দুই বোন/শর্মিলা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


 মেয়েরা দুই জাতের, কোনো কোনো পণ্ডিতের কাছে এমন কথা শুনেছি।

 এক জাত প্ৰধানত মা, অার এক জাত প্ৰিয়া।

 ঋতুর সঙ্গে তুলনা করা যায় যদি, মা হলেন বৰ্ষাঋতু। জলদান করেন, ফলদান করেন, নিবারণ করেন তাপ, উধালোক থেকে আপনাকে দেন বিগলিত ক’রে, দূর করেন শুষ্কতা, ভরিয়ে দেন অভাব।

 অার প্ৰিয়া বসন্তঋতু। গভীর তার রহস্য, মধুর তার মায়ামন্ত্ৰ, তার চাঞ্চল্য রক্তে তোলে তরঙ্গ, পেীছয় চিত্তের সেই মণিকোঠায়, যেখানে সোনার বীণায় একটি নিভূত তার রয়েছে নীরবে, ঝংকারের অপেক্ষায়, যে ঝংকারে বেজে বেজে ওঠে সৰ্বদেহে মনে অনিৰ্বচনীয়ের বাণী।

 শশাঙ্কের স্ত্ৰী শৰ্মিলা মায়ের জাত।

 বড়ো বড়ো শান্ত চোখ; ধীর গভীর তার চাহনি; জলভরা নবমেঘের মতো নধর দেহ, স্নিগ্ধ শ্যামল; সিাঁথিতে সি দুরের অরুণরেখা; শাড়ির কালো পাড়টি প্ৰশস্ত; দুই হাতে মকরমুখো মোটা দুই বালা, সেই ভূষণের ভাষা প্ৰসাধনের ভাষা নয়, শুভসাধনের ভাষা।

 স্বামীর জীবনলোকে এমন কোনো প্ৰত্যন্তদেশ নেই যেখানে তার সাম্ৰাজ্যের প্রভাব শিথিল। শ্রীর অতি লালনের আওতায় স্বামীর মন হয়ে পড়েছে অসাবধান। ফাউণ্টেন কলমটা সামান্য দুৰ্যোগে টেবিলের কোনো অনতিলক্ষ্য অংশে ক্ষণকালের জন্যে অগোচর হোলে সেটা। পুনরাবিষ্কারের ভার স্ত্ৰীর পরে। স্নানে যাবার পূর্বে হাতঘড়িটা কোথায় ফেলেছে শশাঙ্কর হঠাৎ সেটা, মনে পড়ে না, শ্রীর সেটা নিশ্চিত চোখে পড়ে। ভিন্ন রঙের দু-জোড়া মোজার এক-এক পাটি এক-এক পায়ে পরে বাইরে যাবার জন্যে যখন সে প্ৰস্তুত, স্ত্ৰী এসে তার প্ৰমাদ সংশোধন করে দেয়। বাংলা মাসের সঙ্গে ইংরেজি মাসের তারিখ জোড়া দিয়ে বন্ধুদের নিমন্ত্ৰণ করে, তার পরে অকালে অপ্ৰত্যাশিত অতিথিসমাগমের অাকস্মিক দায় পড়ে ঐীর উপর। শশাঙ্ক নিশ্চয় জানে দিনযাত্ৰায় কোথাও ক্ৰটি ঘটলেই শ্রীর হাতে তার সংস্কার হবেই, তাই ক্ৰটি ঘটানোই তার স্বভাব হয়ে পড়েছে। স্ত্ৰী সস্নেহ তিরস্কারে বলে, “অার তো পারিনে। তোমার কি কিছুতেই শিক্ষা হবে না।” যদি শিক্ষা হোত তবে " শৰ্মিলার দিনগুলো হোত অনাবাদি ফসলের জমির মতো ।  শশাঙ্ক হয়তো বন্ধুমহলে নিমন্ত্ৰণে গেছে । রাত এগারোটা হোলো, দুপুর হোলো, ব্ৰিজ খেলা চলছে । হঠাৎ বন্ধুরা হেসে উঠল , “ওহে, তোমার সমনজারির পেয়াদা । সময় তোমার অাসন্ন ।”

 সেই চিরপরিচিত মহেশ চাকর । পাকা গোফ , কঁচা মাথার চুল, গায়ে মেরজাই পরা, কাধে রঙিন ঝাড়ন, বগলে বাঁশের লাঠি । মাঠাকরুন খবর নিতে পাঠিয়েছেন বাবু কি আছেন এখানে । মাঠাকরুনের ভয়, পাছে ফেরবার পথে অন্ধকার রাতে দুৰ্যোগ ঘটে । সঙ্গে একটা লণ্ঠনও পাঠিয়েছেন ।

 শশাঙ্ক বিরক্ত হয়ে তাস ফেলে দিয়ে উঠে পড়ে । বন্ধুরা বলে, “অহা একা অরক্ষিত পুরুষমানুষ ।” বাড়ি ফিরে এসে শশাঙ্ক স্ত্ৰীর সঙ্গে যে অালাপ করে সেটা না স্নিগ্ধ ভাষায় না শান্ত ভঙ্গিতে । শৰ্মিলা চুপ ক’রে ভৎসনা মেনে নেয়। কী করবে, পারে না থাকতে । যতপ্ৰকার অসম্ভব বিপত্তি ওর অনুপস্থিতির অপেক্ষায় স্বামীর পথে ষড়যন্ত্ৰ করে এ আশঙ্কা ও কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারে না !  বাইরে লোক এসেছে, হয়তো কাজের কথায়। ক্ষণে ক্ষণে অন্তঃপুর থেকে ছোটো ছোটো চিরকুট অাসছে, “মনে আছে কাল তোমার অসুখ করেছিল। অাজ সকাল সকাল খেতে এসো।” রাগ করে শশাঙ্ক, অাবার হারও মানে। বড়ো দুঃখে একবার স্ত্ৰীকে বলেছিল, “দোহাই তোমার, চক্ৰবতীবাড়ির গিরি মতো একটা ঠাকুরদেবতা আশ্ৰয় করে॥ তোমার, মনোযোগ অামার একলার পক্ষে বেশি। দেবতার সঙ্গে সেটা ভাগাভাগি ক’রে নিতে পারলে সহজ হয়। যতই বাড়াবাড়ি করো দেবতা অপত্তি করবেন না, কিন্তু মানুষ যে দুৰ্বল।”

 শৰ্মিলা বললে, “হায় হায়, একবার কাকাবাবুর সঙ্গে যখন হরিদ্ধার গিয়েছিলুম, মনে আছে তোমার অবস্থা।”

 অবস্থাটা যে অত্যন্ত শোচনীয় হয়েছিল এ-কথা শশাঙ্কই প্রচুর অলংকার দিয়ে একদা শ্রীর কাছে ব্যাখ্যা করেছে। জানত এই অত্যুক্তিতে শৰ্মিলা যেমন অনুতপ্ত তেমনই আনন্দিত হবে। অাজ সেই অমিত ভাষণের প্রতিবাদ করবে কোন মুখে। চুপ ক’রে মেনে যেতে হোলো, শুধু তাই নয়, সেদিনই ভোরবেলায় অল্প একটু যেন সদির অাভাস দেখা দিয়েছে শৰ্মিলার এই কল্পনা অনুসারে তাকে কুইনিন খেতে হোলো দশ গ্ৰেন, তা ছাড়া তুলসীপাতার রস দিয়ে চা। আপত্তি করবার মুখ ছিল না। কারণ ইতিপূৰ্বে অনুরুপ অবস্থায় আপত্তি করেছিল, কুইনিন খায়নি, জরও হয়েছিল, এই বৃত্তান্তটি শশাঙ্কের ইতিহাসে অপরিমোচনীয় অক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে।

 ঘরে অারোগ্য ও অাবামের জন্যে শৰ্মিলার এই যেমন সস্নেহ ব্যগ্ৰতা বাইরে সন্মান রক্ষার জন্যে তার সতৰ্কতা তেমনি সতেজ। একটা দৃষ্টান্ত মনে পড়ছে।

 একবার বেড়াতে গিয়েছিল নৈনিতালে। অাগে থাকতে সমস্ত পথ কামরা ছিল ৱিজাৰ্ভ-করা॥ জংশনে এসে গাড়ি বদলিয়ে অাহারের সন্ধানে গেছে। ফিরে এসে দেখে উদিপরা দুৰ্জনমূতি ওদের বেদখল করবার উদযোগে প্ৰবৃত্ত। স্টেশনমাস্টার এসে এক বিশ্ববিশ্ৰত জেনেরালের নাম ক’রে বললে, কামরাটা তারই, ভুলে অন্য নাম খাটানো হয়েছে। শশাঙ্ক চক্ষু বিস্কারিত করে সসম্ভমে অন্যত্ৰ যাবার উপক্ৰম করছে, হেনকালে শৰ্মিলা গাড়িতে উঠে দরজা আগলিয়ে বললে, “দেখতে চাই কে অামাকে নামায়। ডেকে অানো তোমার জেনেরালকে। ” শশাঙ্ক তখনো সরকারি কৰ্মচারী, উপরও অালার জ্ঞাতিগোত্ৰকে যথোচিত পাশ কাটিয়ে নিরাপদ পথে চলতে সে অভ্যস্ত। সে ব্যস্ত হয়ে যত বলে, “অাহা, কাজ কী, আরো তো গাড়ি আছে,” শৰ্মিলা কানই দেয় না। অবশেষে জেনেরাল সাহেব রিশেমেণ্ট রুমে আহার সমাধা ক’রে চুরুট মুখে দূর থেকে শ্ৰীমূৰ্তির উগ্ৰতা দেখে গেল হ’টে। শশাঙ্ক স্ত্ৰীকে জিজ্ঞাসা করলে, “জানো কতবড়ো লোকটা।” স্ত্ৰী বললে, “জানার গরজ নেই। যে গাড়িটা আমাদের, সে গাড়িতে ও তোমার চেয়ে বড়ো নয়।”

 শশাঙ্ক প্ৰশ্ন করলে, “যদি অপমান করত।”

 শৰ্মিলা জবাব দিলে, “তুমি আছ কী করতে।”

 শশাঙ্ক শিবপুরে পাস-করা এঞ্জিনিয়ার। ঘরের জীবনযাত্ৰায় শশাঙ্কের যতই ঢিলেমি থাক্‌ চাকরির কাজে সে পাকা। প্ৰধান কারণ, কৰ্মস্থানে যে তুঙ্গী গ্রহের নিৰ্ম দৃষ্টি সে হচ্ছে যাকে চলতি ভাষায় বলে বড়োসাহেব। স্ত্ৰীগ্ৰহ সে নয়। শশাঙ্ক ডিস্টিক্ট এঞ্জিনিয়ারি পদে যখন অ্যাকটিনি করছে এমন সময় আসন্ন উন্নতির মোড় ফিরে গেল উলটো দিকে। যোগ্যতা ডিঙিয়ে কঁাচা অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও যে ইংরেজ যুবক বিরল গুণফরেখা নিয়ে তার অাসন দখল করলে কতৃপক্ষের উধ্বতন কৰ্তার সম্পৰ্ক ও সুপারিশ বহন ক’রে তার এই অভাবনীয় অাবিৰ্ভাব।

 শশাঙ্ক বুঝে নিয়েছে এই অৰ্বাচীনকে উপরের অাসনে বসিয়ে নিচের স্তরে থেকে তাকেই কাজ চালিয়ে নিতে হবে। কতৃপক্ষ পিঠে চাপড় মেরে বললে, “ভেরি সরি মজুমদার, তোমাকে যত শীঘ্ৰ পারি উপযুক্ত স্থান জুটিয়ে দেব।” এরা দুজনেই এক ফ্ৰীমেসন লজের অন্তভুক্ত।

 তবু আশ্বাস ও সান্তনা সত্ত্বেও সমস্ত ব্যাপারটা মজুমদারের পক্ষে অত্যন্ত বিস্বাদ হয়ে উঠল। ঘরে এসে ছোটোখাটো সব বিষয়ে খিটখিটি শুরু করে দিলে। হঠাৎ চোখে পড়ল তার আপিসঘরের এককোণে কুল, হঠাৎ মনে হোলো চৌকির উপরে যে সবুজ রঙের ঢাকাটা অাছে সে রঙটা ও দু-চক্ষে দেখতে পারে না। বেহাৱা বারান্দা ঝাড় দিচ্ছিল, ধুলো উড়ছে ব’লে তাকে দিল একটা প্ৰকাণ্ড ধমক। অনিবাৰ্য ধুলো রোজই ওড়ে কিন্তু ধমকটা সদ্য নুতন।

 অসন্মানের খবরটা স্ত্ৰীকে জানালে না। ভাবলে যদি কানে ওঠে তাহলে চাকরির জালটাতে অারো। জাভা-যাত্রীর পত্র উৎসব। খরচপত্র বাদেও যথেষ্ট উদ্ধৃবৃত্ত যদি থাকে তবেই সাহস করে খরচপত্র চলে, এই কথাটা মানি বলে আমরা মুনফ চাই। সেটা ভোগের বাহুল্যের জন্যে নয়, সেটা সাহসের আনন্দের জন্তে । মানুষের বুকের পাট যাতে বাড়ে তাতেই মানুষকে কৃতাৰ্থ করে। বর্তমান যুগে যুরোপেই মানুষকে দেখি যার প্রাণের মুনফা নানা খাতায় কেবলই বেড়ে চলেছে। এইজন্তেই পৃথিবীতে এত ঘট। করে সে আলো জ্বালল। সেই আলোতে সে সকল দিকে প্রকাশমান। অল্প তেলে কেবল একটিমাত্র প্রদীপে ঘরের কাজ চলে যায়, কিন্তু পুরো মানুষটা তাতে অপ্রকাশিত থাকে। এই অপ্রকাশ অস্তিত্বের কাপণ্য, কম করে থাকা । এটা মানবসত্যের অবসাদ । জীবলোকে মানুষরা জ্যোতিষ্কজাতীয় ; জন্তুরা কেবলমাত্র বেঁচে থাকে, তাদের অস্তিত্ব দীপ্ত হয়ে ওঠে নি। কিন্তু, মানুষ কেবল-যে আত্মরক্ষা করবে তা নয়, সে আত্মপ্রকাশ করবে। এই প্রকাশের জন্যে আত্মার দীপ্তি চাই। অস্তিত্বের প্রাচুর্য থেকে, অস্তিত্বের ঐশ্বর্য থেকেই এই দীপ্তি। বর্তমান যুগে যুরোপই সকল দিকে আপনার রশ্মি বিকীর্ণ করেছে ; তাই মানুষ সেখানে কেবল-যে টিকে আছে তা নয়, টিকে থাকার চেয়ে আরো অনেক বেশি করে আছে । পর্যাপ্তে চলে আত্মরক্ষা, অপর্যাপ্তে আত্মপ্রকাশ। যুরোপে জীবন অপর্যাপ্ত । এটাতে আমি মনে দুঃখ করি নে। কারণ, যে দেশেই যে কালেই মানুষ কৃতাৰ্থ হোক-না কেন, সকল দেশের সকল কালের মানুষকেই সে কৃতাৰ্থ করে। যুরোপ আজ প্রাণপ্রাচুর্যে সমস্ত পৃথিবীকেই স্পর্শ করেছে। সর্বত্রই মানুষের সুপ্ত শক্তির দ্বারে তার আঘাত এসে পড়ল। প্রভূতের দ্বারাই তার প্রভাব। যুরোপ সর্বদেশ সর্বকালকে-যে স্পর্শ করেছে সে তার কোন প্রথম পত্ৰ সত্য দ্বারা ? তার বিজ্ঞান সেই সত্য। তার যে বিজ্ঞান মানুষের সমস্ত জ্ঞানের ক্ষেত্রকে অধিকার করে কর্মের ক্ষেত্রে জয়ী হয়েছে সে একটা বিপুল শক্তি। এইখানে তার চাওয়ার অন্ত নেই, তার পাওয়াও সেই পরিমাণে। গত বছর যুরোপ থেকে আসবার সময় একটি জর্মন যুবকের সঙ্গে আমার আলাপ হয় । তিনি র্তার অল্পবয়সের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ভারতবর্ষে আসছিলেন । মধ্য-ভারতের আরণ্য প্রদেশে যে-সব জাতি প্রায় অজ্ঞাতভাবে আছে তু বৎসর তাদের মধ্যে বাস করে তাদের রীতিনীতি তন্ন তন্ন করে জানতে চান। এরই জন্তে র্তারা দুজনে প্রাণ পণ করতে কুষ্ঠিত হন নি। মানুষ সম্বন্ধে মানুষকে আরো জানতে হবে, সেই আরো জানা বর্বর জাতির সীমার কাছে এসেও থামে না । সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয়কে এইরকম সংঘবদ্ধ করে জানা, বৃহবদ্ধ করে সংগ্রহ করা, জানবার সাধনায় মনকে সম্পূর্ণ মোহমুক্ত করা, এতে করে মানুষ যে কত প্রকাণ্ড বড়ো হয়েছে যুরোপে গেলে তা বুঝতে পারা যায়। এই শক্তি দ্বারা পৃথিবীকে যুরোপ মানুষের পৃথিবী করে স্বষ্টি করে তুলছে। যেখানে মানুষের পক্ষে যা-কিছু বাধা আছে তা দূর করবার জন্যে সে যে শক্তি প্রয়োগ করছে তাকে যদি আমরা সামনে মূর্তিমান করে দেখতে পেতুম তা হলে তার বিরাট রূপে অভিভূত হতে হত। এইখানে যুরোপের প্রকাশ যেমন বড়ো, যাকে নিয়ে সকল মানুষ গর্ব করতে পারে, তেমনি তার এমন একটা দিক আছে যেখানে তার প্রকাশ আচ্ছন্ন। উপনিষদে অাছে, যে সাধকেরা সিদ্ধিলাভ করেছেন— তে সর্বগং সর্বতঃ প্রাপ্য ধরা যুক্তাত্মানঃ সর্বমেবাবিশন্তি : র্তারা সর্বগামী সত্যকে সকল দিক থেকে লাভ করে যুক্তাত্মভাবে সমস্তের মধ্যে প্রবেশ করেন। সত্য সর্বগামী VG) জাভা-যাত্রীর পত্র বলেই মানুষকে সকলের মধ্যে প্রবেশাধিকার দেয় । বিজ্ঞান বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে মানুষের প্রবেশপথ খুলে দিচ্ছে ; কিন্তু আজ সেই যুরোপে এমন একটি সত্যের অভাব ঘটেছে যাতে মানুষের মধ্যে মানুষের প্রবেশ অবরুদ্ধ করে। অন্তরের দিকে য়ুরোপ মানুষের পক্ষে একটা বিশ্বব্যাপী বিপদ হয়ে উঠল। এইখানে বিপদ তার নিজেরও ৷ এই জাহাজেই একজন ফরাসি লেখকের সঙ্গে আমার আলাপ হল। তিনি আমাকে বলছিলেন, যুদ্ধের পর থেকে যুরোপের নবীন যুবকদের মধ্যে বড়ো করে একটা ভাবনা ঢুকেছে। এই কথা তারা বুঝেছে, তাদের আইডিয়ালে একটা ছিদ্র দেখা দিয়েছিল, যে ছিদ্র দিয়ে বিনাশ ঢুকতে পারলে। অর্থাৎ কোথাও তারা সত্যভ্রষ্ট হল, এতদিনে সেটা ধরা পড়েছে। মানুষের জগৎ অমরাবতী, তার যা সত্য-ঐশ্বৰ্ষ তা দেশে কালে পরিমিত নয়। নিজের জন্য নিয়ত মানুষ এই-যে অমরলোক স্বষ্টি করছে তার মূলে আছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা করবার অসীম সাহস। কিন্তু, বড়োকে গড়বার উপকরণ মানুষের ছোটো যেই চুরি করতে শুরু করে অমনি বিপদ ঘটায়। মানুষের চাইবার অন্তহীন শক্তি যখন সংকীর্ণ পথে আপন ধারাকে প্রবাহিত করতে থাকে তখনই কুল ভাঙে, তখনই বিনাশের বন্যা ছৰ্দাম হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মানুষের বিপুল চাওয়া ক্ষুদ্র-নিজের জন্যে হলে তাতেই যত অশাস্তির স্থষ্টি । যেখানে তার সাধনা সকলের জন্যে সেইখানেই মানুষের আকাজক্ষা কৃতাৰ্থ হয় । এই সাধনাকেই গীতা যজ্ঞ বলেছেন ; এই যজ্ঞের দ্বারাই লোকরক্ষা। এই যজ্ঞের পস্থা হচ্ছে নিষ্কাম কর্ম। সে কর্ম দুর্বল হবে না, সে কর্ম ছোটো হবে না, কিন্তু সে কর্মের ফলকামনা যেন নিজের জন্তে না হয় । বিজ্ঞান যে বিশুদ্ধ তপস্যার প্রবর্তন করেছে সে সকল দেশের, প্রথম পত্র সকল কালের, সকল মানুষের— এইজন্যেই মানুষকে তাতে দেবতার শক্তি দিয়েছে, সকলরকম দুঃখদৈন্তপীড়াকে মানবলোক থেকে দূর করবার জন্তে সে অস্ত্র গড়ছে ; মানুষের অমরাবতী নির্মাণের বিশ্বকর্ম এই বিজ্ঞান। কিন্তু, এই বিজ্ঞানই কর্মের রূপে সে হল যমের বাহন। এই পৃথিবীতে মানুষ যদি একেবারে মরে তবে সে এইজন্তেই মরবে— সে সত্যকে জেনেছিল কিন্তু সত্যের ব্যবহার জানে নি। সে দেবতার শক্তি পেয়েছিল, দেবত্ব পায় নি । বর্তমান যুগে মামুষের মধ্যে সেই দেবতার শক্তি দেখা দিয়েছে যুরোপে। কিন্তু সেই শক্তি কি মানুষকে মারবার জন্যেই দেখা দিল ? গত যুরোপের যুদ্ধে এই প্রশ্নটাই ভয়ংকর মূর্তিতে প্রকাশ পেয়েছে। যুরোপের বাইরে সর্বত্রই যুরোপ বিভীষিকা হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ আজ এসিয়া আফ্রিকা জুড়ে । যুরোপ আপন বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের মধ্যে আসে নি, এসেছে আপন কামনা নিয়ে । তাই এসিয়ার হৃদয়ের মধ্যে যুরোপের প্রকাশ অবরুদ্ধ। বিজ্ঞানের স্পর্ধায়, শক্তির গর্বে, অর্থের লোভে, পৃথিবী জুড়ে মানুষকে লাঞ্ছিত করবার এই-যে চর্চা বহুকাল থেকে যুরোপ করছে, নিজের ঘরের মধ্যে এর ফল যখন ফলল তখন আজ সে উদবিগ্ন । তৃণে আগুন লাগাচ্ছিল, আজ তার নিজের বনস্পতিতে সেই আগুন লাগল। সে ভাবছে, থামব কোথায় ? সে থামা কি যন্ত্রকে থামিয়ে দিয়ে ? আমি তা বলি নে । থামাতে হবে লোভ । সে কি ধর্ম-উপদেশ দিয়ে হবে ? তাও সম্পূর্ণ হবে না। তার সঙ্গে বিজ্ঞানেরও যোগ চাই । যে সাধনায় লোভকে ভিতরের দিক থেকে দমন করে সে সাধনা ধর্মের, কিন্তু যে সাধনায় লোভের কারণকে বাইরের দিক থেকে দূর করে সে সাধনা বিজ্ঞানের। দুইয়ের সম্মিলনে সাধনা (t জাভা-ৰাত্রীর পত্র সিদ্ধ হয়, বিজ্ঞানবুদ্ধির সঙ্গে ধর্মবুদ্ধির আজ মিলনের অপেক্ষ আছে । 曝 | জাভায় যাত্রাকালে এই-সমস্ত তর্ক আমার মাথায় কেন এল জিজ্ঞাসা করতে পার। এর কারণ হচ্ছে এই যে, ভারতবর্ষের বিদ্যা একদিন ভারতবর্ষের বাইরে গিয়েছিল। কিন্তু সেই বাইরের লোক তাকে স্বীকার করেছে । তিববত মঙ্গোলিয়া মালয়দ্বীপসকলে ভারতবর্ষ জ্ঞানধর্ম বিস্তার করেছিল, মানুষের সঙ্গে মানুষের আন্তরিক সত্যসম্বন্ধের পথ দিয়ে। ভারতবর্ষের সেই সর্বত্র-প্রবেশের ইতিহাসের চিহ্ন দেখবার জন্তে আজ আমরা তীর্থযাত্রা করেছি। সেইসঙ্গে এই কথাও দেখবার অাছে, সেদিনকার ভারতবর্ষের বাণী শুষ্কতা প্রচার করে নি। মানুষের ভিতরকার ঐশ্বর্যকে সকল দিকে উদবোধিত করেছিল–– স্থাপত্যে ভাস্কর্যে চিত্রে সংগীতে সাহিত্যে । তারই চিহ্ন মরুভূমে অরণ্যে পর্বতে দ্বীপে দ্বীপান্তরে, দুর্গম স্থানে, দুঃসাধ্য কল্পনায়। সন্ন্যাসীর যে মন্ত্র মানুষকে রিক্ত ক’রে নগ্ন করে, মানুষের যৌবনকে পঙ্গু করে, মানবচিত্তবৃত্তিকে নানা দিকে খর্ব করে, এ সে মন্ত্র নয়। এ জরাজীর্ণ কুশপ্রাণ বৃদ্ধের বাণী নয়, এর মধ্যে পরিপূর্ণপ্রাণ বীর্যবান যৌবনের প্রভাব । 8סיס s bה-ןפס צ কল্যাণীয়াসু দেশ থেকে বেরোবার মুখে আমার উপর ফরমাশ এল কিছু-কিছু লেখা পাঠাতে হবে। কাকে পাঠাব লেখা, কে পড়বে ? সর্বসাধারণ ? সর্বসাধারণকে বিশেষ করে চিনি নে, এইজন্তে তার ফরমাশে যখন লিখি তখন শক্ত করে বাধানো খুব-একটা সাধারণ খাতা খুলে লিখতে হয় ; সে লেখার দাম খতিয়ে হিসেব কষা চলে। কিন্তু, মানুষের একটা বিশেষ খাতা আছে; তার আলগা পাতা, সেটা যা-তা লেখবার জন্যে, সে লেখার দামের কথা কেউ ভাবেও না। লেখাটাই তার লক্ষ্য, কথাটা উপলক্ষ। সেরকম লেখা চিঠিতে ভালো চলে ; আটপৌরে লেখা— তার না আছে মাথায় পাগড়ি, না আছে পায়ে জুতো। পরের কাছে পরের বা নিজের কোনো দরকার নিয়ে সে যায় না— সে যায় যেখানে বিনা-দরকারে গেলেও জবাবদিহি নেই, যেখানে কেবলমাত্র বকে যাওয়ার জন্যেই যাওয়া-আসা। স্রোতের জলের যে ধ্বনি সেটা তার চলারই ধ্বনি, উড়ে-চলা মৌমাছির পাখার যেমন গুঞ্জন। আমরা যেটাকে বকুনি বলি সেটাও সেই মানসিক চলে যাওয়ারই শব্দ। চিঠি হচ্ছে লেখার অক্ষরে বকে যাওয়া । এই বকে-যাওয়াটা মনের জীবনের লীলা । দেহটা কেবলমাত্র চলবার জন্যেই বিনা-প্রয়োজনে মাঝে মাঝে এক-একবার ধা করে চলে ফিরে আসে। বাজার করবার জন্যেও নয়, সভা করবার জন্যেও নয়, নিজের চলাতেই সে নিজে আনন্দ পায় বলে । তেমনি নিজের বকুনিতেই মন জীবনধর্মের তৃপ্তি পায়। তাই বকবার অবকাশ চাই, লোক চাই। বক্তৃতার জন্যে লোক চাই অনেক, বকার জন্তে এক-আধজন । खांड-बांबौद्र श्रृंख्र দেশে অভ্যস্ত জায়গায় থাকি নিত্যনৈমিত্তিক কাজের মধ্যে, জানা অজানা লোকের ভিড়ে। নিজের সঙ্গে নিজের আলাপ করবার সময় থাকে না । সেখানে নানা লোকের সঙ্গে নানা কেজো কথা নিয়ে কারবার। সেটা কেমনতরো ? যেন বাধা পুকুরের ঘাটে দশজনে জটলা করে জল ব্যবহার । কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা চাতকের ধর্ম অাছে ; হাওয়ায় উড়ে-আসা মেঘের বর্ষণের জন্তে সে চেয়ে থাকে এক একা। মনের আকাশে উড়ো ভাবনাগুলো সেই মেঘ— সেটা খামখেয়ালের ঝাপটা লেগে ; তার আবির্ভাব তিরোভাব সবই আকস্মিক । প্রয়োজনের তাগিদ-মত তাকে বাধা-নিয়মে পাওয়া যায় না বলেই তার বিশেষ দাম ; পৃথিবী আপনারই বাধা জলকে আকাশে উড়ো জল করে দেয় ; নিজের ফসলক্ষেতকে সরস করবার জন্তে সেই জলের দরকার। বিনা প্রয়োজনে নিজের মনকে কথা বলাবার সেই প্রয়োজন, সেটাতে মন আপন ধারাতেই আপনাকে অভিষিক্ত করে। জীবনযাত্রার পরিচিত ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে মন আজ যা-তা ভাববার সময় পেল । তাই ভেবেছি, কোনো সম্পাদকি বৈঠক স্মরণ করে প্রবন্ধ আওড়াব না, চিঠি লিখব তোমাকে । অর্থাৎ, পাত পেড়ে ভোজ দেওয়া তাকে বলা চলবে না ; সে হবে গাছতলায় দাড়িয়ে হাওয়ায় পড়ে-যাওয়া ফল আঁচলে ভরে দেওয়া । তার কিছু পাকা, কিছু র্কাচা ; তার কোনোটাতে রঙ ধরেছে, কোনোটাতে ধরে নি। তার কিছু রাখলেও চলে, কিছু ফেলে দিলেও নালিশ চলবে না । সেইভাবেই চিঠি লিখতে শুরু করেছিলুম। কিন্তু, আকাশের আলো দিলে মুখ-ঢাকা । বৈঠকখানার আসর বন্ধ হয়ে গেলে ফরাশ বাতি নিবিয়ে দিয়ে যেমন ঝাড়লণ্ঠনে ময়লা রঙের ঘেরাটোপ "ש দ্বিতীয় পত্র পরিয়ে দেয়, হ্যলোকের ফরাশ সেই কাগুটা করলে ; একটা ফিকে ধোয়াটে রঙের আবরণ দিয়ে আকাশ-সভার তৈজসপত্র দিলে মুড়ে। এই অবস্থায় আমার মন তার হালকা কলমের খেলা আপনিই বন্ধ করে দেয়। বকুনির কুলহারা ঝরনা বাক্যের নদী হয়ে কখন একসময় গভীর খাদে চলতে আরম্ভ করে ; তখন তার চলাটা কেবলমাত্র সূর্যের আলোয় কলধ্বনির নূপুর বাজানোর জন্তে নয়, একটা কোনো লক্ষ্যে পৌছবার সাধনায়। আনমনা সাহিত্য তখন লোকালয়ের মাঝখানে এসে পড়ে সমনস্ক হয়ে ওঠে। তখন বাণীকে অনেক বেশি অতিক্রম করে ভাবনাগুলো মাথা তুলে দাড়ায় । উপনিষদে আছে, স নো বন্ধুর্জনিত স বিধাতা : তিনি ভালোবাসেন, তিনি সৃষ্টি করেন, আবার তিনিই বিধান করেন। স্থষ্টি-করাটা সহজ আনন্দের খেয়ালে, বিধান-করায় চিন্তা আছে । যাকে খাস সাহিত্য বলে সেটা হল সেই সৃষ্টিকর্তার এলেকায়, সেটা কেবল আপন-মনে । যদি কোনো হিসাবি লোক স্রষ্টাকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে কেন সৃষ্টি করা হল’ তিনি জবাব দেন, “আমার খুশি | সেই খুশিটাই নানা রঙে নানা রসে আপনাতেই আপনি পর্যাপ্ত হয়ে ওঠে। পদ্মফুলকে যদি জিজ্ঞাসা করে ‘তুমি কেন হলে সে বলে, “আমি হবার জন্যেই হলুম। খাটি সাহিত্যেরও সেই একটিমাত্র জবাব । অর্থাৎ, সৃষ্টির একটা দিক আছে যেটা হচ্ছে স্থষ্টিকর্তার বিশুদ্ধ বকুনি। সে দিক থেকে এমনও বলা যেতে পারে, তিনি আমাকে চিঠি লিখছেন। আমার কোনো চিঠির জবাবে নয়, তার আপনার বলতে ইচ্ছে হয়েছে ব’লে ; কাউকে তো বলা চাই । অনেকেই মন দিয়ে শোনে না, অনেকে বলে, “এ তো সারবান নয় ; এ তো বন্ধুর আলাপ, এ তো সম্পত্তির দলিল নয়। সারবান থাকে মাটির > জাভা-ৰাত্রীর পত্র গর্ভে, সোনার খনিতে ; সে নেই ফুলের বাগানে, নেই সে উদয়দিগন্তে মেঘের মেলায় । আমি একটা গর্ব করে থাকি, ওই চিঠিলিখিয়ের চিঠি পড়তে পারতপক্ষে কখনো ভুলি নে। বিশ্ববকুনি যখন-তখন অামি শুনে থাকি । তাতে বিষয়কাজের ক্ষতি হয়েছে, আর যারা আমাকে দলে ভিড়িয়ে কাজে লাগাতে চায় তাদের কাছ থেকে নিন্দাও শুনেছি ; কিন্তু আমার এই দশা । অথচ, মুশকিল হয়েছে এই যে, বিধাতাও আমাকে ছাড়েন নি। স্বষ্টিকর্তার লীলাঘর থেকে বিধাতার কারখানাঘর পর্যন্ত যে রাস্তাটা গেছে সে রাস্তায় দুই প্রান্তেই আমার আনাগোনার কামাই নেই। এই দোটানায় পড়ে আমি একটা কথা শিখেছি। যিনি স্থষ্টিকর্তা স এব বিধাতা ; সেইজন্যেই তার সৃষ্টি ও বিধান এক হয়ে মিশেছে, তার লীলা ও কাজ এই দুয়ের মধ্যে একান্ত বিভাগ পাওয়া যায় না। তার সকল কর্মই কারুকর্ম ; ছুটিতে খাটুনিতে গড় ; কর্মের রূঢ় রূপের উপর সৌন্দর্যের আব্রু টেনে দিতে র্তার আলস্য নেই। কর্মকে তিনি লজ্জা দেন নি। দেহের মধ্যে যন্ত্রের ব্যবস্থাকৌশল আছে, কিন্তু তাকে আবৃত করে আছে তার সুষমাসৌষ্ঠব, বস্তুত সেইটেই প্রকাশমান । মানুষকেও তিনি সৃষ্টি করবার অধিকার দিয়েছেন ; এইটেই তার সব চেয়ে বড়ো অধিকার । মানুষ যেখানেই আপনার কর্মের গৌরব বোধ করেছে সেখানেই কর্মকে সুন্দর করবার চেষ্টা করেছে। তার ঘরকে বানাতে চায় সুন্দর করে ; তার পানপাত্র অন্নপাত্র সুন্দর ; তার কাপড়ে থাকে শোভার চেষ্টা । তার জীবনে প্রয়োজনের চেয়ে সজ্জার অংশ কম থাকে না । যেখানে মানুষের মধ্যে স্বভাবের সামঞ্জস্য আছে সেখানে এইরকমই ঘটে । এই সামঞ্জস্য নষ্ট হয় যেখানে কোনো একটা রিপু, বিশেষত У о দ্বিতীয় পত্র লোভ, অতি প্রবল হয়ে ওঠে। লোভ জিনিসটা মানুষের দৈন্য থেকে, তার লজ্জা নেই ; সে অাপন অসন্ত্রমকে নিয়েই বড়াই করে। বড়ো বড়ো মুনফাওয়ালা পাটকল চটকল গঙ্গার ধারের লাবণ্যকে দলন করে ফেলেছে দম্ভভরেই। মানুষের রুচিকে সে একেবারেই স্বীকার করে নি ; একমাত্র স্বীকার করেছে তার পাওনার ফুলেওঠা থলিটাকে । বর্তমান যুগের বাহরূপ তাই নির্লজ্জতায় ভরা। ঠিক যেন পাকযন্ত্রটা দেহের পর্দা থেকে সর্বসম্মুখে বেরিয়ে এসে আপন জটিল অন্ত্রতন্ত্র নিয়ে সর্বদা দোলায়মান । তার ক্ষুধার দাবি ও সুনিপুণ পাকপ্রণালীর বড়াইটাই সর্বাঙ্গীণ দেহের সম্পূর্ণ সৌষ্ঠবের চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে। দেহ যখন আপন স্বরূপকে প্রকাশ করতে চায় তখন সুসংযত সুষমার দ্বারাই করে ; যখন সে আপন ক্ষুধাকেই সব ছাড়িয়ে একান্ত করে তোলে তখন বীভৎস হতে তার কিছুমাত্র লজ্জা নেই। লালায়িত রিপুর নির্লজ্জতাই বর্বরতার প্রধান লক্ষণ, তা সে সভ্যতার গিলটি-করা তকমাই পরুক কিম্বা অসভ্যতার পশুচর্মেই coso orgto— devil dance? নাচুক f«Fol jazz dance | বর্তমান সভ্যতায় রুচির সঙ্গে কৌশলের যে বিচ্ছেদ চার দিক থেকেই দেখতে পাই তার একমাত্র কারণ, লোভটাই তার অন্তসকল সাধনাকে ছাড়িয়ে লম্বোদর হয়ে উঠেছে। বস্তুর সংখ্যাধিক্যবিস্তারের প্রচণ্ড উন্মত্ততায় সুন্দরকে সে জায়গা ছেড়ে দিতে চায় না । স্বষ্টিপ্রেমের সঙ্গে পণ্যলোভের এই বিরোধে মানবধর্মের মধ্যে যে আত্মবিপ্লব ঘটে তাতে দাসেরই যদি জয় হয়, পেটুকতারই যদি আধিপত্য বাড়ে, তা হলে যম আপন সশস্ত্র দূত পাঠাতে দেরি করবে না ; দল-বল নিয়ে নেমে আসবে দ্বেষ হিংসা মোহ মদ মাৎসর্য, লক্ষ্মীকে দেবে বিদায় করে । SS জাভা-যাত্রীর পত্র পুর্বেই বলেছি, দীনতা থেকে লোভের জন্ম ; সেই লোভের একটি স্থলভমু সহোদরা আছে তার নাম জড়তা । লোভের মধ্যে অসংযত উদ্যম ; সেই উদ্যমই তাকে অশোভন করে। জড়তায় তার উলটো, সে নড়ে বসতে পারে না ; সে না পারে সজ্জাকে গড়তে, না পারে আবর্জনাকে দূর করতে ; তার অশোভনতা নিরুদ্যমের। সেই জড়তার অশোভনতায় আমাদের দেশের মানবসন্ত্রম নষ্ট করেছে। তাই আমাদের ব্যবহারে আমাদের জীবনের অনুষ্ঠানে সৌন্দর্য বিদায় নিতে বসল ; আমাদের ঘরে-দ্বারে বেশে-ভূষায় ব্যবহারসামগ্রীতে রুচির স্বাধীন প্রকাশ রইল না ; তার জায়গায় এসে পড়েছে চিত্তহীন আড়ম্বর— এতদূর পর্যন্ত শক্তির অসাড়ত এবং আপন রুচি সম্বন্ধেও নির্লজ্জ আত্ম-অবিশ্বাস যে, আমাদের সেই আড়ম্বরের সহায় হয়েছে চৌরঙ্গির বিলিতি দোকানগুলো। বারবার মনে করি, লেখাগুলোকে করব বঙ্কিমবাবু যাকে বলেছেন ‘সাধের তরণী’। কিন্তু, কোথা থেকে বোঝা এসে জমে, দেখতে দেখতে সাধের তরী হয়ে ওঠে বোঝাই-তরী। ভিতরে রয়েছে নানা প্রকারের ক্ষোভ, লেখনীর আওয়াজ শুনেই তারা স্থানে অস্থানে বেরিয়ে পড়ে ; কোনো বিশেষ প্রসঙ্গ যার মালেক নয় এমন একটা রচনা পেলেই সেটাকে অমিবাস গাড়ি করে তোলে। কেউ-বা ভিতরেই ঢুকে বেঞ্চির উপর পা তুলে বসে যায়, কেউ-বা পায়দানে চড়ে চলতে থাকে ; তার পরে যেখানে খুশি অকস্মাৎ লাফ দিয়ে নেমে পড়ে । আজ শ্রাবণমাসের পয়লা । কিন্তু বাকড়া-বুটি-ওয়ালা শ্রাবণ এক ভবঘুরে বেদের মতো তার কালো মেঘের তাবু গুটিয়ে নিয়ে কোথায় যে চলে গেছে তার ঠিকানা নেই। আজ যেন আকাশসরস্বতী নীলপদ্মের দোলায় দাড়িয়ে । আমার মন ওই সঙ্গে সঙ্গে > ૨ দ্বিতীয় পত্র ফুলছে সমস্ত পৃথিবীটাকে ঘিরে। আমি যেন আলোতে তৈরি, বাণীতে গড়া, বিশ্বরাগিণীতে ঝংকৃত, জলে স্থলে আকাশে ছড়িয়ে যাওয়া । আমি শুনতে পাচ্ছি সমুদ্রটা কোন কাল থেকে কেবলই ভেরী বাজাচ্ছে, আর পৃথিবীতে তারই উত্থানপতনের ছন্দে জীবের ইতিহাসযাত্রা চলেছে আবির্ভাবের অস্পষ্টতা থেকে তিরোভাবের অদৃশ্বের মধ্যে। একদল বিপুলকায় বিকটাকার প্রাণী যেন স্থষ্টিকর্তার দুঃস্বপ্নের মতো দলে দলে এল, আবার মিলিয়ে গেল। তার পরে মানুষের ইতিহাস কবে শুরু হল প্রদোষের ক্ষীণ আলোতে, গুহাগহবর-অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায়। দুই পায়ের উপর খাড়া-দাড়ানো ছোটো ছোটো চটুল জীব, লাফ দিয়ে চড়ে চড়ে বসল মহাকায় বিপদবিভীষিকার পিঠের উপর, বিষ্ণু যেমন চড়েছেন গরুড়ের পিঠে। অসাধ্যের সাধনায় চলল তারা জীর্ণ যুগান্তরের ভগ্নাংশবিকীর্ণ দুর্গম পথে। তারই সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীকে ঘিরে ঘিরে বরুণের মৃদঙ্গ বাজতে লাগল দিনে রাত্রে, তরঙ্গে তরঙ্গে । আজ তাই শুনছি আর এমন কোনো-একটা কথা ছন্দে আবৃত্তি করতে ইচ্ছা করছে যা অনাদি কালের। আজকের দিনের মতোই এইরকম আলো-ঝলমলানো কলকল্লোলিত নীলজলের দিকে তাকিয়ে ইংরেজ কবি শেলি একটি কবিতা লিখেছেন— The sun is warm, the sky is clear, The waves are dancing fast and bright. কিন্তু, এ তার ক্লান্ত জীবনের অবসাদের বিলাপ। এর সঙ্গে আজ ভিতরে বাইরে মিল পাচ্ছি নে। একটা জগৎজোড়া কলক্ৰন্দন শুনতে পাচ্ছি বটে, সেই ক্ৰন্দন ভরিয়ে তুলছে অন্তরীক্ষকে, যে অন্তরীক্ষের উপর বিশ্বরচনার ভূমিকা, যে অন্তরীক্ষকে বৈদিক ভারত নাম দিয়েছে ক্ৰন্দসী । এ কিন্তু শ্রান্তিভারাতুর পরাভবের ক্ৰন্দন >\2 জাভা-ৰাষ্ট্রীর পত্ৰ নয় । এ নবজাত শিশুর ক্ৰন্দন, যে শিশু উর্ধ্বস্বরে বিশ্বদ্বারে আপন অস্তিত্ব ঘোষণা ক’রে তার প্রথমক্রন্দিত নিশ্বাসেই জানায়, “অয়মহং ভো ? অসীম ভাবীকালের দ্বারে সে অতিথি । অস্তিত্বের ঘোষণায় একটা বিপুল কান্না আছে। কেননা, বারে বারে তাকে ছিন্ন করতে হয় আবরণ, চূর্ণ করতে হয় বাধা । অস্তিত্বের অধিকার পড়ে-পাওয়া জিনিস নয়, প্রতি মুহূর্তেই সেটা লড়াই-করে-নেওয়া জিনিস। তাই তার কান্না এত তীব্র, আর জীবলোকে সকলের চেয়ে তীব্র মানবসত্তার নবজীবনের কান্না । সে যেন অন্ধকারের-গর্ভ-বিদারণ-করা নবজাত আলোকের ক্ৰন্দনধ্বনি। তারই সঙ্গে সঙ্গে নব নব জন্মে নব নব যুগে দেবলোকে বাজে মঙ্গলশঙ্খ, উচ্চারিত হয় বিশ্বপিতামহের অভিনন্দনমন্ত্র । আজকের দিনে এই আমার শেষ উপলব্ধি নয়। সকালে দেখলুম, সমুদ্রের প্রান্তরেখায় আকাশ তার জ্যোতির্ময়ী চিরন্তনী বাণীটি লিখে দিলে ; সেটি পরম শান্তির বাণী, তা মর্তলোকের বহু যুগের বহু দুঃখের আর্তকোলাহলের আবর্তকে ছাড়িয়ে ওঠে, যেন অশ্রুর ঢেউয়ের উপরে শ্বেতপদ্মের মতো । তার পরে দিনশেষের দিকে দেখলুম একটি অখ্যাত ব্যক্তিকে, যার মধ্যে মনুষ্যত্ব অপমানিত —যদি সময় পাই তার কথা পরে বলব। তখন মানব-ইতিহাসের দিগন্তে দিগন্তে দেখতে পেলুম বিরোধের কালো মেঘ, অশান্তির প্রচ্ছন্ন বজ্রগর্জন, আর লোকালয়ের উপর রুদ্রের ভ্ৰকুটিচ্ছায়া । ইতি ২ শ্রাবণ ১৩৩৪ S 8 \O বুনো হাতি মূর্তিমান উৎপাত, বজ্রবৃংহিত ঝড়ের মেঘের মতো। এতটুকু মানুষ, হাতির একটা পায়ের সঙ্গেও যার তুলনা হয় না, সে ওকে দেখে খামখা বলে উঠল, “আমি এর পিঠে চড়ে বেড়াব।' এই প্রকাণ্ড ছৰ্দাম প্রাণপিণ্ডটাকে গা গা করে শুড় তুলে আসতে দেখেও এমন অসম্ভবপ্রায় কথা কোনো-একজন ক্ষীণকায় মানুষ কোনো-এক কালে ভাবতেও পেরেছে, এইটেই আশ্চর্য। তার পরে ‘পিঠে চড়ব’ বলা থেকে আরম্ভ করে পিঠে চড়ে বসা পর্যন্ত যে ইতিহাস সেটাও অতি অদ্ভুত। অনেকদিন পর্যন্তই সেই অসম্ভবের চেহারা সম্ভবের কাছ দিয়েও অাসে নি— পরম্পরাক্রমে কত বিফলতা কত অপঘাত মানুষের সংকল্পকে বিদ্রুপ করেছে তার সংখ্যা নেই ; সেটা গণনা করে করে মানুষ বলতে পারত, এটা হবার নয়। কিন্তু তা বলে নি। অবশেষে একদিন সে হাতির মতো জন্তুরও পিঠে চড়ে ফসলখেতের ধারে লোকালয়ের রাস্তায়ঘাটে ঘুরে বেড়ালো। এটা সাংঘাতিক অধ্যবসায়, সেইজন্যেই গণেশের হাতির মুণ্ডে মানুষের সিদ্ধির মূর্তি। এই সিদ্ধির দুই দিকে দুই জন্তুর চেহারা, এক দিকে রহস্যসন্ধানকারী সূক্ষ্মন্ত্রাণ তীক্ষ্ণদৃষ্টি খরদন্ত চঞ্চল কৌতুহল, সেটা ইছর, সেইটেই বাহন ; আর-এক দিকে বন্ধনে বশীভূত বন্যশক্তি, যা দুৰ্গমের উপর দিয়ে বাধা ডিঙিয়ে চলে, সেই হল যান— সিদ্ধির যানবাহনযোগে মানুষ কেবলই এগিয়ে চলছে। তার ল্যাবরেটরিতে ছিল ইছর, আর তার য়েরোপ্লেনের মোটরে আছে হাতি । ইছরটা চুপিচুপি সন্ধান বাংলিয়ে দেয়, কিন্তু ওই হাতিটাকে কায়দা করে নিতে মানুষের অনেক দুঃখ । তা হোক, মানুষ দুঃখকে দেখে হার মানে না, তাই সে আজ হ্যলোকের রাস্তায় যাত্রা আরম্ভ করলে। কালিদাস > & জাভা-যাত্রীর পত্র রাঘৱদের কথায় বলেছেন, তারা ‘আনাকরথৰত্ম নাম— স্বর্গ পর্যন্ত র্তাদের রথের রাস্তা। যখন এ কথা কবি বলেছেন তখন মাটির মানুষের মাথায় এই অদ্ভুত চিন্তা ছিল যে, আকাশে না চললে মানুষের সার্থকতা নেই। সেই চিন্তা ক্রমে আজ রূপ ধরে বাইরের আকাশে পাখা ছড়িয়ে দিলে। কিন্তু, রূপ যে ধরল সে মৃত্যুজয়কারী ভীষণ তপস্যায়। মানুষের বিজ্ঞানবুদ্ধি সন্ধান করতে জানে, এই যথেষ্ট নয় ; মানুষের কীর্তিবুদ্ধি সাহস করতে জানে, এইটে তার সঙ্গে যখন মিলেছে তখনই সাধকদের তপঃসিদ্ধির পথে পথে ইন্দ্রদেব যে-সব বাধা রেখে দেন সেগুলো ধূলিসাৎ হয়। তীরে দাড়িয়ে মানুষ সামনে দেখলে সমুদ্র । এত বড়ো বাধা কল্পনা করাই যায় না। চোখে দেখতে পায় না এর পার, তলিয়ে পায় না এর তল ৷ যমের মোষের মতো কালো, দিগন্তপ্রসারিত বিরাট একটা নিষেধ কেবলই তরঙ্গতর্জনী তুলছে। চিরবিদ্রোহী মানুষ বললে, “নিষেধ মানব না ’ বজ্রগর্জনে জবাব এল, ‘না মান তো মরবে। মানুষ তার এতটুকুমাত্র বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ তুলে বললে, ‘মরি তো মরব ? এই হল জাত-বিদ্রোহীদের উপযুক্ত কথা । জাতবিদ্রোহীরাই চিরদিন জিতে এসেছে। একেবারে গোড়া থেকেই প্রকৃতির শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষ নানা ভাবেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিলে। আজ পর্যন্ত তাই চলছে। মানুষদের মধ্যে যারা যত খাটি বিদ্রোহী, যারা বাহ শাসনের সীমাগণ্ডি যতই মানতে চায় না, তাদের অধিকার ততই বেড়ে চলতে থাকে। যেদিন সাড়ে-তিন হাত মানুষ স্পর্ধা করে বললে এই সমুদ্রের পিঠে চড়ব’ সেদিন দেবতার হাসলেন না ; তারা এই বিদ্রোহীর কানে জয়মন্ত্র পড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করে রইলেন। সমুদ্রের পিঠ আজ আয়ত্ত হয়েছে, সমুদ্রের তলটাকেও কায়দা করা শুরু হল। >や9