বিষয়বস্তুতে চলুন

থার্ডক্লাশ (১৯৪১)/শাঁখের করাত

উইকিসংকলন থেকে

শাঁখের করাত

 পনের বৎসর পর পশুপতি গ্রামে ফিরিল। এতদিন পাঞ্জাবে খুড়ার কাছে থাকিয়া পড়াশুনা করিয়াছে, গ্রামের খবর বড় জানিত না। সন্ধ্যাকালে গ্রামের প্রধানেরা একত্র হইয়া গ্রামের এই কৃতবিদ্য সন্তানটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়া, সংক্ষেপে গ্রামের সংবাদ তাহাকে জানাইলেন। সংবাদগুলি এই—

 বিশ সনের ঝড়ে নৌকা ডুবিয়া জমিদার মধু মিত্র মহাশয় পরলোক গিয়াছেন। তদীয় পুত্র অনুকূল সম্পত্তি বন্ধক দিয়া বিলাত যাইবার নাম করিয়া বোম্বাইতে এক সাহেবী হোটেলে আছে।

 রায়-বাড়ীতে রায়-গিন্নী আছেন। রায় মহাশয় ওলাউঠায় ও তাঁহার তিন পুত্র মরিয়াছে কালাজ্বরে।

 কুণ্ডু-বাড়ীতে কেহ নাই; দুই সরিকে বৎসর দশেক ধরিয়া কাঁঠাল গাছের স্বত্ব লইয়া মামলা করিয়া সর্ব্বস্বান্ত হইয়া, শেষে এক সরিক বগুড়ায় মামাবাড়ী, অপর সরিক মালদয় মাসীবাড়ীতে গিয়াছে। বাড়ী খালি, তাহাতে বছিরদ্দি চৌকীদারের মুর্গী ও ধনাই দাসের গরু থাকে।

 ছেলের অভাবে গ্রামের মাইনর ইস্কুলটি উঠিয়া গিয়াছে। ছেলেরা এক হাফ্‌ আখড়াইয়ের দল করিয়াছে, কদম বিশ্বাসের বাড়ীর দরদালানে দুপুর বেলায় তাস পিটিয়া, সন্ধ্যাকালে আখড়াই জুড়িয়া দেয়।

 গ্রামের মেয়েরা দুপুরে নদীতে এবং সন্ধ্যায় মল্লিকদের এঁদো পুকুরে স্নান করেন। নদীর ঘাটে যাইবার উপায় নাই। নবিগঞ্জের চামড়ার গুদামওয়ালার মুন্সী সরকার আর একদল লোক রংদার লুঙ্গী ও ধোপদন্ত কামিজের উপর ওয়েষ্ট কোট আঁটিয়া মাঝ নদীতে বিশ্রী সারি গাহিয়া বাচ খেলে, কখনও কখনও ঘাটে বসিয়া নির্ভয়ে বিড়ি ফুঁকিতে থাকে।

 এই কথা শুনিয়া পশুপতি একেবারে জ্বলিয়া উঠিল, কহিল, “আপনারা কি করেন?” নবিন রায় মহাশয় প্রাচীন ব্যক্তি অনেক দেখিয়াছেন। তিনি কহিলেন, “কি করব দাদা? টাকাই সব। টাকার জোরেই সব হয়। গত বৎসর রাধা বোষ্টমী আর এই বোশেখে মাখন মাঝির জলজ্যান্ত বৌকে ঘাট থেকে তুলে নিয়ে গেল, কে কি করল? টাকায় সাক্ষী বোবা হয়, পুলিশ খোঁড়া হয়। আমরা যদি দু’কথা বলতে যাই, তা হ’লে আর হাটে যাওয়ার পথ থাকে না।” দাশু ঘোষ কহিলেন, “মান-ইজ্জৎ সব মধু মিত্তির মশাইয়ের সঙ্গেই গিয়েছে। জেলেপাড়া নবিগঞ্জের দালালের উৎপাতে সাফ্‌। বৌ-ঝি ঘরে রেখে জাল বাইতে যাবে কে? ভাবছি এই পোষ পেরুলে ঘর দু’খানা ভেঙ্গে নিয়ে সদরে গিয়ে ঘর তুলব।”

 পশুপতি পূর্ব্ববৎ তীব্র স্বরে কহিল, “কোথাও যেতে হবে না! আমি দু’দিনে সব ঠিক্ ক’রে দিচ্ছি। নিশ্চিন্ত থাকুন! শুধু ছেলেগুলোকে একবার আমার কাছে ডেকে দেবেন।”

(২)

 একে বড় মানুষ তাহার পর এম এ পাশ। বহুকাল পর দেশে ফিরিয়াছে। ছেলের দল তাহাকে বড় কেহ দেখে নাই, কৌতূহলী হইয়া হা আখড়াইয়ের দলশুদ্ধ রাত্রি এক প্রহরে পশুপতির বাড়ীর আঙ্গিনায় আসিয়া দাঁড়াইল।

 পশুপতি মুগুর ভাঁজিতেছিল। মুগুর রাখিয়া ছেলেদের পরিচয় লইয়া কহিল, “তোমরা বেঁচে থাকতে গাঁয়ে এই সব অত্যাচার হয়! কি কর তোমরা?” দলের নেতা নরেন্দ্র চক্রবর্ত্তীর বয়স বছর বাইশ, কিন্তু এই বয়সেই সংসারের যাবতীয় অভিজ্ঞতা সে লাভ করিয়া অত্যন্ত প্রবীণ হইয়া পড়িয়াছিল। সে কহিল, “করতে পারি সবই। কিন্তু পিছনে দাঁড়ায় কে বলুন? সব কাজেই টাকা চাই। টাকা পেলে দু’দশটা লাঠিয়াল—”

 পশুপতি রুখিয়া উঠিল, “লাঠিয়াল দিয়ে মা-বোনের ইজ্জৎ বাঁচাবে? এ বুদ্ধি পেলে কোত্থেকে!”

 আপনার সাঙ্গোপাঙ্গ পার্যদের সম্মুখে ধমক খাইয়া নরেন্দ্রের নিতান্ত অপমান বোধ হইল। মনের ক্রোধ মনে চাপিয়া মুখে হাসিয়া কহিল, “তা আপনি যখন এসেছেন যা বলবেন করব।”

 পশুপতি কহিল, “যা বলবার বলব কাল। যা করতে হবে তাও বল্‌ব কাল, বেলা দশটায় এসো।”

 “আজ্ঞে আচ্ছা” বলিয়া নরেন্দ্র চক্রবর্ত্তি চলিয়া গেল এবং পথে বিড়ি ধরাইতে ধরাইতে পার্ষদবৃন্দের দিকে চাহিয়া কহিল, “হাতী ঘোড়া গেল তল, ভেড়া বলেন কত জল। কেমন পাঁচকড়ি?”

 পাঁচকড়ি সূত্রধর একটু কাষ্ঠ হাসিয়া কহিল, “তা বৈকি প্রভু।”

 এক প্রহর রাত্রে পশুপতি একাকী গ্রামের পথে বাহির হইল। তখন হাফ্‌ আখড়াইয়ের গান পর্য্যন্ত শেষ হইয়া গিয়াছে। সমস্ত গ্রাম নিঃঝুম। কাহারো বৈঠকখানায় প্রদীপ নাই। মল্লিকদের চণ্ডীমণ্ডপে সারারাত্রি এককালে পাশা চলিত, সে কথা আব্‌ছায়ার মত তাহার মনে ছিল। দেখিল সেখানে গুটিকতক কুকুর জড়াজড়ি করিতেছে, পথে জনপ্রাণীর সাড়া শব্দ পাইল না, শুধু নদীর ধারে বারোয়ারীতলার বাধানো বেলগাছের নীচে নবিগঞ্জের জনকয়েক লোক তাশ পিটিতেছিল, আর একজন বাঁশের বাঁশীতে আড়খেমটায় একটি পিলু বাঁরোয়ায় টপ্পা বাজাইতেছিল।

 ভোরে বাইক চাপিয়। প্রথমে পশুপতি গেল থানায়। দারোগা বাবু অপাঙ্গে এই নবাগত যুবককে দেখিয়া লইলেন, কিন্তু তাহার ভাব-ভঙ্গী দেখিয়া খুসী হইতে পারিলেন না। পশুপতি তাঁহাকে গ্রামের অবস্থা জানাইয়া পুলিশের কথা কহিতেই দারোগাবাবু কহিলেন, “পুলিশের সাধ্য কি মশাই! সব গাঁয়ের অবস্থাই এই রকম, পুলিশ করে কি? আপনারা লাগুন! সাক্ষী জোগাড় করুন, আমরা পিছনে আছি। আপনারা নিজেরা কিছু করবেন না, মামলা করলে সাক্ষী জোটাতে পারবেন না; মামলা ফেঁসে গেলে খবরের কাগজে পুলিশকে গালাগাল করবেন!” পশুপতি এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় কথা না বলিয়াই সদরের পথ ধরিল। সাত ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া মহকুমা হাকিমের কুঠীতে সে যখন উপস্থিত হইল, সাহেব তখন বারান্দায় বসিয়া ‘ব্রেকফাষ্ট করিতেছিলেন। পশুপতি কাউদিয়া গ্রামের অবস্থা সংক্ষেপে কহিয়া গেল। সাহেব সদ্যঃ বিলাত হইতে আসিয়াছেন, এই বলিষ্ঠ যুবকটীকে তাঁহার ভালো লাগিল। ইংরাজীতে কহিলেন, “জানো বাবু, যে মানুষ আপনাকে সাহায্য করে, ভগবান তাকে সাহায্য করেন। তোমার গ্রামের ছেলেদের নিয়ে একটা ‘পেট্রোল’ আর ‘ডিফেন্স পার্টি’ গ’ড়ে ফেল; দেখবে আপনি উৎপাত কমে যাবে, গুড মর্নিং!”

 পশুপতি ফিরিয়া আসিল। তাহার পূর্ব্ব আদেশ অনুযায়ী ছেলের দল আঙ্গিনায় অপেক্ষা করিতেছিল, পশুপতি তাহাদিগকে কহিল, “আমি কুস্তির আখ্‌ড়া খুল্‌ছি, সেখানে লাঠি খেলাও চলবে তা ছাড়া সকল রকম খেলার সরঞ্জাম রাখব। তোমাদের সবাইকে আস্‌তে হবে।” ছেলেরা স্বীকার করিয়া চলিয়া গেল।

 দ্বিপ্রহরে ঘাটে যাইবার পথে নবীন রায় মহাশয়কে ডাকিয়া পশুপতি কহিল, “প্রায় ক’রে তুলেছি দাদামশাই, দু’দিনে ঠিক ক’রে দেব, ভয় পাবেন না।”

(৩)

 বৈকালে পশুপতি সরকার-বাড়ীর দোলমঞ্চের সন্মুখের মাঠের একবুক ঘেঁটুবন সাফ করিতে লাগিল। মাঠ সাফ হইলে পরদিন সেখানে কুস্তির আখড়া বসিল।

 নিজের জলপানির সঞ্চিত টাকা নিঃশেষ করিয়া সহর হইতে মুগুর ডাম্বেল প্রভৃতি ব্যায়ানের সর্ববিধ সরঞ্জাম কিনিয়া আনিল এবং দশ টাকা বেতনে একজন লাঠিয়াল শিক্ষক রাখিতেও ত্রুটি করিল না। প্রথম দুই-একদিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশী হইল না। হাফ্‌আখড়াইয়ের দলের বড় কেহ আসিল না। কিন্তু ক্রমে যখন ছেলেরা দেখিল যে, চাঁদা দিতে হয় না অথচ পেট ভরিয়া ছোলা আর গুড় খাইতে পাওয়া যায়, তখন নরেন্দ্র চক্রবর্ত্তী শুদ্ধ আসিয়া কুস্তি করিতে লাগিয়া গেল। সপ্তাহখানেক পর একদিন পশুপতি লাঠি ঘাড়ে করিয়া তাহার বাছা বাছা কয়েকটি সাগ্‌রেদের সহিত নবীগঞ্জ গিয়া উপস্থিত হইল। সেখানে চামড়ার আড়তদারের সঙ্গে পশুপতির কি কথাবার্ত্তা হইল জানি না, কিন্তু সেদিন হইতে সন্ধ্যায় তাঁহার লোকজনের বাচখেলা বন্ধ হইয়া গেল, নদীর ঘাটে বসিয়া বিড়ি ফুঁকিতেও কাহাকে দেখা গেল না।

 ক্রমে ক্রমে সন্ধ্যায় নদীর ঘাট গ্রাম-বধূদের কলহাস্য ও কঙ্কণ-বানৎকারে পুনরায় মুখর হইয়া উঠিতে লাগিল এবং জ্যোৎস্না নিশীথে পল্লী-পথ নিঃশঙ্ক পদসঞ্চারে শব্দিত করিয়া গৃহিণীরা পূর্ব্বের মতই পুনরায় রায়-গৃহিণীর নৈশ নারী-সভায় যোগদান করিতে থাকিলেন।

 সেদিন পশুপতি কি কাজে ঘাটের পথে চলিতেছিল; রায়-গৃহিণী কয়েকটি তরুণী বধূর পুরোবর্ত্তিনী হইয়া সান্ধ্য-স্নান সারিয়া ফিরিতেছিলেন। পশুপতিকে দেখিয়া কহিলেন, “বেঁচে থাক লক্ষ্মী দাদা আমার! তোমার দৌলতে নেয়ে বাঁচছি।” তরুণীরা কেহ কথা কহিলেন না, কিন্তু অবগুণ্ঠনের অন্তরাল হইতে অনেকগুলি চক্ষু যুগপৎ তাহার প্রতি স্নিগ্ধ প্রসন্ন কৃতজ্ঞ দৃষ্টিপাত করিল, পশুপতি তাহা দেখিল এবং রায়-গৃহিণীর আশীর্ব্বাদের উত্তরে মাথা নীচু করিয়া নীরবে ঘাটের পথে চলিয়া গেল।

 পশুপতির উৎসাহে ক্রমে ক্রমে দূর গ্রাম হইতে ছেলেরাও আসিয়া তাহার দলে যোগ দিতে আরম্ভ করিল। খুড়া মহাশয় পাঞ্জাব হইতে লিখিলেন, “বেশ করিতেছ, যদি স্থায়ী করিতে পার, তবে একটা কাজের মত কাজ হইবে।” পিতৃব্যের অনুজ্ঞাক্রমে সে বৎসরের ফসল বিক্রয় করিয়া লব্ধ অর্থ তাহার আখ্‌ড়ার সর্ব্বাঙ্গীন উন্নতি-কল্পে ব্যয় করিল এবং মোটা মাহিনা দিয়া কলিকাতা হইতে কুস্তি শিখাইবার জন্য ভোজপুরী পালোয়ান লইয়া আসিল।

 আখ্‌ড়ার শিক্ষার্থীর সংখ্যা যখন একশত ছাড়াইয়া গিয়াছে তখন একদিন সহসা পশুপতি দেখিল যে, ভিনগ্রামের জন-ত্রিশেক ছাত্র অনুপস্থিত। কারণ অনুসন্ধানের জন্য লোক পাঠাইল, তাহারা অনুপস্থিতির কারণ কিছু জানাইল না, তবে বলিয়া দিল তাহারা আর আসিতে পারিবে না। পরদিন নরেন্দ্র চক্রবর্ত্তী ও তাহার দলের জনকয়েক লোককে দেখা গেল না। তাহাদের সকলেরই অসুখ৷

 অকস্মাৎ এতগুলি লোকের একসঙ্গে অসুস্থ হইবার কারণ কিছু পশুপতি আবিষ্কার করিয়া উঠিতে পারিল না, তবে বুঝিল যে ভিতরে কিছু রহস্য আছে। তৃতীয় দিন প্রভাতে থানা হইতে একজন হাওলদার আসিয়া পশুপতির উর্দ্ধতন চতুর্দ্দশ পুরুষের সংবাদ লিখিয়া লইয়া গেল এবং বৈকালে নবীন রায় মহাশয় পাংশু-মলিন মুখে আসিয়া পশুপতির নিকট শঙ্কিত মৃদুস্বরে যাহা বলিলেন, তাহাতেই সমস্ত রহস্যের উদ্ভেদ হইল।

 কয়েকদিন হইতে জন-দুই আগন্তুক গ্রামে ঘোরা-ফেরা করিতেছে। দফাদার আসিয়া সকলকে গোপনে জানাইয়া গিয়াছে যে, কুস্তীর আখ্‌ড়ায় যাহারা খেলা করে, তাহাদের উপর কড়া নজর রাখিবার জন্য দারোগার উপর হুকুম আসিয়াছে। সংবাদ দিয়া নবীন রায় কহিলেন, “তুমি ভাল কর্ত্তেই এসেছিলে দাদা, কিন্তু আমাদের পোড়া কপালে সৈল না, তা’ আর কি করে বল?”

 পশুপতি কোনো কথা কহিল না।

(৪)

 পরদিন আখ্‌ড়া একেবারে শূন্য হইয়া গেল। পশুপতি তাহার বাছা বাছা সাগ্‌রেদের বাড়ীতে নিজেই গিয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের অধিকাংশই শারীরিক অস্বাস্থ্যের দোহাই দিয়া বাড়ী হইতে বাহির হইল না। দুই-চারিজন স্পষ্টই জানাইল যে, দারোগাবাবু আখ্‌ড়ায় যাইতেই তাহাদিগকে নিষেধ করিয়া দিয়াছেন।

 পরদিন প্রভাতে পশুপতি সদরে গিয়া উপস্থিত হইল। পুরাতন ম্যাজিষ্ট্রেট বদলী হইয়া গিয়াছেন, নূতন যিনি আসিয়াছেন তিনি পাকা সিভিলিয়ান্‌, তাঁহার গোঁফ ও চুলেও পাক ধরিয়াছে। পশুপতির নাম শুনিয়াই তিনি পরিষ্কার বাঙ্গলায় কহিলেন, “এসব চালাকী ছেড়ে দাও বাবু। কুস্তির আখ্‌ড়ার নামে ছেলে জড় করে Loyalty undermine করছ তুমি, আমি শুনেছি।”

 পশুপতি তীব্র স্বরে কহিল, “মিথ্যা কথা! গুণ্ডার হাত থেকে গ্রামের লোকজনকে বিশেষ মেয়েদের বাঁচাবার জন্যই আমি ছেলেদের শিক্ষা দিচ্ছিলাম, তাহার সঙ্গে পলিটিক্সের কোন সম্বন্ধ নেই।”

 ম্যাজিষ্ট্রেট্‌ টেবিলের কাগজের দিস্তায় নাম সই করিতে করিতে বলিলেন, "গ্রামের লোকজনকে দেখ্‌বার জন্য গভর্ণমেণ্ট আছে পুলিশ আছে, তার জন্য তোমার কষ্ট করবার দরকার নাই। অবশ্য তুমি যদি কিছু কর্ত্তে চাও, সে তোমার ইচ্ছা, তবে জানবে গভর্ণমেণ্ট বোকা নন। গুড মর্নিং।”

 পশুপতি ফিরিয়া আসিয়া সেই দিনই তাহার দলবলকে ডাকিয়া পাঠাইল, দুই-একজন ছাড়া কেহ আসিল না। যাহারা আসিল, তাহারাও আখড়ায় যোগ দিতে কোনমতেই রাজী হইল না।

 পরদিন সন্ধ্যাকালে কাহারও নিকট হইতে বিদায় না লইয়া ভোজপুরী পালোয়ানের সঙ্গে পশুপতি পান্সীতে গিয়া উঠিল এবং মুখ ফিরাইয়া মুহূর্ত্তকালের জন্য সন্ধ্যার তিমিরচ্ছায়ায় অদৃশ্য নির্জ্জন নদীর ঘাটের দিকে চাহিয়া একবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল।

 ঘাট নির্জ্জন, কিন্তু শুনিল দূরে কদম বিশ্বাসের বাড়ীর আঙ্গিনায় হাফ-আখড়াইয়ের গান আরম্ভ হইয়াছে—

“রমণী পরন রতনো
সুখের শিকলে বাঁধি করহে যতনো।"

 আর তাহার সহিত তাল রাখিয়া ওপাড়ে নবিগঞ্জের হাটে মহরমের লাঠি খেলার একুশখানি কাড়া বাজিতেছে এবং কাছেই রঙ্গিণী খেমটাওয়ালীর বাড়ীর বারান্দায় দারোগাবাবুর জড়িত কণ্ঠস্বরে নিধুবাবুর টপ্পা ও তাঁহার সঙ্গীদের অট্টহাস্য ধ্বনিত হইয়া উঠিতেছে।

সমাপ্ত