দিল্লী চলো/মহাত্মা গান্ধীকে

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

মহাত্মা গান্ধীকে

মহাত্মাজী,

 এখন আপনার স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আপনি কিছু পরিমাণে সাধারণের কাজে মনোনিবেশ করতে পারছেন। তাই আমি আপনাকে ভারতের বহির্ব্বর্ত্তী স্বদেশপ্রেমিক ভারতীয়দের কার্য্যকলাপ এবং পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা বলার অনুমতি চাইছি। কথা কয়টি বলার পূর্ব্বে, ভগ্ন স্বাস্থ্যের দরুন আপনার আকস্মিক কারামুক্তির পর সারা পৃথিবীর ভারতীয়দের মনে যে গভীর উদ্বেগের সঞ্চার হয়েছিল—সেই সংবাদ আপনাকে জানাতে চাই। বৃটিশ কারাগারে শ্রীমতী কস্তুর বাঈজীর শোচনীয় দেহাবসানের পর, আপনার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে স্বদেশবাসীর উদ্বিগ্ন হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। যাই হোক, ঈশ্বর দয়া করে আপনাকে সুস্থ করে তুলেছেন যাতে আমার দেশের আটত্রিশ কোটি আশি লক্ষ লোক আপনার উপদেশ ও নির্দ্দেশের সুযোগ লাভ করতে পারে।

 আপনার সম্বন্ধে ভারতের বহির্ব্বর্ত্তী ভারতবাসীদের মনোভাব কি, সে সম্বন্ধে আমি এরপর কিছু বলতে চাই। এই প্রসঙ্গে আমি যা বলব তা একেবারে খাঁটি সত্য। দেশের মতো ভারতের বাইরেও এমন অনেক ভারতবাসী আছেন যাঁরা বিশ্বাস করেন যে, কেবল সংগ্রামের ঐতিহাসিক পদ্ধতি অনুসারেই ভারতের স্বাধীনতা লাভ সম্ভব। এই সব নরনারী বাস্তবিক অনুভব করেন, বৃটিশ গবর্নমেন্ট কখনও অনুনয় কিংবা নৈতিক চাপ কিংবা অহিংস প্রতিরোধের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। তা সত্ত্বেও, দেশের মত বিদেশী ভারতীয়দের মধ্যেও পথের বিভিন্নতা আছে। ১৯২৯-এর ডিসেম্বর মাসে আপনার উদ্যোগে লাহাের কংগ্রেসে স্বাধীনতা-প্রস্তাব ওঠার পর থেকে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সমস্ত সদস্যের সম্মুখে সাধারণ লক্ষ্য একটি। বিদেশপ্রবাসী ভারতীয়দের কাছে আপনি হচ্ছেন আমাদের দেশের বর্ত্তমান গণ-চেতনার স্রষ্টা। পৃথিবীর সামনে তাঁদের প্রচার-কার্য্যে তারা আপনাকে আপনার প্রাপ্য সকল মর্য্যাদাই দেন। বিশ্বের জনসাধারণের কাছে আমরা ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা এক—আমাদের জীবনের লক্ষ্য এক, আকাঙ্ক্ষা এক এবং কর্ম্মোদ্যোগও এক। ১৯৪১-এ ভারত ত্যাগের পর বৃটিশ প্রভাবমুক্ত যে সব দেশে আমি ঘুরেছি, সে সব দেশে আপনাকে সবাই এত শ্রদ্ধা করে যে, গত এক শত বৎসরের মধ্যে আর কোন ভারতীয় রাজনৈতিক নেতা সেরূপ শ্রদ্ধা পান নি। প্রত্যেক জাতিরই নিজের নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আছে, এবং রাজনৈতিক সমস্যাকে বিচার করার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী আছে। কিন্তু এর ফলে যে মানুষটি এত ভালভাবে তাঁর জাতির সেবা করেছেন এবং সাহসিকতার সঙ্গে সারাজীবন একটি প্রথম শ্রেণীর আধুনিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তাঁর গুণ-বিচারে কিছুমাত্র তারতম্য হয় না। কার্য্যতঃ যে সব দেশ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বন্ধু বলে ভাণ করে, সে সব দেশের চেয়ে যে সব দেশ বৃটিশ সাম্রাজ্য-বিরােধী, সেই সব দেশেই আপনার মূল্য এবং কৃতিত্বের মূল্য দেওয়া হয় বেশী। ভারত বহির্ব্বর্ত্তী স্বদেশপ্রেমিক ভারতীয়রা এবং ভারতের স্বাধীনতার বিদেশী বন্ধুরা আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পােষণ করেন; আর সেই শ্রদ্ধা শত গুণে বেড়ে গিয়েছিল যখন ১৯৪২-এর আগষ্ট মাসে আপনি বীরের মতাে “ভারত ছাড়াে” প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন।

 আমি যখন ভারতে ছিলাম তখনকার অভিজ্ঞতা থেকে—ভারতের বাইরে এসে ব্রিটেনের নীতি সম্বন্ধে আমি যে গােপন সংবাদ সংগ্রহ করেছি তার থেকে—এবং সমগ্র পৃথিবীতে ব্রিটেনের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়ের যে চিত্র আমি দেখেছি তার থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে, বৃটিশ গবর্নমেন্ট কখনও ভারতীয়দের স্বাধীনতার দাবী স্বীকার করে নেবে না। এই যুদ্ধ-জয়ের প্রচেষ্টায় আজ ভারতকে পুরােপুরি শােষণ করাই বৃটেনের একমাত্র চেষ্টা। এই যুদ্ধে বৃটেন তার সাম্রাজ্যের একাংশ হারিয়েছে শত্রুদের কাছে, অপরাংশ হারিয়েছে মিত্রদের কাছে। এ যুদ্ধে কোনপ্রকারে মিত্রশক্তি যদি জয়লাভ করেও, তবে ভবিষ্যতে বৃটেন নয়—আমেরিকাই হবে বেশী শক্তিশালী রাষ্ট্র। তার অর্থ, বৃটেন মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষিত রাজ্যে পরিণত হবে। এই পরিস্থিতিতে বৃটেন পূর্ব্বের চেয়েও বেশী নিদারুণ ভাবে ভারত শােষণ করে তার ক্ষতি পরিপূরণ করার চেষ্টা করবে। এই উদ্দেশ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে চিরদিনের মতাে ধ্বংস করার পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়ে গেছে। আমি গােপন অথচ নির্ভরযােগ্য সূত্র থেকে এই সব পরিকল্পনার কথা জেনেছি বলেই এসম্বন্ধে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করা আমি কর্ত্তব্য বলে মনে করি। আমাদের পক্ষে বৃটিশ গবর্নমেণ্ট এবং বৃটিশ জনগণকে ভিন্ন করে দেখা মারাত্মক ভুল হবে। এবিষয়ে সন্দেহ নেই যে, মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৃটেনেও ক্ষুদ্র একদল আদর্শবাদী আছেন—যাঁরা ভারতকে স্বাধীন দেখতে চান। এই সব আদর্শবাদীকে তাঁদের দেশের লােকেরা মনে করে পাগল; এদের সংখ্যাও নগণ্য। ভারতের ব্যাপারে বাস্তব দিক থেকে বৃটিশ গবর্নমেন্ট এবং বৃটিশ জনসাধারণ সমার্থবােধক। মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধোদ্দেশ্য সম্বন্ধে আমি বলতে পারি, ওয়াশিংটনের শাসকগােষ্ঠী এখন বিশ্ব-প্রভুত্বের স্বপ্ন দেখছেন। এই শাসকগােষ্ঠী এবং তাঁদের বুদ্ধিবাদী টীকাকাররা খােলাখুলি “মার্কিণ শতাব্দী”র কথা বলেন। অর্থাৎ বর্ত্তমান শতাব্দীতে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বে প্রভুত্ব করবে। এই শাসকগোষ্ঠীতে আবার এমন চরমপন্থীও আছেন যাঁরা বৃটেনকে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯তম ষ্টেট বলে থাকেন।

 আপনি সারাজীবন যে পথের বার্ত্তা প্রচার করে আসছেন, সেই পথে—বিনা নররক্তপাতে যদি ভারতের স্বাধীনতা লাভ সম্ভব হত, তবে স্বদেশে কিংবা বিদেশে এমন কোন ভারতবাসী নেই যে সুখী হত না। কিন্তু বাস্তব অবস্থাকে স্বীকার করে নিয়ে আমরা যদি স্বাধীনতা চাই, তবে আমাদের রক্তস্নানের জন্যে প্রস্তুত হতে হবে—এই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

 ভারতে থেকে যদি নিজে চেষ্টায় এবং উপাদানে সশস্ত্র সংগ্রামের ব্যবস্থা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হত, তবে সেটাই হত সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ পন্থা। কিন্তু মহাত্মাজী, ভারতের অবস্থা আপনি আর সকলের চেয়ে ভাল করেই জানেন। আমার কথা বলতে গেলে, ভারতে বিশ বৎসরের জন-সেবার অভিজ্ঞতার পর আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, বাইরের সাহায্য—বিদেশস্থ ভারতীয়দের সাহায্য এবং কোন একটি বা একাধিক বিদেশী শক্তির সাহায্য ছাড়া ভারতে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠন অসম্ভব। বর্ত্তমান যুদ্ধ আরম্ভ হবার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত কোন বিদেশী শক্তির সাহায্য—এমনকি বিদেশস্থ ভারতীয়দের সাহায্য পাওয়াও অত্যন্ত দুষ্কর ছিল। কিন্তু বর্ত্তমান যুদ্ধারম্ভ বৃটিশ সাম্রাজ্যের শত্রুদের কাছ থেকে রাজনৈতিক এবং সামরিক এই উভয়বিধ সাহায্য পাবার সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল। তাদের কাছ থেকে সাহায্য প্রত্যাশা করার পূর্ব্বে আমাকে প্রথম জানার চেষ্টা করতে হয়েছিল, ভারতের স্বাধীনতা-দাবীর প্রতি তাদের যথার্থ মনোভাব কি। কয়েক বৎসর ধরে বৃটিশ প্রচারকরা বিশ্ববাসীদের জানাচ্ছিল অক্ষশক্তিগুলি স্বাধীনতার শত্রু এবং কাজে কাজেই ভারতের স্বাধীনতারও শত্রু। সে কথা কি সত্য? আমি নিজেই নিজেকে এ প্রশ্ন করেছিলাম। কাজেই এই সত্যানুসন্ধানের জন্যে এবং আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধে অক্ষশক্তিপুঞ্জ আমাদের সাহায্য ও সহযােগিতা দিতে প্রস্তুত কিনা—জানার উদ্দেশ্যে আমাকে ভারত ছেড়ে আসতে হয়েছিল।

 কিন্তু গৃহ এবং দেশত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ব্বে, বিদেশ থেকে সাহায্য নেওয়া আমার পক্ষে উচিত হবে কিনা—এ প্রশ্নের মীমাংসা আমাকে করতে হয়েছিল। কি কি উপায়ে অন্যান্য জাতি স্বাধীনতা লাভ করেছে, সেই সব জানার জন্যে আমি ইতিপূর্ব্বে সারা পৃথিবীর বিপ্লবের ইতিহাস পড়েছিলাম। আমি এমন একটি দৃষ্টান্তও পাই নি যেখানে কোন না কোন প্রকারের বিদেশী সাহায্য ছাড়া দাস জাতির স্বাধীনতা লাভ সম্ভব হয়েছে। ১৯৪০ অব্দে আমি আবার গভীর ঐকান্তিকতার সঙ্গে ইতিহাস পাঠ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম, কোন না কোন প্রকারের বিদেশী সাহায্য ছাড়া স্বাধীনতা লাভের উদাহরণ ইতিহাসে নেই। সাহায্য নেওয়া সঙ্গত কিনা—এই নৈতিক প্রশ্ন সম্পর্কে নিজের মনকে বুঝিয়েছিলাম, ব্যক্তিগত জীবনের মতাে রাষ্ট্রীয় জীবনেও ঋণ হিসাবে সাহায্য নেওয়া চলে এবং পরে সে ঋণ শােধ দেওয়া চলে। তাছাড়া বৃটিশ সাম্রাজ্যের মত শক্তিশালী সাম্রাজ্য যদি ভিক্ষার পাত্র হাতে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে পারে, তবে আমাদের মতাে কৃতদাস এবং নিরস্ত্র জাতির পক্ষে বিদেশ থেকে ঋণ হিসাবে সাহায্য নেওয়ায় কি আপত্তি থাকতে পারে? মহাত্মাজী, আমি আপনাকে নিশ্চিতরূপে বলতে পারি, এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়ানাের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ব্বে আমি দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ এবং মাসের পর মাস এর অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করেছি। এতদিন পর্য্যন্ত যথাশক্তি আমার দেশবাসীর সেবা করে পরিণামে বিশ্বাস-ঘাতক হবার কিংবা আমাকে বিশ্বাস-ঘাতক বলে অভিহিত করার কোন সুযােগ কাউকে দেবার ইচ্ছা আমার কখনও হতে পারে না।

 দেশে বসে পূর্ব্বের মতাে কাজ করে যাওয়া ছিল আমার পক্ষে সহজতম উপায়। যুদ্ধকালের জন্য কোন ভারতীয় কারাগারে বন্দী হয়ে থাকাও আমার পক্ষে সহজ ছিল। তার ফলে ব্যক্তিগতভাবে আমার ক্ষতি হত না। দেশবাসীর উদারতা এবং স্নেহকে ধন্যবাদ—ভারতীয় কোন জন-সেবকের পক্ষে শ্রেষ্ঠ সম্মান, তাঁরা তাই আমাকে দিয়েছিলেন। একটি রাজনৈনিক দলও আমি গড়েছিলাম; সেই দলে আমার যাঁরা একনিষ্ঠ এবং অনুগত সহকর্ম্মী, তাঁদের গভীর বিশ্বাস ছিল আমার উপরে। বিপজ্জনক সন্ধানে বিদেশে গিয়ে যে আমি শুধু আমার প্রাণ এবং সমগ্র ভবিষ্যৎ জীবনকে বিপদগ্রস্ত করছিলাম তাই নয়, আমার রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করছিলাম। বিদেশে না গিয়েও আমরা স্বাধীনতা পেতে পারি—এরকম ক্ষীণতম আশা যদি মনে পেতাম, সঙ্কট-মুহূর্ত্তে আমি কখনও ভারত ছেড়ে আসতাম না। আমার জীবিতকালে স্বাধীনতা-লাভের জন্য বর্ত্তমান যুদ্ধের মতো আর একটি সুযোগ—আর একটি সুবর্ণসুযোগ পাব, এরূপ কোন আশা যদি আমার মনে থাকত, আমি গৃহত্যাগ করে আসতাম না। দুটি বিষয়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল; প্রথমতঃ আগামী এক শতাব্দীর মধ্যে আর এরূপ সুবর্ণসুযোগ আসবে না, দ্বিতীয়তঃ, বিদেশ থেকে চেষ্টা না করলে শুধু দেশে বসে নিজেদের চেষ্টায় আমরা স্বাধীনতা অর্জ্জন করতে পারব না। সেই জন্যেই আমি বিপদে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে ইতস্তত করিনি।

 ঈশ্বর আমার প্রতি সদয়। নানা রকম অসুবিধা সত্ত্বেও এ পর্য্যন্ত আমার সব পরিকল্পনা সার্থক হয়েছে। ভারত থেকে বেরিয়ে আসার পর বিদেশে যেখানেই দেশবাসীদের সাক্ষাৎ পেয়েছি, সেখানেই তাদের সঙ্ঘবদ্ধ করা আমার কাজ হল। আমি সানন্দে জানাছি সর্ব্বত্রই আমি তাদের পূর্ণ-সচেতন দেখেছি—ভারতের স্বাধীনতার জন্যে তারা সম্ভবপর সব কিছু করতে প্রস্তুত। মিত্র পক্ষীয়দের সঙ্গে সংগ্রামরত গবর্নমেন্টগুলির ভারত সম্বন্ধে মনোভাব কি জানার জন্যে আমি তাদের সংস্পর্শে এলাম। দেখলাম, গত কয়েক বৎসর যাবৎ বৃটিশ প্রচারকরা যা আমাদের বলছিল, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা—অক্ষ-শক্তিপুঞ্জ এখন খোলাখুলি ভাবেই ভারতের স্বাধীনতার বন্ধু। আমি আরও আবিষ্কার করলাম, আমাদের ইচ্ছানুযায়ী এবং তাদের সামর্থ্যানুযায়ী তারা আমাদের সর্ব্বপ্রকার সাহায্য করতে প্রস্তুত।

 আমি জানি, আমাদের বিপক্ষদল আমার বিরুদ্ধে কি প্রচার-কার্য্য চালাচ্ছে। কিন্তু আমি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত যে আমার দেশবাসীরা আমাকে ভালভাবে জানেন; তাঁরা বিপক্ষীয়দের ফাঁদে পা দেবেন না। যে লোক জাতীয় আত্মমর্য্যাদা এবং গৌরবের জন্যে সারা জীবন সংগ্রাম করেছে ও দুঃখ-ভোগ করেছে, সে কখনও কোন বিদেশী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। তা ছাড়া ব্যক্তিগত দিক থেকেও বিদেশী শক্তির দ্বারা আমার লাভবান হবার কোন সম্ভাবনা নেই। ভারতবাসীর পক্ষে যা পাওয়া সম্ভব, দেশবাসীদের কাছ থেকে সেই শ্রেষ্ঠ সম্মান পেয়ে, বিদেশী শক্তির কাছ থেকে আমার পাওয়ার আর কি থাকতে পারে? সেই ধরণের লোকই শুধু পুতুল হয়ে থাকতে পারে যার কোন গৌরব-বোধ কিংবা আত্মসম্মান-বোধ নেই—যে অন্যের প্রভাবে নিজের জন্য পদ-মর্য্যাদা গড়ে তুলতে চায়।

 আমার সব চেয়ে বড় শত্রুও আমার বিরুদ্ধে একথা বলার সাহস রাখে না যে, আমি জাতীয় গৌরব এবং আত্মসম্মান বিক্রয় করতে পারি। আমার সব চেয়ে বড় শত্রুও বলতে সাহস পাবে না যে, আমার দেশে আমি নগণ্য ব্যক্তি ছিলাম এবং আমার নিজের পদমর্য্যাদা সৃষ্টির জন্যে বিদেশী সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল। ভারতবর্ষ ছেড়ে আমার নিজের জীবন এবং আমার যা কিছু—সবই বিপন্ন করতে হয়েছিল। আমাকে যে এই বিপদের সম্মুখীন হতে হল, তার কারণ, কেবলমাত্র এই ভাবেই আমার দ্বারা ভারতের মুক্তি-সাধনে সাহায্য করা সম্ভব ছিল।

 অক্ষশক্তি সম্বন্ধে এখন শুধু আমার একটি প্রশ্নের জবাব দেওয়া বাকী আছে। আমি তাদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছি—এটা কি সম্ভব? আমার বিশ্বাস একথা সকলেই স্বীকার করবে, বৃটিশদের মধ্যেই সব চেয়ে বুদ্ধিমান ও সুকৌশলী রাজনীতিবিদ পাওয়া যায়। যে লোক সারা জীবন বৃটিশ রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তার পক্ষে পৃথিবীর অন্য কোন রাজনীতিকের দ্বারা প্রতারিত হওয়া সম্ভব নয়। বৃটিশ রাজনীতিবিদরাই যদি আমাকে তোয়াজ করে কিংবা বলপ্রয়োগ করে বাধ্য করতে না পেরে থাকেন, অন্য কোন রাজনীতিবিদই তা পারবেন না। বৃটিশ গবনমেন্টের হাতে আমি দীর্ঘ কারাভোগ অত্যাচার এবং শারীরিক নির্য্যাতন সহ্য করেছি; তারাই যদি আমার নৈতিক অধঃপতন না ঘটাতে পেরে থাকে তবে অন্য কোন শক্তিই তা পারতে পারে না। তাছাড়া, আপনি ব্যক্তিগত ভাবে জানেন যে, আমি আন্তর্জ্জাতিক ঘটনাবলী গভীর ভাবে পর্য্যবেক্ষণ করতাম। এ যুদ্ধারম্ভের পূর্ব্বে আমি আন্তর্জ্জাতিক রাষ্ট্রনেতাদের ব্যক্তিগত সংস্পর্শে এসেছিলাম। কাজেই রাজনীতির খেলায় আমি এমন শিশু নই যে, কোন চতুর সুকৌশলী রাজনীতিবিদ আমাকে প্রতারিত করে যাবে। সর্ব্বশেষ হলেও এটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয় যে অক্ষ-শক্তিপুঞ্জের মনোভাব সম্বন্ধে ধারণা সৃষ্টির পূর্ব্বে আমি অক্ষশক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির এমন সব বড় বড় নেতা ও ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত সংস্পর্শ স্থাপন করেছিলাম, যাঁরা তাঁদের জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাবলীর নিয়ামক। কাজেই আমি সাহসের সঙ্গে এ কথা বলতে পারি, দেশবাসীরা আমার আন্তর্জ্জাতিক ঘটনাবলীর বিচারের উপর পূর্ণতম আস্থা স্থাপন করতে পারেন। বিদেশস্থ ভারতীয়েরা এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে পারবেন যে, আমি দেশত্যাগের পর এমন কোন কাজ করি নি যার ফলে কোন প্রকারে আমার দেশের গৌরব আত্মসম্মান কিংবা স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে। আমি যা কিছু করেছি, তা আমার জাতীর মঙ্গলের জন্যে, বিশ্বের সামনে ভারতের মর্য্যাদা বৃদ্ধির জন্যে এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে এগিয়ে দেবার জন্যে করেছি।

 মহাত্মাজী, পূর্ব্ব-এশিয়ায় যুদ্ধারম্ভের গোড়া থেকে বিরুদ্ধ দল জাপানের বিরুদ্ধে প্রবল এবং বিধ্বংসী প্রচারকার্য্য চালাচ্ছে। কাজেই আমি জাপান সম্বন্ধে কিছু বলব—বিশেষ করে এই কারণে যে বর্ত্তমানে আমি জাপানী গবর্নমেন্ট সেনাবাহিনী এবং জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কাজ করছি। এমন এক সময় ছিল, যখন জাপানের সঙ্গে ব্রিটিশদের মিত্রতা ছিল। যতদিন পর্য্যন্ত ইঙ্গ-জাপ মৈত্রী বজায় ছিল, ততদিন আমি জাপানে আসিনি। যতদিন পর্য্যন্ত দুটি দেশের মধ্যে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্বন্ধ বিদ্যমান ছিল, ততদিন আমি জাপানে আসিনি। জাপান তার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করার পরে— বৃটেন এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পরে— আমি স্বেচ্ছায় জাপান পরিদর্শন করতে মনস্থ করেছিলাম। আমার দেশের অন্যান্য অনেক লোকের মতোই কয়েক বৎসর ধরে আমি জাপবিরোধী প্রচারকার্য্য করেছিলাম। আমার দেশের অন্যান্য অনেক লোকের মতোই আমিও বুঝতে পারতাম না, ১৯৩৭ অব্দে জাপান হঠাৎ চীন আক্রমণ করে বসল কেন? এবং আমার দেশের অন্যান্য লোকের মতো ১৯৩৭ ও ১৯৩৮ অব্দে আমার সহানুভূতি ছিল চুংকিং-এর প্রতি। আপনার হয়তো স্মরণ আছে, কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ১৯৩৮-এর ডিসেম্বর মাসে আমিই চুংকিং-এ চিকিৎসক-বিমান পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু জাপান পরিদর্শনের পরে আমি যা বুঝতে পেরেছি এবং আমাদের দেশের অনেকেই এখনও যা বুঝতে পারছেন না, সেটা হচ্ছে এই যে পূর্ব্ব-এশিয়ায় যুদ্ধারম্ভের পর থেকে সাধারণ ভাবে পৃথিবী সম্বন্ধে এবং বিশেষ করে এশিয়ার জাতিপুঞ্জ সম্বন্ধে জাপানের মনোভাবে পরিপূর্ণ বিপ্লবাত্নক পরিবর্ত্তন এসেছে। শুধু যে জাপানী গবর্নমেন্টেরই এ পরিবর্ত্তন হয়েছে তা নয়, জাপানী জনগণেরও হয়েছে। জাপানী জনগণের মনে এসেছে নতুন চেতনা। বর্ত্তমানে ফিলিপাইন ব্রহ্ম এবং ভারত সম্বন্ধে জাপানের যে মনোভাব, তার মূলে আছে এই পরিবর্ত্তন। চীনেও জাপানের নতুন নীতির মূলে এই একই জিনিষ। জাপান পরিদর্শনের পরে এবং বর্ত্তমান জাপানের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ স্থাপনের পরে আমার এই বিশ্বাস হয়েছে যে, এশিয়া সম্বন্ধে জাপানের বর্ত্তমান নীতি ধাপ্পাবাজি নয়—এর মূলে আছে আন্তরিকতা। সমগ্র জাতির মনে নতুন চেতনা সঞ্চারিত হবার উদাহরণ ইতিহাসে এই প্রথম নয়। ইতিপূর্ব্বে ফরাসী বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে এবং বলশেভিক বিপ্লবের সময় রাশিয়ায় আমরা এর সাক্ষাৎ পেয়েছি। ১৯৪৩-এর নবেম্বর মাসে দ্বিতীয়বার জাপান পরিদর্শনের পর আমি ফিলিপাইন পরিদর্শন করেছিলাম, ফিলিপিনো নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম এবং নিজের চোখে সব কিছু দেখেছিলাম। আমি ব্রহ্মে কিছুকাল ধরে আছি এবং স্বাধীনতা-ঘোষণার পর সে দেশের অবস্থা দেখার স্বচক্ষে সুযোগ পেয়েছি। জাপানের নতুন নীতি প্রকৃত, না নিছক ধাপ্পাবাজি—তা দেখবার জন্য আমি চীনেও গিয়েছিলাম। জাপান এবং চীনের জাতীয় গবর্নমেন্টের মধ্যে সর্ব্বশেষ চুক্তির ফলে চীনের জনসাধারণ যা যা দাবী করেছিল কার্য্যতঃ তার সব কিছুই তারা পেয়েছে। এই চুক্তিতে জাপান যুদ্ধশেষে চীন থেকে তার সৈন্যদল সরিয়ে নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চুংকিং-চীন যুদ্ধ করছে কেন? কেউ কি বিশ্বাস করতে পারে, বৃটেন আমেরিকা নিছক পরোপকার-প্রবৃত্তি থেকেই চুংকিং-চীনকে সাহায্য করেছে? চুংকিংকে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্যে বৃটেন ও আমেরিকা এখন যে সাহায্য করছে, তার বদলে তারা কি প্রতিদান চাইবে না? আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, জাপানের প্রতি অতীত ঘৃণা ও বিদ্বেষের দরুন চুংকিং নিজেকে বৃটেন ও আমেরিকার কাছে বন্ধক দিচ্ছে। যতদিন পর্য্যন্ত চীনের প্রতি জাপান তার বর্ত্তমান নীতির প্রবর্ত্তন করে নি, ততদিন পর্য্যন্ত জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে বৃটিশ ও মার্কিণ সাহায্য চাইবার পিছনে তবু কিছুটা যুক্তি ছিল। কিন্তু বর্ত্তমানে চীন-জাপানের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হওয়ায় চুংকিং-এর পক্ষে জাপানের বিরুদ্ধে অর্থহীন সংগ্রাম চালানো কোনক্রমেই সমর্থন করা যায় না। এটা চীনের জনগণের পক্ষে মঙ্গলজনক নয়—এশিয়ার পক্ষেও মঙ্গলজনক নয়। ১৯৪২-এর এপ্রিল মাসে আপনি বলেছিলেন, আপনার যদি স্বাধীনতা থাকত তবে আপনি চীন এবং জাপানের মধ্যে একটা বোঝাপড়ার চেষ্টা করতেন। আপনার সে উক্তি ছিল, দুর্লভ রাজনীতিবোধের পরিচায়ক। চীনের বর্ত্তমান বিশৃঙ্খলার দরুন মূলতঃ ভারতের দাসত্বই দায়ী। ভারতের উপর বৃটিশ আধিপত্য আছে বলেই ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তিদ্বয় ধাপ্পা দিয়ে চুংকিংকে আশা দিল যে, জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্যে চীনে যথেষ্ট সাহায্য আমদানী করা সম্ভব। মহাত্মাজী, আপনি ঠিকই ভেবেছিলেন, স্বাধীন ভারত জাপান এবং চীনের মধ্যে শান্তিস্থাপনের চেষ্টা করত। আমি বলতে চাই, ভারত স্বাধীনতা পেলে চুংকিং বর্ত্তমানে যে মূর্খতা করছে সে সম্বন্ধে তার চোখ খুলে যাবে, এবং তার ফলে চুংকিং ও জাপানের মধ্যে একটা সম্মানজনক আপোষরফা হবে! আমি পূর্ব্ব-এশিয়ায় আসার পর থেকে এবং চীন-পরিদর্শনের পর থেকে, আমি চীনের সমস্যা আরও গভীর ভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি। আমি দেখছি, চুংকিং-এ এক-নায়কত্বের শাসন চলছে। যদি ন্যায়সঙ্গত কারণে হয়, তা হলে ব্যক্তিগত ভাবে আমার এক-নায়কত্বের বিরুদ্ধে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু চুংকিং-এ যে এক-নায়কত্ব বিরাজমান তার উপর বিদেশী মার্কিণ-প্রভাব সুস্পষ্ট। দুঃখের বিষয়, ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তিদ্বয় চুংকিং-এর শাসকগোষ্ঠীকে এই বলে প্রতারিত করতে পেরেছে যে, কোন প্রকারে জাপানকে যদি পরাজিত করা যায়, তবে এশিয়ায় চীনই হবে প্রধান শক্তি। আসল ব্যাপার কিন্তু এই, জাপান যদি কোনক্রমে পরাজিত হয় তবে চীন সম্পূর্ণ আমেরিকান প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে যাবে। সেটা চীনের পক্ষেও যেমন করুণ হবে, সমগ্র এশিয়ার পক্ষেও তেমনই করুণ হবে। জাপানের পরাজয়ের পর এশিয়ায় সর্ব্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র হবার মিথ্যা আশায় চুংকিং-এর শাসকগোষ্ঠী হোয়াইট হাউস এবং হোয়াইট হলের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে অপবিত্র মৈত্রীবন্ধনে বাঁধা পড়েছে। ভারতে চুংকিং গবর্ণমেণ্ট যে প্রচারকার্য্য চালায় এবং ভারতীয়দের হৃদয়াবেগে নাড়া দিয়ে যে ভাবে তাদের সহানুভূতি লাভের চেষ্টা করে তার কিছু কিছু সংবাদ আমি রাখি। কিন্তু ওয়াল ষ্ট্রীট এবং লম্বার্ড ষ্ট্রীটের কাছে যে চুংকিং নিজেকে বন্ধক রেখেছে, সে আর ভারতীয় জনগণের সহানুভূতি পাবার যোগ্য নয়—বিশেষ করে চীনের প্রতি জাপানের নতুন নীতি প্রবর্ত্তনের পরে।

 মহাত্মাজী, ভারতীয় জনগণ মৌখিক প্রতিশ্রুতি সম্বন্ধে কত গভীরভাবে সন্দিহান, সকলের চেয়ে আপনিই সেকথা জানেন বেশী ভাল করে। জাপানের নীতি-ঘোষণা যদি নিছক প্রতিশ্রুতিমাত্র হত, তবে আমি কিছুতেই জাপানের দ্বারা প্রভাবিত হতাম না। কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখেছি, কিভাবে এই বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও জাপান ফিলিপাইন ব্রহ্ম এবং জাতীয় চীনের মতো দেশে বৈপ্লবিক পরিবর্ত্তন সাধন করেছে। জাপানের যিনি নেতা ও প্রধান মন্ত্রী সেই জেনারেল তোজো প্রতিটি কথার মর্য্যাদা রক্ষা করেন ও তাঁর ঘোষণার সঙ্গে কাজের পরিপূর্ণ সঙ্গতি বিদ্যমান। নৈতিক বিচারে জাপানের এই জাতীয় নেতা সমসাময়িক রাষ্ট্রনায়কদের সকলের চেয়ে বহুগুণে বড়।

 ভারত প্রসঙ্গে এসে আমি একথা বলতে বাধ্য, জাপান তার কাজের দ্বারা ঐকান্তিকতার প্রমাণ দিয়েছে। এমন এক সময় ছিল, যখন লোকে বলত ভারত সম্বন্ধে জাপানের স্বার্থপর অভিপ্রায় আছে। তার যদি স্বার্থের অভিপ্রায়ই থাকত, তবে সে স্বাধীন-ভারতের সাময়িক গবর্নমেন্টকে স্বীকার করে নিত কি? আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সে এই সাময়িক গবর্নমেন্টের হাতে ছেড়ে দেবারই বা সিদ্ধান্ত করত কি? বর্ত্তমানে পোর্টব্লেয়ারে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জন্যে ভারতীয় চীফ কমিশনার নিযুক্ত করা কি সম্ভব হত? স্বাধীনতার সংগ্রামে পূর্ব্ব-এশিয়ার ভারতীয় জনগণকে জাপান বিনাসর্ত্তে সাহায্য করছে কেন? সমগ্র পূর্ব্ব-এশিয়ায় ভারতীয়রা ছড়িয়ে আছে; তারা খুব নিকট থেকে জাপানীদের দেখবার সুযোগ পায়। জাপানের পরিচয় এবং অকৃত্রিমতা সম্বন্ধে নিঃসংশয় না হলে সমগ্র পূর্ব্ব-এশিয়ার ত্রিশ লক্ষ ভারতীর নরনারী তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করবে কেন? আপনি একজন লোককে বলপ্রয়োগে বাধ্য করতে পারেন কিংবা মিষ্ট কথায় তাকে ভুলিয়ে নিজের ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু সমগ্র পূর্ব্ব-এশিয়ায় ছড়ানো ত্রিশ লক্ষ লোককে কেউ বলপ্রয়োগে বাধ্য করতে পারে না।

 পূর্ব্ব-এশিয়ার ভারতীয়রা যদি প্রাণপাত চেষ্টা না করে এবং সর্ব্বাপেক্ষা অধিক স্বার্থত্যাগ না করে জাপানের সাহায্য নিত, তবে তারা অন্যায় কাজের দোষে দোষী হত। কিন্তু ভারতীয়রূপে একথা বলতে আমি আনন্দ ও গর্ব্ব বোধ করি যে পূর্ব্ব-এশিয়াস্থিত আমার স্বদেশবাসীরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য লোক, অর্থ ও দ্রব্যাদি সংগ্রহ-প্রচেষ্টায় তাদের শ্রেষ্ঠ শক্তি নিয়োগ করছে। স্বদেশে অর্থ ও দ্রব্যাদি সংগ্রহ এবং জাতীয় কার্য্যের জন্য লোক সংগ্রহের বিশবৎসরব্যাপী এখন অভিজ্ঞতা আমার কাছে। পূর্ব্ব-এশিয়ার ভারতীয়েরা বর্ত্তমানে যে স্বার্থত্যাগ করছে তার মূল্য আমি সেই অভিজ্ঞতার আলোকে নির্দ্ধারণ করতে পারি। তাদের প্রচেষ্টা অত্যদ্ভুত। তারা সবচেয়ে বেশী স্বার্থত্যাগের জন্যে প্রস্তুত আছে বলেই অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ প্রভৃতি যে সব অত্যাবশ্যক দ্রব্য আমরা প্রস্তুত করতে পারি না, সেগুলো সাহায্যস্বরূপ জাপানের কাছ থেকে নেওয়াতে আমি আপত্তির কারণ দেখি না।

 মহাত্মাজী, আমরা এখানে যে সামরিক গবর্নমেন্ট গঠন করেছি, তার সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই। আজাদ হিন্দ (কিংবা স্বাধীন ভারত সাময়িক গবর্নমেন্ট জাপান, জার্ম্মানী এবং অন্য সাতটি মিত্র গবনমেন্টের পদ মর্য্যাদা ও সম্মান পেয়েছে। সশস্ত্র সংগ্রামের মারফৎ ব্রিটিশ অধীনতা পাশ থেকে ভারতকে মুক্ত করাই সাময়িক গবর্নমেন্টের একমাত্র লক্ষ্য। ইংরাজদের ভারত থেকে বিতাড়িত করার পর শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপিত হলেই সাময়িক গবর্নমেন্টের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। মহাত্মাজী, আমি এসম্বন্ধে আপনাকে নিশ্চিন্ত করতে পারি যে, আমি এবং আমার সহকর্ম্মীরা নিজেদের ভারতীয় জনগণের ভৃত্য বলে বিবেচনা করি। আমাদের প্রচেষ্টা, আমাদের যন্ত্রণাভোগ এবং আমাদের স্বার্থত্যাগের পরিবর্ত্তে পুরস্কার স্বরূপ আমরা শুধু চাই মাতৃভূমির স্বাধীনতা। আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা ভারত স্বাধীন হলেই রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণে ইচ্ছুক। বাকী সকলে স্বাধীন ভারতে যে কোন সাধারণ পদ পেলেই সন্তুষ্ট হবে। আমাদের অন্তরে আজ যে-কথাটা প্রধান জাগছে সেটা হচ্ছে এই যে, বৃটিশ শাসনে সর্ব্বোচ্চ পদের অধিকারী না হয়ে স্বাধীন ভারতে ঝাড়ুদারের কাজ করাও অনেক গুণে ভাল। আমরা সবাই জানি, ভারত স্বাধীন হলে, যাঁদের হাতে ভারতের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে এরূপ লক্ষ লক্ষ সমর্থ নরনারী আমাদের দেশে আছেন।

 ভারতের বুক থেকে শেষ ব্রিটিশটিকে না তাড়াতে পারা পর্য্যন্ত জাপানের কাছ থেকে আমাদের কতটা সাহায্যের প্রয়োজন হবে, সেটা নির্ভর করবে আমরা ভারতের মধ্য থেকে কতটা সহযোগিতা পাই না পাই—তার উপর। জাপান নিজে জোর করে আমাদের সাহায্য দিতে চায় না। নিজেদের প্রচেষ্টায় ভারতীয় জনগণ যদি নিজেদের মুক্তি বিধান করতে পারে, তবে জাপান খুসিই হবে। বৃটেন এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমরাই জাপানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি—কেননা বিপক্ষীয়েরাও অন্যান্য শক্তির কাছে সাহায্য চাইছে। যাই হোক, আমার আশা আছে যে ভারতস্থিত আমার দেশবাসীদের কছ থেকে আমরা এত বেশী সাহায্য পাব যে, জাপানের কাছ থেকে আমাদের অতি সামান্য সাহায্য নিলেও চলবে। কোন প্রকারে ভারতস্থিত আমাদের দেশবাসীরা যদি নিজ চেষ্টায় নিজেদের মুক্তি বিধান করতে পারে কিংবা বৃটিশ গবর্নমেন্ট যদি আপনার “ভারত ছাড়ো” প্রস্তাব গ্রহণ করে তদনুযায়ী কাজ করে, তবে আমার চেয়ে বেশী সুখী কেউ হবে না। আমরা কিন্তু এই ধারণা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি, উল্লিখিত দুটি সম্ভাবনার একটিও বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করবে না এবং সশস্ত্র সংগ্রাম অনিবার্য্য।

 মহাত্মাজী, প্রসঙ্গ শেষ করার পূর্ব্বে আমি আর একটি বিষয়ের উল্লেখ করব—সেটা বর্ত্তমান যুদ্ধের শেষ ফলাফল-ঘটিত প্রশ্ন। তারা বিজয় সম্বন্ধে নিশ্চিত, এই ধারণা সৃষ্টির জন্যে ইংরেজরা যে ধরণের প্রচারকার্য্য চালাচ্ছে তার সঙ্গে আমি ভালভাবেই পরিচিত। কিন্তু আমি আশা করি, আমার দেশবাসী সেই প্রচারে প্রতারিত হবে না এবং এযুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তিদ্বয় জয়লাভ করবে এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্ত্তী হয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে ব্রিটেনের সঙ্গে আপোষের কথা ভাববে না। যুদ্ধকালীন অবস্থার মধ্যে খোলা চোখে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে, ইন্দো-ব্রহ্ম সীমান্তে ও ভারতের অভ্যন্তরে শত্রুর আভ্যন্তরীণ দুর্ব্বলতার কথা জেনে এবং আমাদের শক্তি ও সমর-সামর্থ্যের পরিমাপ করে, আমার মনে আমাদের শেষ বিজয় সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে। আমাদের শত্রুর শক্তি এক ফোঁটাও কম করে দেখার মত মূর্খ আমি নই। আমি জানি আমাদের সম্মুখে দীর্ঘস্থায়ী কঠিন সংগ্রাম আছে। আমি জানি যে সাম্রাজ্য রক্ষার জন্যে শেষ চেষ্টা করার উদ্দেশ্যে বৃটেন ভারতের মাটিতে সাহসের সঙ্গে কঠিন সংগ্রাম করবে। কিন্তু আমি এও জানি, সংগ্রাম যতই দীর্ঘস্থায়ী ও কঠিন হোক, এর ফল হতে পারে শুধু একটি— আমাদেরই বিজয়। ভারতের স্বাধীনতার শেষ সংগ্রাম শুরু হয়েছে। ভারতের মাটিতে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যরা বীরের মতো যুদ্ধ করছে এবং কষ্ট ও অসুবিধা সত্ত্বেও তারা ধীর স্থির গতিতে এগিয়ে চলেছে। সর্ব্বশেষ বৃটেনবাসীকে যে পর্য্যন্ত ভারতের বুক থেকে বিতাড়িত না করা যায় এবং নয়াদিল্লীতে বড়লাটের বাড়ীতে যে পর্য্যন্ত আমাদের ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকা সগৌরবে উড়বার সুযোগ না পায়, সে পর্য্যন্ত এই সশস্ত্র সংগ্রাম চলবেই।

 আমাদের জাতির জনক! ভারতে এই পবিত্র মুক্তিসংগ্রামে আমরা আপনার আশীর্ব্বাদ ও শুভেচ্ছা প্রার্থনা করি।