দিল্লী চলো/পূর্ব্ব-এশিয়ার অবস্থা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

পূর্ব্ব-এশিয়ার অবস্থা

 ইউরোপের অবস্থা সম্বন্ধে বলেছি। এখন ভারত প্রসঙ্গে পূর্ব্ব-এশিয়ার অবস্থা সম্বন্ধে বলব। আগেকার মতো আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলব—বই পড়া বিদ্যে দিয়ে নয়।

 বিগত বিশ্বযুদ্ধে সাধারণ অবস্থা কি রকম ছিল আর এযুদ্ধেই বা কি রকম আছে, সে সম্বন্ধে তুলনামূলক সমালোচনা দিয়ে আমি এখনকার বিষয় বস্তুর আলোচনা শুরু করব। বিগত বিশ্বযুদ্ধে জাপান মিত্রপক্ষে ছিল, এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শত্রুরা ছিল শুধু ইউরোপে এবং নিকট-প্রাচ্যে অর্থাৎ পশ্চিম-এশিয়ায়। গতযুদ্ধের সময় যে সব ভারতীয় বিপ্লবী ভারতের বাইরে কাজ করছিলেন এবং যাঁরা ভারতীয় স্বাধীনতা-আন্দোলনের জন্যে ভারতে সাহায্য আনার চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের কাছে সরবরাহপথের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় সমাধানের অতীত। সাগর-পথে “কোমাগাটা মারু” এবং অন্যান্য জাহাজে করে ভারতে সাহায্য আনার চেষ্টা খুব সহজেই ব্যর্থ হয়েছিল—আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের পথ ছিল বৃটিশদের দ্বারা বিশেষভাবে সুরক্ষিত। বর্ত্তমান যুদ্ধ ভারতের পূর্ব্ব-দ্বার খুলে দিয়েছে; এখন সীমান্ত অতিক্রম করে দেশে প্রবেশ করা আমাদের পক্ষে অত্যন্ত সহজ।

 গত যুদ্ধে বৃটিশরা তাদের সমস্ত যুদ্ধ-প্রচেষ্টা নিয়োজিত করতে পেরেছিল ইউরোপ ও নিকট-প্রাচ্যে—কারণ এশিয়ার বাকি অংশ ছিল মিত্রপক্ষের প্রভাব কিংবা নিয়ন্ত্রণাধীন। এযুদ্ধে ১৯৪১-এর ডিসেম্বর থেকে আমাদের মিত্রপক্ষীয়দের শুধু ইউরোপ এবং নিকট-প্রাচ্যেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে না—পূর্ব্ব-এশিয়ায়ও যুদ্ধ করতে হচ্ছে। এইভাবে তাদের শক্তি এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে পড়ায় এবং জাপানী সেনাবাহিনী নৌবাহিনীর হাতে ইঙ্গ-মার্কিণের ভয়ঙ্কর পরাজয়ের পর ভারতের মুক্তি আন্দোলনের যথেষ্ট সুবিধা হয়েছে। ১৯৩৯-এর সেপ্টেম্বর থেকে ইউরোপের যুদ্ধ এবং ১৯৪১-এর ডিসেম্বর থেকে পূর্ব্ব-এশিয়ার যুদ্ধ ভারতের জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছে, বৃটিশ সিংহের ভয়ে এককালে তারা ভীত ছিল বটে, কিন্তু বৃটিশ-সিংহের পা মাটির তৈরী। ভারতীয় জনগণের কাছে এই ভাবে বৃটিশ-সম্মান ভেঙে পড়ার কারণ পূর্ব্ব-এশিয়ায় জাপানের শক্তি এবং ইউরোপে জার্ম্মানীর শক্তি ভয়ঙ্কর। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং সম্মানের অপূরণীয় হানি হওয়ায়—বৃটিশ-সাম্রাজ্যের আয়ু আজ শেষ হয়ে এসেছে।

 বর্ত্তমানে বিরাট বিশ্বযুদ্ধ চলছে,—বৃটিশরা ভবিষ্যতে তাদের বিশ্বনেতৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে কিনা সেই প্রশ্ন মীমাংসার জন্যে এ যুদ্ধ নয়। সে সমস্যার সমাধান ইতিপূর্ব্বেই হয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন এমন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ইতিবৃত্তবিদের কাছে বৃটিশ-সাম্রাজ্য আজ দরজার পেরেকের মতই মৃত। সমাধানের একটিমাত্র প্রশ্নই আছে; সেটা হচ্ছে এই যে, ভবিষ্যতে বিশ্বকর্ত্তৃত্ব মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাবে, না—এমন কোন নতুন বিশ্ববিধান দেখা দেবে যার ফলে পৃথিবীর সমস্ত জাতির স্বাধীন অস্তিত্বের অধিকার স্বীকৃত হবে। কখন আমার সেই সব স্বদেশবাসীর কথা মনে হয়, যাঁরা এখনও এমন যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখছেন যেখানে বৃটিশ-সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বজায় থাকবে এবং যে ব্যবস্থায় ভারতীয়রা ক্রীতদাসের মতই থেকে যাবে; তখন এঁদের জন্যে করুণা অনুভব করি—দাসত্বের ফলে এঁদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে গভীর অধঃপতন ঘটেছে। দাসত্বের অন্ধকার এমনভাবে তাঁদের অন্ধ করেছে যে তাঁরা উদীয়মান স্বাধীনতার সূর্য্য আদৌ দেখতে পাচ্ছেন না।

 দাসত্বের বিষে দুষ্ট শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান এমন ভারতীয়ও আছেন, যাঁরা ভুলে যান— ব্যক্তিদের মতো সাম্রাজ্যেরও বয়স হয়, জরা আসে এবং মৃত্যু হয়। বার্দ্ধক্য এবং তজ্জনিত জরার আক্রমণ সুরু হলে, পুনরুজ্জীবন অসম্ভব। কৃত্রিম গ্রন্থি সংযোগ করে কিংবা যাদু-যষ্টির ব্যবহারে বৃদ্ধ কখনও যুবক হতে পারে না। মার্কিণ-যষ্টির সাহায্যে বৃদ্ধ উইনষ্টন চার্চ্চিল তাঁর অতি-বৃদ্ধ সাম্রাজ্য নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু হংকং থেকে চিন্দুইন নদী পর্য্যন্ত যে সাম্রাজ্য কয়েক মাসের মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে, দৈবশক্তির দ্বারাও আর তার পুনর্জীবন সম্ভব নয়। এই অঞ্চল সম্বন্ধে এখন মাত্র দুটি সমস্যার সমাধানের প্রয়োজন। প্রথমতঃ পূর্ব্ব-এশিয়ায় শোচনীয় পরাজয়ের ফলে ইঙ্গ-মার্কিণরা যা হারিয়েছে মার্কিণের শক্তি ও সমরায়োজন তা পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি? দ্বিতীয়তঃ ভবিষ্যতে ভারতের ভাগ্যে কি ঘটবে? আমরিকার সাহায্যে বৃটেন তার ভারত-সাম্রাজ্য রক্ষা করতে পারবে কি?

 প্রথম প্রশ্ন সম্বন্ধে আমি স্বীকারই করছি, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রধান মন্ত্রী চার্চ্চিলের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সিদ্ধান্ত করেছেন, যে ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তিদ্বয় প্রথমে ইউরোপের রণাঙ্গনে সকল শক্তি সন্নিবদ্ধ করবে; যতদিন বিশ্বের দরবারে এ ঘোষণা করা হয় নি, ততদিন আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। তাঁরা যদি বিপরীত পন্থা অবলম্বন করে “প্রশান্ত মহাসাগর প্রথম” নীতি অবলম্বন করতেন, তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে আশঙ্কিত হতাম। ইঙ্গ-মার্কিণ সৈন্যরা যদি ইটালী ও ফ্রান্সে অবতরণ না করত, এবং তারা যদি তাদের সমস্ত শক্তি প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়োেগ করত, তা হলে জাপানের সঙ্কট দেখা দিত। সুকৌশলী প্রচারকার্য্যের সাহায্যে প্রেসিডেন্ট রুজভেন্ট জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে উৎসাহের সঞ্চার করতে পারতেন; এ যুদ্ধকে তিনি সমগ্র মার্কিণ জাতির পক্ষে পবিত্র যুদ্ধ কিংবা ধর্ম যুদ্ধ বলেও দাঁড় করাতে পারতেন। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে তার সর্ব্বাপেক্ষা বড় শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। তা ছাড়া বর্ণ-বৈষম্যের দরুণ আমেরিকানরা জাপানী ও অন্যান্য এশিয়াবাসীদের ঘৃণা করে। কাজেই জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রে সহজেই জনপ্রিয় করে তোলা যেত। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট অভাবিতপূর্ব্ব উপায়ে মার্কিণ মনোবল বাড়াতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। এবং তিনি যে তা করেন নি—এর থেকেই বোঝা যায় যে ভাগ্যদেবী জাপান, এশিয়া ও ভারতের কল্যাণ-সাধন করে চলেছেন।

 ইঙ্গ-মার্কিণ পরাজিত হবে—এটা ভাগ্যের নির্দ্দেশ। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তাই ভুল করে “ইউরোপ প্রথম” নীতি গ্রহণ করেছেন। ইউরোপের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে আদৌ জনপ্রিয় নয়, এবং তার পিছনে যে সব কারণ আছে, তা নিয়ে এখানে আমাদের আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। কাজেই ইউরোপের যুদ্ধ সম্বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রে এমন উৎসাহের সঞ্চার করা সম্ভব নয়, যার ফলে আমেরিকার জনগণ যুদ্ধের জন্যে তাদের সব কিছু বিপন্ন করবার অনুপ্রেরণা পাবে। বর্ত্তমান যুদ্ধের মতো বিরাট যুদ্ধ-জয়ের জন্যে “করব-না-হয়-মরব” মনোবৃত্তি অত্যাবশ্যক। জাপানের তা আছে এবং তাই হবে তার চূড়ান্ত বিজয়ের প্রধান কারণ।

 ইঙ্গ-মার্কিণরা সর্ব্বদাই বলছে, তারা প্রথম ইউরোপের যুদ্ধ শেষ করবে; তারপর সমস্ত শক্তি নিয়ে পূর্ব্ব-এশিয়া এবং জাপানের দিকে ফিরবে। জাপানের বিরুদ্ধে চুংকিং-এর যুদ্ধের সপ্তম বার্ষিকী উপলক্ষে কয়েক মাস পূর্ব্বে প্রধান মন্ত্রী চার্চ্চিল মার্শাল চিয়াংকাইশেকের উদ্দেশে প্রেরিত বাণীতে এই কথারই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। কিন্তু ইউরোপের যুদ্ধ কি ভাবে শেষ হবে এবং কে তা শেষ করবে—সেটা দেখবার এখনও বাকী আছে। আমার দিক থেকে আমি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি, “ইউরোপ প্রথম” নীতির ফলে ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি এত ক্ষীণ হয়ে পড়বে যে তারা আর পূর্ব্ব-এশিয়ায় জাপানকে কখনও পরাজিত করতে পারবে না। ইতিহাস পুনরায় এই কথা প্রমাণ করবে, কোন বড় যুদ্ধে দুই রণাঙ্গণে যুদ্ধ করা আত্মহত্যারই সামিল।

 বৃটিশ প্রচারকদের মতে ইঙ্গ-মার্কিণ বিজয়ের ভিত্তি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত বিরাট যুদ্ধ-পণ্য উৎপাদনের আয়োজন। কিন্তু আমরা যখন মার্কিণ যুদ্ধ-পণ্যোৎপাদন বিশ্লেষণ করি, তখন দেখতে পাই যে তার একটা সীমা আছে। মার্কিণ পণ্যোৎপাদন শেষ সীমায় পৌঁছেচে; ভবিষ্যতে বৃদ্ধির পরিবর্ত্তে তা হ্রাস হতে সুরু করবে। জাপান সম্বন্ধে বলতে গেলে—সে যা আয়োজন করেছে এবং ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে তাতে ভবিষ্যতে জাপানের পণ্যোৎপাদন বাড়বে—এ প্রত্যাশা নির্ভয়ে করা যায়। কেউ যদি একথা অবিশ্বাস করেন, তবে তিনি ভবিষ্যতে কি ঘটে না ঘটে তা দেখবার জন্যে অপেক্ষা করে থাকুন।

 এখন বাকি রইল মার্কিণ মনোবলের প্রশ্ন। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, আজ মার্কিণ মনোবল বৃটিশ মনোবলের চেয়ে অনেক উঁচুতে। কিন্তু সে উচ্চতা কতদিন থাকবে? যদি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট “প্রশান্ত মহাসাগর প্রথম” নীতি অবলম্বন করতেন এবং তার দ্বারা বর্ত্তমান যুদ্ধকে জনপ্রিয় জাতীয় যুদ্ধে পরিণত করতেন, তবে বহুদিন পর্য্যন্ত— এমন কি সাময়িক পরাজয় ও বিপর্য্যয় সত্ত্বেও—সে মনোবলকে উঁচুতে তুলে রাখা যেত। ইউরোপীয় যুদ্ধ সম্বন্ধে মার্কিণ উৎসাহকে চুড়ান্তরূপে সঞ্জীবিত করা সম্ভব নয়—এ প্রশ্ন ছেড়ে দিলেও আর একটি অবিসংবাদিত প্রশ্ন থেকে যায় যে, জাপান এবং জার্ম্মানি যেমন নিজেদের অস্তিত্বের জন্যে লড়াই করছে, বৃটেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র তা করছে না। তারা যুদ্ধ করছে বিশ্ব-কর্ত্তৃত্বের জন্যে—বৃটেন চায় ভবিষ্যতে কর্ত্তৃত্ব রক্ষা করতে, আর আমেরিকা চায় ভবিষ্যতে কর্ত্তৃত্ব অর্জ্জন করতে। কাজেই বেশী দিন মনোবল অক্ষুন্ন রাখা আমেরিকানদের পক্ষে অসম্ভব হবে। কেবল উৎপাদন জাতির মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে না। যদি সমর-সজ্জার প্রাচুর্য্যই বিজয়ের কারণ হত, তবে এ যুদ্ধে জার্ম্মানির হাতে ফ্রান্সের পরাজয় হত না। সুতরাং ভবিষ্যতে আমরা দেখতে পাব, ইউরোপীয় রণাঙ্গনে আমেরিকার ক্ষতি যত বাড়তে থাকবে, আমেরিকার শক্তি ও মনোবল তত ক্ষুণ্ণ হবে। তারপরে যদি ইঙ্গ-মার্কিণরা তাদের সমস্ত শক্তি-সামর্থ্য পূর্ব্ব-এশিয়ায় নিয়োগ করার চেষ্টা করে, তবে তারা জাপানের পক্ষে বিশেষ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। ইঙ্গ-মার্কিণরা ইউরোপের যুদ্ধ জয় করতে পারুক বা নাই পারুক, তার সঙ্গে আমার এ উক্তির সম্পর্ক নেই। আর ইঙ্গ-মার্কিণের পক্ষে ইউরোপের যুদ্ধ-জয়ের সম্ভাবনা কতটা আছে বা না আছে, সে প্রশ্নের উত্তর আমি পূর্ব্বেই দিয়েছি।

 পূর্ব্ব-এশিয়ার যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী এবং কঠোর হবে—জাপানের চেয়ে অন্য কেউ সে কথা বেশী করে জানে না। বৃটেন ও মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র-ধারণের পূর্ব্বে জাপান সর্ব্বপ্রকার সম্ভাবনা গণনা করে রেখেছে, এবং প্রয়োজনীয় আয়োজনও সমাপ্ত করা হয়েছে। যুদ্ধারম্ভের পর থেকে জাপান পূর্ব্ব-এশিয়ায় তার অবস্থান দৃঢ়তর করেছে এবং নিজের যুদ্ধ-পণ্যোৎপাদনও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। জাপানী জাতি ও জাপানী সেনাবাহিনীর মনোবলও বহু গুণ বেড়ে গেছে। কাজেই ভবিষ্যতে আমি মার্কিণ-যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জাপানকে পরাজিত করার কোনই সম্ভাবনা দেখি না। সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকানরা কিছু সাফল্য লাভ করেছে; জাপানের অধিকৃত কিংবা নিয়ন্ত্রনাধীন কয়েকটি দ্বীপও তারা অধিকার করতে পেরেছে। কিন্তু এ দ্বীপগুলি রক্ষা-ব্যূহের বহির্বৃত্তে পড়ে। অন্তর্বৃত্ত—যার নাম দিতে পারি লৌহ-চক্র—এখনও জাপানীদের হাতে আছে এবং থাকবেও। এই লৌহ-চক্রে আমেরিকানরা কখনও প্রবেশ করতে পারবে না। আমেরিকানরা বহির্বৃত্তে কামড় দিতে থাকবে, আর জাপান অন্তর্বৃত্তের উপর তার কর্ত্তৃত্ব বজায় রেখেই চলবে। মার্কিণ মনোবল ভাঙতে সুরু না করা পর্য্যন্ত এমনি ধারাই চলতে থাকবে। এ যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়— স্নায়ুরও বটে। পৃথিবীতে এবিষয়ে কারও বোধ হয় মতদ্বৈধ থাকতে পারে না যে, জাপানের মনোবল যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশী; আগামী দিনের দুঃখ-কষ্ট জাপানী স্নায়ু যতটা ভালভাবে সইতে পারবে, আমেরিকান স্নায়ু ততটা কখনও পারবে না।

 আমার সমালোচকরা হয়তো এইখানে চুংকিং-চীনের প্রশ্ন তুলে জানতে চাইবেন, পূর্ব্ব-এশিয়ায় মিত্রশক্তির বিজয় কল্পে চুংকিং কি সাহায্য করতে পারে? চুংকিং-এর বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে নিপ্পন বাহিনীকে যে বাধা দিচ্ছে তার সামরিক মূল্য কেউ অস্বীকার করবে না, এবং নিপ্পনের জনগণ ও সেনাবাহিনী এত বাস্তববাদী যে তারাও এ সত্যকে অবহেলা করে না। কিন্তু চীনে জাপানের নতুন নীতি এবং চীনের জাতীয় গবর্নমেন্টের সঙ্গে জাপানের সর্ব্বশেষ চুক্তি সম্পাদনের ফলে চুংকিংএর নৈতিক ভিত্তি অনেকটা ধ্বসে গেছে। এই চুক্তির ফলে বিরোধের অবসান হলে জাপান চীন থেকে তার সৈন্য সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির দ্বারা চীনের জনগণ কার্য্যতঃ তাদের সবগুলো দাবীই পূরণ করে নিতে পেরেছে। চুংকিং তবে এখন কিসের জন্যে যুদ্ধ করছে? পূর্ব্ব-এশিয়ায় প্রত্যেকের মনেই আজ এই প্রশ্ন। চীনে জাপানের নতুন নীতির ফল হয়েছে এই যে চীনের জনগণের মধ্যে অনেকেই আজ ভাবতে সুরু করছে, যে জাপানের সঙ্গে যখন সম্মানজনক শাস্তিস্থাপন সম্ভব, তখন বিরোধের অবসান হওয়াই উচিত, এবং জাতীয় পুনঃ-সংস্থাপন ও পুনর্গঠনের কাজ আরম্ভ হওয়া উচিত। চীনের জাতীয় গবর্নমেন্ট জাতীয় পুনর্গঠনের কাজে যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই সমগ্র চীনে শান্তির আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়ছে। কাজেই চুংকিং আজ নৈতিক হিসাবে দুর্ব্বল অবস্থায় পড়েছে। কিছুকাল যাবত চুংকিং-এ যে আভ্যন্তরীণ অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলে এ দুর্ব্বলতা বেড়েই গেছে।

 চুংকিং-এর আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে আমি অক্ষশক্তির অন্তর্ভুক্ত কিংবা নিপ্পনের কোন পরিদর্শক বা মন্তব্যকারীর উল্লেখ করব না—আমি উদ্ধৃত করছি একজন আমেরিকান লেখকের মন্তব্য থেকে। কয়েকদিন আগে ‘চিকাগো ডেইলী নিউজের’ সংবাদদাতা আর্চিবল্ড ষ্ঠীল তারযোগে জানিয়েছিলেন: “সাত বৎসরের যুদ্ধের স্তূপীকৃত বোঝার নীচে ক্লান্ত চুংকিং যুদ্ধের অষ্টম বর্ষে পদার্পণ করতে গিয়ে বুঝেছে, এই বৎসরই হবে তার অস্তিত্বের পক্ষে আশঙ্কাজনক। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে চুংকিং খুব বিপদে পড়েছে। গত বৎসর চুংকিং-এর পক্ষে দুঃসময় গেছে—বোধ হয় এ যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দুঃসময়। মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছিল। অবরোধ এবং অন্যান্য কারণে চুংকিং-বাহিনী ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্রমশঃ দুর্ব্বল হয়ে পড়ছে।” প্রতিরোধের অবশিষ্ট শক্তি দক্ষিণ-পূর্ব্ব চীনে নিপ্পনের আক্রমণাত্মক অভিযানের ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—একথার উল্লেখ করে সংবাদদাতা বলেছেন: “জনগণের মনোবৃত্তিতেও যুদ্ধ-ক্লান্তি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।” এর সঙ্গে তিনি যোগ করেছেন, চুংকিং “ক্লান্ত, বড় ক্লান্ত।”

 চুংকিং-এর সঙ্কটজনক পরিস্থিতির কথা জেনে বিবেচনা করে আমেরিকানরা সর্ব্বপ্রকার কৌশল প্রয়োগ করে চুংকিং-এর মনোবল ধরে রাখার প্রয়াস পাচ্ছে। তারা অবশ্য চুংকিং-এর মার্কিণ-সমর্থক মহলের দ্বারা চুংকিং-চীনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তারা এ আশাও দেখাচ্ছে, শীঘ্রই বর্ম্মা-রোড উন্মুক্ত হবে এবং সেই পথে ভারতের মারফত চুংকিং-এ প্রচুর পরিমাণ সাহায্য পাঠানো হবে। এই আশ্বাস অনুযায়ী ইঙ্গ-মার্কিণরা উত্তর থেকে দক্ষিণে ব্রহ্মের উপর বিরাট অভিযান আরম্ভ করেছিল। এই অভিযানকে বিজ্ঞপিত করা হয়েছিল ব্রহ্ম-পুনরুদ্ধারের অভিযান বলে। সে অভিযানের আয়ু এখন শেষ হয়ে গেছে; চুংকিং-এর উপর তার প্রতিক্রিয়া বর্ণনা না করে কল্পনাতেই বেশী অনুভব হয়। ইঙ্গ-মার্কিণের আর একটি অপকৌশল, জাপান পরাজিত হলে চীন এশিয়ার প্রবলতম রাষ্ট্রে পরিণত হবে—এ সম্ভাবনাও চুংকিং-এর সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। আসল ব্যাপার কিন্তু এই জাপানের যদি পরাজয়ই হয়, তবে চীন নিশ্চিত আমেরিকার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে যাবে। যাই হোক, চুংকিং-এর অবস্থা যদি ভাল থাকত, তবে আমেরিকার কৌশলে কাজ হত। কিন্তু চুংকিং-এর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হওয়ায় এবং চ্যাংসা ও অন্যত্র চুংকিং-বাহিনীর পরাজয়ের ফলে চুংকিং-এর মনোবল ভীষণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আমেরিকার প্রচার তাই ফলপ্রসূ হতে পারছে না।

 সংক্ষেপে বলতে গেলে-চুংকিং-এর অবস্থা বর্ত্তমানে এত শোচনীয় এবং ইঙ্গ-মার্কিণদের সাহায্য তার নিজেরই এখন এত দরকার যে, পূর্ব্ব-এশিয়ায় জাপানের বিরুদ্ধে মিত্রপক্ষের যুদ্ধে সে প্রায় কিছুই সাহায্য করতে পারবে না।

  পূর্ব্ব-এশিয়ার এই আলোচনা থেকে আমি নির্ব্বিঘ্নে সিদ্ধান্ত করতে পারি, ইঙ্গ-মার্কিনের পক্ষে জাপানকে পরাজিত করা অসম্ভব। শেষ পর্য্যন্ত জাপানই বিজয়ী হবে। ইউরোপীয় রণাঙ্গনে শেষ পর্য্যন্ত কি ঘটবে না ঘটবে তার উপর ভরসা না রেখেই আমি একথা বলছি।

 এখন আমি ভারতের প্রসঙ্গে আসব। এই জটিল ঘটনাবর্ত্তের মধ্যে ভারত কি পেতে পারে—সে সম্বন্ধে আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব দেব।

 বৃটেনের অতীত ইতিহাস থেকে দেখা যায়, ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়েই শুধু শত্রুর আক্রমণ সম্ভব—এই ধারণার উপর নির্ভর করে বৃটেন চিরকাল ভারতে তদনুরূপ সমর-কৌশল ও সামরিক আয়োজনের ব্যবস্থা করে এসেছে। ভারতের পূর্ব্বদ্বার এখন সহসা উন্মুক্ত হওয়ায় আমি এর মধ্যে বিধাতার অঙ্গুলি-নির্দ্দেশ দেখতে পাচ্ছি—বিশেষ করে যখন ভারতের এই পূর্ব্ব-সীমান্ত-পারে ত্রিশ লক্ষ দেশপ্রেমিক ভারতবাস বাস করে।

 এই ত্রিশ লক্ষ ভারতবাসীকে রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে সঙ্ঘবদ্ধ করা হয়েছে। তাদের নিজেদের যে গবর্নমেন্ট আছে, সেই গবর্নমেন্ট পৃথিবীর নয়টি শক্তির দ্বারা লৌকিকভাবে স্বীকৃত। পূর্ব্ব-এশিয়ার প্রত্যেকটি ভারতবাসী একতাবদ্ধ। বৃটিশরা ভারতে সর্ব্বদা যে ধর্ম্মগত ও অন্যান্য বিভেদ উস্কিয়ে দেবার চেষ্টা করে, এদের মধ্যে সে বিভেদ নেই। ভারতের মুক্তি সাধন কল্পে সাফল্যের সঙ্গে সংগ্রাম চালানোর জন্যে এরা সামগ্রিক সমরপ্রস্তুতির কার্য্যক্রম পরিপূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই সামগ্রিক সমর-প্রস্তুতি ধন, জন এবং দ্রব্যাদি সম্পর্কিত। তাদের নিজেদের আধুনিক একটি সেনাবাহিনী আছে— যে বাহিনী গত মার্চ্চ মাস থেকে ভারতের মাটির উপর যুদ্ধরত।

 একমাত্র প্রশ্ন এই, আজাদ-হিন্দ-ফৌজ জাপানের সশস্ত্র বাহিনীর সাহায্যে এবং স্বদেশস্থিত স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের সহায়তায় ভারতে বৃটিশ-শক্তির উচ্ছেদ করতে পারবে কিনা।

 আমার উত্তর—“হাঁ, পারবে।”

 আমি নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তববাদীর মতোই কথা বলছি। আমি ভারতে বৃটিশদের শক্তি জানি। দেশে ভারতীয় জনগণের যে শক্তি আছে, তাও আমি জানি। ইন্দোব্রহ্ম-সীমান্তে এবং ভারতের অভ্যন্তরে মণিপুর ও আসাম অঞ্চলে ইঙ্গ-মার্কিণ সৈন্যদের শক্তি আমি দেখেছি। গত ফেব্রুয়ারী থেকে এই অভিযানে যেসব যুদ্ধবন্দী আমাদের পক্ষে এসেছে তাদের আমি দেখেছি এবং তাদের সঙ্গে কথাও বলেছি। আমাদের যে সব সহকর্ম্মী এবং চর বর্ত্তমানে ভারতের অভ্যন্তরে কাজ করছেন, তাঁদের কাছ থেকেও বিবরণ পেয়েছি। এই সব থেকে আমি নিঃসন্দেহে বুঝতে পেরেছি, আমরা বিদেশের অধীনতাপাশ থেকে ভারতকে মুক্ত করতে পারব।

 কিন্তু সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী এবং কঠোর হবে। ভারতের মাটিতে সাম্রাজ্যরক্ষার শেষ চেষ্টায় বৃটিশরা প্রাণপণে যুদ্ধ করবে। এ যুদ্ধে এপর্য্যন্ত তারা সেরূপ যুদ্ধ করেনি। কিন্তু আমরা যেরূপ সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করব বৃটিশের বেতনভোগী সেনাদল সেরূপ যুদ্ধ করতে পারবে না—বা করবে না। তা ছাড়া আমাদের মনে মনে এই প্রেরণা আছে, আমরা ন্যায়ের জন্যে সত্যের জন্যে এবং আমাদের জন্ম-স্বত্ব স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করছি। আমরা যখন স্বাধীনতার পূর্ণ-মূল্য দিতে প্রস্তুত এবং আমাদের যখন সমরোপযোগী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাবাহিনী আছে, তখন পৃথিবীর কোন শক্তিই আমাদের বিজয়ের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। এবার ভারতবর্ষ মুক্ত হবেই। এই আমাদের অনমনীয় দৃঢ়সংস্কল্প। ঈশ্বরের ইচ্ছাও তাই।

 বেতার-বক্ত‌ৃতা: ৯ই জুলাই, ১৯৪৪।