বিষয়বস্তুতে চলুন

দুধ-ভাত/ছায়া

উইকিসংকলন থেকে

ছায়া

 ভট্টাচার্যিদের মস্ত ঠাকুরদালানটা এখন খালি প’ড়ে আছে —খাঁ খাঁ করে। ওদের অত বড় বিরাট পরিবার সব ছড়িয়ে ছত্রাকার হয়ে গেছে। কেউ গেছে বিদেশে, কেউ সহরে,—তা ছাড়া অনেকের অকালমৃত্যু ঘটেছে। অত বড় বিরাট পরিবারে একমাত্র ছোট তরফের একটি মাত্র ছেলে —ঐ আধভাঙা বাড়ীতে আসর জাগিয়ে আছে। আগের দিনের সে দীপ্তি নেই, না আছে ভিতরবাহির মহলের সেই গম্‌গমে ভাব —সেই জাঁকজমক, ঝাড়লণ্ঠনের আলো জ্বালা—কিছুই নেই। প্রতিবার পূজোয় সাতখানা গ্রাম নিমন্ত্রিত হয়ে আসতো এই হরিশ ভট্টাচার্যিদের বাড়ী। সে কি বিরাট ব্যাপার—আমোদ-আহ্লাদ, খাওয়া-দাওয়া, বাজনা-বাদ্যি—কোলকাতা থেকে যাত্রা-থিয়েটার সব আসতো। সাত দিন শুধু কাঙালীভোজন। তা ছাড়া তাদের বাড়ীর সাধারণ জীবনযাত্রাও একটা ছোটখাট পূজার মত। লোকজনের হাঁকডাকে বাড়ীটা যেন জীবন্ত হয়ে থাকতো।

 সেই বাড়ী এখন নিঝুম—নিস্তব্ধ। পূর্বদিকের অংশে তিন-চারটে ঘর নিয়ে বাস করে ছোট তরফের এক বংশধর—অত বড় বাড়ীর একাংশে সে যেন টিম টিম করছে। অত বড় বাড়ীর জাঁকজমক বজায় রাখার মত সামর্থ্য নেই—নিতান্ত সাধারণ জীবনযাত্রা।

 দেবল এই ছোট তরফের বংশধর। লোকের মুখে সে পূর্বপুরুষের কত গল্পই না শুনেছে—মায়ের কাছেও কিছু কিছু শুনেছে— তবু মা যখন এ বাড়ীতে বধূবেশে এসেছিলেন তখন এ বাড়ীর ভাঙন ধরেছে। বিরাট ঠাকুর-দালানটার ফাটলগুলির দিকে চেয়ে চেয়ে দেবল তার পূর্বপুরুষের সুখ-সৌভাগ্যের কথা ভাবতো—কেমন ক’রে যে সব বদলে গেল দেবলের কচি ছোট্ট মনে কিছুতেই সে চিন্তা রূপ পেতো না। রাশভারী ঠাকুরদার বাবা অর্থাৎ দেবলের প্রপিতামহের যে প্রকাণ্ড ছবিখানা বৈঠকখানার দেওয়াল জুড়ে টাঙানো আছে, মাকড়সা যাতে নির্বিঘ্নে জাল বু’নে চলেছে, তার পাশেই তার পিতামহের ফটো—সেখানা দেখলে অত ভয় হয় না। বাবার চেহারাটা এদের পাশে মানায় না মোটে। বাবার কেমন হাল্‌কা চেহারা আর কথা। তাই বাবাকে সব কথা বলা যায়। কিন্তু কেমন ক’রে এমন হলো—দেবল সে কথা ভেবেই পায় না। এদিকের ঘরে তো কেউ আসে না—কেবল যখন সন্ধ্যা নামে, মা মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে আস্তে আস্তে বাহির বাড়ীর ঠাকুর-দালানে এসে একটা প্রদীপ জ্বেলে আর ধূনো দিয়ে শাঁখ বাজিয়ে যান। মা এত ছোট্ট—ঠাকুর-দালানে মাকে একেবারে মানায় না। কিন্তু ছোট্ট হ’লে কি হবে-মা যখন শাঁখে ফুঁ দেন তখন মায়ের শক্তির পরিচয় পায় দেবল। সারা গ্রামটায় মায়ের শঙ্খধ্বনির প্রতিধ্বনি হয়। মা গলায় কাপড় দিয়ে ঠাকুরদালানে নত হয়ে প্রণাম করেন, তারপর আবার ভিতরে চ’লে যান। অত বড় ঠাকুর-দালানে ছোট একটা পিলসুজের উপর ছোট্ট পিদীমটা ধুক ধুক ক’রে জ্বলে। এই দৃশ্য দেবল প্রতিদিনই দেখে। সকালে দুপুরে দেবল এই ঠাকুর-দালানের কাছে খেলা করে। এখানটা তার ভারী পছন্দ।

 ঠাকুর-দালানের মোটা থামের ভিতর দেবল তার পূর্বপুরুষের রূপকথা অন্বেষণ ক’রে বেড়ায়।

 দালানের কার্নিশে অনেকগুলি পায়রা বংশপরম্পরায় বাস ক’রে আসছে—তাদের বিরাট পরিবার। মা’র কাছে শুনেছে পায়রারা নাকি বরাবর ছিল—কম আর বেশী, তবে বাইরের কার্নিশে ওদের থাকবার জন্য কাঠের ঘর ক’রে দেওয়া হয়েছিল দেওয়ালে—এখন সে সব ভেঙেচুরে গেছে। কেই বা দেখছে ওদের—তাই ওরা ঠাকুরদালানের ভিতর আশ্রয় নিয়েছে—সেইখানেই তাদের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে।

 দেবল তাই ওদের সব সময় নিরীক্ষণ করতো। ওদের পূর্বপুরুষও এইখানে বড় হয়েছে, এই দালানে উড়ে বেড়িয়েছে, ভট্টাচার্যি বাড়ীর সব সুখ-ঐশ্বর্য দেখেছে, সমারোহের পরিচয় পেয়েছে। দেবল ভাবে: ওরা যদি কথা বলতে পারতো—ঐ দল বেঁধে উ’ড়ে যাওয়ার পত্ পত্ শব্দের মধ্যে দিয়ে ওরা যদি দেবলের ডাক শুনতে পেতো তাহ’লে দেবল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনে নিতো—তার ঠাকুরদার কথা, ঠাকুরদার বাবার কথা। ছবি দেখে তার কেমন ভয় ভয় করে—কিন্তু কেমন ছিলেন তাঁরা—কেমন ছিলো এ বাড়ী— কেনই বা সব তাদের চ’লে গেল,—সেই সব গল্প শুনতে ইচ্ছা করে দেবলের।

 কিন্তু পায়রারা ঝাঁক বেঁধে উ’ড়ে চলে, আবার তারা ফেরে, সারা কার্নিশে ঘু’রে বেড়ায়, ছাদের আল্সেতে উড়ে গিয়ে বসে, মুখে বক্‌ বক্‌ম শব্দ ক’রে মনের কথা ব’লে যায়।

 প্রতিদিন দেখে দেখে দেবল ওদের জীবনযাত্রার প্রণালী মুখস্থ ক’রে ফেলেছে। ওদের বিরাট পরিবার—তবে ছড়িয়ে থাকে। পাশের বাড়ীর জ্যাঠাইমা যে দিন আধ মণ মুগ ছাদে রোদে দিয়েছিলেন সে দিন যেন এদের পরিবারের সেখানে নিমন্ত্রণ ছিল। এটা কিন্তু ভালো লাগে না দেবলের। ওরা রোদে দিয়েছে ব’লে গোষ্ঠীবর্গ মিলে খেতে যেতে হবে—এ ভারী অন্যায়! কেমন বক্ বক্‌ ক’রে ডেকে নিয়ে যাওয়া সবাইকে! কেবল এদের বুড়ী ঠাকুরমা আর যায় নি। ওরা কার্নিশের খাঁজের মধ্যে ঢুকে ব’সে থাকে, মাঝে মাঝে কি যেন বলে আবার চুপ হয়ে যায়।

 দেবল ভাবে কি করে ওরা ওখানে!

 সেদিন দেবল দেখলে একটা পায়রার ডিম ভেঙে ছড়িয়ে প’ড়ে আছে ঠাকুর-দালানে ওঠবার সিঁড়িতে,—আর তারই ওপরের কার্নিশে ব’সে পায়রা- মা জোরে জোরে বক্ বক্‌ম করছে। সবাইকে জানাচ্ছে তার তিনটে ডিমের ভিতর একটা প’ড়ে নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু মুখে সে যাই বলুক, বাকী ডিম দুটোর উপর সে নিজের সারা শরীর দিয়ে ঢেকে গরম রেখেছে, তা ফুটবে ফুটবে আর কি!

 বেচারী পায়রা-মা! একটা বাচ্চা তার নষ্ট হলো। দেবল সেই দিকে তাকিয়ে ভাবছে, একটা মোটা থামের গায়ে হেলান দিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বৈঠকখানার ঘরটা তার সামনে কোণাকুণি ভাবে পড়েছে, জানলার একটা অংশ দিয়ে ঠাকুরদা ও তাঁর বাবার সেই মস্ত ছবি দুখানার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। ঐ বড় ছবি দু’খানা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে দেবলের কাছে। দেবল একবার পায়রা-মা’র করুণ কণ্ঠের শব্দ শোনে—আর মাঝে মাঝে ফি’রে তাকায় সেই জানলার খোলা অংশের দিকে।

 বুড়ো পায়রা ডেকে উঠলো: বলো তো গিন্নি, এদের বাড়ীর বাচ্চা ছেলেটা কি চায়? দেখেছ, ও যতক্ষণ বাড়ীতে থাকে এই দালানে ঘুর ঘুর ক’রে বেড়ায়?

 পায়বা-গিন্নী সারা দেহ ফুলিয়ে ঘাড়ে মুখ ঢুকিয়ে আরাম ক’রে চোখ বুজে ছিল,—ঘাড়টা তুলে মুখটা একবার ঘষে নিয়ে কর্তাকে বললে: কি চায় জানো না? ও কেবলই জানতে চায়, শুনতে চায় ওর পূর্বপুরুষদের কথা, কি রকম ছিল তারা, তাদের সব গেলই বা কেন!

 —কিন্তু জেনেই বা ও কি করবে?

 গিন্নী ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো: জেনে আবার করবে কি? তোমার সাতপুরুষ ধ’রে যে এই ভিটেয় বাস—সব জানো, তবুও তুমি কি পুরোনো কথা নিয়ে বলাবলি করো না? ও বাচ্চা ছেলে, ওর তো জানতে ইচ্ছা করবেই। মা’র কাছে যা শোনে তাতে ওর মন ওঠে না। দেখো না, ও এই কর্তাদের বড় ছবিগুলোর দিকে কেমন ক’রে তাকিয়ে থাকে!

 —হ্যাঁ, তা তো দেখি, আর এদিক ছেড়ে ও যেতেই চায় না।  —ওদের কি না ছিল বলো। তোমার মা’র কাছে যে সব গল্প শুনেছি তার কি-ই বা ও দেখলো!

 দেবল সবিস্ময়ে দেখলো —সন্ধ্যার মৃদু আলোক জানলা দিয়ে বৈঠকখানার ঘরের ভিতর পড়েছে—পিতামহ ও প্রপিতামহের প্রকাণ্ড ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে যেন কথা বলছে। প্রপিতামহের দীর্ঘ বলিষ্ঠ চেহারা, খালি গায়ে শুভ্র পৈতার গোছাট। যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর সামনে পিতামহ নতমস্তকে দাড়িয়ে।... তিরস্কারের ধ্বনি অস্পষ্ট কানে আসে দেবলের, অন্য দিকে পায়রা- গিন্নীর গল্পের ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দ বক্‌ বক্‌ম, বক্‌ বক্‌ম।

 দীর্ঘ বলিষ্ঠ চেহারা ক্রমে ক্রমে অস্পষ্ট হতে থাকে, পিতামহ সস্নেহ দৃষ্টিতে যেন দেবলকে আশীর্বাদ করেন। কি স্নেহময় মমতাভরা দৃষ্টি! দেবলের ইচ্ছা করে দৌড়ে গিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কিন্তু সে পারে না, কেমন যেন ভয় ভয় করে। আবার মুখ তুলে দেবল দৃষ্টিপাত করে বৈঠকখানার ঘরের দিকে। স্নেহপূর্ণ মুখটা ক্রমশঃ যেন মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের সঙ্গে, কেবল একটি কণ্ঠ শুনতে পায় সে: তুমি আবার পূর্বপুরুষের গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারবে। আমার বাবা, যার ছবি দেখে তুমি ভয় পাও, তাঁর কথা চন্দ্র-সূর্য ওঠার মত সত্য, জীবনে তিনি মিথ্যা বলেননি, তাঁর কথা এইমাত্র শুনলে—তিনি বলছেন—তুমি পারবে, দেবল, তুমিই পারবে। ভয় কি দাদু, শক্তি রাখো মনে।—দেবল আর শুনতে পায় না। তার নিজের অজ্ঞাতে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে—দাদু! দাদু!  সে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় ঠাকুর-দালানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে—দাদু! দাদু!

 বিস্মিত দেবলের সকল দৃশ্যপট বদলে দিয়ে সন্ধ্যার শাঁখ বেজে ওঠে—পুঁ—উ—উ—

 দেবল চোখ ফিরিয়ে দেখে ঠাকুর-দালানে প্রণতা মায়ের ছোট্ট মূর্তিটি। আবার বৈঠকখানার জানলা দিয়ে দৃষ্টি দেয়, কিন্তু অন্ধকারে ছবি দুটো মিশে গেছে। কানে আসে কেবল চিরদিনের বাসিন্দাদের পরিচিত সুর—বক্ বক্‌ম! বক্‌ বক্‌ম!