বিষয়বস্তুতে চলুন

দুধ-ভাত/ছবি

উইকিসংকলন থেকে

ছবি

 তোমরা যে যুগে জন্মেছ, সে যুগে কেবলি হানাহানি। মানুষ রক্তলোলুপ, নৃশংস দ্বন্দ্বে মেতে উঠেছে। মনে কর গত ঊনচল্লিশ সালের কথা, জার্মান যেদিন বিপুল বিক্রমে বৃটিশএর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধ’রে যে দিনগুলি চলে গেছে, তার রক্তরাঙা দিনগুলি তোমরা, আমরা কেউই ভুলতে পারিনি। মানুষের অন্ন-বস্ত্রের কি নিদারুণ বীভৎস দৃশ্য! গ্রাম থেকে দলে দলে যে ক্ষুধার্তের দল কোলকাতার রাজপথ ফুটপাত ভরিয়ে তুলেছিল, ‘মা, একটু ফ্যান দাও'—এই আর্তস্বরে, সে ছবি ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে এলেও তোমরা, আমরা কেউই ভুলতে পারিনি! নিরন্ধ্র কোলকাতা নগরীতে শ্বাপদের পদধ্বনি যেন কঠিনতর হয়ে উঠতো, আর চোখের সামনে সেই কঙ্কাল সার ভুখা মিছিলের দল, কেউ পথে, কেউ ফুটপাতে, একমুঠো অন্নের অভাবে মৃত্যুকে বরণ ক’রে নিচ্ছে...এ দৃশ্য কেউ আমরা ভুলিনি।

 যুদ্ধের দামামা থেমে গেল।  দেশ সুস্থ, সুস্থির হয়ে উঠবার সময় না দিয়েই সুরু হোলো হানাহানি, সে হানাহানি ভায়ে ভায়ে। এই হানাহানিতে কত নিরীহ, নির্বিরোধী লোক মারা গেল এবং তার সংখ্যা যে কত তা যেন নির্ণয় করা যায় না। আমাদের কারুর ভাই গেল, কারুর বাবা গেল, কারুর ছেলে গেল—এই ‘গেল রে’ শব্দ যেন গণনায় শেষ হয় না।

 ১৫ আগস্টের স্বাধীনতা উৎসবের ভিতর মিলনের যে মহৎ ছবি ও দৃষ্টান্ত আমরা পেয়েছিলাম তার মর্যাদা কতটুকু দিতে পেরেছি!

 একটা ছোট্ট গল্প বলি শোন: আমাদের পাড়া কোন দল বা সম্প্রদায়ের পল্লী নয়। কিছু দিন আগে পর্যন্ত জাতিধর্মনির্বিশেষে একই পাড়ায়, একই বাড়ীর বিভিন্ন ফ্ল্যাটে বাস করেছে, আজও সে দৃষ্টান্তের চিহ্ন আছে। পাশাপাশি দোকান নিয়ে নির্বিরোধেই তারা দিন যাপন করে।

 কিন্তু সেদিন যখন অকস্মাৎ দ্বিপ্রহরের সূর্য মাথার ওপর সহস্র শিখায় আগুন জ্বালিয়ে উঠলো—চোখের সামনে দেখলাম অবাধ লুঠ আর নৃশংস হত্যালীলা, কানে শুধু আসে ‘মার মার’ রব! দৃষ্টি ঝাপ্‌সা হয়ে আসে, এ কী! এরা কি উন্মাদ?

 তখন মানুষ আর মানুষ নেই, হিংস্র উন্মত্ততায় সমস্ত ভেঙেচুরে ছারখার হয়ে গেল, তারপর লুঠ, তারপর অগ্নিকাণ্ড। আগুনের শিখার ভিতর যেন কার আর্তস্বর শোনা যায়—‘সংহর, সংহর’

 বড় বড় দমকল এসে রাজপথ ভরিয়ে দিল, আগুন নিভলো বটে, কিন্তু অন্তরাগ্নি তখন দাউ দাউ ক’রে জ্বলছে। মানুষ যে যেখানে পারলো পালালো, যারা না পারলো কেউ মরলো অস্ত্রাঘাতে, কেউ মরলো আগুনে, কেউ মরলো বন্দুকের গুলিতে।  কোণের দিকে ছোট বস্তি, ঠিক বস্তি বলা চলে না—আট-দশ ঘর পশ্চিমা, দুই সম্প্রদায়েরই—বাস করতো। তাদের পেশা, কারুর রিক্সা টানা, কারুর পানের দোকান, কেউ তাদেরই মত যারা তাদের জন্য ভাঁড়ের চা আর বেসন-গুড়ের ফুলুরি বানায়—ছোট্ট দোকানটিতে ব’সে, কেউ বা কেবল মোট ব’য়েই চলে। প্রায় সব ঘরেই এরা স্ত্রীপুত্রসহ বাস করে।

 এর উল্টো দিকে প্রকাণ্ড রাজপথ। প্রশস্ত সেণ্ট্রাল এভিনিউ ঈষৎ বাঁক নিয়ে চ’লে গেছে কতোদূরে। সেণ্টাল এভিনিউ’র এদিকে প্রকাণ্ড কাফিখানা। সুস্থ অবস্থায় দেখা যায় সন্ধ্যা হবার পূর্বেই কত রং-বেরং-এর পোষাক প’রে কত রকমের লোক এই কাফিখানায় ভিড় জমায়। পথের দিকের ছোট্ট বারান্দাতে দাঁড়িয়ে আমি এদের জীবনযাত্রা দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, প্রতিদিনকার ইতিহাস আমি মুখস্থ ব’লে দিতে পারি।

 সকাল হ’লেই লরী এসে দাড়ায় কাফিখানার সামনে, শাক, সব্জী, মাছ, মাংস, ডিম ঝুড়ি ঝুড়ি নামিয়ে দেয়। আর খানিক পরে আসে বিভিন্ন বেকারীর ছোট ছোট গাড়ী, নামিয়ে দেয় রুটি ও বিস্কুটের বোঝা, আরও একটু পরে ধীর মন্থর গতিতে আসে কালো রং-এর প্রকাণ্ড ও উঁচু এক বিরাট লরী, তার থেকে নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রঙীন জল, হরেক রকম তার স্বাদ ও গন্ধ। কত দিন ঝুড়ি নামাবার সময় হাত পিছলে ঝুড়ি পথে প’ড়ে গেছে—কাঁচের টুকরোয়, রঙীন জলে, কুলীর পায়ের রক্তে স্থানটি ভ’রে উঠেছে। এসব দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, বিকেল হতেই দেখেছি, গাড়ীর সমারোহ ও বিভিন্ন পরিচ্ছদের মানুষ —রাত্রি বারটা বাজলে তখন কাফিখানার বাতি নিভলো, কিন্তু জ্বলতে লাগলো সেই কাফিখানার নাম বুকে নিয়ে যে কাঁচের বাক্সটির ভিতর বড় আলো।

 একটু দৃষ্টি প্রসারিত ক’রে কোণের দিকে চোখ ফেরালে দেখি সেই যে ছোট্ট বস্তিমত স্থানটি। এদের বাড়ীর ইতিহাসও আমি মুখস্থ ক’রে ফেলেছি। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে আসার আগেই এদের বাড়ীর মেয়েরা বাইরের কারখানার কাজ সেরে ঘরে ফি’রে ঘর-দোর পরিষ্কার করে, স্নান সেরে আগুন জ্বালায়, প্রতি ঘরের লোহার উনুনের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশের দিকে ওঠে—একেবারে অন্ধকার। কারুর উনুনে ঘটি ক’রে ডাল রান্না হচ্ছে, কারুর বা ভাত, কারুর রুটি সেঁকার তাওয়ার শব্দ, বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা খাবারের জন্য মায়ের কাছে তাগাদা জানাচ্ছে। এই ভাবে ভাত ডাল বা ডাল রুটি, কোনো দিন বা একটু মাছের টিকলী—এই রান্না শেষ হতেই পুরুষরা এসে পড়ে। মোটা পিতলের থালায় পুরুষকে মোটা ভাত বেড়ে দিয়ে, অন্য একটা থালায় ভাত ঢেলে মা ছেলে-মেয়ে নিয়ে একসঙ্গেই খেতে বসে। মায়ের পেট ভ’রে খাওয়া কোনদিন হয়, কোনদিন হয় না। তবু পরম তৃপ্তিতে মা বাচ্চাদের খাইয়ে সব ধুয়ে পরিষ্কার ক’রে কুপির আলোতে ছেলে-মেয়েদের গল্প বলে। তারা ঘুমিয়ে পড়লে মাও শুয়ে পড়ে। আবার ভোর বেলা—তাদের মুড়ি বা বাসি রুটি দিয়ে মায়েরা, বাবারা কাজে বেরিয়ে যায়— ছেলেমেয়েরা ঘরে বা পথের সামনে ব’সে খেলা করে, সন্ধ্যার আশায় ব’সে থাকে—এইভাবে চলে তাদের প্রতিদিন। পূজায়, হোলিতে বা ঈদ-এর সময় দেখেছি কেউ একটু নতুন জামা পরেছে, কেউ দুটো নারকেলের সন্দেশ খাচ্ছে, কেউ দু’গাছা কাগজের মালা এনে দরজার সামনে টাঙিয়ে দিয়েছে। এছাড়া এদের পরিবর্তন নেই।

 সেদিনের আকস্মিক বিরোধের হানাহানি ও রক্তপাতের সময় কে কোথায় ছিটকে পড়লো তার ঠিক নেই। যারা কাজে গিয়েছিল তারা আর ফিরলো না, যে মায়েরা ঘরে ছিল তারা যাদের পেলে তাদের নিয়ে কোথায় গেল কিছুই ঠিকানা নেই। কেউ গেল, কারুর শবদেহ পথের উপর পড়লো—খানিক বাদে রেডক্রশের গাড়ী আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ীতে স্থানলাভ করলো। অদূরে কাফিখানা ভেঙেচূরে ছারখার। তাদের যে পারলো পালালো—না পারলো শত্রুর হাতে প্রাণ দিল, জিনিষপত্র ভারে ভারে লুঠ হ’তে লাগলো।

 সূর্য পাটে নামবার আগেই শ্মশানের নিস্তব্ধতা। মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তার মধ্যেই জনবিরল পল্লী, প্রায় আবর্জনা-স্তূপে পরিণত হয়ে উঠলো।

 রাতে নামলো অঝোর ধারায় বৃষ্টি, বুঝি বা মায়ের আঁখিজল। পরের দিন সারা দিনরাত সমান তালে বৃষ্টি, বিরাম-বিশ্রাম-হীন জলধারা। আরও একদিন কেটে গেল।

 ভোরের আলো ফুটবার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল শান্তি-সেনার দল আর শোনা গেল ‘এক হো’ রব।

 ধীরে ধীরে অন্ধকার মুক্ত হয়ে—আলো জাগলো—মানুষ যেন প্রাণ পেল।

 বারান্দার সেই কোণটিতে দাঁড়িয়ে আছি, ভাবছি পরিচিত ছবি আর হয়তো চোখে আসবে না।  সবুজ লরী দ্রুতগতিতে এলো, বেকারীর গাড়ী এলো, সব শেষে এলো কালো বিরাটকায় লরী—কোনদিকে না চেয়ে বোঝা নিয়ে নামলো লোক—এ কি? কাফিখানার দরজাগুলি টুকরা হয়ে রাস্তায় প’ড়ে, কাঁচের বাসনের ভাঙা স্তূপ, লুঠ-তরাজে বীভৎস কাফিখানা, জনমানবের চিহ্ন নেই...। লোকটা নির্বাক বিস্ময়ে খানিক দাঁড়িয়ে রইলো, তারপর ধীরে ধীরে ড্রাইভারের পাশে বসলো—গাড়ীটা দুলে উঠলো, তারপর চ’লে গেল গন্তব্য পথে।

 আর একটু পরে দেখলাম—ভাঙা বস্তির স্তূপ থেকে বেরিয়ে আসছে দু’টি ছেলে-মেয়ে হাত ধরাধরি ক’রে। অনেক কেঁদেছে তারা, ভীতি-বিবর্ণতার ছাপ এখনও মুখ থেকে মুছে যায়নি। কোথায় তাদের কে চ’লে গেছে; ম’রে গেছে তারা জানে না। দু’দিন বাদে ক্ষুধার তাড়নায় দু’জনে বোধ হয় বেরিয়ে পড়েছে।

 এরা আমার পরিচিত কিনা দেখবার জন্য ভালো ক’রে দৃষ্টি ফেরালাম। হ্যাঁ, প্রতিদিন এরা দু’জনে খেলা করতো, হাইড্রেনের জল নিয়ে ছিটাতো, মারামারি করতো, আবার খাবার পেলে কাউকে না দিয়ে খেতো না—একদণ্ড কাছ ছাড়াছাড়ি হতো না, এরা তো তারাই—রহিম পানওয়ালার ছোট্ট ছেলে আকবর আর ফুলুরীওয়ালা লছমন সিং-এর সাত বছরের মেয়ে কলাবতী...।