দুই বোন/নীরদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


তৃতীয় পত্র সাধনার পথে ভয় বারবার ব্যঙ্গ করে উঠছে ; বিদ্রোহীর অন্তরের মধ্যে উত্তরসাধক অবিচলিত বসে প্রহরে প্রহরে হাক দিচ্ছে, ‘মা ভৈঃ ? কালকের চিঠিতে ক্রন্দসীর কথা বলেছি, অন্তরীক্ষে উচ্ছসিত হয়ে উঠছে সত্তার ক্ৰন্দন গ্রহে নক্ষত্রে। এই সত্তা বিদ্রোহী, অসীম অব্যক্তের সঙ্গে তার নিরস্তর লড়াই। বিরাট অপ্রকাশের তুলনায় সে অতি সামান্ত, কিন্তু অন্ধকারের অন্তহীন পারাবারের উপর দিয়ে ছোটো ছোটো কোটি কোটি আলোর তরী সে ভাসিয়ে দিয়েছে— দেশ-কালের বুক চিরে অতলস্পর্শের উপর দিয়ে তার অভিযান । কিছু ডুবছে, কিছু ভাসছে, তবু যাত্রার শেষ নেই। প্রাণ তার বিদ্রোহের ধ্বজ নিয়ে পৃথিবীতে অতি দুর্বলরূপে একদিন দেখা দিয়েছিল। অতি প্রকাণ্ড, অতি কঠিন, অতি গুরুভার অপ্রাণ চারি দিকে গদা উদ্যত করে দাড়িয়ে, আপন ধুলোর কয়েদখানায় তাকে দ্বার জানলা বন্ধ করে প্রচণ্ড শাসনে রাখতে চায় । কিন্তু, বিদ্রোহী প্রাণ কিছুতেই দমে না ; দেয়ালে দেয়ালে কত জায়গায় কত ফুটোই করছে তার সংখ্যা নেই, কেবলই আলোর পথ নানা দিক দিয়েই খুলে দিচ্ছে। সত্তার এই বিদ্রোহমন্ত্রের সাধনায় মানুষ যতদূর এগিয়েছে এমন আর-কোনো জীব না। মানুষের মধ্যে যার বিদ্রোহশক্তি যত প্রবল, যত তুর্দমনীয়, ইতিহাসকে ততই সে যুগ হতে যুগান্তরে অধিকার করছে, শুধু সত্তার ব্যাপ্তি-দ্বারা নয়, সত্তার ঐশ্বৰ্য-দ্বারা । এই বিদ্রোহের সাধনা দুঃখের সাধনা ; দুঃখই হচ্ছে হাতি, দুঃখই হচ্ছে সমুদ্র । বীর্যের দপে এর পিঠে যারা চড়ল তারাই বাচল ; ভয়ে অভিভূত হয়ে এর তলায় যারা পড়েছে তারা মরেছে। আর, যারা একে এড়িয়ে সস্তায় ফললাভ করতে চায় তারা নকল ফলের २ › ግ জাভা-যাত্রীর পত্ৰ ছদ্মবেশে ফাকির বোঝার ভারে মাথা হেঁট করে বেড়ায়। আমাদের ঘরের কাছে সেই জাতের মানুষ অনেক দেখা যায়। বীরত্বের হাকডাক করতে তারা শিখেছে, কিন্তু সেটা যথাসম্ভব নিরাপদে করতে চায়। যখন মার আসে তখন নালিশ করে বলে, বড়ো লাগছে। এরা পৌরুষের পরীক্ষাশালায় বসে বিলিতি বই থেকে তার বুলি চুরি করে, কিন্তু কাগজের পরীক্ষা থেকে যখন হাতের পরীক্ষার সময় আসে তখন প্রতিপক্ষের অনেীদার্য নিয়ে মামলা তুলে বলে, “ওদের স্বভাব ভালো নয়, ওরা বাধা দেয়।’ মানুষকে নারায়ণ সখা বলে তখনই সম্মান করেছেন যখন তাকে দেখিয়েছেন তার উগ্ররূপ, তাকে দিয়ে যখন বলিয়েছেন : দৃষ্টাদ্ভুতং রূপমুগ্রং তবেদং লোকত্ৰয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন— মানুষ যখন প্রাণমন দিয়ে স্তব করতে পেরেছে : অনন্তবীর্যামিতবিক্রমন্তং সৰ্বং সমাপ্লোষি ততোহসি সর্বঃ । তুমিই অনন্তবীর্য, তুমিই অমিতবিক্রম, তুমিই সমস্তকে গ্রহণ করে, তুমিই সমস্ত । ইতি ৩ শ্রাবণ ১৩৩৪ $br 8 কাল সকালেই পৌছব সিঙাপুরে। তার পর থেকে আমার ডাঙার পালা। এই-যে চলছে আমার মনে মনে বকুনি, এটাতে খুবই বাধা হবে। অবকাশের অভাব হবে বলে নয়, মন এই কদিন যে কক্ষে চলছিল সে কক্ষ থেকে ভ্ৰষ্ট হবে বলে। কিসের জন্তে ? সর্বসাধারণ বলে যে-একটি মনুষ্যসমষ্টি আছে তারই আকর্ষণে । লেখবার সময় তার কোনো আকর্ষণ যে একটুও মনের মধ্যে থাকবে না, তা হতেই পারে না । কিন্তু, তার নিকটের আকর্ষণটা লেখার পক্ষে বড়ো ব্যাঘাত। কাছে যখন সে থাকে তখন সে কেবলই ঠেলা দিয়ে দিয়ে দাবি করতে থাকে। দাবি করে তারই নিজের মনের কথাটাকে। প্রকাণ্ড একটা বাইরের ফরমাশ কলমটাকে ভিতরে ভিতরে টান মারে। বলতে চাই বটে তোমাকে গ্রাহ্য করি নে’, কিন্তু হেঁকে উঠে বলার মধ্যেই গ্রাহ করাটা প্রমাণ হয়। আসল কথা, সাহিত্যের শ্রোতৃসভায় আজ সর্বসাধারণই রাজাসনে। এ সত্যটাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে লিখতে বসা অসম্ভব। প্রশ্ন উঠতে পারে উড়িয়ে দেবেই বা কেন ? এমন সময় কবে ছিল যখন সাহিত্য সমস্ত মানবসাধারণের জন্যেই ছিল না ? কথাটা একটু ভেবে দেখবার। কালিদাসের মেঘদূত মানবসাধারণের জন্যেই লেখা, আজ তার প্রমাণ হয়ে গেছে। যদি কোনো বিশিষ্ট দলের জন্তে লেখা হত তা হলে সে দলও থাকত না আর মেঘদূতও যেত তারই সঙ্গে অনুমরণে। কিন্তু, এখন যাকে পাবলিক বলছি কালিদাসের সময় সেই পাবলিক অত্যন্ত গা-ঘেঁষা হয়ে শ্রোতারূপে ছিল না। যদি থাকত তা হলে যে মানবসাধারণ শত শত বৎসরের মহাক্ষেত্রে সমাগত তাদের পথ তারা অনেকটা পরিমাণে আটকে দিত। వె জাভা-যাত্রীর পত্র এখনকার পাবলিক একটা বিশেষ কালের দানাবাধা সর্বসাধারণ । তার মধ্যে খুব নিরেট হয়ে তাল পাকিয়ে আছে এখনকার কালের রাষ্ট্রনীতি সমাজনীতি ধর্মনীতি, এখনকার কালের বিশেষ রুচি প্রবৃত্তি এবং আরো কত কী। এই সর্বসাধারণ যে মানবসাধারণের প্রতিরূপ, তা বলা চলবে না । এর ফরমাশ যে একশো বছর পরের ফরমাশের সঙ্গে মিলবে না, সে কথা জোর করেই বলতে পারি। কিন্তু, এই উপস্থিতকালের সর্বসাধারণ কানের খুব কাছে এসে জোর গলায় ও দিচ্ছে, বাহবা দিচ্ছে। উপস্থিতকালের সংকীর্ণ পরিধির তুলনাতেও এই ছও-বাহবার স্থায়িত্ব অকিঞ্চিৎকর । পাবলিক-মহারাজ আজ দুই চোখ লাল করে যে কথাটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, আসছে-কাল সেইটেকেই এমনি চড়া গলায় ব্যবহার করে যেন সেটা তার নিজেরই চিরকালের চিন্তিত কথা । আজ যে কথা শুনে তার দুই গাল বেয়ে চোখের জল বয়ে গেল, আসছে-কাল সেটাকে নিয়ে হাসাহাসি করবার সময় নিজের গদগদচিত্তের পূর্ব-ইতিহাসটি সম্পূর্ণ বে-কবুল যায়। ইংরেজ বেনের আপিসঘর-গুদামঘরের আশে-পাশে হঠাৎ যখন কলকাতা শহরটা মাথাবাড়া দিয়ে উঠল তখন সেখানে এই নতুনগড়া দোকানপাড়ার এক পাবলিক দেখা দিলে। অন্তত, তার এক ভাগের চেহারা হুতুম পেচার নকশায় উঠেছে। তারই ফরমাশের ছাপ পড়েছে দাশুরায়ের পাচালিতে । ঘন ঘন অনুপ্রাস তপ্তখোলার উপরকার খইয়ের মতো পটুপটু শব্দে ফুটে ফুটে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল— ভাবে শ্রীকান্ত নরকান্তকারীরে, নিতান্ত কৃতান্ত-ভয়াস্ত হবে ভবে। চারি দিকে হায়-হায় শব্দে সভা তোলপাড়। দুই কানে হাত-চাপা, 3. a চতুর্থ পত্র তারস্বরে দ্রুত লয়ে গান উঠল— ওরে রে লক্ষ্মণ, এ কী অলক্ষণ, বিপদ ঘটেছে বিলক্ষণ । অতি নগণ্য কাজে, অতি জঘন্ত সাজে ঘোর অরণ্য-মাঝে কত কঁাদিলাম। ইত্যাদি । দোকানপাড়ার জনসাধারণ খুশি হয়ে নগদ বিদায় করলে। অবকাশের সম্পদকে অবকাশের শিক্ষা -যোগে ভোগ করবার শক্তি যার ছিল না সেই ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাটের পাবলিককে মাথাগুনতির জোরে মানবসাধারণের প্রতিনিধি বলে মেনে নিতে হবে নাকি ? বস্তুত, এই জনসাধারণই দাশুরায়ের প্রতিভাকে বিশ্বসাধারণের মহাসভায় উত্তীর্ণ হতে বাধা দিয়েছিল । অথচ, মৈমনসিং থেকে যে-সব গাথা সংগ্রহ করা হয়েছে তাতে সহজেই বেজে উঠছে বিশ্বসাহিত্যের সুর। কোনো শহুরে পাবলিকের দ্রুত ফরমাশের ছাচে ঢালা সাহিত্য তো সে নয়। মানুষের চিরকালের সুখদুঃখের প্রেরণায় লেখা সেই গাথা । যদি-বা ভিড়ের মধ্যে গাওয়া হয়েও থাকে, তবু এ ভিড় বিশেষ কালের বিশেষ ভিড় নয়। তাই, এ সাহিত্য সেই ফসলের মতো যা গ্রামের লোক আপন মাটির বাসনে ভোগ করে থাকে বটে তবুও তা বিশ্বেরই ফসল— তা ধানের মঞ্জরী । যে কবিকে আমরা কবি বলে সম্মান করে থাকি তার প্রতি সম্মানের মধ্যে এই সাধুবাদটুকু থাকে যে, তার একলার কথাই আমাদের সকলের কথা । এইজন্যেই কবিকে একলা বলতে দিলেই সে সকলের কথা সহজে বলতে পারে। হাটের মাঝখানে দাড়িয়ে সেইদিনকার হাটের লোকের মনের কথা যেমন-তেমন করে মিলিয়ে দিয়ে তাদের সেইদিনকার বহু-মুণ্ডের মাথা-নাড়া-গুনতির ミ> জাভা-যাত্রীর পত্র জোরে আমরা যেন আপন রচনাকে কৃতাৰ্থ মনে না করি ; যেন আমাদের এই কথা মনে করবার সাহস থাকে যে, সাহিত্যের গণনাতত্ত্বে এক অনেক সময়েই হাজারের চেয়ে সংখ্যায় বেশি হয়ে থাকে । এইবার আমার জাহাজের চিঠি তার অন্তিম পংক্তির দিকে হেলে পড়ল। বিদায় নেবার পূর্বে তোমার কাছে মাপ চাওয়া দরকার মনে করছি। তার কারণ, চিঠি লিখব বলে বসলুম কিন্তু কোনোমতেই চিঠি লেখা হয়ে উঠল না। এর থেকে আশঙ্কা হচ্ছে, আমার চিঠি লেখবার বয়স পেরিয়ে গেছে। প্রতিদিনের স্রোতের থেকে প্রতিদিনের ভেসে-আসা কথা ছেকে তোলবার শক্তি এখন আমার নেই। চলতে চলতে চার দিকের পরিচয় দিয়ে যাওয়া এখন আমার দ্বারা আর সহজে হয় না । অথচ, এক সময়ে এ শক্তি আমার ছিল । তখন অনেককে অনেক চিঠিই লিখেছি। সেই চিঠিগুলি ছিল চলতি কালের সিনেমা-ছবি । তখন ছিল মনের পটটা বাইরের সমস্ত আলোছায়ার দিকে মেলে দেওয়া । সেই-সব ছাপের ধারায় চলত চিঠি । এখন বুঝি-বা বাইরের ছবির ফোটোগ্রাফটা বন্ধ হয়ে গিয়ে মনের ধ্বনির ফোনোগ্রাফটাই সজাগ হয়ে উঠেছে। এখন হয়তে দেখি কম, শুনি বেশি। মানুষ তো কোনো-একটা জায়গায় খাড়া হয়ে দাড়িয়ে নেই। এইজন্যেই চলচ্চিত্র ছাড়া তার যথার্থ চিত্র হতেই পারে না । প্রবহমান ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে চলমান আপনার পরিচয় মানুষ দিতে থাকে। যারা আপন লোক, নিয়ত তারা সেই পরিচয়টা পেতে ইচ্ছে করে। বিদেশে নূতন নূতন ধাবমান অবস্থা ও ঘটনার চঞ্চল ভূমিকার উপরে প্রকাশিত আত্মীয়-লোকের ধারাবাহিক পরিচয়ের ইচ্ছা স্বাভাবিক। চিঠি সেই ইচ্ছা পূরণ করবার জন্যেই। ૨૨ চতুর্থ পত্র কিন্তু, সকলপ্রকার রচনাই স্বাভাবিক শক্তির অপেক্ষ করে। চিঠি-রচনাও তাই। আমাদের দলের মধ্যে আছেন সুনীতি। আমি র্তাকে নিছক পণ্ডিত বলেই জানতুম। অর্থাৎ, আস্ত জিনিসকে টুকরো করা ও টুকরো জিনিসকে জোড়া দেওয়ার কাজেই তিনি হাত পাকিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস ছিল। কিন্তু এবার দেখলুম, বিশ্ব বলতে যে ছবির স্রোতকে বোঝায়, যা ভিড় করে ছোটে এবং এক মুহূর্ত স্থির থাকে না, তাকে তিনি তালভঙ্গ না করে মনের মধ্যে দ্রুত এবং সম্পূর্ণ ধরতে পারেন আর কাগজে-কলমে সেটা দ্রুত এবং সম্পূর্ণ তুলে নিতে পারেন। এই শক্তির মূলে আছে বিশ্বব্যাপারের প্রতি র্তার মনের সজীব আগ্রহ । তার নিজের কাছে তুচ্ছ বলে কিছুই নেই, তাই তার কলমে তুচ্ছও এমন একটি স্থান পায় যাতে তাকে উপেক্ষা করা যায় না। সাধারণত, এ কথা বলা চলে যে শব্দতত্ত্বের মধ্যে যারা তলিয়ে গেছে শব্দচিত্র তাদের এলেকার সম্পূর্ণ বাইরে, কেননা চিত্রটা একেবারে উপরের তলায়। কিন্তু, সুনীতির মনে সুগভীর তত্ত্ব ভাসমান চিত্রকে ডুবিয়ে মারে নি এই বড়ে অপূর্ব। স্থনীতির নীরন্ধ চিঠিগুলি তোমরা যথাসময়ে পড়তে পাবে— দেখবে এগুলো একেবারে বাদশাই চিঠি । এতে চিঠির ইম্পিরিয়ালিজম বর্ণনাসাম্রাজ্য সর্বগ্রাহী, ছোটো বড়ো কিছুই তার থেকে বাদ পড়ে নি। সুনীতিকে উপাধি দেওয়া উচিত— লিপিবাচস্পতি কিম্বা লিপিসার্বভৌম কিম্বা লিপিচক্রবর্তী । ইতি ৩ শ্রাবণ ১৩৩৪ । নাগপঞ্চমী । প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পত্র শ্ৰীমতী নির্মলকুমারী মহলানবীশকে লিখিত । ২৩ (t সামনে সমুদ্রের অর্ধচন্দ্রাকার তটসীমা । অনেক দূর পর্যন্ত জল অগভীর, জলের রঙে মাটির আভাস, সে যেন ধরণীর গেরুয়া আঁচল এলিয়ে পড়েছে। ঢেউ নেই, সমস্ত দিন জলরাশি এগোয় আর পিছোয় অতি ধীর গমনে। অন্সর আসছে চুপিচুপি পিছন থেকে পৃথিবীর চোখ টিপে ধরবে বলে— সোনার রেখায় রেখায় কৌতুকের মুচকে-হাসি । , সামনে বা দিকে একদল নারকেলগাছ, সুদীর্ঘ গুড়ির উপর সিধে হয়ে দাড়াতে পারে নি, পরস্পরের দিকে তাদের হেলাহেলি । নিত্যদোলায়িত শাখায় শাখায় সূর্যের আলো ওরা ছিটিয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে, চঞ্চল ছেলেরা যেমন নদীর ঘাটে জল-ছোড়াছড়ি করে। সকালের আকাশে ওদের এই অবগাহনস্নান । এটা একজন চীনীয় ধনীর বাড়ি । আমরা তার অতিথি । প্রশস্ত বারান্দায় বেতের কেদারায় বসে আছি। সমুদ্রের দিক থেকে বুক ভরে বইছে পশ্চিমে হাওয়া । চেয়ে দেখছি, আকাশের কোণে কোণে দলভাঙা মেঘগুলি শ্রাবণের কালো উর্দি ছেড়ে ফেলেছে, এখন কিছুদিনের জন্যে সূর্যের আলোর সঙ্গে ওদের সন্ধি। আমার অস্পষ্ট ভাবনাগুলোর উপর ঝরে পড়ছে কম্পমান নারকেলপাতার ঝরঝর শব্দের বৃষ্টি, বালির উপর দিয়ে ভাটার সমুদ্রের পিছু-হটার শব্দ ওরই সঙ্গে একই মৃত্স্বরে মেলানো। ও দিকে পাশের ঘরে ধীরেন এসরাজ নিয়ে আপন মনে বাজিয়ে চলেছে— ভৈরো থেকে রামকেলি, রামকেলি থেকে ভৈরবী ; আস্তে আস্তে অকেজো মেঘের মতো খেয়ালের হাওয়ায় বদল হচ্ছে রাগিণীর আকৃতি । আজ সকালে মনটা যেন ভাটার সমুদ্র, তীরের দিক টানছে ૨8 পঞ্চম পত্র তাকে কোন দিকে তার ঠিকানা নেই। আপনাকে আপন সর্বাঙ্গে সর্বাস্তাকরণে ভরপুর মেলে দিয়ে বসে আছি, নিবিড় তরুপল্লবের শু্যামলতায় আবিষ্ট রোদ-পোয়ানো ওই ছোটো দ্বীপটির মতো । আমার মধ্যে এই ঘনীভূত অনুভবটিকে বলা যেতে পারে হওয়ার আনন্দ ৷ রূপে রঙে আলোয় ধ্বনিতে আকাশে অবকাশে ভরে ওঠা একটি মূর্তিমান সমগ্রতা আমার চিত্তের উপরে ঘা দিয়ে বলছে ‘আছি’ ; তারই জগতে আমার চৈতন্য উছলে উঠছে ; সমুদ্রকল্লোলেরই মতো একতান শব্দ জাগছে, ওম, অর্থাৎ এই-যে আমি। বিরাট একটা না, হা-করা তার মুখগহ্বর, প্রকাণ্ড তার শূন্ত— তারই সামনে ওই নারকেলগাছ দাড়িয়ে, পাতা নেড়ে নেড়ে বলছে, এই-যে আমি । তুঃসাহসিক সত্তার এই স্পর্ধা গভীর বিস্ময়ে বাজছে আমার মনে, আর ধীরেন ওই-যে ভৈরবীতে মীড় লাগিয়েছে সেও যেন বিশ্বসত্তার আত্মঘোষণা, আপন কম্পমান সুরের ধ্বজাটিকে অসীম শূন্যের মাঝখানে তুলে ধরেছে। এই তো হল ‘হওয়া’। এইখানেই শেষ নেই। এর সঙ্গে আছে করা । সমুদ্র আছে অন্তরে অন্তরে নিস্তব্ধ, কিন্তু তার উপরে উপরে উঠছে ঢেউ, চলছে জোয়ার ভাটা । জীবনে করার বিরাম নেই। এই করার দিকে কত প্রয়াস, কত উপকরণ, কত আবর্জনা । এরা সব জমে জমে কেবলই গণ্ডি হয়ে ওঠে, দেয়াল হয়ে দাড়ায় । এরা বাহিরে সমগ্রতার ক্ষেত্রকে, অস্তরে পরিপূর্ণতার উপলব্ধিকে, টুকরো টুকরো করতে থাকে। অহমিকার উত্তেজনায় কর্ম উদ্ধত হয়ে, একান্ত হয়ে, আপনাকে সকলের আগে ঠেলে তোলে ; হওয়ার চেয়ে করা বড়ো হয়ে উঠতে চায়। এতে ক্লাস্তি, এতে অশান্তি, এতে মিথ্যা। বিশ্বকৰ্মার বঁাশিতে নিয়তই যে ছুটির সুর বাজে এই কারণেই সেটা শুনতে পাই নে ; সেই ছুটির মুরেই বিশ্বকাজের ছন্দ বাধা । ૨૯: জাভা-যাত্রীর পত্ৰ সেই স্বরটি আজ সকালের আলোতে ওই নারকেলগাছের তানপুরায় বাজছে । ওখানে দেখতে পাচ্ছি, শক্তির রূপ আর মুক্তির রূপ অনবচ্ছিন্ন এক । এতেই শাস্তি, এতেই সৌন্দৰ্য । জীবনের মধ্যে এই মিলনটিই তো খুজি— করার চিরবহমান নদীধারায় আর হওয়ার চিরগম্ভীর মহাসমুদ্রে মিলন। এই আত্মপরিতৃপ্ত মিলনটিকে লক্ষ্য করেই গীতা বলেছেন, ‘কর্ম করো, ফল চেয়ে না।’ এই চাওয়ার রাহুটাই কর্মের পাত্র থেকে তার অমৃত ঢেলে নেবার জন্তে লালায়িত। ভিতরকার সহজ হওয়াটি সার্থক হয় বাইরেকার সহজ কর্মে । অন্তরের সেই সার্থকতার চেয়ে বাইরের স্বার্থ প্রবল হয়ে উঠলেই কর্ম হয় বন্ধন ; সেই বন্ধনেই জড়িত যত হিংসা দ্বেষ ঈর্ষা, নিজেকে ও অন্যকে প্রবঞ্চনা । এই কর্মের দুঃখ, কর্মের অগৌরব যখন অসহ্য হয়ে ওঠে তখন মানুষ বলে বসে, দূর হোক গে, কর্ম ছেড়ে দিয়ে চলে যাই ।” তখন আবার আহবান আসে, কর্ম ছেড়ে দিয়ে কর্ম থেকে নিস্কৃতি নেই ; করাতেই হওয়ার আত্মপ্রকাশ । বাহ ফলের দ্বারা নয়, আপন অন্তর্নিহিত সত্যের দ্বারাই কর্ম সার্থক হোক, তাতেই হোক মুক্তি । ফল-চাওয়া কর্মের নাম চাকরি, সেই চাকরির মনিব আমি নিজেই হই বা অন্তেই হোক । চাকরিতে মাইনের জন্যেই কাজ, কাজের জন্তে কাজ নয়। কাজ তার নিজের ভিতর থেকে নিজে যখন কিছুই রস জোগায় না, সম্পূর্ণ বাইরে থেকেই যখন আপন দাম নেয়, তখনই মানুষকে সে অপমান করে। মর্তলোকে প্রয়োজন বলে জিনিসটাকে একেবারেই অস্বীকার করতে পারি নে। বেঁচে থাকবার জন্তে আহার করতেই হবে । বলতে পারব না, ‘নেই-বা করলেম। সেই আবশ্বকের তাড়াতেই পরের দ্বারে মানুষ উমেদারি করে আর সেইসঙ্গেই তত্ত্বজ্ঞানী ভাবতে থাকে, কী করলে এই ২৬ পঞ্চম পত্র কর্মের জড় মারা যায়। বিদ্রোহী মানুষ বলে বসে, বৈরাগ্যমেবাভয়ম। অর্থাৎ, এতই কম খাব, কম পরব, রৌদ্রবৃষ্টি এমন করে সহ্য করতে শিখব, দাসত্বে প্রবৃত্ত করবার জন্যে প্রকৃতি আমাদের জন্তে যতরকম কানমলার ব্যবস্থা করেছে সেগুলোকে এতটা এড়িয়ে চলব যে, কর্মের দায় অত্যন্ত হালকা হয়ে যাবে । কিন্তু, প্রকৃতির কাজে শুধু কানমলার তাড়া নেই, সেইসঙ্গে রসের জোগান আছে। এক দিকে ক্ষুধায় দেয় দুঃখ, আর-এক দিকে রসনায় দেয় মুখ— প্রকৃতি একই সঙ্গে ভয় দেখিয়ে আর লোভ দেখিয়ে আমাদের কাজ করায় । সেই লোভের দিক থেকে আমাদের মনে জন্মায় ভোগের ইচ্ছা । বিদ্রোহী মানুষ বলে, ওই ভোগের ইচ্ছাটা প্রকৃতির চাতুরী, ওইটেই মোহ, ওটাকে তাড়াও, বলো, বৈরাগ্যমেবাভয়ম– মানব না দুঃখ, চাইব না সুখ । কুচারজন মানুষ এমনতরো স্পর্ধ করে ঘরবাড়ি ছেড়ে বনে জঙ্গলে ফলমূল খেয়ে কাটাতে পারে, কিন্তু সব মানুষই যদি এই পস্থা নেয় তা হলে বৈরাগ্য নিয়েই পরস্পর লড়াই বেধে যাবে— তখন বন্ধলে কুলোবে না। গিরিগহবরে ঠেলাঠেলি ভিড় হবে, ফলমূল যাবে উজাড় হয়ে। তখন কপনি-পরা ফৌজ মেশিন-গান বের করবে । সাধারণ মানুষের সমস্যা এই যে, কর্ম করতেই হবে । জীবনধারণের গোড়াতেই প্রয়োজনের তাড়া আছেই। তবুও কী করলে কর্ম থেকে প্রয়োজনের চাপ যথাসম্ভব হালকা করা যেতে পারে ? অর্থাৎ, কী করলে কর্মে পরের দাসত্বের চেয়ে নিজের কর্তৃত্বট। বড়ো হয়ে দেখা দেয় ? কৰ্ম থেকে কর্তৃত্বকে যতই দূরে পাঠানো যাবে কর্ম ততই মজুরির বোঝা হয়ে মানুষকে চেপে মারবে ; এই শূদ্রর থেকে মানুষকে উদ্ধার করা চাই । ২৭ জাভা-যাত্রীর পত্র একটা কথা মনে পড়ে গেল। সেদিন যখন শিলঙে ছিলেম, নন্দলাল কার্সিয়ঙ থেকে পোস্ট কার্ডে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন। স্যাকরা চার দিকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে চোখে চশমা এটে গয়না গড়ছে। ছবির মধ্যে এই কথাটি পরিস্ফুট যে, এই স্তাকরার কাজের বাইরের দিকে আছে তার দর, ভিতরের দিকে আছে তার অাদর । এই কাজের দ্বারা স্যাকরা নিছক নিজের অভাব প্রকাশ করছে না, নিজের ভাবকে প্রকাশ করছে ; আপন দক্ষতার গুণে আপন মনের ধ্যানকে মূর্তি দিচ্ছে। মুখ্যত এ কাজটি তার আপনারই, গৌণত যে মানুষ পয়সা দিয়ে কিনে নেবে তার। এতে করে ফলকামনাটা হয়ে গেল লঘু, মূল্যের সঙ্গে অমূল্যতার সামঞ্জস্য হল, কর্মের শূদ্র গেল ঘুচে। এক কালে বণিককে সমাজ অবজ্ঞা করত, কেননা বণিক কেবল বিক্রি করে, দান করে না । কিন্তু, এই স্যাকরা এই-যে গয়নাটি গড়লে তার মধ্যে তার দান এবং বিক্রি একই কালে মিলে গেছে । সে ভিতর থেকে দিয়েছে, বাইরে থেকে জোগায় নি । ভূতাকে রেখেছি তাকে দিয়ে ঘরের কাজ করাতে। মনিবের সঙ্গে তার মলুয়ত্বের বিচ্ছেদ একান্ত হলে সেটা হয় ষোলো-অানা দাসহ । যে সমাজ লোভে বা দাস্তিকতায় মানুষের প্রতি দরদ হারায় নি সে সমাজ ভূতা আর আত্মীয়ের সীমারেখাটাকে যতদূর সম্ভব ফিকে করে দেয়। ভূত্য সেখানে দাদা খুড়ো জেঠার কাছাকাছি গিয়ে পৌছয়। তখন তার কাজটা পরের কাজ না হয়ে আপনারই কাজ হয়ে ওঠে। তখন তার কাজের ফলকামনাট যায় যথাসম্ভব ঘুচে । সে দাম পায় বটে, তবুও আপনার কাজ সে দান করে, বিক্রি করে না । গুজরাটে কাঠিয়াবাড়ে দেখেছি, গোয়ালা গোরুকে প্রাণের চেয়ে સ્વાઝ পঞ্চম পত্র বেশি ভালোবাসে। সেখানে তার দুধের ব্যবসায়ে ফলকামনাকে তুচ্ছ করে দিয়েছে তার ভালোবাসায় ; কর্ম করেও কর্ম থেকে তার নিত্য মুক্তি। এ গোয়ালা শূদ্র নয়। যে গোয়াল৷ দুধের দিকে দৃষ্টি রেখেই গোরু পোষে, কষাইকে গোরু বেচতে যার বাধে না, সেই হল শূদ্র ; কর্মে তার অগৌরব, কর্ম তার বন্ধন। যে কর্মের অস্তরে মুক্তি নেই, যেহেতু তাতে কেবল লোভ, তাতে প্রেমের অভাব, সেই কর্মেই শূদ্রত্ব। জাত-শূদ্রেরা পৃথিবীতে অনেক উচু উচু আসন অধিকার করে বসে আছে। তারা কেউ-বা শিক্ষক, কেউ-বা বিচারক, কেউ-বা শাসনকর্তা, কেউ-বা ধর্মযাজক। কত ঝি, দাই, চাকর, মালী, কুমোর, চাষি আছে যারা ওদের মতে শূদ্র নয়— আজকের এই রৌদ্রে-উজ্জল সমুদ্রতীরের নারকেলগাছের মৰ্মরে তাদের জীবনসংগীতের মূল সুরটি বাজছে! মলাক্কা ২৮ জুলাই ১৯২৭ રજ কল্যাণীয়াসু এখনই শো মাইল দূরে এক জায়গায় যেতে হবে। সকলেই সাজসজ্জা করে জিনিসপত্র বেঁধে প্রস্তুত। কেবল আমিই তৈরি হয়ে নিতে পারি নি। এখনই রেলগাড়ির উদ্দেশে মোটরগাড়িতে চড়তে হবে। দ্বারের কাছে মোটরগাড়ি উদ্যত তারস্বরে মাঝে মাঝে শৃঙ্গধনি করছে— আমাদের সঙ্গীদের কণ্ঠে তেমন জোর নেই, কিন্তু তাদের উৎকণ্ঠ কম প্রবল নয়। অতএব, এইখানেই উঠতে হল। দিনটি চমৎকার। নারকেলগাছের পাতা ঝিলমিল করছে, ঝরঝর করছে, হলে তুলে উঠছে, আর সামনেই সমুদ্র স্বগত-উক্তিতে অবিশ্রাম কলধ্বনিমুখরিত। ৩০ জুলাই ১৯২৭ কল্যাণীয়াসু রানী, এসেছি গিয়ানয়ার রাজবাড়িতে। মধ্যাহ্নভোজনের পূর্বে সুনীতি রাজবাড়ির ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের নিয়ে খুব আসর জমিয়ে তুলেছিলেন। খেতে বসে রাজা আমাকে বললেন একটু ংস্কৃত আওড়াতে । দু-চার রকমের শ্লোক আওড়ানো গেল। সুনীতি একটি শ্লোকের পরিচয় দিতে গিয়ে যেমনি বললেন ‘শার্দলবিক্রীড়িত অমনি রাজা সেটা উচ্চারণ করে জানালেন, তিনিও জানেন। এখানকার রাজার মুখে অত বড়ো একটা কড়া সংস্কৃত শব্দ শুনে আমি তো আশ্চর্য । তার পরে রাজা বলে গেলেন, শিখরিণী, আন্ধরা, মালিনী, বসন্ততিলক, আরও কতকগুলো নাম যা আমাদের অলংকারশাস্ত্রে কখনো পাই নি। বললেন, র্তাদের ভাষায় এ-সব ছন্দ প্রচলিত। অথচ, মন্দাক্রাস্তা বা অনুষ্টভ এরা জানেন না। এখানে ভারতীয় বিদ্যার এই-সব ভাঙাচোরা মূর্তি দেখে মনে হয় যেন ভূমিকম্প হয়ে একটা প্রাচীন মহানগরী ধ্বসে গিয়েছে, মাটির নীচে বসে গিয়েছে— সেই-সব জায়গায় উঠেছে পরবর্তী কালের ঘরবাড়ি চাষ-আবাদ ; আবার অনেক জায়গায় সেই পুরোনো কীর্তির অবশেষ উপরে জেগে, এই দুইয়ে মিলে জোড়াতাড়া দিয়ে এখানকার লোকালয় । সেকালের ভারতবর্ষের যা-কিছু বাকি আছে তার থেকে ভারতের তখনকার কালের বিবরণ অনেকটা আন্দাজ করা যায়। এখানে হিন্দুধর্ম প্রধানতই শৈব । দুর্গ আছেন, কিন্তু কপালমালিনী লোলরসনা উলঙ্গিনী কালী নেই। কোনো দেবতার কাছে পশুবলি এরা জানে না। কিছুকাল আগে অশ্বমেধ প্রভৃতি যজ্ঞ উপলক্ষে পশুবধ হত, কিন্তু দেবীর কাছে জীবরক্ত নৈবেদ্য מס\ জাভা-যাত্রীর পত্র দেওয়া হত না । এর থেকে বোঝা যায়, তখনকার ভারতবর্ষে ব্যাধ-শবরদের উপাস্য দেবতা উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুমন্দিরে প্রবেশ করে রক্তাভিষিক্ত দেবপূজা প্রচার কবেন নি। তার পরে, রামায়ণ-মহাভারতের যে-সকল পাঠ এ দেশে প্রচলিত আমাদের দেশের সঙ্গে তার অনেক প্রভেদ । যে যে স্থানে এদের পাঠান্তর তার সমস্তই যে অশুদ্ধ, এমন কথা জোর করে বলা যায় না। এখানকার রামায়ণে রাম সীতা ভাই-বোন ; সেই ভাইবোনে বিবাহ হয়েছিল । একজন ওলন্দাজ পণ্ডিতের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল ; তিনি বললেন, তার মতে এই কাহিনীটাই প্রাচীন, পরবর্তীকাল এই কথাটাকে চাপা দিয়েছে। এই মতটাকে যদি সত্য বলে মেনে নেওয়া যায় তা হলে রামায়ণ-মহাভারতের মধ্যে মস্ত কয়েকটি মিল দেখতে পাই । দুটি কাহিনীরই মূলে ছটি বিবাহ। দুটি বিবাহই আর্যরীতি-অনুসারে অসংগত। ভাই-বোনে বিবাহ বৌদ্ধ ইতিহাসে কোনো কোনো জায়গায় শোনা যায়, কিন্তু সেটা আমাদের সম্পূর্ণ শাস্ত্রবিরুদ্ধ। অন্য দিকে এক স্ত্রীকে পাচ ভাইয়ে মিলে বিবাহও তেমনি অদ্ভূত ও অশাস্ত্রীয় । দ্বিতীয় মিল হচ্ছে দুই বিবাহেরই গোড়ায় অস্ত্রপরীক্ষা, অথচ সেই পরীক্ষা বিবাহযোগ্যতা প্রসঙ্গে নিরর্থক। তৃতীয় মিল হচ্ছে দুটি কন্যাই মানবীগর্ভজাত নয়— সীতা পৃথিবীর কন্যা, হলরেখার মুখে কুড়িয়ে-পাওয়া ; কৃষ্ণ যজ্ঞসম্ভব । চতুর্থ মিল হচ্ছে উভয়ত্রই প্রধান নায়কদের রাজ্যচু্যতি ও স্ত্রীকে নিয়ে বনগমন । পঞ্চম মিল হচ্ছে দুই কাহিনীতেই শক্রর হাতে স্ত্রীর অবমাননা ও সেই অবমাননার প্রতিশোধ । সেইজন্যে আমি পূর্বেই অন্যত্র এই মত প্রকাশ করেছি যে, দুটি বিবাহই রূপকমূলক। রামায়ণের রূপকটি খুবই স্পষ্ট। কৃষির ৩২ সপ্তম পত্র হলবিদারণরেখাকে যদি কোনো রূপ দিতেই হয় তবে তাকে পৃথিবীর কন্যা বলা যেতে পারে। শস্তকে যদি নবদুর্বাদলশ্যাম রাম বলে কল্পনা করা যায় তবে সেই শস্যও তো পৃথিবীর পুত্র। এই রূপক অনুসারে উভয়ে ভাইবোন, আর পরস্পর পরিণয়বন্ধনে আবদ্ধ । হরধমুভঙ্গের মধ্যেই রামায়ণের মূল অর্থ। বস্তুত সমস্তটাই হরধমুভঙ্গের ব্যাপার— সীতাকে গ্রহণ রক্ষণ ও উদ্ধারের জন্তে । আর্যাবর্তের পূর্ব অংশ থেকে ভারতবর্ষের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত কৃষিকে বহন করে ক্ষত্রিয়দের যে অভিযান হয়েছিল সে সহজ হয় নি ; তার পিছনে ঘরে-বাইরে মস্ত একটা দ্বন্দ্ব ছিল । সেই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের ইতিহাস রামায়ণের মধ্যে নিহিত, অরণ্যের সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রের দ্বন্দ্ব । মহাভারতে খাণ্ডববন-দাহনের মধ্যেও এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের আভাস পাই । সেও বনের গাছপালা পোড়ানো নয়, সেদিন বন যে প্রতিকূল মানবশক্তির আশ্রয় ছিল তাকে ধ্বংস করা। এর বিরুদ্ধে কেবল-যে অনার্য তা নয়, ইন্দ্র র্যাদের দেবতা তারাও ছিলেন। ইন্দ্র বৃষ্টিবৰ্ষণে খাণ্ডবের আগুন নেবাবার চেষ্টা করেছিলেন । মহাভারতেরও অর্থ পাওয়া যায় লক্ষ্যবেধের মধ্যে। এই শূন্তস্থিত লক্ষ্যবেধের মধ্যে এমন একটি সাধনার সংকেত আছে যে, একাগ্রসাধনার দ্বারা কৃষ্ণাকে পাওয়া যায় ; আর এই যজ্ঞসম্ভবা কৃষ্ণা এমন একটি তত্ত্ব যাকে নিয়ে একদিন ভারতবর্ষে বিষম দ্বন্দ্ব বেধে গিয়েছিল। একে একদল স্বীকার করেছিল, একদল স্বীকার করে নি। কৃষ্ণাকে পঞ্চ পাণ্ডব গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু কৌরবেরা র্তাকে অপমান করতে ক্রটি করেন নি। এই যুদ্ধে কুরুসেনাপতি ছিলেন ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য, আর পাণ্ডববীর অর্জনের সারথি ছিলেন কৃষ্ণ । রামের অস্ত্রদীক্ষা যেমন বিশ্বামিত্রের কাছ থেকে, অর্জুনের Vo \o জাভা-যাত্রীর পত্র যুদ্ধদীক্ষ তেমনি কৃষ্ণের কাছ থেকে। বিশ্বামিত্র স্বয়ং লড়াই করেন নি, কিন্তু লড়াইয়ের প্রেরণা তার কাছ থেকে ; কৃষ্ণও স্বয়ং লড়াই করেন নি, কিন্তু কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের প্রবর্তন করেছিলেন তিনি ; ভগবদগীতাতেই এই যুদ্ধের সত্য, এই যুদ্ধের ধর্ম, ঘোষিত হয়েছে— সেই ধর্মের সঙ্গে কৃষ্ণ একাত্মক, যে কৃষ্ণ কৃষ্ণার সখা, অপমানকালে কৃষ্ণ র্যাকে স্মরণ করেছিলেন বলে তার লজ্জা রক্ষা হয়েছিল, যে কৃষ্ণের সম্মাননার জন্যই পাণ্ডবদের রাজসূয়যজ্ঞ। রাম দীর্ঘকাল সীতাকে নিয়ে যে বনে ভ্রমণ করেছিলেন সে ছিল অনার্যদের বন, আর কৃষ্ণাকে নিয়ে পাণ্ডবেরা ফিরেছিলেন যে বনে সে হচ্ছে ব্রাহ্মণ ঋষিদের বন । পাণ্ডবদের সাহচর্যে এই বনে কৃষ্ণার প্রবেশ ঘটেছিল। সেখানে কৃষ্ণ র্তার অক্ষয় অন্নপাত্র থেকে অতিথিদের অন্নদান করেছিলেন । ভারতবর্ষে একটা দ্বন্দ্ব ছিল অরণ্যের সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রের, আর-একটা দ্বন্দ্ব বেদের ধর্মের সঙ্গে কৃষ্ণের ধর্মের । লঙ্কা ছিল অনার্যশক্তির পুরী, সেইখানে আর্যের হল জয় ; কুরুক্ষেত্র ছিল কৃষ্ণবিরোধী কৌরবের ক্ষেত্র, সেইখানে কৃষ্ণভক্ত পাণ্ডব জয়ী হলেন । সব ইতিহাসেই বাইরের দিকে অন্ন নিয়ে যুদ্ধ, আর ভিতরের দিকে তত্ত্ব নিয়ে যুদ্ধ। প্রজা বেড়ে যায়, তখন খাদ্য নিয়ে স্থান নিয়ে টানাটানি পড়ে, তখন নব নব ক্ষেত্রে কৃষিকে প্রসারিত করতে হয় । চিত্তের প্রসার বেড়ে যায়, তখন যারা সংকীর্ণ প্রথাকে অঁাকড়ে থাকে তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধে যারা সত্যকে প্রশস্ত ও গভীর ভাবে গ্রহণ করতে চায়। এক সময়ে ভারতবর্ষে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ প্রবল হয়েছিল ; এক পক্ষ বেদমন্ত্রকেই ব্ৰহ্ম বলতেন, অন্য পক্ষ ব্ৰহ্মকে পরমাত্মা বলে জেনেছিলেন । বুদ্ধদেব যখন তার ধর্মপ্রচার শুরু করেন তার পূর্বেই ব্রাহ্মণে ক্ষত্রিয়ে মতের দ্বন্দ্ব র্তার পথ অনেকটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। \う8 সপ্তম পত্র রামায়ণ-মহাভারতের মধ্যে ভারতবর্ষের যে মূল ইতিহাস নানা কাহিনীতে বিজড়িত, তাকে স্পষ্টতর করে দেখতে পাব যখন এখানকার পাঠগুলি মিলিয়ে দেখবার সুযোগ হবে। কথায় কথায় এখানকার একজনের কাছে শোনা গেল যে, দ্রোণাচার্য ভীমকে কৌশলে বধ করবার জন্তে কোনো-এক অসাধ্য কর্মে পাঠিয়েছিলেন। দ্রুপদ-বিদ্বেষী দ্রোণ যে পাণ্ডবদের অমুকুল ছিলেন না, তার হয়তো প্রমাণ এখানকার মহাভারতে আছে। রামায়ণের কাহিনী সম্বন্ধে আর-একটি কথা আমার মনে আসছে, সেটা এখানে বলে রাখি। কৃষির ক্ষেত্র দুরকম করে নষ্ট হতে পারে— এক বাইরের দেীরাত্ম্যে, আর-এক নিজের অযত্নে । যখন রাবণ সীতাকে কেড়ে নিয়ে গেল তখন রামের সঙ্গে সীতার আবার মিলন হতে পেরেছিল। কিন্তু, যখন অযত্নে অনাদরে রামসীতার বিচ্ছেদ ঘটল তখন পৃথিবীর কন্যা সীতা পৃথিবীতেই মিলিয়ে গেলেন । অযত্বে নির্বাসিত সীতার গর্ভে যে যমজ সন্তান জন্মেছিল তাদের নাম লব কুশ । লবের মূল ধাতুগত অর্থ ছেদন, কুশের অর্থ জানাই আছে। কুশ ঘাস একবার জন্মালে ফসলের খেতকে-যে কিরকম নষ্ট করে সেও জানা কথা । আমি যে মানেটা আন্দাজ করছি সেটা যদি একেবারেই অগ্রাহ না হয় তা হলে লবের সঙ্গে কুশের একত্র জন্মানোর ঠিক তাৎপর্য কী হতে পারে, এ কথা অামি পণ্ডিতদের জিজ্ঞাসা করি । অন্যদের চিঠি থেকে খবর পেয়ে থাকবে যে, এখানে আমরা প্রকাণ্ড একটা অন্ত্যেষ্টিসৎকারের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছি। মোটের উপরে এটা কতকটা চীনেদের মতো— তারাও অস্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এইরকম ধুমধাম সাজসজ্জা বাজনাবাদ্য করে থাকে। কেবল মম্বোচ্চারণ প্রভৃতির ভঙ্গিট হিন্দুদের মতো। দাহক্রিয়াটা এর জাভা-যাত্রীর পত্র হিন্দুদের কাছ থেকে নিয়েছে। কিন্তু, কেমন মনে হয়, ওটা যেন অস্তরের সঙ্গে নেয় নি। হিন্দুরা আত্মাকে দেহের অতীত করে দেখতে চায়, তাই মৃত্যুর পরেই পুড়িয়ে ফেলে দেহের মমতা থেকে একেবারে মুক্তি পাবার চেষ্টা করে। এখানে মৃতদেহকে অনেক সময়েই বহু বৎসর ধরে রেখে দেয়। এই রেখে দেবার ইচ্ছেটা কবর দেবার ইচ্ছেরই সামিল। এদের রীতির মধ্যে এরা দেহটাকে রেখে দেওয়া আর দেহটাকে পোড়ানো, এই দুই উলটো প্রথার মধ্যে যেন রফানিম্পত্তি করে নিয়েছে। মানুষের মনঃপ্রকৃতির বিভিন্নতা স্বীকার করে নিয়ে হিন্দুধর্ম রফানিস্পত্তিসূত্রে কত বিপরীত রকম রাজিনামা লিখে দিয়েছে তার ঠিকানা নেই। ভেদ নষ্ট করে ফেলে হিন্দুধর্ম ঐক্যস্থাপনের চেষ্টা করে নি, ভেদ রক্ষা করেও সে একটা ঐক্য আনতে চেয়েছে। কিন্তু, এমন ঐক্য সহজ নয় বলেই এর মধ্যে দৃঢ় ঐক্যের শক্তি থাকে না । বিভিন্ন বহুকে এক বলে স্বীকার করেও তার মাঝে মাঝে অলঙ্ঘনীয় দেয়াল তুলে দিতে হয়। একে অবিচ্ছিন্ন এক বলা যায় না, একে বলতে হয় বিভক্ত এক ৷ ঐক্য এতে ভারগ্রস্ত হয়, ঐক্য এতে শক্তিমান হয় না । আমাদের দেশের স্বধৰ্মানুরাগী অনেকেই বালিদ্বীপের অধিবাসীদের আপন বলে স্বীকার করে নিতে উৎসুক হবেন, কিন্তু সেই মুহুর্তেই নিজের সমাজ থেকে ওদের দূরে ঠেকিয়ে রাখবেন। এইখানে প্রতিযোগিতায় মুসলমানের সঙ্গে আমাদের হারতেই হয়। মুসলমানে মুসলমানে এক মুহূর্তেই সম্পূর্ণ জোড় লেগে যায়, হিন্দুতে হিন্দুতে তা লাগে না । এইজন্যেই হিন্দুর ঐক্য আপন বিপুল অংশ-প্রত্যংশ নিয়ে কেবলই নড় নড়, করছে। মুসলমান যেখানে আসে সেখানে সে-যে কেবলমাত্র আপন বল দেখিয়ে বা যুক্তি দেখিয়ে বা চরিত্র দেখিয়ে সেখানকার \SS লোককে আপন সম্প্রদায়ভুক্ত করে তা নয়, সে অাপন সন্ততিবিস্তার-দ্বারা সজীব ও ধারাবাহিক ভাবে আপন ধর্মের বিস্তার করে। স্বজাতির, এমন-কি, পরজাতির লোকের সঙ্গে বিবাহে তার কোনো বাধা নেই। এই অবাধ বিবাহের দ্বারা সে অাপন সামাজিক অধিকার সর্বত্র প্রসারিত করতে পারে। কেবলমাত্র রক্তপাতের রাস্তা দিয়ে নয়, রক্তমিশ্রণের রাস্তা দিয়ে সে দূরে দূরাস্তরে প্রবেশ করতে পেরেছে। হিন্দু যদি তা পারত তা হলে বালিদ্বীপে হিন্দুধর্ম স্থায়ী বিশুদ্ধ ও পরিব্যাপ্ত হতে দেরি হত না। । ১ আগস্ট ১৯২৭ গিয়ানয়ার ষষ্ঠ ও সপ্তম পত্র শ্ৰীমতী নির্মলকুমারী মহলানবীশকে লিখিত । Wool bo গোলমাল ঘোরাফেরা দেখাশোনা বলাকওয়া নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণের ফাকে ফঁাকে যখন-তখন হু-চার লাইন করে লিখি, ভাবের স্রোত আটকে আটকে যায়, তার সহজ গতিটা থাকে না। একে চিঠি বলা চলে না। কেননা, এর ভিতরে ভিতরে কর্তব্যপরায়ণতার ঠেলা চলছে— সেটাতে কাজকে এগিয়ে দেয়, ভাবকে হয়রান করে। পাখি-ওড়ায় আর ঘুড়ি-ওড়ায় তফাত আছে। আমি ওড়াচ্ছি চিঠির ছলে লেখার ঘুড়ি, কর্তব্যের লাঠাইয়ে বাধা, কেবলই হেঁচকে হেঁচকে ওড়াতে হয়। ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। দিনের মধ্যে দু-তিন রকমের প্রোগ্রাম । নতুন নতুন জায়গায় বক্তৃতা নিমন্ত্রণ ইত্যাদি। গীতার উপদেশ যদি মানতুম, ফললাভের প্রত্যাশা যদি না থাকত, তা হলে পালতোলা নৌকার মতো জীবনতরণী তীর থেকে তাঁরাস্তরে নেচে নেচে যেতে পারত। চলেছি উজান বেয়ে, গুণ টেনে, লগি ঠেলে, দাড় বেয়ে ; পদে পদে জিব বেরিয়ে পড়ছে। আমৃত্যুকাল কোনোদিন কোথাও-যে সহজে ভ্রমণ করতে পারব সে আশা বিড়ম্বনা । পথ সুদীর্ঘ, পাথেয় স্বল্প ; অর্জন করতে করতে, গর্জন করতে করতে, হোটেলে হোটেলে ডলার বর্জন করতে করতে, আমার ভ্রমণ— গলা চালিয়ে আমার পা চালানো। পথে বিপথে যেখানে-সেখানে আচমকা আমাকে বক্তৃতা করতে বলে, আমিও উঠে দাড়িয়ে বকে যাই– আমেরিকায় মুড়ি তৈরি করবার কলের মুখ থেকে যেমন মুড়ি বেরোতে থাকে সেইরকম। হাসিও পায় দুঃখও ধরে। পৃথিবীর পনেরো-আনা লোক কবিকে নিয়ে সর্বসমক্ষে এইরকম অপদস্থ করতেই ভালোবাসে ; বলে, ‘মেসেজ দাও । মেসেজ বলতে কী বুঝায় সেটা ভেবে দেখো। সর্বসাধারণ-নামক নির্বিশেষ পদার্থের \ՇԵր