর্যন্ত বিচিত্র বাদ্যধ্বনি ও নাম-গানের শব্দে পাড়ার লোকের কাহারো চোখে নিদ্রা আসিত না।
(৩)
বছর তিনেক এইভাবে কাটিল। বিশ্বনাথের মনিব বৃদ্ধ বয়সে বৃন্দাবন-বাস করিতে গ্রাম ত্যাগ করিলেন, বিশুও বিদায় লইল। বিশুর সংকল্পের কথা শুনিয়া তাহার মাহিনা চুকাইয়া আরো একটা মোটা রকমের দান তাহার সহিত যোগ করিয়া বাবু তাহাকে আশীর্ব্বাদ করিয়া বিদায় দিলেন। বিশু মন্দির-নির্ম্মাণের পুঁজি লইয়া গ্রামে ফিরিল।
অনতিকাল মধ্যে ইঁট-সুরকীতে বিশুর প্রাঙ্গন ভরিয়া গেল। গ্রামের লোক প্রথমে এতটুকু সন্দেহ করে নাই, কিন্তু যখন বিশুর মা’র মুখে আসল উদ্দেশ্যটি প্রকাশ হইয়া পড়িল, তখন গ্রামের ভদ্রমণ্ডলীর মধ্যে একটু চাঞ্চল্য দেখা গেল। বাগ্দীর ছেলে মন্দির গাড়িতেছে! শাস্ত্র-ধর্ম্ম সব রসাতলে গেল! দুই একজন বিশুর মাকে ডাকিয়া সাবধান করিয়া দিলেন। বাতাসী ব্রহ্মশাপের ভয়ে বিবর্ণ মুখে গৃহে ফিরিয়া বিশুর কাছে কাঁদিয়া পড়িল। বিশু কহিল, “কিছু হবে না। আমি কালই পণ্ডিত মহাশয়ের পাতি নিয়ে আসব। পণ্ডিত মহাশয় কলস গ্রামের চতুষ্পাঠীর অধ্যাপক, সে অঞ্চলে তাঁহার বিধানই প্রামাণ্য ছিল।
কিন্তু বিশুকে আর পাতি আনিতে হইল না, সেই রাত্রেই বাতাসী কলেরার আক্রমণে ও ব্রহ্মশাপের ভয়ে ইহলোক ছাড়িয়। প্রস্থান করিল। ভদ্র-সজ্জনেরা কহিলেন—"শাস্ত্র না মান্লে এমনি হয়! ঘোর কলি এখনও হয়নি তো।"
মা’র মৃত্যুর পর বিশু দিন-দুই খুব কাহিল রহিল। তারপর দ্বিগুণ উৎসাহে তার দলবল লইয়া মন্দিরের কাজে লাগিয়া গেল। বৃন্দাঠাকুর ছিলেন গ্রামের মাতব্বর, তার উপর বিশুর বাড়ী ছিল তাঁরই বাড়ীর পাশে; বিশুর কীর্ত্তন, সঙ্গীদের হরিধ্বনি, মৃদঙ্গ করতালের শব্দ তাঁহারই নিদ্রার ব্যাঘাত জন্মাইত বেশী। ইহার পর বিশুর মন্দির উঠিলে তাঁহার বিগ্রহের প্রণামী কমিয়া যাইবারও ভয় ছিল, কাজেই এই বাগ্দী ছোড়ার উপর তিনি জাতক্রোধ হইয়া উঠিলেন। কিন্তু বিশু তখন বড় হইয়াছে-কাহারও ভ্রূকুটি সে গ্রাহ্য করিল না।
(৪)
মন্দির যখন অর্দ্ধেক দূর উঠিয়াছে, তখন এক ঘটনায় গ্রাম তোলপাড় হইয়া উঠিল। রহিম মিস্ত্রীর স্ত্রীর পূর্ব্ব স্বামীর এক কন্যা ছিল। তার বিবাহ হইয়াছিল দূর গ্রামের এক কৃষকের সঙ্গে। সে প্রায় তিন বৎসর পূর্বেকার কথা। এক মাস স্বামীর ঘর করিবার পর সে তাহাকে ‘তালাক’ দিয়া বাপের বাড়ী পাঠাইয়া দিয়াছিল। রহিম তাহাতে মোটেই দুঃখিত হইল না, তাহার মিস্ত্রির কাজে একজন আপনার লোক জোগানদারের প্রয়োজন ছিল। আমিনা রহিমের সহিত বিশ্বনাথের মন্দিরের কাজ করিত। হঠাৎ কেমন করিয়া এই মেয়েটিকে বিশুর বড় ভাল লাগিয়া গেল। আমিনাও এই মিষ্টভাষী সুঠাম বাগ্দী যুবাকে ভালো না বাসিয়া থাকিতে পারিল না। তার কৈশোরে তখন যৌবনের রং ধরিয়াছে। মনে ক্ষুধাও ছিল বিস্তর। কোন কিছু বিচার না করিয়াই এই নবীন প্রনয়ীযুগল প্রেমের দান-প্রতিদান আরম্ভ করিল। একজন বাগ্দি আর একজন সেখ, এ বোধ উভয়ের কাহারও ছিল না। কিন্তু বাগ্দী-পাড়ার যে দুই-একটি রমণীর এ সকল বিষয়ে পাণ্ডিত্য ছিল, তারা এই ব্যাপারটিকে লক্ষ্য করিল এবং সেখের বেটীর সহিত বিশুর এই অসঙ্গত ঘনিষ্টতায় ধিক্কার দিল।
বাহিরের লোক কিছুই জানিত না, কাজেই কিশোর-কিশোরীর এই প্রেম-লীলা অব্যাহত চলিতে লাগিল।
একদিন অপরাহ্নে বাবুর বাড়ীর চণ্ডীমণ্ডপে বিশুর ডাক পড়িল। বিশু আসিল; গ্রামের বাবুরা চণ্ডীমণ্ডপ দখল করিয়া বসিয়াছিলেন; পাচ সাতটা কলিকায় যুগপৎ তামাক পুড়িতেছিল। গিদ্দা বালিশ হেলান দিয়া বৃন্দাঠাকুর, লালন চক্রবর্ত্তী প্রভৃতি মাতব্বরেরা বসিয়াছিলেন; মণ্ডপের প্রাঙ্গণে যুক্তকরে আমিনার মাতা, তার পশ্চাতে জনকয়েক তারই প্রতিবেশী, আর এক কোণে দাড়াইয়া আমিনা মুখে কাপড় দিয়া কাঁদিতেছিল। এই বৈঠক আর সেই সঙ্গে আমিনার মাকে দেখিয়া বিশুর বুকের মধ্যে ধড়াস্ করিয়া উঠিল! সে আসিয়া দাঁড়াইতেই বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “কেষ্টঠাকুর এসেছেন বেটা ছোট জাতের আস্পর্দ্ধা দ্যাখো না। মন্দির গড়বে না! বেটার পেট-পোরা সয়তানী মতলব!”
“সেখের বেটী, তোর নালিশ?" আমিনার মা দশ মিনিট ধরিয়া নানা কথা কহিয়া গেল। বিশু তার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করিয়াছে, সে বিচার চায়!
বিশুর মাথা ঘুরিতেছিল, আমিনা শেষে তাহার সহিত প্রতারণা করিয়াছে, এই চিন্তা তার সমস্ত মনকে বিষাক্ত করিয়া দিয়াছিল, বিশু কথা কহিল না। আমিনা এতটা মনে করে নাই। মা’র মনে অনেক দিন হইতেই সন্দেহ ছিল। কিন্তু সে কিছু দেখিয়াও দেখে নাই। কাল সন্ধ্যায় যখন কানাঘুষায় কথাটি শুনিয়া বৃন্দাঠাকুর তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন, তখন সে তার সন্দেহের কথা তাঁকে জানাইল। তারপর তাঁহারই পরামর্শ মত আমিনাকে প্রশ্ন করিয়া সকল সংবাদ জানিয়া লইল। আমিন। এতখানি ঘটিবে তাহা ভাবে নাই, অকপটে মা’র কাছে সমস্তই বলিয়াছিল। তারপর আজ দ্বিপ্রহরে যখন স্বয়ং বৃন্দাঠাকুর তাহাদের বাড়ীতে উপস্থিত হইয়া আমিনার মা’র সহিত গোপনে পরামর্শ করিয়া গেলেন, তখন অন্তরাল হইতে শুনিয়া ভয়ে তার সর্ব্বাঙ্গ আড়ষ্ট হইয়া গেল। বাবুর বাড়ীতে আসিতেও সে আপত্তি করিয়াছিল। কিন্তু মা তাকে প্রহার করিয়া লইয়া আসিয়াছে। সে আমিনাকে হাজির করিবার ‘জবান’ দিয়াছে, তা’ ছাড়া বৃন্দাঠাকুরের দেওয়া অগ্রিম দশ টাকার নোট তখনও অঞ্চলে বাঁধা ছিল, নেমকহারামী সে কি করিয়া করিবে?
মা’র অভিযোগ শেষ হইলে বিশু তীব্র অথচ বিষণ্ণ দৃষ্টিতে আমিনার দিকে চাহিল, তখন সে আরও বেশী করিয়া কাদিতে লাগিল। চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বিশুকে জবাবদিহি করিবার আদেশ হইল, বিশু তবুও কথা কহিল না। তখন ছোটলোকের দুষ্কার্য্যের জন্য যে শাস্তির বিধান আছে, বিশুর প্রতি তাহাই প্রযুক্ত হইল। লালন চক্রবর্ত্তীর নির্দ্দেশ মত তাঁহার পাইক ফেকু সর্দ্দার বিশুর কাণ ধরিয়া সমস্ত উঠান ঘুরাইতে লাগিল, বিশু আপত্তি করিল না। কিন্তু আমিনা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া একেবারে ফেকু সর্দ্দারের পা জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিয়া কহিল, “মামুজী, মাপ কর! মাপ!"
চণ্ডীমণ্ডপ শুদ্ধ লোক হাসিয়া উঠিল।
কর্ণমর্দ্দন-পর্ব্ব শেষ হইলে বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “তা যেন হলো! তারপর এ মেয়েকে বিয়ে করবে কে? কি বল চৌধুরী, সেখের বেটী যে ইজ্জৎ হানির নালিশ করেছে, তার কি করবে?” চৌধুরী চুপি চুপি কহিলেন, “দু'-দশ টাকা দিয়ে বিশে বিদেয় ক’রে দিক্!”
বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “আরে বল কি, জাত-মারা কাণ্ড। দু'-দশ টাকা! দু-দশ টাকায় জাত ফিরবে?” তারপর আমিনার মাতাকে কহিলেন, “কি গো সেখের বেটী, দু'-দশ টাকা খেসারত নেবে?"
পূর্ব্ব শিক্ষামত আমিনার মা কাঁদিয়া কহিল, "টাকায় কি ইজ্জৎ ফিরবে বাবু? আমার মেয়ে নিয়ে কে ঘর করবে? বাগ্দীর পো আমার বেটীকে ‘নিকা’ করুক!” এত বড় সংযুক্তিটা এতক্ষণ সমাজপতিদের মাথায় খেলে নাই দেখিয়া তাঁহারা আশ্চর্য হইলেন। বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “আমরা যখন আছি গাঁয়ের মাথা, তখন বিচার করতেই হবে, কি বল চৌধুরী? সেখের বেটী যা বলে।”
আমিনার মাতার পশ্চাৎ হইতে গুটি কয়েক কণ্ঠ সমস্বরে কহিল, হ বাবুজী ঠিক হবে বিচার!” তখন চণ্ডীমণ্ডপ হইতে আদেশ জারি হইল বিশুকে কলেন। পড়িয়া আমিনাকে বিবাহ করিতে হইবে।
কলেমা পড়িবার কথা শুনিয়া বিশু কাঁপিয়া উঠিল। সমস্ত পৃথিবীটা তার চোখের সম্মুখ হইতে মুহূর্ত্তে অপহৃত হইয়া গেল। বিশু সংজ্ঞা হারাইল। কিন্তু বাবুদের পঞ্চায়েতের বিচারের নড়চড় হইবার যো নাই। অচেতন বিশুকে লইয়া যাইবার হুকুম পাইয়া আমিনার মা’র প্রতিবেশীরা “আল্লা হো আক্বর” ধ্বনি তুলিল। চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “যা বেটারা, নিয়ে যা, এখানে আর গোল করিস্ নে।”
বিশুর চেতন হইয়াছিল অনেক পূর্ব্বেই; কিন্তু আপনার অবস্থা সম্পূর্ণ বুঝিবার মত জ্ঞান হইল এক প্রহর রাত্রে। দেখিল যে, আমিনার মাতার কুটীরে সে বসিয়া আছে, তার পাশে বসিয়া আমিনা তাকে পাখার বাতাস করিতেছে। মাথার উপর একটা ভারী পদার্থের অস্তিত্ব সে বোধ করিতেছিল—তুলিয়া দেখিল সেটা একটা টুপী। মুহূর্ত্তের মধ্যে টুপীটা ফেলিয়া দারুণ অন্তর্দ্দাহের আবেগে সে উঠিয়া দাড়াইয়া এবং কোন দিকে না চাহিয়া একেবারে সোজা চলিয়া গেল।
(৫)
“তার পর?”
পরের কথা অতি অল্প। সমস্ত রাত্রি পাড়ার লোক শুনিল, বিশু তারস্বরে সুর করিয়া ডাকিতেছে “জয় রাধে গোবিন্দ”, তার সমস্ত দেহ-মন যেন এই সুরের রূপ ধরিয়া অপ্রত্যক্ষ দেবলোকে কোন্ অভীষ্ট দেবের সন্ধান করিতেছিল! সুরের বিরাম নাই। রাত্রি তিন প্রহর হইয়া গেল—গান থামিল না। ভোরের সময় একটা ভীষণ শব্দ হইল, সেই সঙ্গে গানের সুর থামিল। পাড়ার লোক ছুটিয়া আসিল।
নিজের হাতে শাবল দিয়া খুঁড়িয়া মন্দিরের দেয়াল ফেলিয়া তাহারই নীচে বিশু আপনার সমাধি রচনা করিয়াছে। বাহির হইতে দেখা যাইতেছিল শুধু তার রক্তাক্ত সুদীর্ঘ কেশের গুচ্ছ।
গ্রামের ভদ্রলোকেরা আসিয়া ব্যবস্থা দিলেন, ভাঙ্গা দেয়ালের উপর মাটি চাপা দিয়া বিশুর কবর দেওয়া হোক। ওই মাটীর ঢিবিটা তাই!
মস্জিদে বিশুর নাম হইয়াছিল বছির, তাই ইহার নাম হইয়াছে ‘বছিরের দরগা'।
“আমিনা?”
এই ঘটনার পরদিন বিশুর কবরের উপর শাবল দিয়া আপনার মাথা ভাঙ্গিয়া সেও মরিয়াছে। সে নাকি মৃত্যুর পূর্ব্বে পাগল হইয়া গিয়াছিল।