বিষয়বস্তুতে চলুন

থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/লাটের স্পেশাল

উইকিসংকলন থেকে

লাটের স্পেশাল

 মাঘের দ্বিপ্রহর। আঙ্গিনায় রৌদ্রের দিকে পিঠ করিয়া বেণু সর্দ্দার সম্মুখে একখানি পাথরের থালায় এক রাশ সরুচাক্‌লি লইয়া মাধ্যাহ্নিক জলযোগের উপক্রম করিতেছিল। রঙ্গীন ভিজা গাম্‌ছাখানিতে মাথায় আধ-ঘোমটা টানিয়া স্ত্রী বিরাজ পিঠার কাঠা-হাতে সম্মুখে দাঁড়াইয়াছিল। এমন সময় আহ্বান আসিল, “সর্দ্দারের পো! বাইরে এসতো একবার।”

 দফাদারের কণ্ঠস্বর শুনিয়া বেণু উঠিয়া পড়িতেছিল, বিরাজ তাড়াতাড়ি কহিল, “মুখের ‘গাস্‌’টা খেয়ে যাও গো।”

 “দু’খানা খেয়ে আমার পেট ভর্‌বে নারে, বিরাজ! তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাক্, আমি এক্ষুনি আস্‌ছি!”

 বেণু হাত ধুইয়া উঠিয়া গেল।

 মিনিট দশ পর ফিরিয়া আসিয়া হতাশস্বরে বেণু কহিল, আমার আর তোর হাতের সরুচাক্‌লি খাওয়া অদেষ্টে নেইরে, বিরাজ! দে দিকিন্‌ পাগ্‌ড়ীটা এখুনি আবার বেরোতে হ’বে।”

 “এই ভর দুপুরে আবার কোন্ পোড়ার মুখোর মুখ পুড়েছে যে, তোমায় যেতে হ’বে?” বিরাজ কহিল।

 “চেঁচাস্‌নিরে পাগলী। লাটের গাড়ী আস‍্ছে, পাহারায় যেতে হবে। দে পাগড়ীটা। দাঁড়াওগো দফাদার দা, পাগড়ীটা বেঁধে যাচ্ছি।” দ্বারের দিকে চাহিয়া বেণু কহিল।

 বাহির হইতে জবাব আসিল, “একটু চট্‌পট্‌ সেরে নাও, সর্দ্দারের পো! যেতে হ’বে আবার পাকা ছ’ কোশ।”

 পাগড়ী বাঁধা শেষ হইলে বিরাজ দু’খানা সরুচাক্‌লি হাতে করিয়া স্বামীর সম্মুখে দাঁড়াইয়া মিনতি করিয়া কহিল, “আমার মাথা খাও, এই দু’খানি গালে দিয়ে এক ঘটি জল খেয়ে যাও। সেদিনও গড়েছিনু, খেলে না, কোথায় মড়া অগ্‌লাতে গেলে! আজ—"

 “এখন খেলে আর হাঁটতে পারব নারে বিরাজ। সাঁঝে গাড়ী পার ক’রে দিয়ে পহর রাতেই ফিরে আস্‌ব! তুই উনুনে একটু জল বসিয়ে রাখিস্। পিঠেগুলো ভালো ক’রে ঢেকে রাখগে!”—বলিয়া পিষ্টক-স্তূপের দিকে একটি সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া লাঠি হাতে বেণু চৌকিদার বাহির হইয়া গেল।

 স্বামীর বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত সর্ব্বাপেক্ষা প্রীতিকর এই খাদ্যটি অনেক দিন চেষ্টা করিয়াও সে সম্মুখে বসিয়া খাওয়াইতে পারিল না! পিঠাগুলি গুছাইয়া তুলিয়া বিরাজ গামছায় চোখ মুছিল!

 ঘরের বিঘ্নটিকে তো বেণু কোনমতে কাটাইয়া আসিল কিন্তু পথে আর এক বিঘ্ন উপস্থিত। একটি স্বল্পজল অন্ধকারে ডোবার ধারে বেণুর সাত বছরের পুত্র মনাই বঁড়শী নাচাইয়া ‘চ্যাং’ মাছ ধরিতেছিল। প্রত্যহ দ্বিপ্রহরে এইটি ছিল তাহার নিত্যকর্ম্ম। বেণু তাহার দৃষ্টি এড়াইবার জন্য অতি লঘুপদে আসিতেছিল কিন্তু মনাইকে ফাঁকি দিতে পারিল না। পিতার পরিচিত নীল পাগড়ী সে দূর হইতে দেখিয়াছিল কিন্তু পিতা অন্য পথে চলিয়া যাইবে ভয়ে, ভাবে ভঙ্গীতে কোনোরূপ চাঞ্চল্য প্রকাশ করে নাই। বেণু সতর্ক পদে নিকটে আসিতেই, সে ছিপ ফেলিয়া এক লম্ফে পথের মাঝখানে উঠিয়া আসিল এবং তাহার পোষাকের প্রান্ত মুঠা করিয়া কহিল, “কোথা যাচ্ছ বাবা?” বেণু বিপদে পড়িল! সত্য কথা বলিলে মনাই সঙ্গে যাইবার জিদ্ ধরিবে। একটু ভাবিয়া কহিল, “কালীতলায়।”

 জগতে মনাইয়ের ভীতির একমাত্র স্থান ছিল এই বারোয়ারী কালীতলা। সেখানে যত ভূত আর প্রেতের আড্ডা, কোন সূত্রে এই তত্ত্বটী তাহার শিশু-মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়া বাসা বাঁধিয়াছিল। কালীতলার নাম শুনিয়া সে এক পা পিছাইয়া গিয়া কহিল, “সাঁঝের আগে ফিরবে বাবা, জান‍্লে?”

 পুত্রের সঙ্কাবিহ্বল দৃষ্টি দেখিয়া বেণু কহিল, “সাঁঝের আগেই ফিরব মনাই, তুই ঘরে যা” তাহার পর পুত্রকে একটি চুমা দিবার অভিপ্রায়ে দুই হাত বাড়াইয়া তাহাকে বুকে তুলিতে যাইতেছিল, এমন সময় পিছনে দফাদার কহিয়া উঠিল, “পথে দাঁড়িয়ে আর দেরী কোরো না, সর্দ্দারের পো, বেলা ভাটিয়ে আস‍্ছে।”

 অগত্যা মাথা নীচু করিয়া পুত্রের গালে তাড়াতাড়ি একটা চুমা দিয়া বেণু কহিল, “ঘরে যা মনাই তোর মা পিঠে নিয়ে ব’সে আছে।” পিঠার কথা শুনিয়া সে ছিপগাছি তুলিয়া লইয়া বিনাবাক্যে বাড়ীর পথ ধরিল এবং কিছুদূর গিয়া গলির মোড়ের বেত ঝোপের আড়াল হইতে মুখ বাহির করিয়া পিতাকে অবশ্য অবশ্য সন্ধ্যায় ঘরে ফিরিবার জন্য দ্বিতীয় বার উপদেশ দিয়া গেল।

(২)

 শীতের ছোট শেষ বেলাটি অনেকক্ষণ পূর্ব্বেই শেষ হইয়া গিয়াছে। প্রতি চল্লিশ হাত অন্তর চৌকীদার নামধারী এক-একটা মানব সন্তান লাঠি ঘাড়ে করিয়া লাটের স্পেশালের প্রতীক্ষায় দাঁড়াইয়া খোলামাঠের তীব্র হাওয়ায় শীতে কাঁপিতেছিল। গাড়ী আসিবার সময় ছিল সন্ধ্যায়, কিন্তু রাত্রি প্রহর উত্তীর্ণ হইয়া গেল গাড়ী তখনও আসিল না। বেণু অধীর হইয়া উঠিল। দিব্য চক্ষে সে দেখিতে পাইল, পাথরের থালায় সরুচাক্‌লি সাজাইয়া এতক্ষণে বিরাজ প্রদীপ জ্বালিয়া তাহার প্রতীক্ষা করিতেছে। বেণু জিজ্ঞাসা করিল, “গাড়ীর খবর কি দফাদার দা?”

 দফাদার নিজেও বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিল, কহিল, “মালিক হুজুরদের হুকুম তামিল করতে এসেছি। থানা থেকে ব’লে দিলে সাঁজ বেলায় যাবে গাড়ী, এখন তো রাত এক পহর কাঁথাখানাও আনিনি!” দফাদার মাথার পাগড়ী খুলিয়া গায়ে জড়াইল। শীত তখন ক্রমেই তীব্র হইয়া উঠিতেছিল।

 বস্তুতঃ গাড়ী ছাড়িবার সময় ঘণ্টা পাঁচেক পিছাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, কিন্তু গণ্ডগ্রামের চৌকীদারের কাছে সে সংবাদ পৌঁছে নাই।

 এমন সময় মেঘ করিয়া আসিল। চৌকীদারের দল প্রমাদ গণিল। ইহার পর যদি বৃষ্টি আরম্ভ হয় তাহা হইলে প্রাণ লইয়া গৃহে ফেরা অসম্ভব, এ কথা দফাদারকে স্পষ্ট ভাষায় জানাইতে কেহই দ্বিধা করিল না। দফাদার একটি ছোট পুটলী উঁচু করিয়া ধরিয়া কহিল, “শীতের ওষুধ সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আয় দেখি!” ইঙ্গিতটা সকলেই বুঝিল। পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে “বোম্‌ বোম্‌ ভোলানাথ” শব্দে স্থানটি মুখর হইয়া উঠিল এবং গঞ্জিকার ধূমে অন্ধকার আরও জমাট বাঁধিয়া গেল। দফাদার ডাকিল, “সর্দ্দারের পো, কোথায় গা?”

 বেণু জবাব দিল, “উহু! আমি খাব না দফাদার দা।” এক কালে সে পূরাদস্তর গঞ্জিকাসেবী ছিল কিন্তু বৎসর তিনেক হইল বিরাজ তাহাকে তাহার শাঁখা সিঁদুরের দিব্য দিয়া নেশা ছাড়াইয়াছে; সেই অবধি বেণু গাঁজার কলিকা স্পর্শ করে নাই। শীতের ওষুধ সেবন করিয়া চৌকীদারের দল কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হইল। কেবলমাত্র বেণু দুই হাঁটু মুড়িয়া তাহার উপর মুখ রাখিয়া শীতে ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

হুস্! হুস্!

 “উঠে দাঁড়া সব। লাঠি ঘাড়ে ঠিক্ হ’য়ে সাম‍্নে চেয়ে থাক!”

 দফাদার হাঁকিল।

 হুস্! হুস্! গাড়ী চলিয়া গেল—মাল গাড়ী।

 বিরক্ত হইয়া চৌকীদারেরা অদৃষ্টকে অভিসম্পাত দিল। দফাদার কহিল, “শীতের ওষুধ আর একবার তৈরী করে’ নাও দেখি, শীত ভয়ে ভাগবে।”

 ঔষধ সেবন চলিতে থাকিল, দূর হইতে বেণু, ধূম-কুণ্ডলীর দিকে চাহিয়া রহিল, নড়িল না।

 রাত্রি দশটায় দুই এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়িল। বেণু কোনক্রমে উঠিয়া দাঁড়াইয়া দেখিল যে, সঙ্গীরা চার পাচজন করিয়া কুণ্ডলী পাকাইয়া ভূমি-শয্যায় আশ্রয় লইয়াছে।

 বেণুর মনে হিংসা হইল। সর্ব্বাঙ্গ তখন অসহ্য শীতে আরষ্ট হইয়া আসিতেছিল; পদতলের পাথরের নুড়িগুলি মনে হইতেছিল বরফের টুক্‌রার মত। কিছু দূরে তারের বেড়ায় হেলান দিয়া দফাদার ঘুমাইতেছিল। বেণু কিছুক্ষণ কি ভাবিল তাহার পর দফাদারের গাঁজার সরঞ্জামের পুঁটলীটি বাহির করিয়া আনিল। কলিকায় আগুন দিয়া সে মৃদুস্বরে কহিল, “কিছু মনে করিস্‌নি, বিরাজ! তোর শাঁখা-সিঁদুর অক্ষয় হোক্! আজ এক টান না টান্‌লে আর বাঁচব না। বোম্‌! বোম্‌!”

 অনেক দিনের অনভ্যাস, কলিকায় বার দুই দম দিতেই বের মাথা ঘুরিয়া উঠিল, লাইনের দিকে ঠিক্‌রিয়া পড়িয়া সে চীৎকার করিয়া উঠিল, “মাথায় একটু জল দাও গো দফাদার দা! সারা পিরথিম ঘুরছে!” তাহার আড়ষ্টকণ্ঠ হইতে কথাগুলি বাহির হইল অতি ক্ষীণস্বরে, তাহাতে দফাদারের নিদ্রাভঙ্গ হইল না।

 মধ্য রাত্রি। হিমসিক্ত আচ্ছাদনের নীচে কুণ্ডলী করিয়া তন্দ্রাচ্ছন্ন প্রহরীর দল কাঁপিতেছিল। এমন সময় দূরের কোনো সজাগ প্রাণীর কণ্ঠ শোনা গেল, “লাটের গাড়ী! লাটের গাড়ী!”

 প্রদীপ্ত আলোক-ফলকে নিশীথের অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া রক্তচক্ষু লৌহ-দানব ছুটিয়া আসিল। চৌকীদারের দল কাঁপিতে কাঁপিতে ধড়্‌ফড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কেবল উঠিল না একজন! যেখানে বেণু সর্দ্দার পাহারায় ছিল সেখান হইতে অতি ক্ষীণ একটি আর্ত্তনাদ শোনা গেল—মুহূর্ত্তের জন্য। এঞ্জিন কোনও অজ্ঞাত বস্তুতে বাধা পাইয়া একটু দুলিল কিন্তু তাহার গতি মন্থর হইল না।

 স্পেশাল চলিয়া গেল। পরদিন প্রাতে সংবাদ-পত্রে বিজ্ঞাপিত হইল যে লাটের গাড়ী নিরাপদে সহরে পৌঁছিয়াছে।

   

 বেণু সর্দ্দারের নিষ্প্রাণ দেহপিণ্ড যখন সহরের ‘মর্গ’ হইতে শতদীর্ণ হইয়া ফিরিয়া আসিল তাহার পূর্ব্বেই বিরাজের সরুচাক্‌লি শুখাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছে।