দুই বোন/ঊর্মিমালা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


অষ্টম পত্ৰ উদাসীন কানের কাছে অত্যন্ত নির্বিশেষ ভাবের উপদেশ দেওয়া, যা কোনো বাস্তব মানুষের কোনো বাস্তব কাজেই লাগে না । পরলোকগত বহুসংখ্যক পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে পাইকেরি প্রথায় পিণ্ডি দেওয়ার মতো— যেহেতু সে পিণ্ড কেউ খায় না সেইজন্যে তাতে না আছে স্বাদ, না আছে শোভা । যেহেতু সেটা রসনাহীন ও ক্ষুধাহীন নামমাত্রের জন্য উৎসর্গ-করা সেইজন্যে সেটাকে যথার্থ খাদ্য করে তোলার জন্যে কারও গরজ নেই। মেসেজ-রচনা সেইরকম রচনা । আজ বিকেলের গাড়িতে পিনাঙ যেতে হবে । তার আগে, যদি স্বসাধ্য হয় তবে নাওয়া আছে, খাওয়া আছে ; যদি দুঃসাধ্য হয় তবু একটা মিটিঙে গিয়ে বক্তৃতা আছে ; ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, শাস্তি নেই, অবকাশ নেই ; তার পরে সুদীর্ঘ রেলযাত্রা ; তার পরে স্টেশনে মাল্যগ্রহণ, এড্রেস্-শ্রবণ, তদুত্তরে বিনতিপ্রকাশ ; তার পরে নতুন বাসায় নতুন জনতার মধ্যে জীবনযাত্রার নতুন ব্যবস্থা ; তার পরে ষোলোই তারিখে জাহাজে চড়ে জাভায় যাত্রা ; তার পরে নতুন অধ্যায় । ইতি ১৩ অগস্ট ১৯২৭ টাইপিঙ Ծ:) ‘ঐবিজয়’লক্ষী তোমায় আমায় মিল হয়েছে কোন যুগে এইখানে। ভাষায় ভাষায় গাঠ পড়েছে, প্রাণের সঙ্গে প্রাণে । ডাক পাঠালে আকাশপথে কোন সে পুবেন বায়ে দূর সাগরের উপকূলে নারিকেলের ছায়ে। গঙ্গাতীরের মন্দিরেতে সেদিন শঙ্খ বাজে, তোমার বাণী এপার হতে মিলল তারি মাঝে । বিষ্ণু আমায় কইল কানে, বললে দশভূজা, অজানা ওই সিন্ধুতীরে নেব আমার পূজা । মন্দাকিনীর কলধারা সেদিন ছলোছলো পুব সাগরে হাত বাড়িয়ে বললে, ‘চলে, চলো।’ রামায়ণের কবি আমায় কইল আকাশ হতে, ‘আমার বাণী পার করে দাও দূর সাগরের স্রোতে । তোমার ডাকে উতল হল বেদব্যাসের ভাষা— বললে, “আমি ওই পারেতে বাধব নতুন বাসা । ‘আমায় বয়ে যাও গো লয়ে সুদূর দেশের পানে। সেদিন প্রাতে সুনীল জলে ভাসল আমার তরী— শুভ্র পালে গর্ব জাগায় শুভ হাওয়ায় ভরি। তোমার ঘাটে লাগল এসে, জাগল সেথায় সাড়া, কুলে কুলে কাননলক্ষ্মী দিল আঁচল নাড়া। ‘ঐবিজয়’লক্ষ্মী প্রথম দেখা আবছায়াতে আঁধার তখন ধরা, সেদিন সন্ধ্যা সপ্তঋষির আশীর্বাদে ভরা। প্রাতে মোদের মিলন-পথে উষা ছড়ায় সোনা, সে পথ বেয়ে লাগল দোহার প্রাণের আনাগোনা । দুইজনেতে বাধনু বাসা পাথর দিয়ে গেথে, দুইজনেতে বসন্তু সেথায় একটি আসন পেতে । বিরহরাত ঘনিয়ে এল কোন বরষের থেকে । কালের রথের ধুলা উড়ে দিল আসন ঢেকে । বিস্মরণের ভাটা বেয়ে কবে এলেম ফিরে ক্লান্তহীতে রিক্তমনে একা আপন তীরে । বঙ্গসাগর বহুবরষ বলে নি মোর কানে সে যে কভু সেই মিলনের গোপন কথা জানে। জাহ্নবীও আমার কাছে গাইল না সেই গান সুদূর পারের কোথায় যে তার আছে নাড়ীর টান । এবার আবার ডাক শুনেছি, হৃদয় আমার নাচে, হাজার বছর পার হয়ে আজ আসি তোমার কাছে । মুখের পানে চেয়ে তোমায় আবার পড়ে মনে আরেক দিনের প্রথম দেখা তোমার শ্যামল বনে । হয়েছিল রাখীর্বাধন সেদিন শুভ প্রাতে ; সেই রাখী যে আজো দেখি তোমার দখিন হাতে । এই-যে পথে হয়েছিল মোদের যাওয়া-আসা আজো সেথায় ছড়িয়ে আছে আমার ছিন্ন ভাষা । 8X खांछ-दांबौब्र नज সে চিহ্ন আজ বেয়ে বেয়ে এলেম শুভক্ষণে সেই সেদিনের প্রদীপ-জ্বালা প্রাণের নিকেতনে । আমি তোমায় চিনেছি আজ, তুমি আমায় চেনে— নূতন-পাওয়া পুরানোকে আপন বলে জেনে । ২১ অগস্ট ১৯২৭ [ বাটাভিয়া ] ষবদ্বীপ G२ কল্যাণীয়াসু বেীমা, মালয় উপদ্বীপের বিবরণ আমাদের দলের লোকের চিঠিপত্র থেকে নিশ্চয় পেয়েছ। ভালো করে দেখবার মতে, ভাববার মতে, লেখবার মতে, সময় পাই নি। কেবল ঘুরেছি আর বকেছি। পিনাঙ থেকে জাহাজে চড়ে প্রথমে জাভার রাজধানী বাটাভিয়ায় এসে পৌছনো গেল। আজকাল পৃথিবীর সর্বত্রই বড়ো শহর মাত্রই দেশের শহর নয়, কালের শহর। সবাই আধুনিক। সবাই মুখের চেহারায় একই, কেবল বেশভূষায় কিছু তফাত । অর্থাৎ, কারো-বা পাগড়িটা ঝকঝকে কিন্তু জামায় বোতাম নেই, ধুতিখানা হাটু পর্যন্ত, ছেড়া চাদরখানায় ধোপ পড়ে না, যেমন কলকাতা ; কারো-বা আগাগোড়াই ফিট্‌ফাটু ধোওয়া-মাজা, উজ্জল বসনভূষণ, যেমন বাটাভিয়া। শহরগুলোর মুখের চেহারা একই বলেছি, কথাটা ঠিক নয়। মুখ দেখা যায় না, মুখোষ দেখি। সেই মুখোষগুলো এক কারখানায় একই ছাচে ঢালাই করা। কেউ-বা সেই মুখোষ পরিষ্কার পালিশ করে রাখে, কারো-বা হেলায়-ফেলায় মলিন। কলকাতা আর বাটাভিয়া উভয়েই এক আধুনিক কালের কন্যা ; কেবল জামাতারা স্বতন্ত্র, তাই অাদরযত্নে অনেক তফাত । শ্ৰীমতী বাটাভিয়ার সিথি থেকে চরণচক্র পর্যন্ত গয়নার অভাব নেই। তার উপরে সাবান দিয়ে গা মাজা-ঘষা ও অঙ্গলেপ দিয়ে ঔজ্জল্যসাধন চলছেই। কলকাতার হাতে নোয়া আছে, কিন্তু বাজুবন্দ দেখি নে। তার পরে যে জলে তার স্নান সে জলও যেমন, আর যে গামছায় গা-মোছা তারও সেই দশা । আমরা চিৎপুরবিভাগের পুরবাসী, বাটাভিয়ায় এসে মনে হয় কৃষ্ণপক্ষ থেকে শুক্লপক্ষে এলুম। 8 ○ জাভা-যাত্রীর পত্র হোটেলের খাচায় ছিলেম দিন-তিনেক ; অভ্যর্থনার ক্রটি হয় নি। সমস্ত বিবরণ বোধ হয় সুনীতি কোনো-এক সময়ে লিখবেন। কেননা সুনীতির যেমন দর্শনশক্তি তেমনি ধারণাশক্তি। যত বড়ো র্তার আগ্রহ তত বড়োই তার সংগ্ৰহ । যা-কিছু র্তার চোখে পড়ে সমস্তই তার মনে জমা হয়। কণামাত্র নষ্ট হয় না । নষ্ট-যে হয় না সে তু দিক থেকেই, রক্ষণে এবং দানে। তন্নষ্টং যন্নদীয়তে । বুঝতে পারছি, তার হাতে আমাদের ভ্রমণের ইতিবৃত্ত লেশমাত্র ব্যর্থ হবে না, লুপ্ত হবে না । বাটাভিয়া থেকে জাহাজে করে বালিদ্বীপের দিকে রওনা হলুম। ঘণ্টা-কয়েকের জন্ত্যে সুরবায়া শহরে আমাদের নামিয়ে নিলে। এও একটা আধুনিক শহর ; জাভার আঙ্গিক নয়, জাভার আনুষঙ্গিক । আলাদিনের প্রদীপের মন্ত্রে শহরটাকে নিউজীলণ্ডে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিলেও খাপছাড়া হয় না। পার হয়ে এলেম বালিদ্বীপে ; দেখলেম ধরণীর চিরযৌবনা মূর্তি। এখানে প্রাচীন শতাব্দী নবীন হয়ে আছে। এখানে মাটির উপর অন্নপূর্ণার পাদপীঠ শ্যামল আস্তরণে দিগন্ত থেকে দিগন্তে বিস্তীর্ণ ; বনচ্ছায়ার অঙ্কলালিত লোকালয়গুলিতে সচ্ছল অবকাশ । সেই অবকাশ উৎসবে অনুষ্ঠানে নিত্যই পরিপূর্ণ। এই দ্বীপটুকুতে রেলগাড়ি নেই। রেলগাড়ি আধুনিক কালের বাহন। আধুনিক কালটি অত্যন্ত কৃপণ কাল, কোনো দিকে একটু মাত্র বাহুল্যের বরাদ্দ রাখতে চায় না । এই কালের মানুষ বলে : Time is money । তাই কালের বাজেখরচ বন্ধ করবার জন্তে রেলের এঞ্জিন হাফাতে হাফাতে, ধোওয়া ওগরাতে ওগরাতে, মেদিনী কম্পমান করে দেশদেশান্তরে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে । কিন্তু, এই বালিদ্বীপে বর্তমান কাল শত শত অতীত শতাব্দী জুড়ে এক হয়ে নবম পত্র আছে । এখানে কালসংক্ষেপ করবার কোনো দরকার নেই। এখানে যা-কিছু অাছে তা চিরদিনের ; যেমন একালের তেমনি সেকালের । ঋতুগুলি যেমন চলেছে নানা রঙের ফুল ফোটাতে ফোটাতে, নানা রসের ফল ফলাতে ফলাতে, এখানকার মানুষ বংশপরম্পরায় তেমনি চলেছে নানা রূপে বর্ণে গীতে নৃত্যে অনুষ্ঠানের ধারা বহন করে । রেলগাড়ি এখানে নেই, কিন্তু আধুনিক কালের ভবঘুরে যারা এখানে আসে তাদের জন্তে আছে মোটরগাড়ি । অতি অল্পকালের মধ্যেই তাদের দেখাশুনো ভোগ-করা শেষ করা চাই । তারা অঁাটকালের মানুষ এসে পড়েছে অপর্যাপ্ত-কালের দেশে । এখানকার অরণ্য পর্বত লোকালয়ের মাঝখান দিয়ে ধুলে উড়িয়ে চলেছি আর কেবলই মনে হচ্ছে, এখানে পায়ে হেঁটে চলা উচিত। যেখানে পথের দুই ধারে ইমারত সেখানে মোটরের সঙ্গে সঙ্গে দুই চক্ষুকে দৌড় করালে খুব বেশি লোকসান হয় না ; কিন্তু পথের দু ধারে যেখানে রূপের মেলা সেখানকার নিমন্ত্রণ সারতে গেলে গরজের মোটরটাকে গারাজেই রেখে আসতে হয় । মনে নেই কি, শিকার করতে তুষান্ত যখন রথ ছুটিয়েছিলেন তখন তার বেগ কত ; এই হচ্ছে যাকে বলে প্রোগ্রেস, লক্ষ্যভেদ করবার জন্তে তাড়াহুড়ো । কিন্তু, তপোবনের সামনে এসে তাকে রথ ফেলে নামতে হল, লক্ষ্যসাধনের লোভে নয়, তৃপ্তিসাধনের আশায় । সিদ্ধির পথে চলা দৌড়ে, সুন্দরের পথে চলা ধীরে । আধুনিক কালে সিদ্ধির লোভ প্রকাণ্ড, প্রবল ; তাই আধুনিক কালের বাহনের বেগ কেবলই বেড়ে যাচ্ছে । যা-কিছু গভীরভাবে নেবার যোগ্য, দৃষ্টি তাকে গ্রহণ না ক’রে স্পর্শ করেই চলে যায়। এখন হ্যামলেটের অভিনয় অসম্ভব হল, হ্যামলেটের সিনেমার হল জিত। 8& (१२ দুই বোন ম্যানেজারবাবু বলেন, “ধtধা লাগছে। আমরা তে৷ জানতুম টাকাট। ও-পক্ষে অস্পৃশ্য ছিল।” ম্যানেজার নীরদকে পছন্দ করতেন না । উর্মি বলে, “কিন্তু বিদেশে—” কথাটা শেষ করে नt । কাকাবাবু বলেন, “এদেশের স্বভাব বিদেশের মাটিতে বদলে যেতে পারে সে জানি–কিন্তু আমরা তার সঙ্গে তাল রাখব কী ক’রে ।” উর্মি বলে, “টাকাট। না পেলে হয়তো বিপদে পড়তে পারেন।”

  • আচ্ছা বেশ, পাঠাচ্ছি মা, তুমি বেশি ভেবো না । ব’লে রাখছি এই শুরু হোলো কিন্তু এই শেষ নয় ।”

শেষ যে নয় অনতিকাল পরেই আরো বড়ো অঙ্কে তার প্রমাণ হোলো । এবার প্রয়োজন স্বাস্থ্যের । ম্যানেজার গম্ভীরমুখে বললেন, “শশাঙ্কবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো ।” উর্মি শশব্যস্ত হয়ে বললে, “আর যাই করে, দিদিরা এ-খবরটা যেন না পান ।” “একলা এই দায়িত্ব নিতে ভালো লাগছে না ।” “একদিন তো টাকা তার হাতেই পড়বে ।” নবম পত্র অস্তর্নিহিত সুন্দর ঐক্যবন্ধনেই সমস্ত ভিড়ের লোককে আপনিই সংযত করে বেঁধেছে। সমস্ত ব্যাপারটি এত বৃহৎ, এত বিচিত্র, আর আমাদের পক্ষে এত অপূর্ব যে, এর বিস্তারিত বর্ণনা করা অসম্ভব। হিন্দু অনুষ্ঠানবিধির সঙ্গে এ দেশের লোকের চিত্তবৃত্তির মিল হয়ে এই-যে স্বষ্টি, এর রূপের প্রাচুর্যটিই বিশেষ করে দেখবার ও ভাববার জিনিস। অপরিমিত উপকরণের দ্বারা নিজেকে অশেষভাবে প্রকাশ করবার চেষ্টা, সেই প্রকাশ কেবলমাত্র বস্তুকে পুঞ্জিত ক’রে নয়, তাকে নানা নিপুণ রীতিতে সজ্জিত ক’রে। জাপানের সঙ্গে এখানকার প্রাকৃতিক অবস্থার মিল আছে । জাপানের মতোই এখানে দ্বীপটি আয়তনে ছোটো, অথচ এখানে প্রকৃতির রূপটি বিচিত্র এবং তার স্বষ্টিশক্তি প্রচুরভাবে উর্বরা । পদে পদেই পাহাড় ঝরনা নদী প্রান্তর অরণ্য অগ্নিগিরি সরোবর। অথচ, দেশটি চলাফেরার পক্ষে সুগম, নদীপৰ্বতের পরিমাণ ছোটো ; প্রজাসংখ্যা বেশি, ভূমির পরিমাণ কম, এইজন্যে কৃষির উৎকর্ষ -দ্বারা চাষের-যোগ্য সমস্ত জমি সম্পূর্ণরূপে এর চষে ফেলেছে ; খেতে খেতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল সেচ দেবার ব্যাপক ব্যবস্থা এ দেশে দীর্ঘকাল থেকে প্রচলিত। এখানে দারিদ্র্য নেই, রোগ নেই, জলবায়ু সুখকর । দেবদেবীবহুল, কাহিনীবহুল, অনুষ্ঠানবহুল পৌরাণিক হিন্দুধর্ম এখানকার প্রকৃতির সঙ্গে সংগত ; সেই প্রকৃতি এখানকার শিল্পকলায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে, বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যের প্রবর্তনা করেছে । জাপানের সঙ্গে এর মস্ত একটা তফাত । জাপান শীতের দেশ ; জাভা বালি গরমের দেশ। জাপান অন্য শীতের দেশের লোকের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে আপনাকে রক্ষা করতে পারলে, জাভা বালি তা পারে নি। আত্মরক্ষার জন্তে যে দৃঢ়নিষ্ঠ অধ্যবসায় দরকার এদের ፀፃ জাভা-যাত্রীর পত্র তা ছিল না । গরম হাওয়া প্রাণের প্রকাশকে যেমন তাড়াতাড়ি পরিণত করে তেমনি তাড়াতাড়ি ক্ষয় করতে থাকে। মুহুর্তে মুহুর্তে শক্তিকে সে শিথিল করে, জীবনের অধ্যবসায়কে ক্লাস্ত করে দেয় । বাটাভিয়া শহরটি-যে এমন নিখুঁত ভাবে পরিপাটি পরিচ্ছন্ন তার কারণ, শীতের দেশের মানুষ এর ভার নিয়েছে ; তাদের শীতের দেশের দেহে শক্তি অনেক কাল থেকে বংশানুক্রমে অস্থিতে মজ্জাতে পেশীতে স্নায়ুতে পুঞ্জীভূত ; তাই তাদের অক্লাস্ত মন সর্বত্র ও প্রতি মুহূর্তে আপনাকে প্রয়োগ করতে পারে। আমরা কেবলই বলি, “যথেষ্ট হয়েছে, তুমিও যেমন— চলে যাবে। যত্ন জিনিসটা কেবল হৃদয়ের জিনিস নয়, শক্তির জিনিস। অনুরাগের আগুনকে জালিয়ে রাখতে শক্তির প্রাচুর্য চাই। শক্তিসঞ্চয় যেখানে অল্প সেখানে আপনিই বৈরাগ্য এসে পড়ে। বৈরাগ্য নিজের উপর থেকে সমস্ত দাবি কমিয়ে দেয়। বাইরের অসুবিধা, অস্বাস্থ্য, অব্যবস্থা, সমস্তই মেনে নেয়। নিজেকে ভোলাবার জন্যে বলতে চেষ্টা করে যে, ওগুলো সহ্য করার মধ্যে যেন মহত্ত্ব আছে । যার শক্তি অজস্র সে সমস্ত দাবি মেনে নিতে আনন্দ পায় ; এইজন্যেই সে জোরের সঙ্গে বেঁচে থাকে, ধ্বংসের কাছে সহজে ধরা দিতে চায় না। যুরোপে গেলে সব চেয়ে আমার চোখে পড়ে মানুষের এই সদাজাগ্রত যত্ন । যাকে বলি বিজ্ঞান, সায়ানস্, তার প্রধান লক্ষণ হচ্ছে জ্ঞানের জন্যে অপরাজিত যত্ন । কোথাও আন্দাজ খাটবে না, খেয়ালকে মানবে না, বলবে না ধরে নেওয়া যাক’, বলবে না ‘সর্বজ্ঞ ঋষি এই কথা বলে গেছেন । জ্ঞানের ক্ষেত্রে, নীতির ক্ষেত্রে যখন আত্মশক্তির ক্লাস্তি আসে তখন বৈরাগ্য দেখা দেয় ; সেই বৈরাগ্যের অযত্বের ক্ষেত্রেই ঋষিবাক্য, বেদবাক্য, গুরুবাক্য, মহাত্মাদের অনুশাসন, আগাছার জঙ্গলের মতো জেগে ওঠে— নিত্যপ্রয়াসসাধ্য জ্ঞানসাধনার পথ ՑԵ নবম পত্ৰ রুদ্ধ করে ফেলে। বৈরাগ্যের অযত্নে দিনে দিনে চারি দিকে যে প্রভূত আবর্জনার অবরোধ জমে ওঠে তাতেই মানুষের পরাভব ঘটায়। বৈরাগ্যের দেশে শিল্পকলাতেও মানুষ অন্ধ পুনরাবৃত্তির প্রদক্ষিণপথে চলে, এগোয় না, কেবলই ঘোরে। মাদ্রাজের শ্রেষ্ঠা পয়ত্রিশ লক্ষ টাকা খরচ করে, হাজার বছর আগে যে মন্দির তৈরি হয়েছে ঠিক তারই নকল করবার জন্তে । তার বেশি তার সাহস নেই, ক্লান্ত মনের শক্তি নেই ; পাখির অসাড় ডানা খাচার বাইরে নিজেকে মেলে দিতে আনন্দ পায় না। খাচার কাছে হার মেনে যে পাখি চিরকালের মতো ধরা দিয়েছে সমস্ত বিশ্বের কাছে তাকে হার মানতে হল । এ দেশে এসে প্রথমে আনন্দ হয় এখানকার সব অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্যে ও সৌন্দর্যে । তার পরে ক্রমে মনে সন্দেহ হতে থাকে, এ হয়তো খাচার সৌন্দর্য, নীড়ের সৌন্দর্য নয়— এর মধ্যে হয়তো চিত্তের স্বাধীনতা নেই। অভ্যাসের যন্ত্রে নিখুত নকল শত শত বৎসর ধরে ধারাবাহিক ভাবে চলেছে । আমরা যারা এখানে বাহির থেকে এসেছি আমাদের একটা তুর্লভ সুবিধা ঘটেছে এই যে, আমরা অতীত কালকে বর্তমানভাবে দেখতে পাচ্ছি। সেই অতীত মহৎ, সেই অতীতের ছিল প্রতিভা, যাকে বলে নবনবোন্মেষশালিনী বুদ্ধি ; তার প্রাণশক্তির বিপুল উদ্যম আপন শিল্পস্থষ্টির মধ্যে প্রচুরভাবে আপন পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু তবুও সে অতীত, তার উচিত ছিল বর্তমানের পিছনে পড়া ; সামনে এসে দাড়িয়ে বর্তমানকে সে ঠেকিয়ে রাখল কেন ? বর্তমান সেই অতীতের বাহন মাত্র হয়ে বলছে, আমি হার মানলুম। সে দীনভাবে বলছে, এই অতীতকে প্রকাশ করে রাখাই আমার কাজ, নিজেকে লুপ্ত করে দিয়ে। নিজের পরে বিশ্বাস করবার সাহস নেই। এই হচ্ছে নিজের শক্তি 8 82 जांछ-वांबौब्र *ब সম্বন্ধে বৈরাগ্য, নিজের পরে দাবি যতদূর সম্ভব কমিয়ে দেওয়া । দাবি স্বীকার করায় দুঃখ আছে, বিপদ আছে, অতএব— বৈরাগ্যমেবাভয়ম। অর্থাৎ, বৈনাশ্বমেবাভয়ম্। সেদিন বাংলিতে আমরা যে অনুষ্ঠান দেখেছি সেটা প্রেতাত্মার স্বৰ্গারোহণপর্ব। মৃত্যু হয়েছে বহু পূর্বে ; এত দিনে আত্মা দেবসভায় স্থান পেয়েছে বলে এই বিশেষ উৎসব । সুখবতী-নামক জেলায় উবুদ-নামক শহরে হবে দাহক্রিয়া, আগামী পাচই সেপ্টেম্বরে। ব্যাপারটার মধ্যে আরও অনেক বেশি সমারোহ থাকবে— কিন্তু তবু সেই মাদ্রাজি চেটির পয়ত্রিশ লক্ষ টাকার মন্দির। এ বহু বহু শতাব্দীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, সেই অস্ত্যেষ্টিক্রিয়াই চলেছে, এর আর অন্ত নেই। এখানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এত অসম্ভবরকম ব্যয় হয় যে সুদীর্ঘকাল লাগে তার আয়োজনে— যম আপন কাজ সংক্ষেপে ও সস্তায় সারেন কিন্তু নিয়ম চলে অতি লম্বা ও হর্মুল্য চালে। এখানে অতীত কালের অস্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলেছে বহুকাল ধরে, বর্তমানকালকে আপন সর্বস্ব দিতে হচ্ছে তার ব্যয় বহন করবার জন্তে । এখানে এসে বারবার আমার এই কথা মনে হয়েছে যে, অতীতকাল যত বড়ো কালই হোক, নিজের সম্বন্ধে বর্তমানকালের একটা স্পর্ধা থাকা উচিত ; মনে থাকা উচিত, তার মধ্যে জয় করবার শক্তি আছে। এই ভাবটাকে আমি একটি ছোটো কবিতায় লিখেছি, সেটা এইখানে তুলে দিয়ে এই দীর্ঘ পত্র শেষ করি । নন্দগোপাল বুক ফুলিয়ে এসে বললে আমায় হেসে, ‘আমার সঙ্গে লড়াই করে কখখনো কি পারো ? বারে বারেই হারে। ’ ф е নবম পত্র আমি বললেম, তাই বই-কি ! মিথ্যে তোমার বড়াই, হোক দেখি তো লড়াই।’ ‘আচ্ছা, তবে দেখাই তোমায় এই বলে সে যেমনি টানলে হাত দাদামশায় তখখনি চিৎপাত । সবাইকে সে আনলে ডেকে, চেচিয়ে নন্দ করলে বাড়ি মাত ॥ বারে বারে শুধায় আমায়, বলে। তোমার হার হয়েছে নাকি ? আমি কইলেম, বলতে হবে তা কি । ধুলোর যখন নিলেম শরণ প্রমাণ তখন রইল কি আর বাকি ? এই কথা কি জানো— আমার কাছে, নন্দগোপাল, যখনই হার মান, আমারই সেই হার, লজ্জা সে আমার । ধুলোয় যেদিন পড়ব, যেন এই জানি নিশ্চিত, 尊 তোমারই শেষ জিত।’ ইতি ৩০ আগস্ট ১৯২৭ কারেম আসন । বালি প্রীমতী প্রতিমা দেবীকে লিখিত । & X So কল্যাণীয়াসু মীরা, যেখানে বসে লিখছি এ একটা ডাকবাঙলা, পাহাড়ের উপরে । সকালবেলা শীতের বাতাস দিচ্ছে। আকাশে মেঘগুলো দল বেঁধে আনাগোনা করছে, সূর্যকে একবার দিচ্ছে ঢাকা, একবার দিচ্ছে খুলে। পাহাড় বললে যে ছবি মনে জাগে এ একেবারেই সেরকম নয়। শৈলশিখরশ্রেণী কোথাও দেখা যাচ্ছে না— বারান্দ থেকে অনতিদূরেই সামনে ঢালু উপত্যক নেমে গিয়েছে, তলায় একটি ক্ষীণ জলের ধারা একে বেঁকে চলেছে ; সামনে অন্ত পারের পাড়ি অর্ধচন্দ্রের মতো, তার উপরে নারকেলবন আকাশের গায়ে সার বেঁধে দাড়িয়ে । উপর থেকে নীচে পর্যন্ত থাকে থাকে শস্তের খেত। পাহাড়ের বুক বেয়ে একটা ভাঙাচোরা পথ পরপারের গ্রামের থেকে জল পর্যন্ত নেমে গেছে। জলধারার কাছেই একটা উৎস। এই উৎসকে এ দেশের লোকে পবিত্র বলে জানে ; সমস্ত দিন দেখি মেয়েরা স্নান করে, জল তুলে নিয়ে যায়। এরা বলে, এই জলে স্বান করলে সর্ব পাপ মোচন হয়। বিশেষ বিশেষ পার্বণ আছে যখন বিস্তর লোক এখানে পুণ্যস্নান করতে আসে। এই জায়গাটার নাম ‘তীৰ্ত আম্পুল । তীর্ত অর্থাৎ তীর্থ, আম্পূল মানে উৎস— উৎসতীর্থ। এই উৎস সম্বন্ধে একটি গল্প আছে। বহুকাল পূর্বে এক রাজার এক সুন্দরী মেয়ে ছিল । সেই মেয়েটি রাজার এক পারিষদকে ভালোবেসেছিল। পারিষদের মনেও যে ভালোবাসা ছিল না তা নয়, কিন্তু রাজকন্যাকে বিয়ে করবার যোগ্য তার জাতিমৰ্যাদা নয় জেনে রাজার সম্মানের প্রতি লক্ষ করে রাজকন্যার ভালোবাসা (t ૨ দশম পত্র কর্তব্যবোধে প্রত্যাখ্যান করে। রাজকন্তা রাগ করে তার পানীয় দ্রব্যে বিষ মিশিয়ে দেয়। যুবক একটুখানি পান করেই ব্যাপারখানা বুঝতে পারে, কিন্তু পাছে রাজকন্যার নামে অপবাদ অাসে তাই পালিয়ে এই জায়গাকার বনে এসে গোপনে মরবার জন্তে প্রস্তুত হয়। দেবতারা দয়া করে এই পুণ্য-উৎসের জল খাইয়ে তাকে বাচিয়ে দেন । হিন্দু ভাবের ও রীতির সঙ্গে এদের জীবন কিরকম জড়িয়ে গেছে ক্ষণে ক্ষণে তার পরিচয় পেয়ে বিস্ময় বোধ হয়। অথচ হিন্দুধর্ম এখানে কোথাও অমিশ্র ভাবে নেই ; এখানকার লোকের প্রকৃতির সঙ্গে মিলে গিয়ে সে একটা বিশেষ রূপ ধরেছে ; তার ভঙ্গীট হিন্দু, অঙ্গটা এদের। প্রথম দিন এসেই এক জায়গায় কোন-এক রাজার অস্ত্যেষ্টিসৎকার দেখতে গিয়েছিলুম ! সাজসজ্জাআয়োজনের উপকরণ আমাদের সঙ্গে মেলে না ; উৎসবের ভাবটা ঠিক আমাদের শ্রাদ্ধের ভাব নয় ; সমারোহের বাহা দৃশ্যটা ভারতবর্ষের কোনো-কিছুর অনুরূপ নয় ; তবুও এর রকমটা আমাদের মতোই ; মাচার উপরে এখানকার চুড়া-বাধা ব্রাহ্মণের ঘণ্টা নেড়ে ধূপ-ধুনো জালিয়ে হাতের আঙুলে মুদ্রার ভঙ্গী করে বিড়বিড় শব্দে মন্ত্র পড়ে যুাচ্ছে। আবৃত্তিতে ও অনুষ্ঠানে কিছুমাত্র স্বলন হলেই সমস্ত অশুদ্ধ ও ব্যর্থ হয়ে যায় । ব্রাহ্মণের গলায় পৈতে নেই। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, এরা ‘গায়ত্রী’ শব্দটা জানে কিন্তু মন্ত্রটা ঠিক জানে না। কেউ-বা কিছু কিছু টুকরো জানে। মনে হয়, এক সময়ে এর সর্বাঙ্গীণ হিন্দুধর্ম পেয়েছিল, তার দেবদেবী রীতিনীতি উৎসব-অনুষ্ঠান পুরাণস্থতি সমস্তই ছিল। তার পরে মূলের সঙ্গে যোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, ভারতবর্ষ চলে গেল দূরে— হিন্দুর সমুদ্রযাত্রা হল নিষিদ্ধ, হিন্দু আপন গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে কষে বাধলে, ●" कॉछ-शांबौब्र श्रृंद्ध ঘরের বাইরে তার যে এক প্রশস্ত আঙিনা ছিল এ কথা সে ভুললে । কিন্তু, সমুদ্রপারের আত্মীয়-বাড়িতে তার অনেক বাণী, অনেক মূর্তি, অনেক চিহ্ন, অনেক উপকরণ, পড়ে আছে বলে সেই আত্মীয় তাকে সম্পূর্ণ ভুলতে পারলে না। পথে ঘাটে পদে পদে মিলনের নানা অভিজ্ঞান চোখে পড়ে। কিন্তু সেগুলির সংস্কার হতে পায় নি ব’লে কালের হাতে সেই-সব অভিজ্ঞান কিছু গেছে ক্ষয়ে, কিছু বেঁকেচুরে, কিছু গেছে লুপ্ত হয়ে । সেই-সব অভিজ্ঞানের অবিচ্ছিন্ন সংগতি আর পাওয়া যায় না। তার অর্থ কিছু গেছে ঝাপসা হয়ে, কিছু গেছে টুকরো হয়ে । তার ফল হয়েছে এই, যেখানে-যেখানে ফাক পড়েছে সেই ফাকটা এখানকার মানুষের মন আপন স্থষ্টি দিয়ে ভরিয়েছে। হিন্দুধর্মের ভাঙাচোরা কাঠামো নিয়ে এখানকার মানুষ আপনার একটা ধর্ম, একটা সমাজ, গড়ে তুলেছে। এখানকার এক সময়ের শিল্পকলায় দেখা যায় পুরোপুরি হিন্দুর প্রভাব ; তার পরে দেখা যায় সে প্রভাব ক্ষীণ ও বিচ্ছিন্ন। তবু যে ক্ষেত্রকে হিন্দু উর্বর করে দিয়ে গেছে সেই ক্ষেত্রে এখানকার স্বস্থানীয় প্রতিভা প্রচুরভাবে আপনার ফসল ফলিয়েছে। এখানে একটা বহুছিদ্র পুরোনো ইতিহাসের ভূমিকা দেখি ; সেই আধভোলা ইতিহাসের ছেদগুলো দিয়ে এ দেশের স্বকীয় চিত্ত নিজেকে প্রকাশ করছে । বালিতে সব-প্রথমে কারেম-আসন বলে এক জায়গার রাজবাড়িতে আমার থাকবার কথা । সেখানকার রাজা ছিলেন বাংলির শ্রাদ্ধ-উৎসবে। পারিষদ-সহ বালির ওলন্দাজ গবর্নর সেখানে মধ্যাহ্নভোজন করলেন, সেই ভোজে আমরাও ছিলেম। ভোজ শেষ করে যখন উঠলেম তখন বেলা তিনটে । সকালে সাড়ে-ছটার সময় জাহাজ থেকে নেমেছি ; ঘাটের থেকে মোটরে আড়াই ঘণ্টা & 8 দশম পত্র বাকানি ও ধুলো খেয়ে যজ্ঞস্থলে আগমন। এখানে ঘোরাঘুরি দেখাশুনা সেরে বিনা স্বানেই অত্যন্ত ক্লান্ত ও ধূলিমান অবস্থায় নিতান্ত বিতৃষ্ণার সঙ্গে খেতে বসেছি ; দীর্ঘকালপ্রসারিত সেই ভোজে আহার ও আলাপ-আপ্যায়ন সেরে আমাদের নিমন্ত্রণকর্তা রাজার সঙ্গে তার মোটরগাড়িতে চড়ে আবার সুদীর্ঘপথ ভেঙে চললুম তার প্রাসাদে। প্রাসাদকে এরা পুরী বলে। রাজার ভাষা আমি জানি নে, আমার ভাষা রাজা বোঝেন না— বোঝাবার লোকও কেউ সঙ্গে নেই। চুপ করে গাড়ির জানাল দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলুম। মস্ত সুবিধে এই, এখানকার প্রকৃতি বালিনি ভাষায় কথা কয় না ; সেই শু্যামার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখি আর অরসিক মোটরগাড়িটাকে মনে মনে অভিশাপ দিই। মনে পড়ল, কখনো কখনো শুষ্কচিত্ত গাইয়ের মুখে গান শুনেছি ; রাগিণীর যেটা বিশেষ দরদের জায়গা, যেখানে মন প্রত্যাশা করছে গাইয়ের কণ্ঠ অত্যুচ্চ আকাশের চিলের মতো পাখাটা ছড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ স্থির থাকবে কিম্বা দুই-একটা মাত্র মীড়ের ঝাপটা দেবে, গানের সেই মর্মস্থানের উপর দিয়ে যখন সেই সংগীতের পালোয়ান তার তানগুলোকে লোটন-পায়রার মতো পালটিয়ে পালটিয়ে উড়িয়ে চলেছে, তখন কিরকম বিরক্ত হয়েছি। পথের দুই ধারে গিরি অরণ্য সমুদ্র, আর সুন্দর সব ছায়াবেষ্টিত লোকালয়, কিন্তু মোটরগাড়িটা দুন-চৌদুন মাত্রায় চাকা চালিয়ে ধুলো উড়িয়ে চলেছে, কোনো-কিছুর পরে তার কিছুমাত্র দরদ নেই ; মনটা ক্ষণে ক্ষণে বলে উঠছে, ‘আরে, রোসে৷ রোসো, দেখে নিই।” কিন্তু, এই কল-দৈত্য মনটাকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় ; তার একমাত্র ধুয়ে, সময় নেই– সময় নেই। এক জায়গায় যেখানে বনের ফঁাকের ভিতর দিয়ে নীল সমুদ্র দেখা গেল ●红 জাভা-যাত্রীর পত্র রাজা আমাদের ভাষাতেই বলে উঠলেন সমুদ্র ; আমাকে বিস্মিত ও আনন্দিত হতে দেখে আউড়ে গেলেন, ‘সমুদ্র, সাগর, অব্ধি, জলাঢ্য। তার পরে বললেন, সপ্তসমুদ্র, সপ্তপর্বত, সপ্তবন, সপ্ত-আকাশ ।’ তার পরে পর্বতের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন ‘অদ্রি’ ; তার পরে বলে গেলেন, ‘সুমেরু, হিমালয়, বিন্ধ্য, মলয়, ঋষ্যমূক । এক জায়গায় পাহাড়ের তলায় ছোটাে নদী বয়ে যাচ্ছিল, রাজা আউড়িয়ে গেলেন, ‘গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা, গোদাবরী, কাবেরী, সরস্বতী। অামাদের ইতিহাসে একদিন ভারতবর্ষ অাপন ভৌগোলিক সত্তাকে বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিল ; তখন সে আপনার নদীপৰ্বতের ধ্যানের দ্বারা আপন ভূমূর্তিকে মনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিল। তার তীর্থগুলি এমন করে বাধা হয়েছে— দক্ষিণে কন্যাকুমারী, উত্তরে মানসসরোবর, পশ্চিমসমুদ্রতীরে দ্বারকা, পূর্বসমুদ্রে গঙ্গাসংগম— যাতে করে তীর্থভ্রমণের দ্বারা ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ রূপটিকে ভক্তির সঙ্গে মনের মধ্যে গভীরভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। ভারতবর্ষকে চেনবার এমন উপায় আর কিছু হতে পারে না। তখন পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করতে হত, সুতরাং তীর্থভ্রমণের দ্বারা কেবল যে ভারতবর্ষের ভূগোল জানা যেত তা নয়, তার নানাজাতীয় অধিবাসীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় আপনিই হত । সেদিন ভারতবর্ষের আত্মোপলব্ধি একটা সত্যসাধনা ছিল ব'লেই তার আত্মপরিচয়ের পদ্ধতিও আপনিই এমন সত্য হয়ে উঠেছিল। যথার্থ শ্রদ্ধা কখনও ফাকি দিয়ে কাজ সারতে চায় না। অর্থাৎ, রাষ্ট্রসভার রঙ্গমঞ্চের উপর ক্ষণিক মিলনের অভিনয়কেই সে মিলন বলে নিজেকে ভোলাতে চায় না । সেদিন মিলনের সাধনা ছিল অকৃত্রিম নিষ্ঠার সাধনা ৷ সেদিনকার ভারতবর্ষের সেই আত্মমূর্তিধ্যান সমুদ্র পার হয়ে & So দশম পত্র পূর্বমহাসাগরের এই সুদূর দ্বীপপ্রান্তে এমন করে স্থান পেয়েছিল যে, অাজ হাজার বছর পরেও সেই ধ্যানমন্ত্রের আবৃত্তি এই রাজার মুখে ভক্তির সুরে বেজে উঠল, এতে আমার মনে ভারী বিস্ময় লাগল। এই-সব ভৌগোলিক নামমাল এদের মনে আছে বলে নয়, কিন্তু যে প্রাচীন যুগে এই নামমালা এখানে উচ্চারিত হয়েছিল সেই যুগে এই উচ্চারণের কী গভীর অর্থ ছিল সেই কথা মনে ক’রে । সেদিনকার ভারতবর্ষ আপনার ঐক্যটিকে কত বড়ো আগ্রহের সঙ্গে জানছিল আর সেই জানাটিকে স্থায়ী করবার জন্যে, ব্যাপ্ত করবার জন্যে, কিরকম সহজ উপায় উদ্ভাবন করেছিল তা স্পষ্ট বোঝা গেল আজ এই দূর দ্বীপে এসে— যে দ্বীপকে ভারতবর্ষ ভুলে গিয়েছে। রাজা কিরকম উৎসাহের সঙ্গে হিমালয় বিন্ধ্যাচল গঙ্গা যমুনার নাম করলেন, তাতে কিরকম তার গর্ব বোধ হল! অথচ, এ ভূগোল বস্তুত তাদের নয় ; রাজা যুরোপীয় ভাষা জানেন না, झैनि আধুনিক স্কুলে-পড়া মানুষ নন ; সুতরাং পৃথিবীতে ভারতবর্ষ জায়গাটি-যে কোথায় এবং কিরকম সে সম্বন্ধে সম্ভবত তার অস্পষ্ট ধারণা— অন্তত বাহ্যত এ ভারতবর্ষের সঙ্গে তাদের কোনো ব্যবহারই নেই। তবুও হাজার বছর আগে এই নামগুলির সঙ্গে যে মুর মনে বাধা হয়েছিল সেই সুর আজও এ দেশের মনে বাজছে । সেই স্থরটি কত বড়ো খাটি স্থর ছিল তাই আমি ভাবছি। আমি কয়েক বছর আগে ভারতবিধাতার যে জয়গান রচনা করেছি তাতে ভারতের প্রদেশগুলির নাম গেথেছি-- বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গার নামও আছে। কিন্তু, আজ আমার মনে হচ্ছে, ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশের ও সমুদ্রপর্বতের নামগুলি ছন্দে গেথে কেবলমাত্র একটি দেশপরিচয় গান আমাদের লোকের মনে গেথে দেওয়া ভালো । দেশাত্মবোধ বলে একটা শব্দ আজকাল আমরা কথায় কথায় ব্যবহার করে ¢ ግ জাভা-যাত্রীর পত্র থাকি, কিন্তু দেশাত্মজ্ঞান নেই যার তার দেশাত্মবোধ হবে কেমন করে । তার পরে রাজা আউড়ে গেলেন সপ্তসমুদ্র, সপ্তপর্বত, সপ্তবন, সপ্ত-আকাশ-- অর্থাৎ, তখনকার দিনে ভারতবর্ষ বিশ্বভূবৃত্তান্ত যেরকম কল্পনা করেছিল তারই স্মৃতি । আজ নূতন জ্ঞানের প্রভাবে সেই স্মৃতি নির্বাসিত, কেবল তা পুরাণের জীর্ণ পাতায় আটকে রয়েছে, কিন্তু এখানকার কণ্ঠে এখনও তা শ্রদ্ধার সঙ্গে ধ্বনিত। তার পরে রাজা চার বেদের নাম, যম বরুণ প্রভৃতি চার লোকপালের নাম, মহাদেবের নামাষ্টক বলে গেলেন ; ভেবে ভেবে মহাভারতের অষ্টাদশ পর্বের নাম বলতে লাগলেন, সবগুলি মনে এল না । রাজপুরীতে প্রবেশ করেই দেখি, প্রাঙ্গণে একটি বেদীর উপর বিচিত্র উপকরণ সাজানো ; এখানকার চারজন ব্রাহ্মণ— একজন বুদ্ধের, একজন শিবের, একজন ব্রহ্মার, একজন বিষ্ণুর পূজারি— মাথায় মস্ত উচু কারুখচিত টুপি, টুপির উপরিভাগে কাচের তৈরি এক-একটা চূড়া। এরা চারজন পাশাপাশি বসে আপন-আপন দেবতার স্তবমন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন। একজন প্রাচীন এবং একজন বালিকা অর্ঘ্যের থালি হাতে করে দাড়িয়ে। সবসুদ্ধ সাজসজ্জা খুব বিচিত্র ও সমারোহবিশিষ্ট । পরে শোনা গেল, এই মাঙ্গল্যমন্ত্রপাঠ চলছিল রাজবাড়িতে আমারই আগমন-উপলক্ষে। রাজা বললেন, আমার আগমনের পুণ্যে প্রজাদের মঙ্গল হবে, ভূমি সফল হবে, এই কামনায় স্তবমন্ত্রের আবৃত্তি। রাজা বিষ্ণুবংশীয় বলে নিজের পরিচয় দিলেন । বেলা সাড়ে-চারটের সময় স্নান করে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলুম। কারও মুখে কথা নেই। ঘণ্টা-হুয়েক এই ভাবে যখন গেল তখন রাজা স্থানীয় বাজার থেকে বোম্বাই প্রদেশের এক খোজ ( Եր দশম পত্র মুসলমান দোকানদারকে তলব দিয়ে আনালেন। কী আমার প্রয়োজন, কিরকম আহারাদির ব্যবস্থা আমার জন্তে করতে হবে, ইত্যাদি প্রশ্ন । আমি রাজাকে জানাতে বললুম, তিনি যদি আমাকে ত্যাগ করে বিশ্রাম করতে যান তা হলেই আমি সব চেয়ে খুশি হব। তার পরদিনে রাজবাড়ির কয়েকজন ব্রাহ্মণপণ্ডিত তালপাতার পুথিপত্র নিয়ে উপস্থিত। একটি পুথি মহাভারতের ভীষ্মপর্ব। এইখানকার অক্ষরেই লেখা ; উপরের পংক্তি সংস্কৃত ভাষায়, নীচের পংক্তিতে দেশী ভাষায় তারই অর্থব্যাখ্যা । কাগজের একটি পুথিতে সংস্কৃত শ্লোক লেখা । সেই শ্লোক রাজা পড়ে যেতে লাগলেন ; উচ্চারণের বিকৃতি থেকে বহু কষ্টে তাদের উদ্ধার করবার চেষ্টা করা গেল। সমস্তটা যোগতত্ত্বের উপদেশ। চিত্তবুদ্ধি, ত্রি-অক্ষরাত্মক ওঁ, চন্দ্রবিন্দু এবং অন্য সমস্ত শব্দ ও ভাবনা বর্জন করে শুদ্ধচৈতন্যযোগে মুখমাপুয়াং– এই হচ্ছে সাধনা। আমি রাজাকে আশ্বাস দিলেম যে, আমরা এখানে যে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত পাঠিয়ে দেব, তিনি এখানকার গ্রন্থগুলি থেকে বিকৃত ও বিস্মৃত পাঠ উদ্ধার করে তার অর্থব্যাখ্যা করে দিতে পারবেন। এ দিকে আমার শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত হতে চলল। প্রতি মুহুর্তে বুঝতে পারলুম, আমার শক্তিতে কুলোবে না। সৌভাগ্যক্রমে সুনীতি আমাদের সঙ্গে আছেন ; তার অশ্রান্ত উদ্যম, অদম্য উৎসাহ । তিনি ধুতি প’রে, কোমরে পট্টবস্ত্র জড়িয়ে, পেদণ্ড’ অর্থাৎ এখানকার ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বসে গেলেন । র্তার সঙ্গে আমাদের দেশের পূজোপকরণ ছিল ; পূজাপদ্ধতি তাদের দেখিয়ে দিলেন। আলাপআলোচনায় সকলকেই তিনি আগ্রহান্বিত করে তুলেছেন। যখন দেখা গেল, আমার শরীর আর সইতে পারছে না, তখন (tò জাভা-যাত্রীর পত্র আমি রাজপুরী থেকে পালিয়ে এই আম্পল-তীর্থাশ্রমেযু নির্বাসন গ্রহণ করলুম। এখানে লোকের ভিড় নেই, অভ্যর্থনা-পরিচর্যার উপদ্রব নেই। চার দিকে সুন্দর গিরিব্রজ, শস্যশ্যামল উপত্যক, জনপদবধূদের স্নানসেবায় চঞ্চল উৎসজলসঞ্চয়ের অবিরত কলপ্রবাহ, শৈলতটে নির্মল নীলাকাশে নারিকেলশাখার নিত্য আন্দোলন ; আমি বসে আছি বারান্দায়, কখনও লিখছি, কখনও সামনে চেয়ে দেখছি । এমন সময় হঠাৎ এসে থামল এক মোটরগাড়ি । গিয়ানয়ারের রাজা ও এই প্রদেশের একজন ওলন্দাজ রাজপুরুষ নেমে এলেন । এর বাড়িতে আমার নিমন্ত্রণ । অন্তত এক রাত্রি যাপন করতে হবে । প্রসঙ্গক্রমে আপনিই মহাভারতের কথা উঠল। মহাভারতের যে-কয়ট পর্ব এখনও এখানে পাওয়া যায় তাই তিনি অনেক ভেবে ভেবে আউড়িয়ে গেলেন । বাকি পর্ব কী তাই তিনি জানতে চান। এখানে কেবল আছে, আদিপর্ব, বিরাটপর্ব, উদ্যোগ-পর্ব, ভীষ্মপর্ব, আশ্রমবাসপৰ্ব, মূষলপর্ব, প্রস্থানিকপর্ব, স্বর্গারোহণপৰ্ব । মহাভারতের কাহিনীগুলির উপরে এ দেশের লোকের চিত্ত বাসা বেঁধে আছে । তাদের আমোদে আহলাদে কাব্যে গানে অভিনয়ে জীবনযাত্রায় মহাভারতের সমস্ত চরিত্রগুলি বিচিত্রভাবে বর্তমান। অর্জন এদের আদর্শ পুরুষ। এখানে মহাভারতের গল্পগুলি কিরকম বদলে গেছে তার একটা দৃষ্টান্ত দিই। সংস্কৃত মহাভারতের শিখণ্ডী এখানে শ্ৰীকান্তি নাম ধরেছে। শ্ৰীকান্তি অর্জনের স্ত্রী। তিনি যুদ্ধের রথে অর্জনের সামনে থেকে ভীষ্মবধের সহায়তা করেছিলেন । এই শ্ৰীকান্তি এখানে সতী স্ত্রীর আদর্শ। গিয়ানয়ারের রাজা আমাকে অনুরোধ করে গেলেন, আজ রাত্রে মহাভারতের হারানো পর্ব প্রভৃতি পৌরাণিক বিষয় নিয়ে ৬e দশম পত্র তিনি আমার সঙ্গে আলোচনা করতে চান। আমি তাকে স্থনীতির কথা বলেছি ; সুনীতি তাকে শাস্ত্রবিষয়ে যথাজান সংবাদ দিতে পারবেন । ভারতের ভূগোলস্মৃতি সম্বন্ধে একটা কথা আমার মনে আন্দোলিত হচ্ছে। নদীর নামমালার মধ্যে সিন্ধু ও শতদ্রু প্রভৃতি পঞ্চনদের নাম নেই, ব্রহ্মপুত্রের নামও বাদ পড়েছে। অথচ, দক্ষিণের প্রধান নদীগুলির নাম দেখছি। এর থেকে বোঝা যায়, সেই যুগে পঞ্জাবপ্রদেশ শক হন যবন ও পারসিকদের দ্বারা বারবার বিধ্বস্ত ও অধিকৃত হয়ে ভারতবর্ষ থেকে যেন বিদ্যায় সভ্যতায় স্থলিত হয়ে পড়েছিল ; অপর পক্ষে ব্ৰহ্মপুত্র নদের দ্বারা অভিষিক্ত ভারতের পূর্বতম দেশ তখনও যথার্থরূপে হিন্দুভারতের অঙ্গীভূত হয় নি। এই তো গেল এখানকার বিবরণ। আমার নিজের অবস্থাটা যেরকম দেখছি তাতে এখানে আমার ভ্রমণ সংক্ষেপ করতে হবে। ৩১ অগস্ট ১৯২৭ কারেম আসন । বালি बैंबर्टो ौब्रl cझर्रोक जिथिङ । も。 SS কল্যাণীয়েযু রথী, বালিদ্বীপটি ছোটো, সেইজন্যেই এর মধ্যে এমন একটি সুসজ্জিত সম্পূর্ণতা । গাছে-পালায় পাহাড়ে-ঝরনায় মন্দিরে-মূর্তিতে কুটীরে-ধানখেতে হাটে-বাজারে সমস্তটা মিলিয়ে যেন এক। বেখাপ কিছু চোখে ঠেকে না। ওলন্দাজ গবর্মেন্ট, বাইরে থেকে কারখানাওয়ালাদের এই দ্বীপে আসতে বাধা দিয়েছে ; মিশনরিদেরও এখানে আনাগোনা নেই। এখানে বিদেশীদের জমি কেনা সহজ নয়, এমন-কি চাষবাসের জন্যেও কিনতে পারে না । আরবি মুসলমান, গুজরাটের খোজা মুসলমান, চীনদেশের ব্যাপারীরা এখানে কেনা-বেচা করে— চার দিকের সঙ্গে সেটা বেমিল হয় না ; গঙ্গার ধার জুড়ে দ্বাদশ দেউলগুলিকে লজ্জিত করে বাংলাদেশের বুকের উপর জুটমিল যে নিদারুণ অমিল ঘটিয়েছে এ সেরকম নয়। গ্রামের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ গ্রামের লোকেরই হাতে। এখানে খেতে জলসেকের আর চাষবাসের যে রীতিপদ্ধতি সে খুব উৎকৃষ্ট। এর ফসল যা ফলায় পরিমাণে তা অন্ত দেশের চেয়ে অনেক বেশি। কাপড় বোনে নানা রঙচঙ ও কারুকৌশলে । অর্থাৎ, এর কোনো মতে ময়লা ট্যান কোমরে জড়িয়ে শরীরটাকে অনাদৃত করে রাখে না। তাই, যেখানে কোনো কারণে ভিড় জমে, বর্ণচ্ছটার সমাবেশে সেখানটা মনোরম হয়ে ওঠে । মেয়েদের উত্তর অঙ্গ অনাবৃত। এ সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠলে তারা বলে, “আমরা কি নষ্ট মেয়ে যে, বুক ঢাকব । শোনা গেল, বালীতে বেশ্বারাই বুকে কাপড় দেয়। মোটের উপর এখানকার মেয়ে-পুরুষের দেহসৌষ্ঠব ও মুখের চেহারা ভালোই । বেঢপ মোটা বা রোগা আমি তো এ পর্যন্ত দেখি নি। এখানকার পরিপুষ্ট শু্যামল প্রকৃতির সঙ্গে এখানকার পাটল ఆశి “অবলা রমণীকে অরক্ষিত অবস্থায় সবুজ পাগড়িধারীর হাতে সমৰ্পণ ক’রে দিতে সংকোচ নেই এই বুঝি তোমার শিভলরি। শেষকালে ওর টানাটানিতে শশাঙ্ক কাজ ফেলে যায় মোটর হাকিয়ে। এইরকম উৎপাত চলছে টের পেলে শমিলা বিষম বিরক্ত হয়। কেননা ওর মতে পুরুষের সাধনার ক্ষেত্ৰে মেয়েদের অনধিকার প্রবেশ কোনোমতেই মাৰ্জনীয় নয়। উমিকে শমি লা বরাবর ছেলেমানুষ ব’লেই জেনেছে। আজো সেই ধারণাটা ওর মনে অাছে। তা হোক, তাই ব’লে অাপিসঘর তো ছেলেখেলার জায়গা নয়। তাই উমিকে ডেকে যথেষ্ট কঠিনভাবেই তিরস্কার করে। সে তিরস্কারের নিশ্চিত ফল হোতে পারত, কিন্তু শ্রীর কুদ্ধ কণ্ঠস্বর শুনে শশাঙ্ক স্বয়ং দরজার বাইরে এসে দাড়িয়ে উমি কে আশ্বাস দিয়ে চোখ টিপতে থাকে। তাসের প্যাক দেখিয়ে ইশারা করে, ভাবখানা এই যে, “চলে এসো, অাপিসঘরে বসে তোমাকে পোকার খেলা শেখাব।” এখন খেলার সময় একেবারেই নয়, এবং খেলবার কথা মনে অানবারও সময় ও অভিপ্ৰায় ওর ছিল না। কিন্তু দিদির কঠোর ভৎ সনায় উমির মনে বেদনা লাগছে এটা তাকে যেন উমির চেয়েও বেশি বাজে । ও নিজেই তাকে অনুনয়, এমন কি ঈষৎ তিরস্কার ক’রে কাজের ক্ষেত্ৰ থেকে সরিয়ে রাখতে পারত কিন্তু শৰ্মিলা যে এই নিয়ে উমিকে শাসন করবে এইটে সহ করা ওর পক্ষে বড়ো কঠিন । শমিলা শশাঙ্ককে ডেকে বলে, “তুমি ওর সব অাবদার এমন ক’রে শুনলে চলবে কেন । সময় নেই , অসময় নেই, তোমার কাজের লোকসান হয় যে ।” শশাঙ্ক বলে , “অাহা ছেলেমানুষ, এখানে ওর সঙ্গী নেই কেউ, একটু খেলাধুলা না পেলে বাঁচবে কেন ।” এই তো গেল নানাপ্ৰকার ছেলেমানুষি । ওদিকে শশাঙ্ক যখন বাড়ি তৈরির প্ল্যান নিয়ে পড়ে, ও তার পাশে চোঁকি টেনে নিয়ে এসে বলে, বুঝিয়ে দাও । সহজেই বোঝে, গাণিতিক নিয়মগুলো জটিল ঠেকে না । শশাঙ্ক ভারি খুশি হয়ে উঠে ওকে প্ৰব্লেম দেয়, ও কষে নিয়ে আসে । জুট্‌ কোম্পানীর । সটীমলঞ্চে শশাঙ্ক কাজ তদন্ত করতে যায়, ও ধ’রে বসে, আমিও যাব । শুধু যায় তা নয়, মাপজোখের হিসাব নিয়ে তৰ্ক করে, শশাঙ্ক পুলকিত হয়ে ওঠে । ভরপুর কবিত্বের চেয়ে এর রস বেশি । এখন তাই চেম্বারের কাজ যখন বাড়িতে নিয়ে অাসে তা নিয়ে ওর মনে আশঙ্কা থাকে না॥ লাইন টানা আঁকি কষার কাজে তার সঙ্গী জুটেছে। উৰ্মিকে পাশে নিয়ে বুঝিয়ে বুঝিয়ে কাজ এগোয়। খুব দ্ৰুত বেগে এগোয় না বটে, কিন্তু সময়ের দীৰ্ঘতাকে সাৰ্থক মনে হয়। এইখানটাতে শমিলাকে রীতিমতো ধাক্কা দেয়। উৰ্মির ছেলেমানুষিও সে বোঝে, তার গৃহিণীপনার ক্ৰটিও সস্নেহে সহ্য করে, কিন্তু ব্যবসায়ের ক্ষেত্ৰে স্বামীর সঙ্গে স্ত্ৰীবুদ্ধির দূরত্বকে স্বয়ং অনিবাৰ্য ব’লে মেনে নিয়ে ছিল সেখানে উৰ্মির অবাধে গতিবিধি ওর একটুও ভালো লাগে না। ওটা নিতান্তই সম্পধা। অাপন অাপন সীমা মেনে চলাকেই গীতা বলেন স্বধৰ্ম। মনে মনে অত্যন্ত অধীর হয়েই একদিন ওকে জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা উৰ্মি, তোর কি ঐসব আঁকা জোখা আঁাক কষা ট্ৰেস করা সত্যই ভালো লাগে।” “অামার ভারি ভালো লাগে দিদি।” শমিলা অবিশ্বাসের সুরে বললে, “হঁঃ, ভালো লাগে। ওকে খুশি করবার জন্যেই দেখাস যেন ভালো লাগে।” না হয় তাই হোলো। খাওয়ানোপরানো সেবাযত্নে শশাঙ্ককে খুশি করাটা তো শমিলার মনঃপূত । কিন্তু এই জাতের খুশিটা ওর নিজের খুশির জাতের সঙ্গে মেলে শশাঙ্ককে বারবার ডেকে বলে, “ওকে নিয়ে সময় নষ্ট করে। কেন । ওতে যে তোমার কাজের ক্ষতি হয় । ও ছেলেমানুষ, এসব কী বুঝবে ।” শশাঙ্ক বলে, “অামার চেয়ে কম বোঝে না ।” মনে করে এই প্ৰশংসায় দিদিকে বুঝি আনন্দ দেওয়াই হোলো । নিৰ্বোধ । নিজের কাজের গোরবে শশাঙ্ক যখন অাপন স্তীর প্ৰতি মনোযোগকে খাটো করেছিল, তখন শমি লা সেটা যে শুধু অগত্যা মেনে নিয়েছিল তা নয়, তাতে সে গর্ব বোধ করত । তাই ইদানীং আপন সেবাপরায়ণ হৃদয়ের দাবি অনেক পরিমাণেই কমিয়ে এনেছে । ও বলত, পুরুষমানুষ রাজার জাত, দুঃসাধ্য কৰ্মের অধিকার ওদের নিয়তই প্ৰশস্ত করতে হবে । নইলে তারা মেয়েদের চেয়েও নীচু হয়ে যায়। কেননা মেয়েরা আপন স্বাভাবিক মাধুৰ্য ভালোবাসার জন্মগত ঐশ্বৰ্যেই সংসারে প্রতিদিন অাপন অাসনকে সহজেই সাৰ্থক করে । কিন্তু পুরুষের নিজেকে সাৰ্থক করতে হয় প্ৰত্যহ যুদ্ধের দ্বারা। সেকালে রাজারা বিনা প্ৰয়োজনেই রাজ্যবিস্তার করতে বেরোত। রাজ্যলোভের জন্যে নয়, নুতন ক’রে পেীরুষের গৌরব প্ৰমাণের জন্যে। এই গৌরবে মেয়েরা যেন বাধা না দেয়। শৰ্মিলা বাধা দেয়নি, ইচ্ছা ক’রেই শশাঙ্ককে তার লক্ষ্যসাধনায় সম্পূৰ্ণ পথ ছেড়ে দিয়েছে। একসময়ে তাকে ওর সেবাজালে জড়িয়ে ফেলেছিল, মনে দুঃখ পেলেও সেই জালকে ক্ৰমশ খৰ্ব করে এনেছে। এখনো সেবা যথেষ্ট করে অদৃশ্যে নেপথ্যে। হায় রে, অাজ ওর স্বামীর এ কী পরাভব দিনে দিনে প্ৰকাশ হয়ে পড়ছে। রোগশয্যা থেকে সব ও দেখতে পায় না, কিন্তু যথেষ্ট আভাস পায়। শশাঙ্কের মুখ দেখলেই বুঝতে পারে সে যেন সৰ্বদাই কেমন আবিষ্ট হয়ে অাছে। ঐ একত্তি মেয়েটা এসে অল্প এই কদিনেই এতবড়ো সাধনার আসন থেকে ঐ কৰ্মকঠিন পুরুষকে বিচলিত করে দিলে। অাজ স্বামীর এই অশ্ৰদ্ধয়তা শমিলাকে রোগের বেদনার চেয়েও বেশি করে বাজছে। শশাঙ্কের অাহারবিহার বেশবাসের চিরাচরিত ব্যবস্থায় নানারকম ক্ৰটি হচ্ছে সন্দেহ নেই। যে পথ্যটা তার 이 8 দুই বোন বিশেষ রুচিকর, সেটাই খাবার সময় হঠাৎ দেখা যায় অবর্তমান । তার কৈফিয়ত মেলে, কিন্তু কোনো কৈফিয়তকে এ সংসার এতদিন আমল দেয়নি । এসব অনবধানতা ছিল অমার্জনীয়, কঠোর শাসনের যোগ্য ; সেই বিধিবদ্ধ সংসারে আজ এতবড়ে যুগান্তর ঘটেছে যে গুরুতর ক্রটিগুলোও প্রহসনের মতো হয়ে উঠল। দোষ দেব কা’কে । দিদির নির্দেশমতে উমি যখন রান্নাঘরে বেতের মোড়ার উপর ব’সে পাক প্রণালীর ' পরিচালনকার্যে নিযুক্ত, সঙ্গে সঙ্গে পাচক ঠাকরুনের পূর্বজীবনের বিবরণগুলির পর্যালোচনাও চলছে, এমন সময় শশাঙ্ক হঠাৎ এসে বলে, “ওসব এখন থাক।” “কেন কী করতে হবে ।” “আমার এবেল ছুটি আছে, চলো, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বিলডিংটা দেখবে। ওটার গুমর দেখলে হাসি পায় কেন তোমাকে বুঝিয়ে দেব।” এতবড়ো প্রলোভনে কর্তব্যে ফাকি দিতে উৰ্মির মনও তৎক্ষণাৎ চঞ্চল হয়ে ওঠে । শৰ্মিলা জানে পাকশাল থেকে তার সহোদরার অন্তর্ধানে আহার্যের উৎকর্ষসাধনে কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না, তবু স্নিগ্ধ * 3. দুই বোন ዓ¢ হৃদয়ের যত্নটুকু শশাঙ্কের আরামকে অলংকৃত করে । কিন্তু আরামের কথা তুলে কী হবে, যখন প্রতিদিনই স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, আরামটা সামান্ত হয়ে গেছে, স্বামী হয়েছে খুশি । এইদিক থেকে শমিলার মনে এল অশান্তি । রোগশয্যায় এপাশ-ওপাশ ফিরতে ফিরতে নিজেকে বার বার ক’রে বলছে, “মরবার আগে ঐ কথাটুকু বুঝে গেলুম ; আর সবই করেছি, কেবল খুশি করতে পারিনি । ভেবেছিলুম উর্মিমালার মধ্যে নিজেকেই দেখতে পাব, কিন্তু ও তো আমি নয়, ও যে সম্পূর্ণ আর এক মেয়ে ।” জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবে, “আমার জায়গা ও নেয়নি, ওর জায়গা আমি নিতে পারব না । অামি চলে গেলে ক্ষতি হবে কিন্তু ও চলে গেলে সব শূন্ত হবে o ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, শীতের দিন আসছে, গরম কাপড়গুলো রোদরে দেওয়া চাই। উমি। তখন শশাঙ্কর সঙ্গে পিং পং খেলছিল, ডেকে পাঠালে । বললে, “উমি, এই নে চাবি । গরম কাপড়গুলে। ছাদের উপর রোদে মেলে দে গে।” উমি অালমারিতে চাবি সবেমাত্র লাগিয়েছে এমন يضا ዓõ দুই বোন সময় শশাঙ্ক এসে বললে, “ওসব পরে হবে, ঢের সময় আছে । খেলাটা শেষ করে যাও ।” “কিন্তু দিদি— “আচ্ছা, দিদির কাছে ছুটি নিয়ে আসছি।” দিদি ছুটি দিলে, সেই সঙ্গে বড়ো একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল । দাসীকে ডেকে বললে, “দে তো আমার মাথায় । ঠাণ্ডাজলের পটি ” যদিও অনেকদিন পরে হঠাৎ উমি ছাড়া পেয়ে যেন আত্মবিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল, তবু সহসা এক-একদিন মনে পড়ত ওর জীবনের কঠিন দায়িত্ব । ও তো স্বাধীন নয়, ও যে বাধা ওর ব্রতের সঙ্গে । তারি সঙ্গে মিলিয়ে যে-বাধন ওকে ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে বেঁধেছে তার অনুশাসন আছে ওর পরে । ওর দৈনিক কর্তব্যের খুটিনাটি সেই তো স্থির করে দিয়েছে। ওর জীবনের পরে তার চিরকালের অধিকার এ-কথা উমি কোনোমতে অস্বীকার করতে পারে না। যখন নীরদ উপস্থিত ছিল স্বীকার করা সহজ ছিল, জোর পেত মনে । এখন ওর ইচ্ছে একেবারেই বিমুখ হয়ে গেছে অথচ কৰ্তব্য বুদ্ধি তাড়া দিচ্ছে। কৰ্তব্য বুদ্ধির অত্যাচারেই মন আরো যাচ্ছে বিগড়িয়ে। নিজের অপরাধ ক্ষমা করা কঠিন হয়ে উঠল ব’লেই অপরাধ প্ৰশ্ৰয় পেতে লাগল। বেদনায় অাফিমের প্রলেপ দেবার জন্যে শশাঙ্কের সঙ্গে খেলায় অামাদে নিজেকে সৰ্ব্বক্ষণ ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। বলে, যখন সময় আসবে তখন আপনি সব ঠিক হয়ে যাবে, এখন যে-কয়দিন ছুটি ওসব কথা থাক্। আবার হঠাৎ এক-একদিন মাথা বাকানি দিয়ে বই খাতা টাঙ্কের থেকে বের করে তার উপরে মাথা গুজে বসে। তখন শশাঙ্কর পালা। বইগুলো টেনে নিয়ে পুনরায় বাক্সজাত ক’রে সেই বাক্সর উপর সে চেপে বসে। উৰ্মি বলে, “শশাঙ্কদা, ভারি অন্যায়। অামার সময় নষ্ট কোরো না।” শশাঙ্ক বলে, “তোমার সময় নষ্ট করতে গেলে অামারো সময় নষ্ট। অতএব শোধবোধ।” তারপরে খানিকক্ষণ কাড়াকড়ির চেষ্টা ক’রে অবশেষে উমি হার মানে। সেটা যে ওর পক্ষে নিতান্ত অাপত্তিজনক তা মনে হয় না। এইরকম বাধা পেলেও কৰ্তব্য বুদ্ধির পীড়ন দিনপাঁচ-ছয় একাদিক্ৰমে চলে তারপরে অাবার তার জোর কমে যায়। . বলে, “শশাঙ্কদা, অামাকে দুৰ্বল মনে কোরো না। মনের মধ্যে প্ৰতিজ্ঞা দৃঢ় করেই রেখেছি।” “অৰ্থাৎ?” “অৰ্থাৎ এখানে ডিগ্রি নিয়ে যুরোপে যাব ডাক্তারি শিখতে।” “তার পরে?” “তার পরে হাসপাতাল প্ৰতিষ্ঠা ক’রে তার ভার নেব।” “অার কার ভার নেবে। ঐ যে নীরদ মুখুজে ক’লে একটা ইনসাফারেবল” শশাঙ্কের মুখ চাপা দিয়ে উৰ্মি বলে “চুপ করে॥ এই সব কথা বলে। যদি তোমার সঙ্গে একেবারে ঝগড়া। হয়ে যাবে।” নিজেকে উৰ্মি খুব কঠিন ক’রে বলে, সত্য হোতে হবে অামাকে সত্য হোতে হবে। নীরদের সঙ্গে ওর যে-সম্বন্ধ বাবা স্বয়ং স্থির করে দিয়েছেন তার প্রতি খাটি না হোতে পারাকে ও অসতীত্ব ব’লে মনে করে। কিন্তু মুশকিল এই যে, অপর পক্ষ থেকে কোনো জোর পায় না। উৰ্মি যেন এমন একটি গাছ যা মাটিকে আঁকড়ে অাছে কিন্তু আকাশের আলো থেকে বঞ্চি পাতাগুলো পাণ্ডুবৰ্ণ হয়ে আসে। এক-একসময় অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, মনে মনে ভাবে, এ মানুষটা চিঠির মতো চিঠি লিখতে পারে না কেন। উমি অনেক কাল কনভেণ্ট পড়েছে। আর কিছু না হোক ইংরেজিতে ওর বিদ্যে পাকা। সে-কথা। নীরদের জানা ছিল। সেইজন্যেই ইংরেজি লিখে নীরদ ওকে অভিভূত করবে এই ছিল তার পণ। বাংলায় চিঠি লিখলে বিপদ বাচিত কিন্তু নিজের সম্বন্ধে বেচারা জানে না যে, সে ইংরেজি জানে না। ভারি ভারি শব্দ জুটিয়ে এনে, পুথিগত দীৰ্ঘপ্ৰস্থ বচন যোজনা ক’রে ওর বাক্যগুলোকে করে তুলত বস্তাবোবাই গোরুর গাড়ির মতো। উমির হাসি আসত, কিন্তু হাসতে সে লজা পেত, নিজেকে তিরস্কার ক’রে বলত বাঙালীর ইংরেজিতে ক্ৰটি হোলে তা নিয়ে দোষ ধরা॥ সুবিশ। দেশে থাকতে মোকাবিলায় যখন নীরদ ক্ষণে ক্ষণে সদুপদেশ দিয়েছে তখন ওর বুকুম-সকমে সেগুলো গভীর হয়ে উঠেছে গেীরবে। যতটা কানে শোনা যেত তার চেয়ে অান্দাজে তার ওজন হোত বেশি। লম্বা চিঠিতে আনন্দাজের জায়গা থাকে না। কোমর-বাধা ভারি ভারি কথা হালকা হয়ে যায়, মোটা মোট আওয়াজেই ধরা পড়ে বলবার বিষয়ের কমতি। নীরদের যে ভাবটা কাছে থাকতে ও সয়ে গিয়েছিল সেইটে দরের থেকে ওকে সবচেয়ে কাজে। লোকটা একেবারেই হাসতে জানে না। চিঠিতে সব চেয়ে প্ৰকাশ পায় সেই অভাবটা। এই নিয়ে শশাঙ্কের সঙ্গে তুলনা ওর মনে আপনিই এসে পড়ে। তুলনার একটা উপলক্ষ্য এই সেদিন হঠাৎ ঘটেছে। কাপড় খুজতে গিয়ে বাক্সের তলা থেকে বেরোল পশমে-বোনা একপাটি অসমাপ্ত জুতো। মনে পড়ে গেল চার বছর আগেকার কথা। তখন হেমন্ত ছিল বেঁচে। ওরা সকলে মিলে গিয়েছিল দাজিলিঙে। অামাদের অন্ত ছিল না। হেমন্তে অার শশাঙ্কে মিলে ঠাট্টাতামাশার পাগলা-বোরা বইয়ে দিয়েছিল। উমি তার এক মাসির কাছ থেকে পশমের কাজ নতুন শিখেছে। জন্মদিনে দাদাকে দেবে। ব’লে একজোড়া জুতো বুনছিল। তা নিয়ে শশাঙ্ক ওকে কেবলই ঠাট্টা করত, বলত, “দাদাকে আর যাই দাও, জুতো নয়, ভগবান মনু বলেছেন ওতে গুরুজনের অসন্মান হয়।” উৰ্মি কটাক্ষ ক’রে বলেছিল, “ভগবান মনু তবে কাকে প্ৰয়োগ করতে বলেন।” শশাঙ্ক গম্ভীর মুখে বললে, “অসম্মানের সনাতন অধিকার ভগ্নীপতির। অামার পাওনা অাছে। সেটা। সুদে ভারি হয়ে উঠল।” “মনে তো পড়ছে না॥” “পড়বার কথা নয়। তখন ছিলে নিতান্ত নাবালিকা। সেই কারণেই তোমার দিদির সঙ্গে শুভলগ্নে যেদিন এই সেীভাগ্যবানের বিবাহ হয়, সেদিন বাসর-রজনীর কৰ্ণধার পদ গ্ৰহণ করতে পারোনি। অাজ সেই কোমল করপল্লবের অরচিত কানমলাটাই রুপ গ্ৰহণ করছে সেই করপল্লবরচিত জুতো যুগলে। ওটার প্রতি আমার দাবি রইল জানিয়ে রেখে দিলুম।” দাবি শোধ হয়নি, সে-জুতো যথাসময়ে প্ৰণামীরুপে নিবেদিত হয়েছিল দাদার চরণে। তারপর কিছুকাল পরে শশাঙ্কর কাছ থেকে উমি একখানি চিঠি পেল। পেয়ে খুব হেসেছে সে। সেই চিঠি আজও তার বাক্সে অাছে। অাজ খুলে সে আবার পড়লে: “কাল তো তুমি চলে গেলে। তোমার স্মৃতি পুরাতন হোতে না হোতে তোমার নামে একটা কলঙ্ক বটনা হয়েছে সেটা তোমাৰ কাছে গোপন ক বা অকৰ্তব্য মনে কর। অামার পায়ে একজোড়া। তালতলী চটি অনেকেই লক্ষ্য করেছে। কিন্তু তার চেযে লক্ষ্য করেছে তার ছিদ্ৰভেদ ক’রে অামার চরণনথরপংক্তি মেঘমুক্ত চন্দ্ৰমালার মতো। ( ভারত চন্দের অন্নদামঙ্গল দ্রষ্টব্য। উপমার যাথাৰ্থ্য সম্বন্ধে সন্দেহ ঘটলে তোমার দিদির কাছে মীমাংসনীয়।) আজ সকালে আমার অাপিসের বৃন্দাবন নন্দী যখন আমার সপাদুক চরণ স্পৰ্শ ক’রে প্রণাম করলে তখন অামাৰ পদমৰ্যাদায় যে বিদীৰ্ণতা প্ৰকাশ পেয়েছে তারি অগেীরব মনে আন্দোলিত তোলো। সেবককে জিজ্ঞাসা করলেম, “মহেশ, আমাৰ সেই অন্য নৃতন চটি জোড়াটা গতিলাভ করেছে অন্য কোন অনধিকারীর শ্ৰীচৰণে।” সে মাথা চলকিসে বললে, “ও-বাডির উমি মাসিদের সঙ্গে আপনি যখন দাজিলিঙ যান সেই সময়ে চটিজোডাটাও গিয়েছিল। আপনি ফিবে এসেছেন সেই সঙ্গে ফিরে এসেছে তার একপাটি, অার এক পাটি—” তার মুখ লাল হয়ে উঠল। আমি এক ধমক দিয়ে বললুম, “বাস, চুপ ” সেখানে অনেক লোক ছিল। চটিজুতো -হরণ হীনকায। কিন্তু মানুষের মন দুৰ্বল, লোভ দুৰ্দম, এমন কাজ করে ফেলে, ঈশ্বর বোধ করি ক্ষমা করেন। তবু অপহরণ কাজে বুদ্ধির পরিচয় থাকলে দুফাৰ্যের প্লানি অনেকটা কাটে। কিন্তু একপাটি চটি! ধিক!!! যে এ-কাজ করেছে, যথাসাধ্য তাবে নাম অামি উহ্য রেখেছি। সে যদি তা স্ব ভাবসিদ্ধ মুখ্যতা সঙ্গে এই নিয়ে অনৰ্থক চেঁচামেচি করে তাহলে কথাটা ঘাটাঘাটি হয়ে যাবে। চটি নিযে চটচটি সেইখানেই খাটে যেখানে মান খাটি। মহেশে মতো নিন্দুকে মুখবন্ধ এখনি করতে পারো একজোড়া শিল্পকাখচিত চটির সাহায্যে। যেমন তার অাম্পধ॥ পায়ের মাপ এই সঙ্গে পাঠাচ্ছি।” চিঠিখানা পেয়ে উমি স্মিতমুখে পশমের জুতো বুনতে বসেছিল কিন্তু শেষ করেনি। পশমের কাজে আর তার উৎসাহ ছিল না। আজ এটা আবিষ্কার ক’রে স্থির করলে এই অসমাপ্ত জুতোটাই দেবে শশাঙ্ককে সেই দাৰ্জিলিঙ যাত্রার সাৎসরিক দিনে। সে-দিন অার কয়েক সপ্তাহ পরেই আসছে। গভীর একটা দীৰ্ঘনিশ্বাস পড়ল— হায় রে কোথায় সেই হাস্যোজল অাকাশে হালকাপাখায় উড়ে-যাওয়া দিনগুলি! এখন থেকে সামনে প্রসারিত নিরবকাশ কৰ্তব্যকঠোর মর জীবন। অাজ ২৬শে ফান্তন। হোলিখেলার দিন। মফস্বলের কাজে এ-খেলায় শশাঙ্কের সময় ছিল না, এ-দিনের কথা তারা ভুলেই গেছে। উমি আজ তার শয্যাগত দিদির পায়ে অাবিরের টিপ দিয়ে প্ৰণাম করেছে। তারপরে দুই বোন খুজতে খুজতে গিয়ে দেখলে শশাঙ্ক আপিসঘরের ডেস্কে বুকে প’ড়ে একমনে কাজ করছে। পিছন থেকে গিয়ে দিলে তার মাথায় অাবির মাখিয়ে, রাঙিয়ে উঠল তার কাগজপত্ৰ। মাতামাতির পালা পড়ে গেল। ডেস্কে ছিল দোয়াতে লাল কালি, শশাঙ্ক দিলে উমির শাড়িতে ঢেলে। হাত চেপে ধ’রে তার আঁচল থেকে ফাগ কেড়ে নিয়ে উমির মুখে দিলে ঘ’যে, তারপরে দাঁড়াদোঁড়ি ঠেলাঠেলি চেঁচামেচি।, বেলা যায় চলে স্নানাহারের সময় যায় পিছিয়ে, উমির উচ্চহাসির স্বরোচ্ছাসে সমস্ত বাড়ি মুখরিত। শেষকালে শশাঙ্কের অস্বাস্থ্য আশঙ্কায় দূতের পরে দূত পাঠিয়ে শমিলা এদের নিবৃত্ত করলে। দিন গেছে। রাত্ৰি হয়েছে অনেক। পুম্পিত কৃষ্ণচুড়ার শাখাজাল ছাড়িয়ে পূৰ্ণচাঁদ উঠেছে অনাবৃত অাকাশে। হঠাৎ ফাস্তুনের দমকা হাওয়ায় বারবার শব্দে দোলাদুলি ক’রে উঠেছে বাগানের সমস্ত গাছপালা, তলাকার ছায়ার জাল তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে। জানলার কাছে উমি চুপ ক’ব বসে। ঘুম আসছে না কিছুতেই। বুকের মধ্যে রক্তের দোলা শান্ত হয়নি। অামের বোলের গন্ধে মন উঠেছে ভরে। অাজ বসন্তে মাধবীলতার মজায় মজায় যে ফুল ফোটাবার বেদনা সেই বেদনা যেন উমির সমস্ত দেহকে ভিতর থেকে উৎসুক করেছে। পাশের নাবার ঘরে গিয়ে মাথা ধুয়ে নিলে, গা মুছলে ভিজে তোয়ালে দিয়ে। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে কিছুক্ষণ পরে স্বপ্ন জড়িত ঘুমে আবিষ্ট হয়ে পড়ল। রাত্ৰি তিনটের সময় ঘুম ভেঙেছে। চাদ তখন জানলার সামনে নেই। ঘরে অন্ধকার, বাইরে আলোয় ছায়ায় জড়িত সুপারিগাছের বীথিকা। উমির বুক ফেটে কান্না এল, কিছুতে থামতে চায় না। উপুড় হয়ে পড়ে বালিশে মুখ গুজে কঁাদতে লাগল। প্ৰাণের এই কান্না, ভাষায় এর শব্দ নেই, অৰ্থ নেই। প্ৰশ্ন করলে ও কি বলতে পারে কোথা থেকে এই বেদনার জোয়ার উদবেলিত হয়ে ওঠে ওর দেহে মনে, ভাসিয়ে নিয়ে যায় দিনের কৰ্মতালিকা, রাত্রের সুখনিদ্ৰা। সকালে উমি যখন ঘুম ভেঙে উঠল তখন ঘরের মধ্যে রেীন্দ্ৰ এসে পড়েছে। সকালবেলাকার কাজে ফঁাক পড়ল, ক্লান্তির কথা মনে ক’রে শমিলা ওকে ক্ষমা করেছে। কিসের অনুতাপে উৰ্মি আজ অবসন্ন। কেন মনে হচ্ছে ওর হার হোতে চলল। দিদিকে গিয়ে বললে, “দিদি, আমি তো তোমার কোনো কাজ করতেই পারিনে— বলো তো বাডি ফিরে যাই।” অাজ তো শমিলা বলতে পারলে না, “না যাসনে ৷” বললে, “আচ্ছা যা তুই। তোর পড়াশুনোর ক্ষতি হচ্ছে। যখন মাঝে মাঝে সময় পাবি দেখে শুনে যাস।” শশাঙ্ক তখন কাজে বেরিয়ে গেছে। সেই অবকাশে সেইদিনই উমি বাড়ি চলে গেল। শশাঙ্ক সে-দিন যান্তিক ছবি অঁাকার এক সেট সরঞ্জাম কিনে বাড়ি ফিরলে। উৰ্মিকে দেবে, কথা ছিল তাকে এই বিদ্যেটা শেখাবে। ফিরে এসে তাকে যথাস্থানে না দেখতে পেয়ে শমিলার ঘরে এসে জিজ্ঞাসা করল, “উমি গেল কোথায়।” শমিলা বললে, “এখানে তার পড়াশুনোর অসুবিধে হচ্ছে ব’লে সে বাড়ি চলে গেছে।” “কিছুদিন অসুবিধে করবে ব’লে সে তো প্ৰস্তুত হয়েই এসেছিল। অসুবিধের কথা হঠাৎ আজই মনে উঠল কেন।” কথার সুর শুনে শমিলা বুঝলে শশাঙ্ক তাকেই সন্দেহ করছে। সে-সম্বন্ধে কোনো বৃথা তৰ্ক না করে বললে, “আমার নাম ক’রে তুমি তাকে ডেকে নিয়ে এসো, নিশ্চয় কোনো অপত্তি করবে না।” উমি বাড়িতে ফিরে এসে দেখলে অনেকদিন পরে বিলেত থেকে ওর নামে নীরদের চিঠি এসে অপেক্ষা করছে। ভয়ে খুলতেই পারছিল না। মনে জানে নিজের তরফে অপরাধ জমা হয়ে উঠেছে। নিয়মভঙ্গের কৈফিয়ত স্বৰূপ এর অ্যাগে দিদির রোগের উল্লেখ করেছিল। কিছুদিন থেকে কৈফিয়তটা প্ৰায় এসেছে মিথ্যে হয়ে। শশাঙ্ক বিশেষ জেদ ক’রে শামিলার জন্যে দিনে একজন রাত্রে একজন নাস নিযুক্ত করে দিয়েছে। ডাক্তারের বিধানমতে রোগীর ঘবে সৰ্বদা অাত্মীয়দের অানাগোনা তারা রোধ করে। উমি মনে জানে নীরদ দিদির রোগের কৈফিয়তটাকেও গুরুতর মনে করবে না, বলবে, “ওটা কোনো কাজের কথা নয়।” বস্তুতই কাজের কথা নয়। অামাকে তো দরকার হচ্ছে না। অনুতপ্তচিত্তে স্থির করলে এবারে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইব। বলব আর কখনো ক্ৰটি হবে না, কিছুতে নিয়ম ভঙ্গ করব না। চিঠি খোলবার অাগে অনেকদিন পরে অাবার বের করলে সেই ফোটোগ্ৰাফখানা। টেবিলের উপর রেখে দিলে। জানে ঐ ছবিটা দেখলে শশাঙ্ক খুব বিদ্ৰুপ করবে। তবু উমি কিছুতেই কুষ্ঠিত হবে না তার বিদ্ৰুপে; এই তার প্রায়শ্চিত্ত। নীরদের সঙ্গে ওর বিবাহ হৰে এই প্ৰসঙ্গটা দিদিদের বাড়িতে ও চাপা। দিত। অন্যেরাও তুলত না কেননা এ প্রসঙ্গটা ওখানকার সকলের অপ্ৰিয়। আজ হাত মুঠো ক’রে উমি স্থির করলে—ওর সকল ব্যবহারেই এই সংবাদটা জোরের সঙ্গে ঘোষণা করবে। কিছুদিন থেকে লুকিয়ে রেখেছিল এনগেজমেণ্ট অাঙটি। সেটা বের ক’রে পরলে। আঙটিা নিতান্তই কম দামের,—নীরদ আপন অনেস্ট গরিবিয়ানার গর্বের দ্বারাই ঐ সস্তা অাঙটির দাম হীরের চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভাবখানা এই যে, “আঙটির দামেই আমার দাম নয় অামার দামেই আঙটির দাম।” নিজেকে যথাসাধ্য শোধন করে নিয়ে উমি অতি ধীরে লেফাফাটা খুললে। চিঠিখানা প’ড়ে হঠাৎ লাফিয়ে উঠল। ইচ্ছা করল নাচতে, কিন্তু নাচ ওর অভ্যোস নেই। সেতারটা ছিল বিছানার উপর, সেটা তুলে নিয়ে সুর না বেঁধেই বানান ঝংকার দিয়ে যা-তা বাজাতে লাগল। দুই বোন ৮৯ ঠিক এমন সময়ে শশাঙ্ক ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলে, “ব্যাপারখানা কী। বিয়ের দিন স্থির হয়ে গেল বুঝি?” “হঁ। শশাঙ্কদা, স্থির হয়ে গেছে।” “কিছুতেই নড়াচড় হবে না?” “কিছুতেই না।” “তাহলে এইবেলা সানাই বায়না দিই, অর ভীমনাগের সন্দেশ?” “তোমাকে কোনো চেষ্টা করতে হবে না।” “নিজেই সব করবে? ধন্য বীরাঙ্গনা। আর কনেকে আশীৰ্বাদ?” “সে-অাশীৰ্বাদের টাকাটা অামার নিজের পকেট থেকেই গেছে।” “মাছের তেলেই মাছ ভাজা? ভালো বোঝা গেল না। ” “এই নাও বুঝে দেখো।” ব’লে চিঠিখানা ওর হাতে দিলে। প’ড়ে শশাঙ্ক হো হো করে হেসে উঠল। লিখছে, যে-রিসার্চের দুরুহ কাজে নীরদ আত্ম নিবেদন করতে চায়, ভারতবর্ষে তা সম্ভব নয়। সেই-জন্যেই ওর জীবনে আর একটা মস্ত স্যাক্ৰিফাইস মেনে নিতে হোলো। । উমির সঙ্গে বিবাহের সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন না করলে উপায় নেই । একজন যুরোপীয় মহিলা ওকে বিবাহ ক’রে ওর কাজে আত্মদান করতে সন্মত । কিন্তু কাজটা সেই একই, ভারতবর্ষেই করা হোক আর এখানেই । রাজারামবাবু যে-কাজের জন্য অৰ্থ দিতে চেয়েছিলেন, তার কিয়দংশ সেখানে নিযুক্ত করলে অন্যায় হবে না । তাতে মতব্যক্তির পরে সন্মান করাই হবে । শশাঙ্ক বললে, “জীবিত ব্যক্তিটাকে কিছু কিছু দিয়ে যদি সেই দূরদেশেই দীৰ্ঘকাল জিইয়ে রাখতে পারো তো মন্দ হয় না । টাকা বন্ধ করলে পাছে খিদের জ্বালায় মরিয়া হয়ে এখানে দৌড়ে অাসে এই ভয় অাছে।” উমি হেসে বললে, “সে-ভয় যদি তোমার মনে থাকে, টাকা তুমিই দিয়ো, আমি এক পয়সা ও দেব না । ” শশাঙ্ক বললে, “অাবার তো মন বদল হবে না । মানিনীর অভিমান তো অটল থাকবে ।” “বদল হোলে তোমার তাতে কী শশাঙ্কদা ।” “প্রশ্নের সত্য উত্তর দিলে অহংকার বেড়ে যাবে, অতএব তোমার হিতের জন্যে চুপ করে রইলুম। কিন্তু ভাবছি, লোকটার গণ্ডদেশ তো কম নয়, ইংরেজিতে যাকে বলে চীক।” উৰ্মির মনের মধ্যে থেকে প্ৰকাণ্ড একটা ভার নেমে গেল— বহুদিনের ভার। মুক্তির আনন্দ ও কী যে করবে তা ভেবে পাচ্ছে না। ওর সেই কাজের ফৰ্দটা ছিাঁড়ে ফেলে দিলে। গলিতে ভিক্ষুক দাড়িয়ে ভিক্ষা চাইছিল, জানালা থেকে আঙটিা ছুড়ে ফেললে তার দিকে। জিজ্ঞাসা করলে, “এই পেনসিলের দাগ দেওয়া মোটা বইগুলো কি কোনো হকার কিনবে।” “নাই যদি কেনে, তার ফলাফলটা কী অাগে শুনি।” “যদি ওর মধ্যে সাবেককালের ভূতটা বাসা করে। মাঝে মাঝে অধোক রাত্ৰে তৰ্জনী তুলে আমার বিছানার কাছে এসে দাড়ায়।” “সে অাশঙ্কা যদি থাকে হকারের অপেক্ষা করব না, অামি নিজেই কিনব।” “কিনে কী করবে।” “হিন্দুশাস্ত্ৰমতে অন্ত্যেষ্টিসৎকার। গয়া পৰ্যন্ত যেতে রাজি, তাতে যদি তোমার মন সান্তনা পায়।” “না, অতটা বাড়াবাড়ি সইবে না ।” “আচ্ছা, আমার লাইব্ৰেরির কোণে পিরামিড বানিয়ে ওদের মামি করে রেখে দেব ।” “আজ কিন্তু তুমি কাজে বেরোতে পাবে না ।” “সমস্ত দিন ?” “সমস্ত দিনই ।” “কী করতে হবে ।” “মোটরে ক’রে উধাও হয়ে যাব ।” “দিদির কাছে ছুটি নিয়ে এসো গে।” “না, ফিরে এসে দিদিকে বলব, তখন খুব বকুনি খাব । সে-বকুনি সইবে ।” “আচ্ছা, আমিও তোমার দিদির বকুনি হজম করতে রাজি, টায়ার যদি ফাটে দুঃখিত হব না, ঘণ্টায় পঁয়তাল্লিশ মাইল বেগে দুটা-চারটে মানুষ চাপা দিয়ে একেবারে জেলখানা পৰ্যন্ত পোঁছতে আপত্তি নেই কিন্তু তিন সত্যি দাও যে মোটর-রথযাত্ৰা সাঙ্গ ক’রে অামাদেরি বাড়িতে তুমি ফিরে আসবে।” “অসাব, আসব, অাসব ।” মোটরযাত্রার শেষে ভবানীপুরের বাড়িতে দুজনে এল, কিন্তু ঘণ্টায় পঁয়তাল্লিশ মাইলের বেগ রক্ত থেকে এখনো কিছুতেই থামতে চায় না। সংসারের সমস্ত দাবি সমস্ত ভয় লজা এই বেগের কাছে বিলুপ্ত হয়ে গেল। কয়দিন শশাঙ্কের সব কাজ গেল ঘুলিয়ে। মনের ভিতরে ভিতরে সে বুঝেছে যে, এটা ভালো হচ্ছে না। কাজের ক্ষতি খুব গুরুতর হওয়াও অসম্ভব নয়। রাত্ৰে বিছানায় শুয়ে শুয়ে দুৰ্ভাবনায় দুঃসম্ভাবনাকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখে। কিন্তু পরের দিনে অাবার সে স্বাধিকার প্ৰমত্ত, মেঘদূতের যক্ষের মতন। মদ একবার খেলে তার পরিতাপ ঢাকতে অাবার খেতে হয়।